১৭ বছর ধরে সরকারি সম্পত্তি দখল করে জামাতের অফিস
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
কাগজ প্রতিবেদক, বগুড়া : বগুড়া শহরে ব্যস্ততম সড়কে প্রায় কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি দখল করে থাকা জামাতে ইসলামী ও তাদের ট্রাস্টি পরিচালিত দৈনিক পত্রিকার অফিসটি ছেড়ে দেয়ার জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গত ১৭ বছর ধরে বারবার নোটিশ দেওয়া হলেও কোনো কাজ হয়নি। বরং তারা তাদের দখল সম্প্রসারণ করেছে। এসব ঘটনায় জেলা প্রশাসনের ভূমিকাও নিয়েও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। তবে নবাগত জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, এই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে খুব শিগগিরই তিনি ব্যবস্থা নেবেন।
শহরের নওয়াববাড়ী সড়কে ‘সিদ্দিক আমীনের বিল্ডিং’ নামে পরিচিত তিনতলা ভবনটির মালিক অবাঙালি (বিহারি) সিদ্দিক আমীন। মুক্তিযুদ্ধকালে সে পরিবার-পরিজনসহ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। এ কারণে স্বাধীনতার পর বাড়িটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে পরিগণিত হয় এবং বিধি অনুযায়ী তা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য গণপূর্ত বিভাগের ওপর দায়িত্ব ন্যস্ত হয়। ওই বাড়ির নিচতলার একটি অংশে গণপূর্ত বিভাগের রক্ষণাবেক্ষণ শাখাও খোলা হয়। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি তৎকালীন জেলা প্রশাসক শহীদুল আলমের (জোট আমলের বহুল আলোচিত শিক্ষা সচিব) মেয়াদকালে জামাতের নেতাকর্মীরা বাড়িটির নিচতলা মাসিক ভাড়ায় বরাদ্দ নিয়ে দলীয় কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। আর ভবনের দোতলা ও তৃতীয় তলার ঘরগুলো জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা বাসভবন হিসেবে ব্যবহার করতে থাকেন। ’৮৯ সালের শেষদিকে জাহানারা হাসিব নামে সাবেক এক সরকারি কর্মকর্তার পরিবারের সদস্য ওই ভবনের তৃতীয় তলায় ভাড়ার বিনিময়ে বসবাস শুর" করেন। পরে সেটি তিনি স্থায়ীভাবে বরাদ্দ কিংবা কিস্তিতে কেনার জন্য ১৯৯০ সালের ১১ জানুয়ারি জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করেন।
কিš' বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির নামে পরিত্যক্ত বাড়িঘর বরাদ্দ না দেওয়া সংক্রান্ত ১৯৮৭ সালের ৫ জুলাই পূর্ত মন্ত্রণালয়ের জারি করা আদেশের (স্মারক বিবিধ ৭/৮৭/১৮৫/৩৫) পরিপ্রেক্ষিতে ওই ভবনে জামাতে ইসলামীর অফিস ও জাহানারা হাসিবের অবস্থান অবৈধ দখল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯৯০ সালের ৭ জুন তৎকালীন বগুড়া জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পরিত্যক্ত বাড়িঘর ব্যবস্থাপনা পরিষদের সভায় পূর্ত মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ ওই নীতিমালার আলোকে সিদ্দিক আমীন বিল্ডিঙের অবৈধ দখলদার জামাতে ইসলামী ও জাহানারা হাসিবকে বাড়িটি খালি করে দেওয়ার জন্য তিন দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে রেজুলেশন গ্রহণ করা হয়। ওই সভার রেজুলেশনে পরিত্যক্ত বাড়িঘর ব্যবস্থাপনা পরিষদের সভাপতি তৎকালীন জেলা প্রশাসক ফজলুর রহমান ছাড়াও সদস্য সচিব গণপূর্ত বিভাগ বগুড়ার তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী কামাল উদ্দিন চৌধুরী এবং অন্য তিন সদস্য তৎকালীন পুলিশ সুপার আলতাফ হোসেন মোল্লা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আব্দুল মালেক মিয়া, পৌরসভা চেয়ারম্যান এড. জহুর"ল ইসলাম ও গৃহনির্মাণ ঋণদান সংস্থার আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মোঃ আজিজুল হকের যৌথ স্বাক্ষর রয়েছে।
