ওয়ান
ইলেভেন (প্রথম পর্ব)
ওয়ান ইলেভেন মানে জানুয়ারির এগার। সংখ্যায় লিখলে ১/১১। ইতিহাসের পাতায় এই দিনটি কিছু তাৎপর্যময় ঘটনার কারণে বিখ্যাত। ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দের এই দিনে জেদ্দায় ইবনে সউদ নিজেকে হেজাজের বাদশাহ হিসেবে ঘোষণা করেন। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে বীর বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেনকে ব্রিটিশ সরকার চট্টগ্রামের জেলখানায় ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করে। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে ভারত ও পাকিস্তানের
মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধের সমাপ্তিতে শান্তির জন্য তাসখন্দ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি অস্থায়ী শাসনতান্ত্রিক আদেশ জারি করেন। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে কথাশিল্পী সৈয়দ মুজতবা আলী মৃত্যুবরণ করেন।
আমার স্থায়ী মেমোরিতে সংরক্ষিত এই তথ্যগুলো আমার নিউরনে ক্রমাগত ঘুরপাক খেতে থাকে।
১/১১ এর এই ঘটানাগুলো কাকতালীয়ভাবে বাংলাদেশের ভাগ্যের সাথে মিলে যাচ্ছে। এদিন বাংলাদেশে পূর্বাপর ঘটনার প্রেক্ষিতে জরুরি আইন জারি হয়। ওয়ান ইলেভেনের আগে হরতাল, ঘেরাও, মিছিল-মিটিং এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল যে জাতির সভ্য অস্তিত্ব অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। দেশের রাজনীতি ও প্রশাসন হয়ে পড়েছিল ব্যক্তি ও পরিবারকেন্দ্রিক। দেশের আপামর জনগণ এই রাজনীতির অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল। সংঘাত-সংঘর্ষের মধ্যে শান্তির বাতাবরণ আনয়নে অনিবার্য পরিণতি ছিল ওয়ান ইলেভেন।
১/১১ এর এই ১ ডিজিটটি আমার বাইনারি ডিজিটের একটি একক। আমার বাইনারি ডিজিটের আরেকটি একক হচ্ছে ০। অর্থাৎ আমার যুক্তি, বুদ্ধি এই ১ এবং শূন্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আমি যা কিছু বুঝি ১ এবং ০ দিয়েই বুঝি। অভিধানের ভাষায় ০ বা জিরো হচ্ছে 'শূন্য অঙ্ক'। আরেক অর্থে 'অনস্তিত্ব' অর্থাৎ যার অস্তিত্ব নাই। গণিতের ভাষায় শূন্য হচ্ছে এমন একটি আপেক্ষিক যেটির মান অদৃশ্য হয়ে যায় বা মিলিয়ে যায়। আর ১ হচ্ছে অস্তিত্ব প্রকাশের একক বা Living being. এই ০ দিয়ে ১ কে ভাগ করলে ভাগফল হয়ে যাবে অসীম আর ১ দিয়ে ০ কে ভাগ করলে ভাগফল হবে শূন্য।
ওয়ান ইলেভেনের দিনটি এলেই আমার ১ ডিজিটটি প্রচণ্ড শক্তিশালী হয়ে যায়। কারণ ওয়ান ইলেভেনে আমার জন্মটাও অনেকটা এরকম ০ এবং ১ এর খেলা ছিল। রাজপথে মৃত গণতন্ত্রের নমুনা হয়ে পড়ে থেকে আমি শূন্যের মাঝে বিলীন হয়ে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে বসের এই ল্যাবরুমে আমাকে সাইবর্গ ম্যান করে অস্তিত্ব প্রকাশের একক অর্থাৎ ১ হিসেবে প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে। এই দিনটিতে তাই তিনটি ১ ডিজিটের সাথে একটি ০ ডিজিট কোনরকমেই পেরে উঠে না। আমি তিনটি ১ ডিজিটের বদৌলতে প্রচণ্ড শক্তিশালী হয়ে উঠি।
আজও আমি প্রচণ্ড শক্তিশালী হয়ে উঠেছি। আমার ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক নিউরন থেকে পাঠানো সংকেত ভদ্রলোকের ইলেক্ট্রো-কেমিক্যাল সংকেত বুঝা সবগুলো নিউরনকে প্রভাবিত করে ফেলেছে। সেখান থেকে ক্রমাগত সংকেত যাচ্ছে গরীব পিঠা বিক্রেতার গলাকে সাঁড়াশির মতো চেপে ধরা আঙ্গুলের ডগায়। আরেকটু ধরে রাখলেই সব শেষ হয়ে যাবে। আমার উপর কোথা থেকে যেন নৃশংসতা এসে ভর করে। আমার স্থায়ী মেমোরিতে একে একে পৃথিবীব্যাপী সমস্ত নৃশংসতার ছবি এসে জড়ো হয়। আমি ক্রমাগত মেসেজ পাঠিয়ে যেতে থাকি-
"গরীব পিঠা বিক্রেতার গলাটাকে আরও জোরে চেপে ধর। সমস্ত শস্যমূল্য সন্ত্রাসীর গলাটা চেপে ধর। সমস্ত পণ্যমূল্য সন্ত্রাসীর গলাটা চেপে ধর। সমস্ত রাজনৈতিক দুর্বৃত্তের গলাটা চেপে ধর..."
