somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অর্পিত [পর্ব ৪]

০৬ ই নভেম্বর, ২০০৮ দুপুর ১:৪৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



The following story contains mature contents - last para maybe unsuitable for the readers of 13 and below.

প্রথম পর্বঃ Click This Link

অনুগ্রহ করে প্রথম থেকে পড়ে গল্পের ধারাবাহিকতা রক্ষা করুন।
==================================================

১.
নিজ চোখে দেখলেও ঘটনার বাস্তবতা ও ভয়াবহতা বুঝতে প্রচুর সময় লাগল। নকশী এতটা হিংস্র হয়ে উঠতে পারে এটা কল্পনাও করতে পারিনি আসলে। প্রায় মিনিট তিনেক বিমূঢ়ের মত দাঁড়িয়ে রইলাম। ভুলেই গেলাম যে আমার এখন কিছু একটা করণীয়। হঠাৎই যেন শরীরে জ্ঞান ফিরে এলো আমার। দৌড়ে গেলাম হুজুরের পড়ে থাকা দেহটার দিকে। হৃদস্পন্দন দেখার জন্য হুজুরের বুকে হাত দিলাম। হৃদস্পন্দন তো টের পেলামই না, উল্টো আমারই একটা স্পন্দন মিস হয়ে গেল।
হুজুরের হৃদপিন্ডটা নিথর!

আশেপাশের কলাপাতা পড়ে ছিল। ঠিক করলাম হুজুরের লাশটাকে কলাপাতা দিয়ে ঢেকেই সরে পড়বো। ভুলেই গেলাম যে একটু আগে তিনি আমাদের জন্য কাজ করছিলেন। তার মৃত্যুটা আমাদের জন্যই। এবং একান্তভাবে আমরাই তার মৃত্যুর জন্য দায়ী। কিন্তু তখন নিজের বিপদটা টের পেলাম আগে। সভ্যতা থেকে কিছুটা দূরে আছি আমরা। নিজে যে কবর খুঁড়ে লাশটা দাফন করে যাব তার কোন উপায় নেই। আর বাইরের জগত থেকে লোক আনলে তো পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার করবে। কোন সন্তোষজনক উত্তর নেই আমাদের কাছে। নিজের জন্য না হোক, নকশীর স্বার্থে হলেও কেটে পড়াটা সবচাইতে নিরাপদ।
ঝোপঝাড়ের আড়ালে হুজুরের লাশটা যতটা সম্ভব লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করলাম। হুজুরের চিন্তা শেষ হলে নকশীর দিকে তাকালাম। ভয়াবহ অবস্থা ওর। ঠোঁটে আর কাঁধের দিকে রক্তে একাকার হয়ে আছে। চুলগুলো উষ্কখুষ্ক হয়ে আছে। দেখেই বোঝা যায় ও ঠিক নেই। তখনো ভোরের আলো ফোটেনি। অন্ধকারের মধ্যে নকশীর কাছে যাওয়া একটা দুঃসাহসিক ব্যাপার। টিভি সিনেমায় সবসময়ই দেখেছি এরকম ভুত-প্রেতের কাছে সাহস করে মানুষ যায়। তখন মনে হতো গাধাগুলোর কি জীবনের ভয় নাই নাকি! কিন্তু বাস্তবে আমি নিজেই যখন এমন একটা পরিস্থিতির সম্মুখীন হলাম, তখন বুঝলাম কেন যায়।
হৃদপিন্ডটা পাগলের মত লাফাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন আমাকে সতর্ক করে দিচ্ছে মানুষরূপী ভ্যাম্পায়ারটার কাছে না যেতে। কিন্তু আমি জানি ও মানুষরূপী ভ্যাম্পায়ার না। ভ্যাম্পায়াররূপী মানুষ। ওকে দেখে এখনো বোঝা যাচ্ছে না ওর ভ্যাম্পায়ার সত্তাটা এখনো জেগে আছে কি না। তবুও সাহস সঞ্চয় করে ওর দিকে ধীরে ধীরে এগোলাম। ওর যতই কাছে যাচ্ছি, আমার মধ্যে ভয়টা বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু নিজেকে রোধ করতে পারছি না।
নকশীর একেবারে সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ওর কাঁধে হাত রেখে আস্তে করে ডাক দিলাম। "নকশী!" ও বোধহয় শুনলো না। আরেকটু জোরে ডাক দিতেই ঝট করে ফিরে তাকাল। আমি একটু পেছনে সরে গেলাম। আতঙ্কটা তখনো যায়নি। নকশী আমার দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। কিন্তু ওর চেহারায় দ্রুত পরিবর্তনটা আমি ধরতে পারলাম। শীঘ্রই তার মধ্যে পরিবর্তন হবে, সেটা বুঝতে পারলাম। অপেক্ষা করতে থাকলাম পরিবর্তনটার জন্য।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই নকশী স্বাভাবিক হয়ে গেল। একটু আগে ও একটা খুন সংঘটিত করেছে। কিন্তু ও সেটা জানেনা। আমি তাকে সেটা জানতে দিতে চাই না। ওর সব প্রশ্ন এড়িয়ে গেলাম। তবুও ও ঠিকই বুঝে ফেলল যে ও মারাত্মক কিছু একটা করে বসেছে। ওর ঠোঁটে আর কাপড়ে লেগে থাকা রক্ত তারই প্রমাণ।
ওকে নিয়ে খোলা জায়গার সেই পুকুরে আসলাম। ও এখন আর কোন প্রশ্ন করছে না। অপরাধবোধ জেগে উঠায় ও চুপ হয়ে গেছে। আমি ওকে যথাসম্ভব শান্ত রাখার চেষ্টা করছি। হাসিখুশি প্রাণবন্ত একটা মেয়ে যদি হঠাৎ করে এমন নীরব হয়ে যায়, তাহলে তা খুবই দুঃখের বিষয় হবে। তবে আশা করছি ও ঠিক হয়ে যাবে। কারণ ও এখনো জানেনা, ও কী করেছে।