বাড়িটি অবৈধ দখলমুক্ত করার জন্য প্রায় ১৭ বছর আগে আনুষ্ঠানিক সভায় রেজুলেশন করার পর বিগত বছরগুলোতে একাধিকবার চিঠি দিয়েও রাজনৈতিক এবং প্রভাবশালী মহলের চাপে জেলা প্রশাসন কিংবা গণপূর্ত বিভাগ ভবনটি খালি করতে পারেনি। বরং অবৈধ দখলদার হয়েও জামাতের নেতাকর্মীরা উল্টো বগুড়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকার নামে বরাদ্দ দেওয়া দোতলার পাঁচটি কক্ষের মধ্যে দুটি দখল করে তাতে তাদের দলীয় পত্রিকা দৈনিক সাতমাথার অফিস প্রতিষ্ঠা করেছে। দোতলার বরাদ্দপ্রাপ্ত শিক্ষিকা ইয়াকুত আরা ফেরদৌসীর স্বামী আব্দুস সালাম অভিযোগ করেছেন, ২০০২ সালের জানুয়ারি মাসে তার স্ত্রীর নামে বরাদ্দ হওয়ার প্রায় দেড় বছরের মাথায় ২০০৩ সালের আগস্টে জামাত নেতাকর্মীরা তাদের উভয়ের অনুপস্থিতিতে দুটি কক্ষ দখল করে নেয়। তিনি জানান, অবৈধভাবে দখল করা কক্ষ দুটি ফেরত পাওয়ার জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেও কোনো ফল পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, ’৯০ সালের রেজুলেশনের সূত্র ধরে ওই ভবনের অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের জন্য জোট সরকারের শাসনামলের শুর"র দিকে ২০০২ সালের ২ জুলাই জামাতে ইসলামী ও জাহানারা হাসিবের বরাদ্দ বাতিল সংক্রান্ত নতুন করে আরেকটি চিঠি ইস্যু করা হয়। কিš' তাতেও কোনো কাজ হয়নি। বলা যেতে পারে চিঠিটি ছিল শুধু আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। তবে চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি দেশে জর"রি অবস্থা জারির তিন মাসের মাথায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ওই ভবনটির সর্বশেষ অবস্থা জানতে চেয়ে গত ১২ এপ্রিল গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীকে চিঠি দেওয়া হয়। এর সাত দিনের মাথায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গণপূর্ত বিভাগের পাঠানো প্রতিবেদনে জামাতে ইসলামী ও জাহানারা হাসিবকে অবৈধ দখলদার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এরপর নিয়ম অনুযায়ী জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের মাধ্যমে বাড়িটি দখলমুক্ত করার কথা থাকলেও অজ্ঞাত কারণে গত দু মাসেও তা করা হয়নি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলা প্রশাসন উচ্ছেদ কার্যক্রমের জন্য কোনো উদ্যোগ না নিয়ে উল্টো গণপূর্ত বিভাগকেই প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণের গত ১৩ জুন চিঠি দিয়েছে।
উচ্ছেদ কার্যক্রম নিয়ে কেন এই কালক্ষেপণ জানতে চাইলে বগুড়ার নবাগত জেলা প্রশাসক হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার যোগদানের আগে কী হয়েছে তা আমি বলতে পারবো না, তবে এখন যখন জেনেছি, তখন অবশ্যই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে’। তিনি জানান, আগামী ২৪ জুন জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর উচ্ছেদ কার্যক্রম সম্পর্কিত প্রস্তাবনা উত্থাপন করতে বলা হবে।
অবৈধ ঘোষিত হওয়ার পরেও দখল না ছাড়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে জামাতের শহর কমিটির আমির আবিদুর রহমান সোহেল বলেন, ‘দলীয় কার্যালয়ের জন্য ভবনটি বৈধভাবে বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে এবং রশিদের মাধ্যমে নিয়মিত ভাড়া পরিশোধ করা হচ্ছে বলেই আমি জানি’। পরিত্যক্ত বাড়িঘর বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির নামে বরাদ্দ দেওয়া যাবে না বলে ১৯৮৭ সালে পূর্ত মন্ত্রণালয়ের নীতিমালার কথা জানালে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই’। এ প্রসঙ্গে দৈনিক সাতমাথা পত্রিকার সম্পাদক ও জামাতে ইসলামী বগুড়া জেলা কমিটির আমির অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দিন বলেন, ‘বাড়িটি আমাদের পার্টির তরফে চিরস্থায়ীভাবে কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিš' পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি’। দল নিয়ন্ত্রিত পত্রিকা দৈনিক সাতমাথার নামে ভবনটির দোতলার একাংশ দখলের অভিযোগটি তিনি অস্বীকার করেন। অপর দখলদার জাহানারা হাসিবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে পাওয়া যায়নি।
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।
শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন
মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪
মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।
মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন
শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন
পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।