ভদ্রলোকের হাতের আঙ্গুলগুলো কেমন শিথিল হয়ে আসছে। তাহলে কি আমার পাঠানো মেসেজ আর কাজ করছে না! আমি আগেই বলেছি মানুষের মন বড়ই রহস্যময়। আমার প্রোগ্রাম চালিত নিউরন দিয়ে রহস্যময় মানব মস্তিষ্কের পুরোটা আমি বুঝে উঠতে পারি না। এক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। আমার পাঠানো সংকেত গ্রহণে কিছু নিউরন বোধ হয় বিদ্রোহ করেছে। কিংবা ভদ্রলোকের মস্তিষ্কের নিউরনের সাথে আমার পাঠানো ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক সংকেত বোঝা নিউরনের যোগাযোগ বিভ্রাট ঘটেছে বোধ হয়। শেষ পর্যন্ত নৃশংসতার কাছে মানব মনের জয় হয়েছে। ভদ্রলোক গরীব পিঠা বিক্রেতার গলাটি ছেড়ে দিয়েছেন। আশেপাশের লোকজনের মধ্যে গুঞ্জন স্তিমিত হয়ে আসছে।
"ভাইসব। আপনারা সবাই দেখেছেন যে আমি এই গরীব পিঠা বিক্রেতার গলাটা টিপে ধরেছিলাম। আরেকটু হলে মেরেই ফেলেছিলাম।"
নাটকীয় ভঙ্গীতে কথা ক'টি বলে ভদ্রলোক সবার মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করে।
"আমি কিছুক্ষণ আগে বাস থেকে যখন এখানে এসে নেমেছি, আমি বাসের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। বিশ মিনিটের পথ দুই ঘন্টা লেগেছে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিলাম। আজিমপুর থেকে শান্তিনগরে এসে বাসটি যখন পৌঁছোয় আমি নেমে দেখি আমি শায়েস্তা খাঁর রাজত্বে এসে পড়েছি।
আরে ব্বাহ!
মানুষজন ফুটপাথ ঘিরে সস্তায় জিনিসপত্র কিনছে। যেই আমলে টাকায় আটমন চাল পাওয়া যেতো সেই আমলের দামে কেনার জন্য সারা ঢাকা শহরের মানুষগুলো এই পথে এসে ভিড় জমিয়েছে। আমার মনটা আনন্দে নেচে উঠলো। আমি মনের আনন্দে মানুষের মেলা দেখতে দেখতে হাঁটছি।
আহা! শায়েস্তা খাঁর আমল। সব কিছু সস্তা। আমার পকেটে যা আছে তাতে কমপক্ষে ১২০ মন চাল পাওয়া যাবে। এই পরিমাণ চালের দাম মাত্র ১৫ টাকা। আগে পেট পুরে কিছু খেয়ে নেই। তারপর সব কিছু কেনা যাবে। শীতের সন্ধ্যায় ফুটপাথে ভাঁপা পিঠার ঘ্রাণ পেয়ে আমার ক্ষিধাটা আরও চনমনিয়ে উঠল। পিঠা বিক্রেতার আন্তরিক আপ্যায়নে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। শায়েস্তা খাঁর আমলে যেন পারলে একেবারে ফ্রি খাইয়ে দেয়। মাত্র তিনটি পিঠা খেয়ে ৩ পয়সা দিতে গিয়েছি, ব্যাটা বলে কিনা ১২০ মন চালের দাম দিতে হবে।
তখন আমার মাথায় ওয়ান ইলেভেন এসে ভর করে। ওয়ান ইলেভেনের কুশীলবরা আমাদের শায়েস্তা খাঁর আমলের গল্প শুনিয়েছিলেন। সেই গল্প শুনে শুনে নগরীর পশ্চিম তোরণের সন্ধানে ঢাকা শহর চষে বেড়াচ্ছি। তিন তিনটি ওয়ান ইলেভেন চলে গিয়েছে কিন্তু সেই তোরণের সন্ধান পাইনি। শায়েস্তা খান যখন ঢাকা ত্যাগ করেন, নগরীর পশ্চিম তোরণে সস্তায় পণ্যমূল্য প্রদর্শনকারীর জন্য তোরণটি উন্মুক্ত রাখার কথা বলেছিলেন। সেই থেকে আমি তোরণটির সন্ধান করছি। আজ ঢাকা নগরীর পশ্চিমে আজিমপুর-পলাশী গিয়েছিলাম। সেখান থেকে শান্তিনগরে