নকশী বলল, এখন কোথায় যাব?
বাসায়।
হুজুর কী বললেন?
কিছু চিকিৎসা দিয়েছেন।
কী ধরণের চিকিৎসা।
কিছু বললাম না। নকশী কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। যখন বুঝল জবাব পাবার আশা নেই। তখন অন্যদিকে তাকালো। যাবার আগে শেষবারের মত হুজুরের কুঁড়েটার দিকে তাকালাম। অমনি চোখে পড়লো দরজার পাশে ঝোলানো মালাটা। কোন বাতাস নেই, তবুও মালাটা একটু দুলছে। যেন জ্যান্ত কিছু একটা।

অনেক কায়দা কসরৎ করে নকশীর চোখকে ফাঁকি দিয়ে মালাটা নিয়ে নিলাম। নতুন চিন্তা যোগ হয়েছে মাথায়। কীভাবে এটা ওর গলায় পড়ানো যায়। দুই মিনিটের জন্য ওর মনকে ব্যস্ত রাখা যায় কীসে? ভেবে কোন কূল কিনারা না পেয়ে আপাতত ভাবাভাবি বন্ধ করে দিলাম।

দু'জনে পাশাপাশি হাঁটছি। এখনো সূর্য উঠেনি। তাই পথ দেখে চলতে কষ্ট হচ্ছে। দু'জন পাশাপাশি হাঁটছি। নকশী প্রথমবারের মত একটা কথা জিজ্ঞেস করল, সুমন, আমি কি ঠিক হবো?
আমি প্রথম বুঝতে পারলাম না। মানে?
মানে আমি কি সম্পূর্ণ সুস্থ হতে পারবো কখনো?
আমি বললাম, অবশ্যই পারবে। পারবে না কেন। তুমি শীঘ্রই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবে। কোন চিন্তা কোরো না।
নকশী আমার দিকে কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তাকাল। তুমি আমার জন্য অনেক করছো। আমি সত্যিই আনন্দিত ও ব্যথিত। কারণ আমার জন্য তোমার এত কষ্ট করতে হচ্ছে।
আমার এজাতীয় কথা শুনতে ভাল লাগেনা। তাই ওকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, ম্যাপটা বের করো। কোন পথে যাচ্ছি দেখতে হবে।
আমার এড়িয়ে যাওয়াটা নকশী খুব ভাল করেই বুঝল। তবে কিছু বলল না। ম্যাপটা বের করে আমার হাতে দিল। আমি দেখে পথ ঠিক করে নিলাম।

