somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যেখানে দেখিবে ছাই

০২ রা জুন, ২০১৮ বিকাল ৫:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



শ্বশুরবাড়ির যাবতীয় আচার অনুষ্ঠান আমি পারতপক্ষে এড়িয়ে চলি। যেভাবে পারা যায়, নিজেকে সুড়ুৎ করে একটা ফাঁক দিয়ে বের করে আনি। কিছুতেই ফাঁদি পা দিই না।
ফাঁদ মানে প্রকৃত ফাঁদ। যাকে বলে একেবারে মরণ ফাঁদ।

আমার বউয়ের সাথে আমার বিয়েটা পারষ্পারিক পছন্দের, মানে ঐ লাভ ম্যারেজ আর কী! শ্বশুরবাড়ির লোকজনের ধারণা, আমি পুরাই একটা মাকাল ফল। ওপরটা দেখনদারি হলেও ভেতরটা একদম ফোপরা।
ফোপরা বলতে আবার নারকেলের ফোপরা ভেবে বসবেন না যেন! ওটা তো তবু খাওয়া যায়। ফেরিওয়ালারা ঘুরে ঘুরে ভ্যানে করে ফেরি করে। অর্থাৎ সেটার খানিক দাম আছে। আমি আর যাই হই না কেন, ফেরি করে দেখানোর বস্তু না। তালাচাবি মেরে সিন্দুকে ঢুকিয়ে রাখতে পারলে বেশ হতো। কারো সামনে আর বের করারই দরকার পড়তো না। এটা আমার শ্বশুরবাড়ির লোকেদের ধারণা আর কী!

আমি হলাম গিয়ে ফাঁপা...পেঁপে পাতার ডাঁটি দেখেছেন? সেটার ভেতরে যেমন ফাঁপা থাকে। একদিক দিয়ে ফুঁ দিলে আরেকদিক দিয়ে বাতাস বেরোয়। আমি হলাম গিয়ে সেই জিনিস! যে যেদিক দিয়ে পারে ফুঁ দিয়ে যাচ্ছে। মনে মনে ভাবছে, অসুবিধা কী! বাতাসই তো বেরোবে। আওয়াজ বের হওয়ার তো আর মুরোদ নেই!

এসব কথা কেউ যে আমাকে বলেছে তা নয়, তবু সবার চোখের দিকে তাকালেই বেশ বুঝতে পারি। কেমন আড়ে আড়ে তাকায় সবাই আমার দিকে। সেই দৃষ্টিতে অবজ্ঞা মেশানো সস্তা কৌতুহল ছাড়া আর কিছু দেখি না। মনে মনে যেন জিজ্ঞেস করছে,
‘কী হে জামাই ছোকরা...আছো কেমন? কাজকর্ম জুটেছে কিছু নাকি শুয়ে বসেই দিন চলে যাচ্ছে? নাকি আজকাল বউয়ের ঘাড়ে চেপে বসেছো?’
মুখে একটু মুচকি মুচকি হাসি লেগে থাকে। চোখে চোখ পড়লেই অপ্রস্তুত হয়ে মুখ লুকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
এসব সয়ে গেছে এতদিনে। তবে তারপরেও মুখোমুখি হওয়াটা যতদূর সম্ভব ঠেকিয়ে রাখি।

আমার কাজকর্মকে তারা আবার ঠিক ধরার মধ্যে গণ্য করে না। ঠিকাদারী আবার কোনো কাজ হলো নাকি? যেখানে তাদের বড় জামাই, মানে আমার ভাইরা ভাই মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির হর্তাকর্তার লম্বা চওড়া একটা চেয়ার বাগিয়ে বসে আছে... সেখানে ঠিকাদার জামাইয়ের পরিচয় দিতেই তো লজ্জায় মাথা কাটা যায়। কী ভীষণ অপমানের কথা! লোকের দ্বারে দ্বারে কাজের সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো জামাই! ছ্যাঁ...তাদের মেয়েটা আর কাউকে খুঁজে পেল না?

