somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ ছাদের রেলিঙে আশফাকুর রহমানের টেবিল ল্যাম্প

২৮ শে জুন, ২০২১ রাত ১০:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



টপ! টপ! টপ!

কাগজের ওপর পানির ফোঁটা পড়বার আওয়াজ। হালকা এবং মৃদু। তবুও, আশফাকুর রহমান স্পষ্ট শুনতে পায় সে শব্দ। বিদ্যুৎবিহীন ছোট এক কামরায়, আশফাকুর রহমানের মাথার তালুর স্বেদগ্রন্থি থেকে উৎসারিত স্বেদবিন্দুর স্রোত তার বিস্তৃত কপাল বেয়ে নাকের ডগা হয়ে সম্মুখে রাখা টালি খাতার ওপর আছড়ে পড়ার আগে ঝলকে ওঠে দূরবর্তী টেবিল ল্যাম্পের ঈষৎ ঘোলাটে সাদা আলোয়। সে ঘরে ফ্যান ঘোরে না, সে ঘরে কেউ কথা কয় না, সে ঘরে বাতাসের প্রবাহ যেন অনাদিকাল থেকে বন্ধ।

টপ! টপ! টপ!

টালি খাতার ওপর অঙ্কিত রেখাচিত্রের দুরূহ নকশার কোল ঘেঁষে নহরের মতো প্রবাহিত হয় তিনফোঁটা পানি। আশফাকের মাথার ঘাম। অল্প একটু পথ। দুটো সরল রেখা। তিনচারটে যুক্তাক্ষর আর অঙ্ক। স্বেদবিন্দুর গতি থেমে যায়। তারা বসে পড়ে খাতার বুকে। মিলিয়ে যায়।

আশফাকুর রহমান তর্জনী দিয়ে ঠেলে তার পাতলা রিমের চশমা ওপরে তুলে আনে। দীর্ঘদিন যাবত একটি মোটা ফ্রেম কাঁচ বদলে ব্যবহার করা হচ্ছিল। সম্প্রতি তার ডাক্তার ভাইঝি তাকে উপহার দিয়েছে এই হালকা - আরামদায়ক ফ্রেম। হঠাৎ আশফাকের মনে পড়ে যায় সেই ফ্রেমের কথা। দীর্ঘদিনের পুরনো সঙ্গী বলে , ফ্রেম বদলানোর পরেও, আগের ফ্রেমটি ফেলে দেয় নি সে। আছে কোথাও আসেপাশে। কোন ওয়ার্ডরোব, বা টেবিলের ওপর। আশফাক নড়ে চড়ে বসে ডানে বামে তাকায়।

খেয়াল করে, এই গরমেও রুমের জানালা বন্ধ। ইলেক্ট্রিসিটি নেই বেশ কিছুক্ষণ। তবুও কেন জানালা বন্ধ এই প্রশ্ন তাকে হালকাভাবে নাড়া দিয়ে গেলেও বেশীক্ষণ সে এই প্রশ্নে আটকে থাকতে পারে না। আশফাক এখন একটা কাজের মধ্যে আটক। উঠে জানালা খুলতে খুলতে চিন্তা করে - বৈশাখ মাসে এ কি ভয়াবহ গরম! কি কারণ হতে পারে? পত্রপত্রিকার খবর পড়লে বোঝা যায়, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে বদলে গেছে বাংলাদেশের পরিবেশ। গলছে মেরু অঞ্চলের বরফ। পৃথিবী জুড়ে বাড়ছে সাগরের পানির উচ্চতা। ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বায়ুমণ্ডলের ওজনস্তর। ক্ষতিকর সব রশ্নি ধেয়ে আসছে ভূমণ্ডলে। আচ্ছা, নদীভাঙ্গনের ফলে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল আর ঘরবাড়ি যে তলিয়ে যাচ্ছে, তাও কী এই বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলাফল? নাকি এর পেছনেও আছে ভারতের ষড়যন্ত্র?

আশফাকের চিন্তা এ পর্যায়ে এসে আটকে যায়। কোন স্থির সিদ্ধান্তে তার পক্ষে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। অফিসের কলিগ ওয়ালীউল্লাহ সাহেবকে ফোন দিলে তিনি হয়তো একটা ধারণা দিতে পারতেন। সাত পাঁচ চিন্তা করে এই অন্ধকারে আর মোবাইল খুঁজতে মন চায় না তার। ইলেক্ট্রিসিটি নেই প্রায় ঘণ্টাখানেক। কবে আসবে?

- 'দু'টা মোমবাতি কিনে এনেছে এইমাত্র, লুতফা, নীচে থেকে। ছয় যোগ ছয়, বারোটাকা। ওটাও মনে করে খাতায় তুলে রেখো।'
স্ত্রী ফাহমিদা পাশে দিয়ে যাওয়ার সময় ফোঁড়ন কাটে।

প্রতি সন্ধ্যায় ধর্মগ্রন্থ খুলে বসার মতো গুরুত্ব সহকারে, নিয়মমাফিক, দৈনন্দিন হিসাবনিকাশের টালি খাতা খুলে বসার অভ্যাসকে আশফাকের পরিবারের সবাই বিদ্রূপের চোখে দেখে। আশফাকের তাতে খুব একটা আপত্তি নেই। 'এ ম্যান হ্যাজ টু ডু হিজ ডিউটি। অ্যান্ড দা শো মাস্ট গো অন।'

আশফাক পুনরায় মনোযোগ তার খাতায় ফিরিয়ে আনে। ঘামের ফোঁটা শুকিয়ে গেছে দ্রুত। আশফাক একবার খাতার পাতায় হাত বোলায়। সে স্পর্শে থাকে যত্ন, আর ভালোবাসার ছাপ। একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেলে পৃষ্ঠার একদম ওপরে লেখে ২৭ এপ্রিল ২০১৯। তারপর, নীচে, দুটো কলাম তৈরি করে বামপাশের কলামের ওপরে শিরোনাম লেখে 'খরচের খাত' , ডানপাশে শিরোনাম হয় 'খরচের অঙ্ক' ।