অনেকক্ষণ হাঁটার পর গহীন জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসতে পারলাম। তারপর খোলা প্রান্তরে ছোট্ট একটা পুকুর চোখে পড়লো। সেখানেও কোন বসতি নেই। সূর্য সবে উদয় হচ্ছে। সামনে আর জঙ্গল নেই। তাই এখানে হাতমুখ ধুয়ে নেবার সিদ্ধান্ত নিলাম।
পুকুরে হাতমুখ ধুয়ে মাটিতেই বসে পড়লাম। প্রচন্ড ক্লান্তি লাগছে। শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু শুয়ে গেলে পুরো ঘুমিয়ে যাব এই ভয়ে শোয়া থেকে বিরত থাকছি। নকশীর দিকে তাকালাম। ওর বুকের দিকে চোখ পড়ল। রক্তের রং এখনো যায় নি। আমরা এখনো বিপদের মধ্যে আছি। রাস্তায় পুলিশ ঝামেলা বাঁধাতে পারে। তাহলে তো মহাসর্বনাশ।
আমাদের সঙ্গে কোন খাবার দাবার নেই। তাই খিদে নিয়েই বসে রইলাম। বাসে উঠার আগে দোকান থেকে কিছু কিনে নিতে হবে। নকশীর দিকে তাকালাম। আমার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ক্লান্ত ও। ঘাসের উপরেই শুয়ে পড়েছে। আমি উঠে ওর কাছে গেলাম। ওর কাছে গিয়ে বসতেই ও চোখ মেলে তাকাল। ওকে দেখে মনে হলো সব কষ্ট ভুলে থাকতে চাচ্ছে ও। আমি বললাম, যাবে না? ও মাথা নাড়লো। না, যাবো না।
আমার অবাক লাগল। কী বলে এইসব। না গিয়ে কী করবে? এখানে বসে থেকে লাভ নেই। চল চল- তাগাদা গিলাম।
ও কিছুক্ষণ আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। বুঝতে চেষ্টা করলাম ও কিছু বলতে চাচ্ছে কি না। তবে বুঝলাম না। ওকে ধরে টেনে তুললাম। তারপর আবার সেই সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিলাম। কখনো রিকশা, কখনো হাঁটা। অবশেষে বাসে উঠলাম।


২.
বাসায় পৌঁছে..
আন্টি আমাদের দেখে দৌড়ে এলেন। অনেক কথা জিজ্ঞেস করলেন এক নিঃশ্বাসে। শিহাব ভাইয়া ঘরে ছিল। বললেন, পরে জিজ্ঞেস করো না এসব। মাত্র এসেছে, হাতমুখ ধুয়ে খাবার দাবার খেতে দাও। পরে কথা হবে।
মনে মনে ভয়ে ভয়ে ছিলাম নকশীর হঠাৎ এই চুপ হয়ে যাওয়া দেখে। কিন্তু এখন দেখছি নকশী রিকভার করে নিয়েছে ট্র্যাজেডিটাকে। এটা দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। আন্টির দেখলাম আর সহ্য হচ্ছে না ঘটনা জানার জন্য। চোখের ইশারায় জিজ্ঞাসা করলেন কাজ হয়েছে কি না। আমি আন্টির কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বললাম, একটা ভাল খবর আছে আর দুইটা খারাপ খবর আছে। আর কিছু বললাম না। তবে আন্টি চিন্তিত হয়ে গেলেন। খারাপ খবরের সংখ্যা বেশি-- এই জন্যই হয়তো।

প্রথম সুযোগেই আন্টি আমাকে চেপে ধরলেন ঘটনা খুলে বলার জন্য। আমি পুকুরপাড়ে হুজুরের মালার কথা পর্যন্ত বললাম। তারপর বললাম, এখন ভাল খবর হচ্ছে এই যে, নকশীকে স্থায়ীভাবে বাঁচানোর অন্ততপক্ষে একটা উপায় পাওয়া গেছে। কিন্তু খারাপ খবর হচ্ছে, নকশীর মনকে এই দুই-তিন মিনিট সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা বিষয়ের উপর নিবদ্ধ রাখা যায় কীভাবে? সামান্যতম ভুল হয়ে গেলেই সর্বনাশ। যে মালা পড়াতে যাবে, সে আর ফিরে আসবে না।
আন্টিকে চিন্তিত দেখালো। আমার মাথায় কিছু আসছে না। দেখি কয়েকদিন চিন্তা করে কিছু বের করতে পারি কি না।