তা তাদের মাথা কাটুক চাই ধড় কাটুক, আমার তাতে ইয়েটাও যায় আসে না।
এই ঠিকাদারীর দৌরাত্ম্য দেখিয়েই যে দু’দুটো ফ্ল্যাটের মালিক হয়ে বসে আছি, সেসব এদের মতো কানাদের চোখে পড়লে তো! তাদের মেয়েটাকে খাওয়াইতে খাওয়াইতে যে আমার সাইজের ডাবল বানিয়ে ফেলেছি, সেটাও তাদের চোখে পড়ে না। এতবড় একটা হাতি সামনে দিয়ে আসা যাওয়া করছে, তখন তাদের মুখে আওয়াজ নাই। শুধু আমার মতো নিরীহ পিঁপড়াকে দেখলেই তাদের গলা চুলবুল করে। যত্তসব!

আমার বৌ শাহানা...ধনীর ললনা। শাকভাত ছোট মাছ এসব আবার তার পেটে সহে না। তার জন্য বাজার থেকে বড় বড় রুই কাতলা কিনে আনি। নিত্য নতুন রেস্টুরেণ্টে খাওয়াইতে নিয়ে যাই। মাসে অন্ততঃ দু’বার বসুন্ধরা শপিং মলের চার তলায় ঘুরতে নিয়ে যাই। চার তলায়...মানে ঐ যে সব জুয়েলারির দোকানগুলো যেখানে গাঁট হয়ে আখড়া গেড়েছে।

আমার বৌ ঘুরে ঘুরে আংটি, চুড়ি, কানের দুল পছন্দ করে বেড়ায়। দরদাম করে ছেড়ে দিলে একটা কথা ছিল। কিছু না কিছু প্রতিবারই তার পছন্দ হয়ে যায়। ভেটকি মাছের মতো ফুলে থাকা মুখে সেসব কানের দুল কী শোভা বর্ধন করে, এই কথা আমাকে জিজ্ঞেস না করাই ভালো। বিয়ের আগে তবু চেহারাতে একটা খোলতাই ছিল। ভেবেছিলাম, ধনীর দুলালী...সাথে এই খোলতাই টুকু বাড়তি পাওনা। তাই দেখে শুনে ঝুলে গিয়েছিলাম। ঝোলাতেও বেশি বেগ পেতে হয়নি।
এখন না আছে সেই বীণা...আর না বাজে সেই বাঁশরী! সবই আমার অদৃষ্ট!

বৌয়ের কাজ বলতে শুধু ফেসবুকে টাইট হয়ে বসে থাকা আর ঘণ্টায় ঘণ্টায় ছবি পোস্ট মারা। আমি রেস্টুরেন্টের খাবারের বিল মেটাই আর সে ফেসবুকে ‘চেক ইন’ করে। মুখের কাছে মোবাইল নিয়ে এসে স্পাউট করে। মাঝে মাঝে আমাকেও করতে হয়। বড়লোকের মেয়ের মর্জি। মর্জিমাফিক না চললে তো আবার মুশকিল।

হাতির সাথে বসে থাকা তার গোবেচারা স্বামীকে দেখে ফেসবুকে লোকজন হাস্যরসাত্মক কমেন্টের তুফান ছুটায়ে দেয়। টুংটুং শব্দে ক্রমাগত নোটিফিকেশন আসতে আসে। বৌ দাঁত কেলায়ে সেগুলো চেক করতে করতে আমাকেও কিছু কিছু দেখায়।
‘এই দেখ দেখ, ইকবাল ভাই কী কমেন্ট করছে...হি হি...লিখেছে...দেখ বেচারা জামাই আবার...হি হি ...থাক তুমি শুনলে কষ্ট পাবা। তবে নীচে আরেকটা ভালো কমেন্ট করেছে। লিখেছে, চেক লাগবে শ্যালিকা? লাগলে বল, সঙ্কোচ কর না।’

আমার গা জ্বলে গেল। এই ইকবাল হারামীটারে আমি দুই চক্ষে দেখতে পারি না। আরে...ঐ ব্যাটাই, যার কথা বলছিলাম। আমার ভাইরা ভাই। ব্যাটার বড় বড় কথার তোড়ে জলোচ্ছ্বাস হয়ে যায়। ফুটানি দেখলে অস্থিমজ্জা সমেত জ্বলে যায়। বড় চাকরি করে দেখে দুনিয়ার রঙ মনে হয় ঠাউর করতে পারে না।
ব্যাটারে যদি আচ্ছামত একটা ডলা দিতে পারতাম!