১। যাতায়াত = রিকশা ভাড়া (২৫ + ২৫) ৫০ টাকা
= বাসভাড়া (১৫ + ১৫) ৩০ টাকা
২। পিয়ন মনসুরের বোনের বিয়ে = ৫০০ টাকা
৩। লুতফার ভার্সিটির দৈনিক খরচ = ৩০০ টাকা
৪। নুডুলস ১৬ টার প্যাকেট = ২৫০ টাকা
৫। ম্যাগি টেস্টিং সল্ট ১ ডজন = ৬০ টাকা
৬। ডিম ২ ডজন = ২০০ টাকা
৭। সরিষার তেল = ২৫৫ টাকা
৮। ইস্পি ড্রিংক = ২২০ টাকা

মোট = ১৮৬৫ টাকা

আশফাক মুখে মুখে একবার হিসাব করলে, যোগফল হল ১৮৫৫ টাকা। তারপর ক্যালকুলেটরে যোগ করলে যোগফল হল ১৮৬৫ টাকা। অতঃপর ক্যালকুলেটরের হিসেবকেই সঠিক ধরে নেয়া। টাকার অঙ্কটা নীচে লিখে পেছনের পাতাগুলো ওলটানো শুরু করলে দেখা যায়, মাসের ১ থেকে ২৭ তারিখের মধ্যে মাত্র ৬ দিন দৈনিক খরচের অঙ্ক ১০০০ টাকার নীচে ছিল। লম্বা একটা শ্বাস ফেলে আশফাক টালি খাতাটা বন্ধ করা মাত্রই , কাকতালীয়ভাবে, কারো কোন স্পর্শ ছাড়াই, রুম জুড়ে টিমটিমিয়ে আলো ছড়ানো টেবিল ল্যাম্পটা নিভে গেলো। আশফাক কিছুটা অবাক হলেও মুখে কিছু বললো না। হালকা হেলান দিয়ে বসলো বরং বেতের সোফায়। মাথার পেছনে হাত রেখে চোখ বুজে বসলে খানিকটা আরামও লাগা শুরু হল, এই গুমোট গরমের মাঝে।

একটু পর আশফাকের মনে পড়লো, আজ প্রায় তিনমাস হয়েছে, এ টেবিল ল্যাম্পে কোন চার্জ দেয়া হচ্ছে না। প্লাগ হারিয়ে গেছে। অন্য কোন প্লাগের পিন এই ল্যাম্পের পোর্টের সঙ্গে মেলে না। তারমানে, গত তিন মাস ধরে ল্যাম্পটা তাদের আলো দিয়ে চলেছে কোন রকম চার্জ নেয়া ছাড়াই। এই চিন্তা থেকে, ল্যাম্পটার চার্জার খুঁজে পাওয়া গেলো কিনা, তার খোঁজ নেয়াটা আশফাকের নৈতিক দায়িত্ব বলেই মনে হোল।

- 'টেবিল ল্যাম্পটার চার্জার খুঁজে পেয়েছ ফাহমিদা? নিভে গেলো যে ওটা ...'

- 'পাই নাই খুঁজে' রান্নাঘর থেকে ফাহমিদা উত্তর দেয়, 'নিভে গেলে মাথার পেছনে দুটো বাড়ি দাও, আপনাতেই চালু হয়ে যাবে।'

চাইনিজ বাতির ওপর চাইনিজ টেকনিকের প্রয়োগ। স্ত্রী'র পরামর্শ মতো আশফাক সাহেব আস্তে আস্তে ল্যাম্পটার পেছনে মৃদু চাপড় দিতে থাকে। বারকয়েক ব্যাটারিতে চাপড় খাওয়ার পর তা তীব্র আলো সহকারে জ্বলে ওঠে। আশফাক কিছুটা অবাক হয় এই আলোয়। কিন্তু বাতিটার গায়ের সুইচ ঘুরিয়ে আলোর তীব্রতা কমানোর সাহস তার আর হয় না। পাছে যদি আবার আলো বন্ধ হয়ে যায়!

- 'কি, জ্বলেছে?' রান্নাঘর থেকে ফাহমিদার কণ্ঠ ভেসে আসে।

- 'হ্যাঁ!' আশফাকও সজোরে জবাব দেয়।

- 'তুমি আইপিএসটা ঠিক করাচ্ছ না কেন বলতো! ইলেক্ট্রিশিয়ান ছেলেটা, কি যেন ওর নাম, আনিস বোধয়, ওকে ফোন দিলে তো ও নিজে এসে ঠিক করে দিয়ে যায়। অন্তত দেখে তো বলতে পারে যে মেশিন গিয়েছে, না ব্যাটারি নষ্ট।'

- 'ব্যাটারিতে ডিস্টিলড ওয়াটার লাগবে বোধয় ...' এর চে বেশী খরচের কথা মনে করতে আশফাকের মন সায় দেয় না।

- 'ঠিক আছে, তা আনিসই এসে বলুক না!' রান্নাঘর থেকে আবারো ফাহমিদার বিরক্তি মিশ্রিত কণ্ঠ ভেসে আসে।

- 'মা, আজ ডেলিভারি ম্যান এসেছিল আমার পার্সেল নিয়ে?'

আশফাক আর ফাহমিদার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কন্যা লুতফার আগমন ঘটে প্রেক্ষাপটে। পায়ে পায়ে হেঁটে সে বেরিয়ে এসেছে তার রুম থেকে ড্রয়িং রুমে। উচ্চকিত কণ্ঠে সে জানতে চাইছে কিছু, কিন্তু তার দুহাতের দশটি আঙ্গুল খুব ব্যস্ত ভঙ্গীতে কাজ করে চলেছে হাতে ধরে রাখা মোবাইলের স্ক্রিনে। তার কণ্ঠে উৎকণ্ঠা, কিন্তু চেহারায় নির্লিপ্ততা। আশফাক মনোযোগ দিয়ে তার কন্যার দিকে চেয়ে থেকেও ঠাহর করতে পারে না, কোন ফাঁকে তার কন্যার মাঝে এতো পরিবর্তন এলো। কতো মসৃণতার সঙ্গে মাল্টি টাস্কিং করছে সে!

- 'কেন, তুই বাসায় ছিলি না? তোকে ফোন দেয় নাই?'

- ' না। ফোন আসে নি কোন। এ জন্যেই তো জিজ্ঞেস করছি...'