এসে এই কাণ্ড। তারপরের ঘটনা তো আপনারা দেখেছেন নিশ্চয়ই।"
ফুটপাথের এ অংশে ছোটখাট একটা জনসমাগম হয়ে গেছে। এতক্ষণ রুদ্ধশ্বাসে সবাই দেখছিল একটি নৃশংসতার অধ্যায়। এক গরীব পিঠা বিক্রেতার উপর আক্রোশ ঝাড়ছিল এক ভদ্রলোক। গলা টিপে মেরেই ফেলেছিল কিশোর ছেলেটিকে। কতই বা বয়স হবে কিশোরটির। চৌদ্দ পনের বছর বয়স। অনেকটা সিডরের সমান হবে। আমার ল্যাবরুমের কথা মনে পড়ে। হিমিডা, এন্ডামিন,
থিয়ামিন সবার কথা মনে পড়ে। বসের নির্দেশে সবাই যার যার কাজ করে যাচ্ছে। আমিও শায়েস্তা খাঁর গেটের এপাশে থেকে আমার চিন্তা-ভাবনার কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।
বাংলাদেশের সব স্বপ্ন দেখার ভার কেন বস শুধু আমার উপরই চাপিয়ে দিয়েছেন, তা আজও বুঝে উঠতে পারি না। ওয়ান ইলেভেনের দিনগুলোতে ওয়ান ইলেভেনের কুশীলবরা মাঝে মাঝে শায়েস্তা খাঁর আমলের স্বপ্ন দেখাতেন জনগণকে। আমার স্থায়ী মেমোরিতে সংরক্ষিত তথ্য থেকে দেখতে পাচ্ছি বাংলার সুবাহদার শায়েস্তা খাঁ'র আমলে (১৬৬৪-১৬৮৮) শস্যের দাম খুব কম ছিল। টাকায় আট মন চাল পাওয়া যেতো। অর্থাৎ ৪০ সের চালের দাম ছিল ২ আনা। তাঁর প্রায় ২৪ বছরের শাসনামল বাংলার স্বর্ণযুগ ছিল বলে আমার স্থায়ী মেমোরিতে সংরক্ষিত তথ্যাবলি জানাচ্ছে। একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন শাসক হিসেবে ঢাকা ত্যাগের সময় নগরীর পশ্চিম তোরণে তিনি একটি বাণী উৎকীর্ণ করে গেছেন-
"পণ্যের সস্তামূল্য প্রদর্শনকারীরাই একমাত্র এই তোরণ উন্মুক্ত করবে।"
বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্যের দাম দিনদিন যেভাবে বাড়ছে তাতে বোঝা যায় সস্তামূল্য প্রদর্শনকারী কেউই আর অবশিষ্ট নেই। শায়েস্তা খাঁর এই তোরণ দিয়ে যারা প্রবেশ করেছে তারা সব শস্যমূল্য সন্ত্রাসী। গ্রামের দরিদ্র কৃষকের উৎপাদিত একটি লাউ ১০ টাকায় কিনে কয়েক হাত বদল হয়ে চুড়ান্ত ভোক্তার কাছে পৌঁছে ৪০ টাকায়। ৬০ টাকা কেজি আমদানি করা ডালের কাগজ দুই হাত ঘুরে খুচরা দোকানে বিক্রয় হয় ১৬০ টাকা। জিনিসপত্রের দাম বাড়লে মানুষের কেনার ক্ষমতা কমে যায়। কেনার ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য তাকে অন্যায় পথ বেছে নিতে হয়। সমাজে বেড়ে যায় ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস। এই অরাজকতা দেশে ডেকে আনে নৈরাজ্য। মাঝে মাঝে শনির আখড়া কিংবা কানসাট প্লাবিত করে বিদ্রোহ হয়। এতে করে আবারও আরেকটি ওয়ান ইলেভেনের বীজ রোপিত হয়।
চলবে...
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১২:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