আমি ফাঁক পেয়ে চলে আসলাম। ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিলাম দ্বিতীয় খারাপ খবরটা বলতে হলো না বলে। নকশীর রুমে গেলাম। এখন আমাদের আর কিছু করার নেই। থাকতে হবে সুযোগের অপেক্ষায়। ঠিক করলাম, সুযোগ পাওয়ামাত্রই অ্যাকশনে যেতে হবে। কোন ভাবাভাবির ফুসরৎ যেন না থাকে। তবে তার আগে অবশ্যই নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে যে, কাজটা হবে।

ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিয়ে নেই আগে। রাতে ডিনারের পর ছাদে গেলাম আমি। কিছুক্ষণ পরই দেখলাম নকশীও ছাদে আসলো। আকাশটা মেঘাচ্ছন্ন। হালকা ঠান্ডা বাতাস বইছে জোরে জোরে। যেকোন সময় প্রবল বর্ষণ শুরু হতে পারে। এমন একটি পরিবেশ আমার সবসময় পছন্দ। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ আমার ভাল লাগে যতক্ষণ না বৃষ্টি শুরু না হয়। নকশী এসে আমার পাশে দাঁড়াল। বলল, আজ সারাদিন তোমার উপর অনেক ধকল গেছে তাই না?
আমি বললাম, হ্যাঁ। সমান ধকল তোমার উপর দিয়েও গেছে। বরং একটু বেশিই গেছে।
হাসল নকশী। ও কিছু না। তবে আমার মতে তোমার কষ্টটা বেশি ছিল। লিডিং তো তুমিই দিয়েছ....
ওকে থামিয়ে দিলাম। তুমি কি গভীর রাতে কৃতজ্ঞতা জানাতে ছাদে এসেছ? একটু ধমকের স্বরেই বললাম। ও দেখলাম সাথে সাথে মাথা নেড়ে বলল, না না তা নয়। আমি...মানে..মানে..... তোতলাতে শুরু করল ও। আমার কাছে বিষয়টা রহস্যজনক মনে হলো। ও খুব জোরে না করছে। তারমানে ওর এখানে আসার পেছনে অন্য একটা উদ্দেশ্য আছে। কী সেটা?
প্রচন্ড শীত করছে। হাত প্যান্টের পকেটে ঢোকালাম। হাতে লাগলো নকশীর জন্য দেয়া সেই মালা। ইচ্ছে হচ্ছে এখনই পড়িয়ে দেই। নকশীকে এখন খুব স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। কিন্তু হুজুরের কথা মনে পড়লো, মালাটা পড়াতে গেলেই ওর ভ্যাম্পায়ার সত্তাটা জেগে উঠবে এবং যে পড়াতে যাবে তাকে হত্যা করবে। আমি অনেক ভেবে দেখলাম, মালা পড়ানোর কাজটা আমারই করা উচিৎ। কারণ, নকশীর মনকে ব্যস্ত রাখার দায়িত্ব আমার। আমি যদি এই দায়িত্বে ব্যর্থ হই, তাহলে তৃতীয় যে মালা পড়াতে আসবে, তার মৃত্যুর কারণ হবে আমার ব্যর্থতা। তাই ভেবেচিন্তে ঠিক করেছি, পুরো কাজটা একাই সারবো।
হঠাৎই খেয়াল করলাম নকশী শীতে কাঁপছে। ব্যস্ত হয়ে বললাম, নকশী ঠান্ডা লাগবে তোমার। ঘরে যাও। ও যেতে চাইলো না। আমি ওর কাছে গেলাম। আমাকেই নিয়ে যেতে হবে। কিন্ত পারলাম না। ও দাবি করল ওর নাকি ঠান্ডা লাগছে না। পুরো মিথ্যা কথা। প্রচন্ড ঠান্ডা বাতাস বওয়া শুরু করেছে তখন। ওর চুলগুলো পুরো উড়ছে। মনে হচ্ছে ইলেকট্রিক টেবিল ফ্যানের সামনে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে ওকে। ওকে জোরাজুরি করেও ঘরে নিতে পারলাম না। তারপর বললাম, আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি দাঁড়াও। আমিই গিয়ে নিয়ে আসছি।
ও বাধা দিল। বলল, লাগবে না। আমার হাত ধরে আটকে রাখতে চাইল। আমি ওর হাতটা ঝাড়া দিয়ে ফেলে বললাম, বোকার মত কথা বোলো না। ঠান্ডা লেগে গেলে পড়ে বুঝবে মজা। নিচে নামতে গিয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম।