আশফাক স্ত্রী কন্যার সংলাপ থেকে মনোযোগ সরিয়ে হেলান দিয়ে বসে পুনরায় সোফায়। অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে রোজ ইফতারের সময় হয়ে যায়। রোজার মাস। রাস্তা জুড়ে শেষ বিকেলে মানুষের ভিড়। যানবাহনে একটা সিট নিয়ে প্রবল লড়াই। তারপর, বাড়ির নিকটবর্তী বাসস্টপেজে নেমে কপাল ভালো থাকলে একটা রিকশা জোটানো। মাসের শেষ পাঁচদিন তো রিকশা দেখলেও দূরের কোন বাহন মনে হয়। ডাকার জন্যে হাত ওঠাতে গেলে হাতেরও যেন নিজস্ব একটা মতামত তৈরি হয়ে যায়। পকেটে থাকলে পকেট ছেড়ে বেরুতে চায় না। নীচে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকলে আর ওপরে উঠতে চায় না। আর কোন সদাইপাতি ধরে রাখলে তো কথাই নেই। তবুও আজ খুব ক্লান্ত লাগছিল বলেই, মাসের সাতাশ তারিখেও নিতান্ত অনিচ্ছা সত্যেও একটা রিকশা নেয়া। রিকশায় উঠেই বা শান্তি কোথায়? রিকশাওয়ালা করুন স্বরে পুরোটা রাস্তা জুড়ে কেবল বিলাপ করে গেলো। সবকিছুর দাম বাড়ে। চাল-ডাল-তেল-নুন-চিনি। শুধু বাড়ে না রিকশাভাড়া। সে কীভাবে তার সংসার চালায় ভাড়া এতো কম হলে? কীভাবে তার ছেলের মাদরাসার খরচ জোগাবে সে? তার মেয়ের বিয়ে হবে কীভাবে? বউএর নিতান্ত প্রয়োজনীয় একটা শাড়ি? এক কামরার রুমভাড়া?

আশফাক যখন রিকশা থেকে নেমে দাঁড়ায়, তখন সামনে স্রেফ রিকশাওয়ালা নয়, দাঁড়িয়ে থাকে ছেঁড়া শাড়ি গায়ে রিকশাওয়ালার বৌ, মাদরাসার বেতনের কার্ড হাতে তার ছেলে, ভাতের থালা হাতে তার মেয়ে, এমন কি ধুমসে মোটা বাড়িওয়ালাও, তার বাড়িভাড়ার দাবীতে। আশফাক পকেট হাতড়ে বোঝে, বেশী দেয়ার মতো অতিরিক্ত পাঁচটাকার দোমড়ানো মোচড়ানো ছেঁড়া একটা নোটই কেবল আছে তার উদ্বৃত্ত। কিন্তু এই নোট ভিখারিকে দিলে সেও মুখের ওপর ছুঁড়ে মারবে, আর এ তো গতরে খাটা রিকশাওয়ালা। আশফাক রিকশাওয়ালার হাতে ঠিক করা ভাড়াটুকুই তুলে দিয়ে, তার জ্বলন্ত চাহুনি এড়িয়ে পায়ে পায়ে তার বাসার সদর দরজার দিকে এগিয়ে যান। মানসম্মানের বোধ দিনকে দিন সবার টনটনে হচ্ছে, স্রেফ তার মতো ছোট সরকারি চাকুরেদের ছাড়া।

- 'এতো এতো মালামাল অনলাইনে অর্ডার করার বদলে ভাবছি নিজেই একটা অনলাইন শপ খুলে ফেলি না কেন ...' রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে মোবাইল টিপতে টিপতে বলে লুতফা।

- 'ওরে বাবা! এতোসব মালামাল অনলাইনে অর্ডার করতে খারাপ লাগছে বলে নিজেই এখন দশরকমের প্রোডাক্টের ব্যবসা অনলাইনে শুরু করবি?' কন্যার প্রস্তাবে ফাহমিদা বিস্মিত হন।

- 'আরে না! ওটা তো বলার জন্যে বলা। যেকোনো একটা প্রোডাক্টের ব্যবসা শুরু করবো আগে।'

- 'এটা ভালো বুদ্ধি!' এবার কন্যার প্রস্তাব ফাহমিদার যুক্তিসঙ্গত মনে হয়, 'তা ব্যবসা করবি কিসের?'

- ' জানি না। শাড়ি হতে পারে, সালোয়ার কামিজ হতে পারে, পাঞ্জাবীও হতে পারে। আবার হাতে বানানো গয়নাগাটিরো হতে পারে।' মোবাইল স্ক্রিনে আঙ্গুলকে ব্যস্ত রাখতে রাখতেই উত্তর দেয় লুতফা।

- 'ভালো তো! তো, শুরু করছিস না কেন? শুরু করে ফেল। যত দেরি হবে, প্রতিযোগিতা তত বাড়বে, ব্যবসা দাঁড়া করাতে সময় লেগে যাবে তত।'

- 'বাহ মা! তুমি দেখি ব্যবসা বাণিজ্য ভালোই বোঝো!'

- 'বুঝবো না কেন? এ আর এমন কি রকেট সায়েন্স!' মেয়ের প্রশংসায় খুশী মনে হয় ফাহমিদাকে। সমঝদারের মতো বলেন, 'যাই হোক, দেরি করিস না আর। শুরু করে দে আল্লার নাম নিয়ে।'

- 'টাকা লাগবে বেশ কিছু।'

কন্যার এ কথার প্রেক্ষিতে অবশ্য দীর্ঘক্ষণ যাবত ফাহমিদাকে কিছু বলতে শোনা যায় না।

- 'তোর বাবাকে বল।' রান্নাঘর থেকে হাত মুছতে মুছতে বেরিয়ে আসেন ফাহমিদা।

সোফায় চোখ বন্ধ করে হেলান দিয়ে বসে থাকা আশফাক মা ও মেয়ের সম্পূর্ণ কথোপকথন, এবং কথোপকথন শেষে কন্যার পায়ে পায়ে তার পাশের সোফায় এসে বসে পড়া - সবই শুনতে পায়।

- 'বাবা, তুমি কী চাও না তোমার মেয়ে জীবনে অনেক সফল, আর অনেক প্রতিষ্ঠিত হোক?'

