নীলু সুলতানা
সাগরে চলতে চলতে যাত্রীবাহী জাহাজ মেরি সেলেস্টির অদৃশ্য হয়ে যাবার ঘটনা একসময় আলোড়ন তুলেছিল। মানুষ এই রহস্যের কিনারা করতে পারেনি। তবে অদৃশ্য হয়ে যাবার এরকম আরও কিছু ঘটনা আছে, ইতিহাসের পাতায় হয়তো তেমন ভাবে স্থান পায়নি। সেগুলোর ব্যাখ্যা আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি। হয়তো কোন দিন পাওয়া যাবেও না।
১৭০২Ñ১৭১৪ সালের স্প্যানিশ ওয়ার অভ সাকসেশন-এর নিখোঁজ চার হাজার সেনার কথাই প্রথমে ধরা যাক। সশস্ত্র এই দলটি পিরেনিজ পর্বতমালার নিচে ক্যাম্প করেছিল। একদিন সকালে তারা ক্যাম্প গুটিয়ে ফেলে। এরপরে আর তাদের খোঁজ পাওয়া যায়নি। সমস্ত রসদসহ একেবারে বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছিল যেন অতবড় দলটা। আজও কেউ জানে না তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছে।
১৯২৪ সালে, মিশরের মরুভূমিতে একটি হালকা প্লেনের দুই ক্রু হঠাৎ করেই হারিয়ে যায়। তাদের প্লেনে রেডিও ছিল না। বেস-এ ফিরে আসার নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাবার পরে তাদের সন্ধানে সার্চ পার্টি নেমে পড়ে। হারানো প্লেনটির খোঁজ পাওয়া যায় মরুভূমিতে। পড়ে আছে। প্লেনটির সবই ঠিকঠাক। কিন্তু ক্রু দু'জনের কোন খবর নেই। শুধু বালুতে তাদের পায়ের ছাপ দেখা গেল। পঞ্চাশ গজের মত জায়গা তারা হেঁটে এগিয়েছে ছাপ দেখে বোঝা যায়। কিন্তু তারপর আর কোন চিহ্ন নেই তাদের। তাহলে কোথায় গেল লোক দুটো? গোটা এলাকা তন্নতন্ন করে খুঁজেও তাদের হদিস মিলল না।
শুধু যে সেনাবাহিনী বা পাইলটদের জীবনে এমন রহস্যময় ঘটনা ঘটেছে তা নয়, সাধারণ মানুষও এমন বিচিত্র ঘটনার শিকার হয়েছে। আমেরিকার টেনিসি রাজ্যের গ্যালাটিন গ্রামের এক কৃষক, ল্যাং, ১৮৮০ সালের ২৩ সেপ্টেম্বরের বিকেলে, বলতে গেলে বহু লোকের চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছে। ঘর থেকে বেরুবার সময় তার ১১ বছরের মেয়ে সারাহ্ এবং ৮ বছরের ছেলে ডেভিড উঠনে খেলা করছিল। স্থানীয় এক বিচারপতি, অগাস্টাস পিক তাঁর এক বন্ধুকে নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে ওদিক দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ ঘোড়াটা গর্তে পড়ে যায়। অগাস্টাস পিক চেঁচিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ল্যাং-এর। তাঁদেরকে সাহায্য করতে বলেন। ল্যাং হাত নেড়ে ইশারা করে। বলে আসছে। হাঁটতে শুরু করে সে। কিন্তু মাঠ ধরে কিছুদূর এগোবার পরে হঠাৎ নেই হয়ে যায় ল্যাং।
ল্যাংকে চোখের সামনে অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখে বিমূঢ় হয়ে পড়েন বিচারপতি এবং তার বন্ধু। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে পড়েন তাঁরা, দৌড়ে যান মাঠে। কিন্তু ল্যাংকে দেখতে পাননি কোথাও। মাঠে কোন গর্ত নেই যে তার মধ্যে পড়ে যেতে পারে ল্যাং। নিটোল, সমান মাঠ। তাহলে কোথায় গেল ল্যাং? অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ল্যাং যেখানে অদৃশ্য হয়ে গেছে, সেখানে বৃত্তাকারে ঘাসের বেশ বড় একটা চাপড়া গজিয়ে ওঠে এক বছরের মাথায়। ল্যাং-এর বাচ্চারা বলেছে, তারা ওখান থেকে তাদের বাবার গলা শুনতে পেয়েছে। সাহায্যের জন্যে নাকি চিৎকার করছিল ল্যাং। কিন্তু ল্যাং-এর এই আকস্মিক অন্তর্ধান রহস্য রহস্যই থেকে গেছে। এর কোন সন্তোষ-জনক ব্যাখ্যা মেলেনি।
১৯৪৪ সালে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে জাপানীরা প্রশান্ত মহাসাগর থেকে বিতাড়িত হচ্ছে, ওই সময় দু'টি আমেরিকান হেলডাইভার বম্বার, প্রতিটিতে তিনজন করে ক্রু, বেরিয়েছিল রুটিন টহলে। তারা পলায়নরত কোন শত্রু জাহাজ বা সাবমেরিন খুঁজে বেরুচ্ছিল। টেক-অফের ঘণ্টাখানেক পরে, এয়ারফিল্ড পেট্রল লীডারের কাছ থেকে একটি মেসেজ পেল। লীডার বলছে তাদের প্রত্যেকের প্লেনের কম্পাস হঠাৎ পাগলামি শুরু করে দিয়েছে। সঠিক দিক নির্দেশনা পাওয়া যাচ্ছে না। ক্রুরা বুঝতে পারছে না তারা কোথায় যাবে বা যাচ্ছে। আরও বারকয়েক সাহায্য প্রার্থনার পরে একটি বিশাল ফ্লাইং বোট পাঠিয়ে দেয়া হলো তাদের সাহায্যের জন্যে। বোটটিতে ক্রুর সংখ্যা তেরো, দু'জন নেভিগেটরও আছে। কিন্তু হেলডাইভারের পজিশনে পৌঁছার পরে ওটাও সাহায্যের জন্যে আবেদন পাঠাতে শুরু করল। ফ্লাইং বোটের চারটে কম্পাসই উল্টো পাল্টা কাঁপাকাঁপি শুরু করে দিয়েছে। খানিক পরে আর ওদের সাহায্য প্রার্থনা শোনা গেল না। ভোজবাজির মত দু'টি হেলডাইভার সহ ফ্লাইংবোটটিও অদৃশ্য হয়ে গেল। অথচ আশপাশে শত মাইলের মধ্যে শত্রুপক্ষের কোন প্লেন ছিল না যাতে ব্যাখ্যা করা যেত শত্রুর হাতে ধ্বংস হয়েছে তারা। বহু খোঁজাখুঁজি করেও ওগুলোর আর সন্ধান মেলেনি। এরা সব কোথায় গেল? এটা এখনও রহস্য হয়েই আছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