আমার গায়ে পাঁচশো ভোল্টের বিদ্যুৎ চালায়ে দিয়ে বৌ বলতে লাগলো,
‘লিখে দিই, দিয়া যান চেক। তাইলে কাল আরেকটা নতুন রেস্টুরেন্ট...কী বল?’

আমি নিরীহ মুখে বললাম,
‘আজকের খানার পরে দু’দিন রেস্ট নিবা না? পরিস্থিতি কী হয় সেটাও তো দেখা দরকার। পেট বেশি গরম হয়ে গেলে আবার ছুটাছুটির ব্যাপার আছে। আল্লাহ আল্লাহ করে তিন চারদিন পার হোক, তারপর না হয় চেকটা নিও।’

বৌ আমার কাছে সস্তামার্গীয় কথাবার্তা শুনে অভ্যস্ত। এসব উচ্চমার্গীয় কথা সে বুঝতে পারলো না। মুখের হাসি না টলিয়েই বললো,
‘তাইলে তাই করি। এক সপ্তাহ পরেই চেকটা পাঠাইয়া দিতে বলি। উফ! জোশ একটা কাজ হইছে আজকের ছবিটা দিয়া!’
আমি মুখটাকে শুঁটকী মাছের মতো করে কোকাকোলার গ্লাসে চুমুক দিতে লাগলাম। খিদেটা যেটুকু ছিল, সেটুকুও মরে গেছে ইতিমধ্যে।
বৌয়ের সাথে এলে বিলের চিন্তায় এমনিতেই খিদে কমে যায় আমার। আজ মাঝখানে ভাইরা ভাইয়ের এই টিপ্পনিভরা চেকের প্রস্তাবে সেটা একেবারেই নাই হয়ে গেল। মনে মনে ষড়যন্ত্রের নীলনকশা এঁকে চললাম। একদিন না একদিন আমি এই ব্যাটার ইজ্জতের ফালুদা বানিয়ে খাবোই খাবো!

আমাদের এই রেস্টুরেন্ট যাত্রার দু’সপ্তাহের মাথাতেই আবার শ্বশুরবাড়িতে দাওয়াতের ডাক পেলাম। পিঠা খাওয়ার দাওয়াত। এদের লেগেই থাকে! কিছু একটা ছুঁতো পেলেই খাওয়াখাওয়ি। আর তার ফল হিসেবে সাইজে কেউই আমার অর্ধাঙ্গিনীর চেয়ে কম যায় না। দরজা কেটে ঘরে ঢুকতে হয় এমন অবস্থা!

শত বাহানা দেখিয়েও পার পেলাম না এই যাত্রায়। বৌ কাঁদোকাঁদো মুখে বললো,
‘আপা প্রতিবার দুলাভাইকে নিয়ে এসে কত রঙঢঙ করে! আর তুমি খালি আমাকে এভোয়েড করে চল। আমার বাবার বাড়ির কোনোকিছুতেই তুমি যেতে চাও না!’

এমন সরাসরি অভিযোগে আর কিছু বলার থাকে না। অগত্যা বেজার মুখে যুদ্ধে যাবার প্রস্তুতি নিতে লাগলাম।
শ্বশুরবাড়ি যাওয়া আমার কাছে যুদ্ধে যাওয়ারই সামিল। নানাদিক থেকে তীর বর্শা গোলা বারুদ ছুটে আসতে থাকে। আমি অসহায়ের মতো সেসব ঠেকাতে থাকি। বৌ তো বাপের বাড়িতে পা দেওয়া মাত্রই আমাকে ভুলে যায়। স্বজাতিদের পেয়ে আমার কথা আর তার মনেই থাকে না।

এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। বাড়িতে পা দেওয়া মাত্রই সে কাকে দেখে যেন ‘ওহ মাই গড’ বলে উল্কার বেগে হারিয়ে গেল। আমি গোবেচারার মতো পেছনে পড়ে রইলাম। বাড়ির সবাই তখন বড় জামাইয়ের পাতে দুধপুলি তুলে দিতে ব্যস্ত।

আমি এসে স্ব উদ্যোগে চেয়ার টেনে বসলাম। শ্বশুর সাহেবকে কদমবুছি করতেই শশব্যস্তে বলে উঠলেন,
‘ওহ হো...এসে পড়েছো...থাক থাক আবার সালাম কেন? নাও পিঠা নিয়ে খেতে শুরু কর।’
বলতে বলতে তিনি ব্যস্ত ভঙ্গিতে অন্যদিকে সটকে পড়লেন। ঠিকাদার জামাইয়ের পেছনে বেশি সময় নষ্ট করার প্রয়োজন দেখলেন না।

কেউই আগ বাড়িয়ে এসে আমার প্লেটে পিঠা তুলে দিল না। আমি নিজেই চুপিচুপি চোরের মতো পিঠা তুলে খেতে শুরু করে দিলাম। তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে এখান থেকে বেরুতে পারলে আমিও বাঁচি, আমার ইজ্জতও বাঁচে! গুষ্টি কিলাই শ্বশুরবাড়ির!

খাওয়ার টেবিলে একটু উত্তেজনা বিরাজ করছে এখন। শাশুড়ি চোখ বড় বড় করে দুবাই থেকে তার নতুন কিনে আনা পাথর বসানো কানের দুল হারিয়ে যাওয়ার গল্প শোনাচ্ছেন। আমার বৌ, শালা শ্যালিকা এমনকি আমার ভাইরা ভাই ইকবালও পাশে বসে গভীর মনোযোগে সেই গল্প শুনছে। গল্প শোনার ফাঁকে ফাঁকে আমার প্রতি তাদের শ্যেন দৃষ্টি দেখে মনে হতে লাগলো, দুলটা বুঝি আমিই সরিয়েছি!

ঠিক এমন সময়েই বেরসিকের মতো আমার ফোনটা বেজে উঠলো। হাতে নিয়ে দেখলাম সরকারি অফিসের এক এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ারের ফোন। গতমাসে একটা কাজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। দিব দিচ্ছি করেও ঝুলিয়ে রেখেছিল। এই মাসের শুরুতেই মালপানির বন্দোবস্ত করে দিয়ে তক্কে তক্কে ছিলাম। আজ যখন নিজে থেকে ফোন দিয়েছে, তার মানে উপঢৌকন পছন্দ হয়েছে।

এখন এই জায়গায় বসে কাজের কথা বলা যাবে না। উঠে ডাইনিং রুমের পাশের বারান্দাটাতে চলে গেলাম। কেউ লক্ষ্য করলো বলে মনে হলো না। আমিও আরাম করে কাজের আলাপ সেরে নিলাম।
বারান্দা থেকে ফিরতে যাচ্ছি এমন সময় মনে হলো মেঝেতে একদলা ছাইয়ের মধ্যে কী যেন চকচক করছে।

নীচে ছাই কেন রাখা হয়েছে সেটা না বুঝতে পারলেও মাথার মধ্যে ধাঁই করে একটা সম্ভাবনা উঁকি দিয়ে গেল। ঐ চকচকে জিনিসটা আমার শাশুড়ি আম্মার পাথর বসানো দুল না তো! আমি যদি সেটা উদ্ধার করে তার হাতে দিতে পারি তাহলে তো রাতারাতি হিরো বনে যাবো! শ্বশুরবাড়িতে সম্মান ফিরে পাওয়ার এটাই একটা মোক্ষম সুযোগ। এই সুযোগ কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না।