আশফাক তার মেয়ের প্রশ্ন শোনে। কিন্তু এ চাতুর্যে পূর্ণ প্রশ্নের কোন জবাব হঠাৎ করে খুঁজে পান না।

- 'আমার তো মনে হয় এ জন্যেই আমি তোকে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি করিয়েছি...'

এবার আশফাকের সুচিন্তিত বক্তব্যে মুখে কুলুপ পড়ে তার কন্যার। একটু পর, বয়সের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে, যুক্তির বদলে যুক্তি উপস্থাপনের বদলে আবেগি চিৎকার চ্যাঁচামেচিকেই নিজের প্রধান অস্ত্র বানিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে লুতফা, তার বাবার ওপর।

- 'এও একটা কথা! হাজার হাজার ছেলেমেয়ে পড়ে ভার্সিটিতে। তাদের সবাই কী সফল আর প্রতিষ্ঠিত হয় জীবনে? বড় কিছু করার জন্যে, সুপ্রতিষ্ঠিত হবার জন্যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাগবেই - এ একটা ভুল শিক্ষা দিয়ে তোমরা আমাদের তরুণ প্রজন্মকে বড় করছ বাবা!'

আশফাক এতক্ষণ ইলেক্ট্রিসিটির অভাবে যে গরম, তার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিল খানিকটা। কন্যার শিক্ষা বিষয়ক চিন্তাভাবনা, এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ভুল পথে প্রচলিত করায় তার মতো দায়গ্রস্থ পিতাদের ভূমিকা নিয়ে বক্তৃতা শুনে তার আবার গরম লাগা শুরু হয়। কারন, তার রমজানের পড়ন্ত বিকেলে অভুক্ত অবস্থায় বাসে ঝুলে আসার অভিজ্ঞতা মনে পড়ে। তার মনে পড়ে, প্রতি চার মাস অন্তর কন্যার সেমিস্টার আর কোর্স ফি বাবদ ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকার হিসাব মেলাতে গিয়ে লোকাল বাস ছাড়া অন্য কোন বাহনে চড়া হয়ে ওঠে না। কিন্তু এসব কথা মুখফুটে সে তার বিদ্রোহী কন্যাকে বলে উঠতে পারে না। তার মন সায় দেয় না।

- 'কতোটাকা লাগবে তোর অনলাইন বিজনেস স্টার্ট করতে?' মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করে আশফাক, কন্যা লুতফাকে।

- 'হাজার দশেক টাকার শাড়ি পাইকারি দোরে কিনে বাসায় রাখতে চাই আপাতত। সঙ্গে ডিজাইনের খরচ, র্যা পিং বাবদ আরও পাঁচ। পনেরো হাজার টাকা যদি হয়, টায় টায় ব্যবসাটা শুরু করতে পারি।'

আশফাক একেবারে চুপ হয়ে যায়। দীর্ঘদিনের সংসার জীবনে এই এক অভ্যাস সে রপ্ত করতে পেরেছে। উচ্চবাচ্য - ঝগড়াঝাটি করা তার ধাতে নেই। যা কিছু তার পছন্দ হয় না, কথা হোক বা কাজ, জবাবে সে একদম চুপ মেরে যায়। তার মাসিক বেতনের মধ্য থেকেই সংসারের খরচ, বাড়িভাড়া, লুতফার পড়াশোনার টাকা, হাতখরচা। প্রায়ই জমানো টাকায়ও হাত দিতে হয়। একমাত্র আনন্দের ব্যাপার, তার কোন ধারদেনা নেই কারো কাছে। এই টানাটানির সংসারে মাসের মধ্যখানে হুট করে পনেরো হাজার টাকা আশফাক জোগাড় করবে কোথা থেকে - বুঝে উঠতে পারে না।

- 'কি, কথা বলছ না যে!' উত্তেজিত লুতফার হাত থেকে মোবাইলটা নীচে পড়ে যায়। বেশ দামী মোবাইল। স্যামসাং গ্যালাক্সি সিরিজের একটা ফোন। হাজার পঁচিশেক টাকা লেগেছিল মোবাইলটা কিনতে, মাস ছয়েক আগে। আশফাক সচেতনভাবে চেষ্টা করে এইসমস্ত সংখ্যা, টাকার ডিজিট মাথা থেকে দূরে রাখতে। কিন্তু শত চেষ্টাতেও তা হয়ে ওঠে না। সংখ্যা, কেবল সংখ্যা ঘোরে তার মাথায়।

- 'ধ্যাত্তের!'

মেয়ে অন্ধকারে উবু হয়ে মোবাইল খুঁজে না পেয়ে টেবিল ল্যাম্পটা হাতে নিয়ে সেটা খুঁজে দেখার চেষ্টা করছিল। ঠিক এমন সময় বাতিটা নিভু নিভু হয়ে বন্ধই হয়ে যায় একদম। কিশোরী কন্যার ধৈর্য কম। সে দূরে আছড়ে ফেলে বাতিটাকে। অদ্ভুত ব্যাপার, সে ল্যাম্প দূরে আছড়ে পড়েও পূর্ণোদ্যমে আলো ছড়াতে থাকে। কাত হয়ে পড়ে থাকা ল্যাম্পের আলোতে তার কন্যা খুঁজে পায় মোবাইল।

- 'কি, কি বলল তোর বাবা? টাকা দেবে?'

ফাহমিদা ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে এই ফাঁকে।

- 'বাবা আর কি বলবে? চুপ করে আছে!'

- 'বলবেই বা আর কি?' ল্যাম্পটা মাটি থেকে তুলে আবারো টি টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে ফাহমিদা বলে চলে, 'শিখেছে তো এই এক জিনিস। সবকিছুতেই মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকা। সংসারে উন্নতি করতে হলে মানুষের উঠে পড়ে চেষ্টা করা লাগে। তোর বাপের জীবনে উন্নতি করার ইচ্ছা ছিল কোনোদিন? ঘানি টেনে গেলো সারাজীবন, এই চার্জারের মতো। না পারলো নিজে সুখী হতে, না শান্তি দিলো আমাকে!'