ছাদ থেকে নামার সিঁড়ির দিকের দরজাটা বাহির থেকে তালা দেয়া!


৩.
অবাক হয়ে পেছনে তাকালাম। নকশী ততক্ষণে ঘুরে দাঁড়িয়েছে আমার দিকে পেছন করে। আমি মনে মনে খুব অবাক হলাম। ধীরে ধীরে নকশীর কাছে গেলাম। ওর থেকে সামান্য দূরত্বে থাকতেই নকশী কেমন যেন গলায় বলল, যেতে তো পারলে না, তাই না?
আমার কেন যেন ভয় ভয় লাগতে শুরু করল। কোন বিপদে পড়তে যাচ্ছি আল্লাহই জানেন। ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ও আমার দিকে তাকাল না। বুঝলাম রেগে আছে। আস্তে করে একটা হাসি দিয়ে ওর কাঁধে হাত রেখে বললাম, রাগ করছো কেন নকশী? আমি তো তোমার ভালোর জন্যই শীতের কাপড় আনতে যাচ্ছিলাম।
ও কিছু বলল না। মনে হলো রাগের মাত্রাটা আরেকটু বেড়েছে।
আমি বললাম, আচ্ছা নকশী, আমার মনে হচ্ছে আজ সকাল থেকে তুমি কিছু বলতে চাচ্ছ। ঠিক না?
আশ্চর্য! সাথে সাথে নকশীর চেহারার ভাবমূর্তি পাল্টে গেল। আবার আগের সেই স্বাভাবিক নকশীর চেহারা ফিরে এলো। বাচ্চা মানুষের মত মাথা ঝাঁকালো, হ্যাঁ।
আমি একটু আগ্রহী হলাম। জিজ্ঞেস করলাম, বলো। খোলাখুলি বলো। সকালেই বলতে পারতে।
নকশী কিছু বলল না। আমি তাকে সময় দিলাম। কিন্তু ও বোধহয় কীভাবে বলবে কথা গোছাতে পারছে না। আমি ওকে উৎসাহ দিলাম। বলো, কী হয়েছে?
নকশীকে দেখলাম ক্রমেই দ্বিধান্বিত হয়ে যাচ্ছে। অবাক লাগল। এমন কী কথা যে ও সেটা বলতে এত দ্বিধাবোধ করছে। নকশীকে বললাম, শোনো নকশী। তোমার সঙ্গে আমার অনেকদিনের বন্ধুত্ব। অন্যরকম একটা সম্পর্ক আছে তোমার সঙ্গে। খুব ভাল বন্ধু বলে জানি আমি তোমাকে আর এজন্যই আমি তোমার জন্য মন থেকে করি। কিন্তু তুমি যদি সামান্য একটা কথা বলতে এত দ্বিধা কর, তাহলে এটা কেমন হলো?