সাত পাঁচ কিছু না ভেবে উবু হয়ে বসে সোজা সেই ছাইয়ে হাত ডুবিয়ে দিলাম। চকচকে জিনিসটার এক প্রান্ত ধরে টান মারতেই বুঝলাম সাধারণ এক রাঙতা কাগজের একটা কোনা বের হয়ে আছে। বিশেষ কিছুই নয়। কিন্তু আমার হাতে যে আঠালো জিনিস মেখে গেল তা নিয়ে এখন আমি ভেতরে আবার কীভাবে ঢুকবো, সেই চিন্তাতেই অস্থির হয়ে গেলাম।

মেঝেতে কীসের যেন বিষ্টাকে ছাইচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। আমার হাত গিয়ে পড়েছে সোজা সেই ছাইমাখা বিষ্ঠায়।
হাত গুটিয়ে বেকুব হয়ে বসে ভাবতে লাগলাম এখন কী করবো!

এমন সময়ে মিউ আওয়াজ শুনে তাকিয়ে দেখি সাদা ধবধবে চেহারার এক বেড়াল বেজায় আনন্দে আমার ভগ্নদশা দেখছে। শ্বশুরবাড়িতে যে বিড়াল পোষে এটাই তো আমার জানা ছিল না!

এখন আমার পরবর্তী করনীয় কী দ্রুতগতিতে ভাবতে লাগলাম। নিকটতম বাথরুমে ঢুকতে হলেও আমাকে ডাইনিং টেবিল পার হয়েই যেতে হবে। এই বিষ্টামাখা হাত নিয়ে আমি সেই পুলসিরাত কীভাবে পার হবো?

ভাবতে ভাবতেই দেখি কোন ফাঁকে যেন আমার ইঁচড়ে পাকা শ্যালিকা এসে হাজির হয়েছে বারান্দায়। আমাকে মেঝেতে ছাইমাখা হাতে বসে থাকতে দেখেই বেরসিকের মতো চেঁচিয়ে উঠলো,
‘এ মা, দুলাভাই আপনি বিড়ালের হাগুতে হাত দিয়েছেন? এঃ হে! আপুনি দেখে যাও...দুলাভাই কী করেছে!’
আমি মনে মনে প্রমাদ গুনলাম। এমন পরিস্থিতিতেই বুঝি বলা যায়, ‘হে ধরণী দ্বিধা হও...আমি প্রবেশ করি তোমার অতল গহবরে!’

বাতাসের বেগে চাউর হয়ে গেল কথা। বৌ আবারো কাঁদোকাঁদো মুখে বলে উঠলো,
‘তুমি এই জিনিসে হাত দিয়ে দিলা? কেন? আর কিছু পেলে না হাত দেওয়ার জন্য?’

বৌ আমার হাতকে তার আঁচলের পেছনে লুকাতে বললো। আমি আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ তার নির্দেশ পালন করলাম। অকাজ একটা হয়ে গেছে। এখন বৌ যদি ফাঁকি ঝুকি মেরে ইজ্জতের কিছুটা বাঁচাতে পারে।
এভাবে লুকিয়ে ছাপিয়ে বৌ আমাকে নিয়ে চললো বাথরুমের উদ্দেশ্যে।

ডাইনিং টেবিলে বসে থাকা প্রতিটি চোখ এখন আমার দিকে তাক করা। ডাইনী শ্যালিকা পুরো হাটে একেবারে হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছে। কেউ কেউ উঁকিঝুঁকি মেরে আমার হাতের চেহারা দেখার চেষ্টা করছে।

শাশুড়ি এতক্ষণে আমার দিকে মনোযোগ দেবার সময় পেলেন। মুখখানাকে হাঁড়ি বানিয়ে বললেন,
‘ছাইয়ের মধ্যে কি কিছু খুঁজছিলে নাকি? হুলোটা যখন তখন যেখানে সেখানে অকাজ করে রাখে। সবসময় কাজের মেয়েগুলো পরিষ্কার করতে পারে না। তাই ছাই চাপা দিয়ে রেখেছিল। তুমি সেই ছাইয়ে কী মনে করে হাত দিয়ে দিলা?’