ফাহমিদার মুখ অবিরাম চলতে থাকে। কথার পীঠে চড়ে পাশের বাসার ব্যাংকার কিসলু সাহেবের কথা বলে আসে। ব্যাংকে চাকরীর পাশাপাশি শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে তার যে এখন কোটিপতির হাল, তা জানা হয়। তাদের বিল্ডিং এর পাশের খালি প্লটে যে বিল্ডার্স দালান তুলছে, তার মালিক চারজন চ্যাংড়া ছেলে, তাও জানা হয়। কারো মধ্যে যদি বৈষয়িক দূরদর্শিতা থাকে, তবে বিল্ডার্স না হোক, অন্তত পাঁচ - সাতজনে মিলে একটা জমি কিনে রাখতে পারে ঢাকার ভেতর, বা আসেপাশে। সে জায়গায় কোন ডেভলাপারকে দালান তুলতে দিলেও তো দু' - একটা ফ্ল্যাটের মালিক হয়ে একচান্সে কোটিপতি বনা যায়। এরকম আরও অজস্র ঘটনা, গল্প, আর জীবন নিয়ে আফসোস ফাহমিদার মুখ থেকে স্রোতের মতো বেরিয়ে আসে অনর্গল। ফাহমিদার জিভ যেন হাত হয়ে কপাল চাপড়ে দেয় - কেন জীবন নিয়ে এমন নিরাসক্ত, অনাকাঙ্খি, উচ্চাভিলাসবিহীন এক লোকের সংসারে তার এসে পড়া লাগলো? আশফাক বরাবরের মতোই চুপ করে বসে অপেক্ষা করতে থাকে এশার আজানের। এই আজান শেষ হলে ফাহমিদার নিজের ভাইবোনদের সঙ্গে ফোনালাপ করবার সময় শুরু হয়। এ এক নৈমিত্তিক রুটিনওয়ারি ঘটনা। সে ফোনালাপেরও মূল বিষয় জীবন নিয়ে হতাশা। এক অথর্ব মানুষের পাকেচক্রে পড়ে জীবনের অপচয়। একইরকম অসহ্যকর আশফাকের জন্য। কিন্তু আজকের এ সরাসরি, মুখোমুখি বসে আক্রমণ শানানোর চে' তার স্ত্রী অন্যকোনো রুমে গিয়ে ভাইবোনদের কাছে সাংসারিক হতাশার সাতকাহন ফেঁদে বসলে সেটা মন্দ হয় না আশফাকের জন্যে।

অনন্তকাল ধরে চলতে থাকা এই আক্ষেপের হাত থেকে আপাত মুক্তি খোঁজার জন্যেই হয়তো আশফাক আবারো মনোনিবেশ করে মিটমিটিয়ে জ্বলতে থাকা টেবিল ল্যাম্পটার দিকে। আপাদমস্তক সাদা ল্যাম্পটার গায়ের রং ময়লা হয়ে গেছে। কোথাও তার রং কালচে খয়রি, কোথাও হলদেটে ভাব। এধরণের ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি আসলে ধুয়ে মুছে ঠিকঠাক মতো পরিষ্কার করবারও উপায় নেই। দিন দিন তাই এদের চেহারা স্রেফ মলিন থেকে মলিনতর হতে থাকে।

কি যেন ভেবে আশফাক নিজের গালে হাত রাখে। হাতের তালুতে, আঙ্গুলে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি এসে লাগে। কতোদিন গেল, শেভ করা ছাড়া? সঠিক দিনের সংখ্যা তার মনে আসে না। তিন কি চারদিন হবে হয়তো। এর বেশী হবার কথা না। অফিসে যাচ্ছে সে প্রতিদিন। এর চে' বেশী হলে কারো না কারো চোখে পড়তো। কেউ না কেউ স্মরণ করিয়ে দিতো। গালে হাত বোলাতে বোলাতে আশফাক তাকিয়ে থাকে পুনরায় টেবিল ল্যাম্পটির দিকে। আলো দিচ্ছে সে এখনও মিটমিটিয়ে। চার্জ দেয়া হচ্ছে না আজ মাস তিনেক প্রায়। গায়ের রঙ মলিন। আছাড়ও খেলো এই মাত্র একটা। জ্বলছে তবুও। এতো শক্তিশালী এর ব্যাটারি! আশফাকের অবাক লাগে। কোন দেশি কোম্পানি? নাম কি এর? চশমাটা ঠেলে আবার নাকের অপর তোলে। অপরিচিত কিছু হরফ ল্যাম্পটার গায়ে অঙ্কিত। তা চায়নিজ - জাপানিজ - কোরিয়ান, যেকোনো দেশের হরফ হতে পারে।

আশফাকের মনে এই মূক যন্ত্রটির জন্যে এক অপরিচিত মায়া জেগে ওঠে। তার অবাক লাগে, কি কারণে প্রতিনিয়ত একটু একটু ক্ষয়ে গিয়ে এই বাতি আলো দিয়ে যাচ্ছে তাকে ও তার পরিবারকে? এ টেবিল ল্যাম্পের ভেতরে বৈদ্যুতিক আধানের যে ক্ষুধা, তার ব্যাপারে সচেতন নয় তারা কেউ। ওরও কী ক্ষুধায় কষ্ট হয়? যখন চার্জ ছাড়া জ্বলতে জ্বলতে হুট করে নিভে যায় একেকবার, অনেক যন্ত্রণা হয় ওর তখন? যন্ত্রণা হয় একাকীত্বের? কেউ ওকে বোঝে না, তাই? যন্ত্রের কী কষ্ট হয়, যখন সে দেখে, তিলে তিলে একটা সংসারে আলো দিতে গিয়ে সে নিজে শেষ হয়ে যাচ্ছে, অথচ তার এই আত্মত্যাগের কোন অ্যাপ্রিসিয়েশন সে পাচ্ছে না কারো কাছে? কারো সহানুভূতি ছাড়া নিষ্ঠুর এক নীরব মৃত্যুর দিকে তার পায়ে পায়ে এগিয়ে চলা, এই তার নিয়তি কেবল?

আশফাক উঠে গিয়ে ল্যাম্পটাকে তুলে এনে কোলে নিয়ে বসে। একটু পর দেখা যায় সে টেবিল ল্যাম্পটার গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, যেমন মানুষ হাত বুলিয়ে দেয় পরম আদরে, অসুস্থ কোন মানুষের গায়ে।

হঠাৎ করে প্রবল দমকা হাওয়া ঝাপটা মারে রুম জুড়ে। দড়াম দড়াম করে ঘরের দরোজা বাড়ি খায় চৌকাঠে। কাঁচের জানালাগুলো ঝনঝনিয়ে ওঠে। আশফাক চমকে ওঠে, যত না ঝোড়ো হাওয়ার দাপটে, তার চেয়েও অধিক তার কন্যা লুতফার ছোটাছুটিতে।

- 'মা! কালবোশেখির ঝড় এসেছে!!!'