নকশী যেন একটু কেঁপে উঠলো। তুমি খুব রাগ করবে। তাই....
আমি বললাম, না। রাগ করবো না। তুমি যাই করো না কেন, আমি রাগ করবো না। যাও, কথা দিলাম। এবার অন্ততপক্ষে বলো কী বলবে?
নকশী তবুও চুপ।
মনটা খারাপ হয়ে গেল। এই কথা শোনার আগ পর্যন্ত আমার তো ঘুম হবে না। নকশী বলো না প্লিজ।
তারপর হঠাৎ একটা ঘটনা ঘটল। যার জন্য আমি মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না।
আমি নকশীর ঠিক সামনে দাঁড়ানো ছিলাম। নকশীকে অনুরোধ করছি বারবার ওর কথাটা বলার জন্য। ও কিছু বলছিল না। হঠাৎ এক ঝটকায় আমার দুই বাহু ধরে সজোরে টান দিল। আমি সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত থাকায় নকশীর শরীরের উপর ধাক্কা খেলাম। ও আর আমাকে ছাড়লো না। পলকেই ওর ঠোঁটের স্পর্শ টের পেলাম আমার ঠোঁটে। এক অদ্ভূত শিহরণ বয়ে গেল সমস্ত শরীরে। কী হচ্ছে তখনও বুঝতে পারিনি। এক মুহুর্তের জন্য মনে হয়েছিল নকশীর ভ্যাম্পায়ার সত্তার কাছে আমি পরাজিত। কিন্তু পরমুহুর্তেই বুঝতে পারলাম, নকশীর ভ্যাম্পায়ার সত্তার কাছে আমি পরাজিত নই। বরং, নকশীর ভালবাসার কাছে আমি পরাজিত। ওর মনে যে এতকিছু ছিল তা আমি আগে কখনো বুঝতে পারিনি। কখনো বোঝার চেষ্টাও করিনি। আজ যখন ও আমাকে টেনে নিয়ে চুমু খেলো, তখন আর না বুঝে পারলাম না।

এমন সেনসিটিভ মুহুর্তে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি বিষয় মনে পড়ল। সেটা হচ্ছে মালা! নকশীকে দেয়া সেই মালাটা আমার পকেটেই আছে। নকশী আমাকে ধরেছে তো ধরেছেই, ওর ঠোঁটজোড়া আর আমাকে ছাড়ছে না। আমি সুযোগটা কাজে লাগানো চেষ্টা করলাম। আমি একহাত নকশীর গলার উপর দিয়ে পেছনে ঘাড়ের কাছে নিয়ে গেলাম। আরেক হাতে বের করলাম কালো রঙ্গের সেই মালাটা। নকশীর ঘাড়ের উপর দুইহাতে ধরলাম মালাটা। এবার শুধু পরিয়ে দেবার অপেক্ষা। একমুহুর্তের জন্য হলেও আমার জীবনের আনন্দঘন মুহুর্তগুলো মনে পড়ল। কারণ, জানিনা, এটাই আমার জীবনের শেষ কাজ কি না। ব্যর্থ হওয়া মানে মৃত্যু। তবুও সাহস সঞ্চয় করলাম। প্রথমবারের মত আমি নকশীর চুমুতে সাড়া দিলাম। এতে নকশীর শরীর আরো শক্ত হয়ে গেল। প্রথম সুযোগেই এক ঝটকায় আমি দুইহাত নকশীর গলার দুইপাশ দিয়ে সামনে নিয়ে আসলাম। আর সঙ্গে সঙ্গে নকশীর শরীরে যেন বিদ্যুতের শক দেয়া হয়েছে, এমনভাবে বেঁকে গেল। প্রচন্ড ছটফট করতে শুরু করল ও। চিৎকার করার চেষ্টা করছে কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছে না। এর কারণ, ঠান্ডা লেগে গেছে ওর। এই শীতে খাটো পোষাক পড়ে ছাদে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকায় গলা বসে গেছে ওর।
প্রচন্ডভাবে কাঁপছে শরীরটা। আমার কাছে মনে হচ্ছে যুগের পর যুগ পেরিয়ে যাচ্ছে। অথচ ঘড়ির কাঁটা বলছে ত্রিশ সেকেন্ডের বেশি যায়নি। এমন সময় চোখে পড়ল সেই ভয়াবহ জিনিসটা। যা আমার হৃদস্পন্দনকে প্রায় থামিয়ে দিল।

মালার সামনের দিকটা লাগানো হয়নি। যেকোন মুহুর্তে মালাটা গলা থেকে খুলে পড়ে যেতে পারে। যার পরিণাম হবে, আমার মৃত্যু!


[চলবে]

পঞ্চম ও শেষ পর্ব পড়তে ক্লিক করুন: Click This Link

মন্তব্য পরবর্তী পর্বে গ্রহণ করা হবে।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে মে, ২০১১ রাত ১০:১৩
৩টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×