ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার হরিণমারি সীমান্তের মন্ডুমালা গ্রামে রয়েছে এক বিশাল আম গাছ। দু’বিঘা জমি জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই গাছটি কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে এশিয়ার সর্ব বৃহত্তম আম গাছ। এ আম গাছ দেখার জন্য প্রতিদিন শত শত মানুষ বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসে।
মন্ত্রী, সচিব, হাই কমিশনার, জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন জেলার অসংখ্যা মানুষ বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার সীমান্তবর্তী হরিণমারি মন্ডুমালা গ্রামে ছুটে আসে এ আম গাছ দেখতে।
যে আমটির জন্য ঠাকুরগাঁও বিখ্যাত তার নাম “সূর্যাপুরী”। চমৎকার স্বাদ, সুমিষ্ট এবং ছোট আঁটি বিশিষ্ট আমটির স্বাদ যিনি একবার পেয়েছেন, তিনিই বারবার ছুটে এসেছেন উত্তরের এই শান্ত জনপদে। কেউ আসে বন ভোজনে, কেউ আসে শিক্ষা সফরে, কেউ আসে অলস সময় অতিবাহিত করার জন্য। তবে এ আমের চেয়েও আজ বেশি বিখ্যাত হয়ে আছে, ছবির এই আমগাছটি। কেবল একটি সূর্যাপুরী আমের গাছ রয়েছে দু’বিঘা জমি জুড়ে। প্রায় দু’শ বছরের অসংখ্য ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে হরিণমারী সীমান্ত এলাকার মন্ডুমালা গ্রামে এই আমগাছটি দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় ৫০ হাত প্রসে'র প্রবীণ এই গাছটি চারদিকে ছড়িয়ে দিয়েছে বিস্তৃত ডালপালা। প্রতিটি ডালের দৈর্ঘ্য ৫০/৬০ হাত। বিরাট জায়গা জুড়ে মাটিতে আসন গেড়ে জবুথবু হয়ে বসে থাকা গাছটিকে দেখলে মনে হয় সারি সারি আমগাছ জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে। কখনও মনে হয় গাঢ় সবুজ টিলায় সেজেছে হরিণমারীর প্রকৃতি।
স্থানীয় বয়োবৃদ্ধ রহিমউদ্দীন (৭১) ও ভবেষ বাবু (৮০) জানান, গাছটির ডালপালা আরও অনেক বেশি ছিলো। ঝড়ে ভেঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কিছুটা কমেছে গাছটির আয়তন। তবে আশপাশের দশ গ্রামের সবচাইতে প্রবীণ ব্যক্তিটিও গাছটির বয়সের সঠিক কিছুই জানেন না। কেউ বলেছেন দেড়’শ, আবার কেউ বলেছেন আড়াইশ বছর। তবে এলাকার বেশির ভাগ মানুষই একমত যে, গাছটির বয়স কিছুতেই দু’শ বছরের কম নয়।
পৈত্রিক সূত্রে গাছের মালিক ইসলাম উদ্দীনের মতে, গত বছর ৪৫ হাজার টাকা আয় হয়েছিল এ গাছের সূর্যাপুরী আম বিক্রি করে। এ বছর আমের ফলন কম হলেও দাম বেশী, তাই তিনি আশা করছেন, এবার অন্তত ৪০ হাজার টাকার আম বিক্রি করতে পারবেন। তিনি আরও জানান, এ বছর আম কিছু কম হয়েছে। তার এ আমগাছের খ্যাতি এ জেলা ছাড়িয়ে-ছড়িয়ে পড়েছে দেশ জুড়ে। আগামীতে বিদেশী অভ্যাগতদের ভিড়ও দেখা যাবে, এমন আশা ব্যক্ত করলেন বালিয়াডাঙ্গী সমিরউদ্দীন কলেজের অধ্যক্ষ বেলাল রব্বানী। নতুন যারাই দূর-দুরান্ত থেকে এ জেলায় একবারের জন্যও আসেন তারা এক নজর দেখার জন্য গাছটির কাছে ছুটে যান। এশিয়ার বৃহত্তম আমগাছটির পাশেই এই গাছের ডাল থেকে জন্ম নেয়া আরো কয়েকটি বিরাট আকারের গাছ বেড়ে উঠছে। ইসলাম উদ্দীনের মতে, ফলনের শর্ত ঠিকভাবে পূরণ করা হলে এই গাছ থেকে অজস্র চারা বানিয়ে জেলার অনেক জায়গায় এমন আম গাছ ছড়িয়ে দেয়া যাবে। আর তা হলে দু’বিঘা কেন আগামীতে চার বিঘা আয়তনের আম গাছ দেখতে পাওয়াও বিস্ময়ের কিছু হবে না।
এই আম গাছটির সাথে বহুদিন থেকে পরিচিত ঠাকুরগাঁও কৃষি সমপ্রসারণ অধিদফতরের শস্য উৎপাদন বিশেষজ্ঞ আব্দুল মজিদ জানান, এ আম গাছটি হচ্ছে লতানো আম গাছ। এ গাছের ডাল কেটে কলম চারা করা হলে এর আবাদ সারা জেলায় ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব। ইতোপূর্বে কৃষি অধিদফতরের প্রাক্তন মহা-পরিচালক এনামুল হক নিজে উদ্যোগী হয়ে জেলার বিভিন্ন নার্সারীতে এ গাছটি কলম চারা সরবরাহ করেছেন। এদিকে এই গাছটিকে ঘিরে হরিণমারীকে একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা ও ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসন। প্রাক্তন জেলা প্রশাসক মিঞা আব্দুল্লাহ মামুন ও প্রাক্তন উপজেলা নির্বাহী অফিসার খন্দকার আজিম আহমেদ নিজে উদ্যোগী হয়ে বালিয়াডাঙ্গী থেকে হরিণমারীর ঐ রাস্তাটিকে ইট বিছিয়ে সংস্কার করিয়েছেন। দাবি উঠেছে রাস্তাটিকে পাকা করার। বর্তমানে এখানে পর্যটকদের জন্য বসার ব্যবস্থা করেছেন উপজেলা কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে উপজেলা পরিষদের উদ্যোগে আম গাছটিতে যাত্রী ছাউনি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন। যাত্রী ছাউনিতে ৪ মে: টন চাল বরাদ্দ করা হয়েছে বলে জানান, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান প্রবীর কুমার রায়।
জেলা প্রশাসক মুন্সি শাহাবুদ্দীন আহমেদ জানান, পর্যটকদের জন্য ঐ গাছটির কাছে একটি রেষ্ট হাউস করার পরিকল্পনা জেলা ও সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসনের রয়েছে। সমগ্র ঠাকুরগাঁওবাসীর গর্ব এ দু’বিঘার আমগাছটি যেন আগামীতে হাজার বছর এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারে এজন্য সরকারের আরো মনোযোগের দাবি ঠাকুরগাঁওবাসীর।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