লুতফার কণ্ঠে উদ্বেগ না আনন্দ, বোঝা যায় না। তবে ফাহমিদা যখন চেঁচিয়ে ওঠে, তখন বোঝা যায়, ঝড় আসলে উদ্বিগ্ন হবার এক ব্যাপার।

- 'ছাদে এতো এতো কাপড় মেলে রাখা! বিকালে বললাম, যা গিয়ে নিয়ে আয়। বদ মেয়ে, শুনলিই না আমার কথা!'
- 'তো এখন গিয়ে নিয়ে আসি!'
- 'হ্যাঁ, এই রাত দুপুরে, ঝড়ের মাঝে তুমি একা একা ছাদে কাপড় আনতে যাও!'

মেয়েকে উপর্যুপরি মুখঝামটা দেয়ার পর মেয়ের বাপ আশফাকের দিকে ফেরে ফাহমিদা। স্বামীর কোলে টেবিল ল্যাম্প দেখে আঁতকে ওঠে সে,

- 'একি! তুমি টেবিল ল্যাম্প কোলে নিয়ে বসে আছো কেন? গরমে মাথা নষ্ট হয়ে গেলো নাকি?'

আশফাক উত্তর না দিয়ে আস্তে করে ল্যাম্পটা সামনের টি টেবিলের ওপর রেখে দেয়।

- 'চুপ করে বসে না থেকে যাও না, গিয়ে ছাদ থেকে কাপড়গুলো নিয়ে এসো। না হলে আগামীকাল ভিজে কাপড়েই অফিসে যেতে হবে।'

আশফাক উঠে রওনা দিলে পেছন থেকে তার স্ত্রী পুনরায় ডেকে ওঠে।

- 'ল্যাম্পটা সাথে করে নিয়ে যাও, নইলে অন্ধকারে উষ্ঠা খেয়ে পড়বে। আমি কামরার ভেতর মোমবাতি ধরাচ্ছি।'

ছাদে উঠতেই তীব্র বাতাস আশফাককে ঠেলে সরিয়ে দিতে চায়। আশফাকের ওজন বেশী হওয়ায় ওর সঙ্গে সুবিধা করতে না পারলেও ওর চুল হয়তো কয়েকগাছি উড়েই যায় বাতাসের তোড়ে। প্রথমে অন্ধকারে ঠাহর করা মুশকিল হয়, কার কাপড় কোনখানে। একটুক্ষণ ছাদের দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে থাকলে অন্ধকার চোখে সয়ে আসে, এবং আশফাক দেখতে পায়, ছাদে আসলে একটা মাত্র নাইলনের রশির ওপরেই কিছু কাপড় ঝোলানো, এবং সম্ভবত তার সবই তাদের। বাতাসের ধাক্কায় তারা সব কাঁচুমাচু ভঙ্গীতে রশির এককোনে গিয়ে জমায়েত তৈরি করেছে। আশফাক দ্রুত কাপড়গুলি গুছিয়ে হাতে তুলে নিয়ে পায়ে পায়ে নীচে নেমে আসে। রুমে, সোফার উপর কাপড়গুলি রেখে আবার বেরিয়ে যাবে, এমন সময় ফাহমিদা রান্নাঘর থেকে উঁকি মারে।

- 'যাচ্ছ কোথায়?'
- 'এই একটু হাওয়া খেয়ে আসি...'

বেরিয়ে আসার পূর্বে আশফাক সতর্কভাবে পুরো ড্রয়িং রুম এবং অন্যান্য রুমের দরোজায় চোখ বুলায়। লুতফাকে দেখা যায় না।

- 'লুতফা কোথায়? ও কী ছাদে যাবে একটু আমার সঙ্গে?'

- 'আরে নাহ!' রান্নাঘর থেকে ফাহমিদার কণ্ঠ ভেসে আসে, 'ওনার ফোন এসেছে এই মাত্র। ছাড়তে ছাড়তে রাত্রি পার।'

সচেতন পিতার মতো আশফাকের মনে ইচ্ছে জাগে ও কার সাথে এতক্ষণ কথা বলতে, তা জানার। কিন্তু সে ইচ্ছাকে চাপা দিয়ে আশফাক দ্রুতগতিতে ছাদে চলে আসে।

ভুলে ছাদেই টেবিল ল্যাম্পটা রেখে যাওয়া হয়েছে। আশফাক ঝুঁকে ওটা হাতে তুলে নেয়। টিমটিমিয়ে জ্বলছে আলো। জ্বলুক। উপরে আসমানে চোখ রাখে আশফাক। পুবাকাশ কালো হয়ে আছে। নিকশ কালো মেঘে ছাওয়া একদম। পুবদিক থেকেই বাতাস বইছে প্রবল গতিতে। মেঘও দ্রুতগতিতে ছুটে আসছে তার মাথার ওপর আসমানে।

আশফাক পায়ে পায়ে চলে আসে ছাদের রেলিং এর কাছে। সামনের প্লটটা এখনও খালি। তার পাশের প্লটে পাইলিং শেষ হয়ে দালান তোলা শুরু হয়েছে মাত্র। দেয়াল তোলা হয় নি, ছাদ ঢালাই করা চারতলা পর্যন্ত। তাই বাতাসের গতিতে বাঁধা পড়ছে না একদম। আশফাক ঝুঁকে তাকিয়ে দেখে, নীচের খালি প্লটে একটা রিকশা গ্যারেজ বোধয়। এতটাই আঁধার, দেখে কিছু বোঝা যায় না। কারো অবয়ব, কোন অবয়বের নড়াচড়া।

আশফাক আলতো করে হাত রাখে ছাদের নিচু রেলিঙে। খুবই দায়সারাভাবে করা কাজ। হাঁটু পর্যন্ত উঁচু। একসারি ইটের ওপর একপরত সিমেন্টের প্লাস্টার মেরে দেয়া কোনরকমে। আশফাক হাত সরিয়ে নিলে আঙ্গুলের গোড়ায় বালু বালু অনুভব হয়। বাম হাতে ধরে রাখা টেবিল ল্যাম্পটিকে ছাদের রেলিঙে রেখে সে লাফ দিয়ে উঠে পড়ে রেলিঙের ওপর। একসারি ইটের গাথুনি মাত্র, তাই তাল সামলাতে একটু কষ্ট হয় প্রথম প্রথম। কিন্তু আশফাক সামলে নেয় দ্রুত। বাতাসের তোড় একটা সমস্যা বটে। কিন্তু তাও কেমন করে যেন মোটামুটি কমে এসেছে।

রেলিঙের ওপর দাঁড়িয়ে আশফাক একটা সিগারেট ধরায় কায়দা করে। বাতাসে কিছুতেই লাইটার জ্বলতে চায় না। বহুকষ্টে, বহুদিনের অভ্যাস, কায়দাকানুন কাজে লাগিয়ে একহাত দিয়ে লাইটার জ্বালিয়ে আরেক হাত দিয়ে বাতাস আগলে সিগারেট ধরাতে হয়। আসেপাশের কোন দালানের জানালা প্রবল শব্দে বাড়ি খায় ফ্রেমের সঙ্গে। কাঁচ ভেঙ্গে পড়ার আওয়াজ হয়। আশফাক নিজেও দুলতে থাকে একটু একটু। পাশে টেবিল ল্যাম্পটি তার মতো করেই রেলিং আঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে। আবারো নীচে তাকায় আশফাক। নীচের ঘুরঘুটটি অন্ধকারকে তার ভয় লাগে না। এ সমস্ত ভয় তার অনেক আগেই জয় করা হয়ে গেছে। আজ তেত্রিশ নং দিন, তিনি রাতের বেলা ছাদের রেলিঙে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছেন। তবে আজকের দিনের ব্যতিক্রম হচ্ছে তার সঙ্গী, এই টেবিল ল্যাম্প।

হঠাৎ তার মনে প্রশ্ন এলো, ছাদের গেটটা কী আটকানো হয়েছে? যদি হুট করে এখন কেউ এসে পড়ে তার এই নিশিবিলাসে বিঘ্ন ঘটায়? আশফাক লাফ দিয়ে নেমে এসে যত আস্তে সম্ভব , ছাদের গেটটা লক করে দেয়। এই ঝড়ের রাতে কারো ছাদে আসার কথা না। তাও যদি কেউ আসতে চায়, বাসা থেকে লুতফা বা ফাহমিদা যদি বেরিয়ে আসে তার খোঁজে। তাদের ঠেকানোর জন্যে গেটটা আটকান দরকার।

আবারো পায়ে পায়ে আশফাক এগিয়ে যায় রেলিঙের কাছে। এবারে উঠে দাঁড়ানোর বদলে সে ওপাশে পা ঝুলিয়ে বসে পড়ে। একটা হাত টেবিল ল্যাম্পের ওপর এমনভাবে রাখা, যেন ঘনিষ্ঠ কোন এক বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে বসে আছে সে।

আশফাক টের পায়, একদম ভেতর থেকে তার জীবনের স্বাদ আহ্লাদ সব শুকিয়ে মরে গেছে। কোনকিছুতেই সে আর আনন্দ পায় না। প্রতিনিয়ত, প্রতি পদক্ষেপে তাকে, তার জীবনকে ঘরের - বাইরের মানুষরা এমনভাবে জাজ করতে থাকে, তাতে করে তার জীবনীশক্তি একদম কণ্ঠায় এসে ঠেকেছে। আশফাকের অবাক লাগে, সেই বিস্ময় আস্তে আস্তে ক্ষোভে রুপান্তরিত হয়। কি অদ্ভুত মানুষের জন্মের প্রক্রিয়া! জন্মাবার আগে কেউ তাকে জিজ্ঞেস করে নি সে আদৌ জন্মাতে চায় কি না। বা, জন্মালেও সে কোথায়, কোন পরিবারে, কোন পরিবেশে, কার সন্তান হিসেবে জন্ম নেবে। তবুও তাকে এসে পড়তে হয়েছে পৃথিবীতে। নিম্নমধ্যবিত্ত এক পরিবারে। নিম্নমধ্যবিত্ত মেধা নিয়ে। পাথর ঠেলে পাহাড়ে ওঠাবার মতো একএকটা দিনের বোঝা বওয়ার দায়িত্ব কাঁধে চাপিয়ে। ঢাকা শহরে এমন ব্যাকগ্রাউন্ডের পরিবার তার একার নয়, এমন মানুষ তিনি একা নন। এমন অনেকেই আছে, যাদের একদম টায় টায় হিসাবের জীবন। কিন্তু সে সমস্ত পরিবারে হাসি - আনন্দও আছে। ছোট ছোট বিষয় সেলিব্রেট করার আগ্রহ আছে, দৈনন্দিন জীবনের দুঃখকষ্টের পাশাপাশি। তার জীবনে সেই হাসি - আনন্দের মুহূর্তগুলো আর আসে না। ক্রমাগত সফল আত্মীয়স্বজন আর পাড়া প্রতিবেশীদের সঙ্গে তুলনা করতে করতে তার জীবনকে বিষিয়ে ফেলেছে তার স্ত্রী। কন্যাটা ছোটবেলায় নেওটা ছিল তার। বড় হয়ে কেমন যেন হয়ে গেলো। সারাদিন মোবাইল নিয়ে বসে থাকে, কথা বলতে আসে শুধু কোনকিছুর প্রয়োজন হলে।

সিগারেটে শেষ টানটা দিয়ে তা দূরে ফেলে দেয় সে। হাওয়ার মধ্যে পাগলাটে ভাবটা ক্রমশ কমে এসেছে। বৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছে এক ফোঁটা দু' ফোঁটা করে। কি ভারী তার একেকটা বিন্দু! চারপাশে মিষ্টি ঠাণ্ডা হাওয়া।

আশফাকের দু'পায়ের ফাঁক দিয়ে নীচে তাকালে যে গহীন অন্ধকার লাগে, তা তাকে আজ বেশ কিছুদিন ধরেই খুব করে টানে। যেন এই একটা জায়গা যা তার আপন। আশফাক একটু এগিয়ে গেলেই সে তাকে দৌড়ে এসে জাপটে ধরবে। আশফাকের মনোযোগ সরে আসে পাশে মিটমিটিয়ে জ্বলতে থাকা ল্যাম্পটার প্রতি। মাসের পর মাস, নিজে কোন চার্জ না নিয়ে তার পরিবারকে আলো দিয়ে যাচ্ছে যন্ত্রটা। কি কারণে? ওর কি লাভ? লাভ অবশ্য আশফাকের নিজেরও কিছু আছে বলে মনে হয় না। কাজেই, আরও নিখুঁতভাবে যদি প্রশ্নটা করা যায়, ওর কি দায়? আশফাকের পরিবারের সবার সঙ্গে আশফাকের রক্তের সম্পর্ক। এ ল্যাম্পের তো সে সম্পর্ক নয়। সে কেন একটু একটু করে ধুঁকে ধুঁকে মরবে আলো দিতে দিতে তার পরিবারকে?

আশফাক গভীর মমতায় দু'বার হাত বুলিয়ে দেয় টেবিল ল্যাম্পটার গায়ে। তৃতীয়বার আস্তে করে চাপড় মেরে ল্যাম্পটাকে ফেলে দেয় রেলিঙের নীচে। অনেকটা সময় নিয়েই যেন, আলো ছড়াতে ছড়াতে নীচে পড়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। আশফাকের দু'পায়ের ফাঁকে আবারো পরিচিত গভীর অন্ধকার।

আশফাক আবাও উঠে দাঁড়ায় রেলিঙের ওপর। তার বন্ধু টেবিল ল্যাম্পকে ঘানি টানা জীবন থেকে মুক্তি দিয়ে তার মন বেশ ফুরফুরে লাগে। এরমাঝে বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছে ঝমঝমিয়ে। আশফাক রেলিঙের এ'মাথা থেকে ও'মাথা হেঁটে চলে বার দু'য়েক। তারপর ঠিক মাঝ বরাবর এসে দাঁড়ায় সে। আবারো তাকায় নীচে, তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, গহীন কালো আঁধারের দিকে। টেনে টেনে বড় করে দুবার শ্বাস নেয়।
আশফাক ঝাঁপ দেয়। সামনে - শূন্যে নয়, পেছনে। ছাদে। উল্টো হেঁটে আস্তে আস্তে ছাদের মাঝ বরাবর এসে দাঁড়ায়। আস্তে আস্তে একটা একটা করে শার্টের বোতাম খুলে, শার্ট থেকে শরীরকে মুক্ত করে। পরনের পাজামা আলগোছে খুলে পা দিয়ে মাড়িয়ে এক লাথিতে দূরে সরিয়ে দেয়।

সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় সে টান টান হয়ে শুয়ে পড়ে ছাদের মেঝেতে। চোখ বন্ধ করে অনুভব করে নিজেকে ঐ ল্যাম্পের জায়গায়। চূর্ণবিচূর্ণ অবস্থায়। আস্তে আস্তে তার ওপর তাল তাল মাটি জমতে থাকে। তাল তাল মাটি। শরীরের ওপর আছড়ে পড়া বৃষ্টির ছাঁট যেন সে আর টের পায় না। মাটি আগলে রাখে তাকে।

লুতফার বিয়েটা এখনও বাকি।

- 'এ ম্যান হ্যাজ টু ডু হিজ ডিউটি, অ্যান্ড দা শো মাস্ট গো অন...'

হিসহিসিয়ে উচ্চারণ করে আশফাক।



সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে জুন, ২০২১ রাত ১০:৩১
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ভালোবাসা ও নৌকা

লিখেছেন সাব্বির আহমেদ সাকিল, ০৮ ই ডিসেম্বর, ২০২১ বিকাল ৪:৩৯

ভালোবাসা হলো একটা ডিঙি নৌকার মতো । যেখানে নৌকাকে ব্যালেন্স করবার জন্য দু’জন মানুষ থাকে । দু’জন মানুষের কাছে থাকে একটা বৈঠা । একজন বৈঠা বাইতে বাইতে ক্লান্ত হয়ে গেলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

এটা ধর্মীয় পোষ্ট নহে

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই ডিসেম্বর, ২০২১ সন্ধ্যা ৬:১০

ছবিঃ আমার তোলা।

আল্লাহ আমার উপর সহায় আছেন।
অথচ আমি নামাজ পড়ি না। রোজা রাখি না। এক কথায় বলা যেতে পারে- ধর্ম পালন করি না। তবু আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী লীগের আমলে ২২ জন ছাত্রলীগারের ফাঁসী?

লিখেছেন চাঁদগাজী, ০৮ ই ডিসেম্বর, ২০২১ সন্ধ্যা ৬:২৫




** এই রায় সঠিক নয়, ইহা আজকের জন্য মুলা; হাইকোর্টে গেলে ২/৩ জনের ফাঁসীর রায় টিকে থাকবে, বাকীরা জেল টেল পাবে। ****

১ম বিষয়: আওয়ামী লীগের শাসনামলে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

পথের প্রেম

লিখেছেন মৌরি হক দোলা, ০৯ ই ডিসেম্বর, ২০২১ সকাল ১০:৫১



সেদিন তোমার কাছে প্রতিশ্রুতি চেয়েছিলাম,
ভয়ে বিবর্ণতা জাপটে ধরেছিল তোমায়।‌
সেদিন তোমার ভীতসন্ত্রস্ত মন,
আমাদের মাঝে নিয়ে এলো
পাহাড়সম দূরত্ব।

বিচ্ছিন্ন দুই প্রান্তরে হারিয়ে গেলাম
তুমি আর আমি।
অদেখা - অস্পর্শে
বয়ে গেল বহুদিন...

আজ আর কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

নগ্নতা : (ফর অ্যাডাল্টস ওনলি)

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ০৯ ই ডিসেম্বর, ২০২১ দুপুর ১:৪৪

শচীন ভৌমিকের লেখা ফর এডাল্টস ওনলি থেকে কিছু কিছু অংশ যা পড়ে বেশ তৃপ্তি (!!) পেয়েছি। যারা বইটি পড়েননি তাঁরা পড়ে দেখতে পারেন।----



ষাটের দশকে আমেরিকায় Mooning বলে একটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×