এবার মুখ খুললো আমার জানের দুশমন ভাইরা ভাই ইকবাল। বিটকেলে মুখটাকে আরেকটু তেতো বানিয়ে তাকে চিনির গুঁড়া মিশিয়ে দিয়ে বললো,
‘আহা! সব ছাইয়েই কি অমূল্য রতন মেলে ভায়া?’

একটা হাসির ঝড় উঠলো। আমার বৌয়ের মুখটা আরেকটু কাঁদোকাঁদো হয়ে উঠলো। মনে মনে বললাম,
‘দাঁড়া ব্যাটা! এর শোধ যদি না তুলছি তাহলে আমি আমার বাপের পোলাই না!’

শ্বশুরবাড়ি থেকে বেইজ্জত হয়ে আসার পরে মনমরা হয়ে মাস দুয়েক কাটিয়ে দিলাম। বৌকে নিয়েও কোথাও বের হই না। শোকের মাত্রাটা এত তীব্র যে বৌও এটা নিয়ে বেশি চাপাচাপি করে না।

মাস দুয়েক পরে একদিন হোটেল শেরাটনে গেছি এক রাঘব বোয়ালকে কব্জা করতে। এই মালটাকে পটাতে পারলে একটা সাঙ্ঘাতিক দাঁও মারা যাবে। বিদেশী পয়সার আমদানি আছে। একবার কাজ হাসিল হলেই টাকাই টাকা! ছোটখাট সরকারি অফিসারদের পেছনে কয়েকবছর না ঘুরলেও চলবে।

আমার হাতে একটা ব্রীফকেস। পার্টি এখনো আসেনি। এয়ারকন্ডিশন্ড লবিতে বসেও ঘামতে লাগলাম। আসার কথা বলেও ফস্কে গেল না তো! হয়ত অন্য কাউকে ইতিমধ্যেই সেট করে ফেলেছে।

বসে বসে বড় হোটেলের ঠাঁট দেখছি, এমন সময় চোখ গিয়ে পড়লো বেশ খানিকটা দূরে রাখা একটা টেবিলে। আরে! এ যে দেখি আমার ভাইরা ভাই! সাথে একটা কচি লাউয়ের মতো নরম বালিকা। আমার ভাইরা ভাই হাত নেড়ে নেড়ে কী যেন বোঝাচ্ছে আর মেয়েটি খিল খিল করে হাসতে হাসতে একেবারে তার গায়ের ওপরেই লুটিয়ে পড়ছে।

আমি রাঘব বোয়ালের কথা কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গেলাম। কী সিনেমা চলেছে ওখানে এটা তো আমাকে জানতেই হবে! এমন সুযোগ কি সবসময় আসে?
হাঁটি হাঁটি পায়ে এগিয়ে গেলাম সামনে। একেবারে সেই টেবিলের সামনে গিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে উঠলাম,
‘আরে ইকবাল ভাই যে! অফিসের কাজে এসেছেন নাকি?’

চমকে উঠে আমাকে দেখেই কিছুক্ষণ হতবুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে থাকলো আমার ভাইরা ভাই। তার চেহারার নাখোশ ভাব আমার নজর এড়ালো না। ঠিক ধরেছি! ডালের মধ্যে কালো কিছু একটা নিশ্চয়ই আছে!

চেহারার ভ্যাবাচ্যাকা ভাব দ্রুতই কাটিয়ে উঠে ব্যাটা উল্টো তার স্বভাবসুলভ গুঁতা মেরে বললো,
‘আরে কী খবর ভায়া? তুমি এখানে? কেউ সাথে করে নিয়ে এসেছে নাকি?’
আমি সেই গুঁতা খেয়েও বিশেষ গা করলাম না। মোষের সামনে লাল কাপড় ঝুলালেও সে গুঁতা মারতে আসে। আর লাল কাপড় তো এখন আমার হাতে। দেখবি ব্যাটা কেমন মজা!

‘জি ভাই, পার্টি সাথে করে নিয়ে এসেছে। তা আপনি কাকে সাথে করে নিয়ে এসেছেন? আলাপ করাবেন না?’
নিতান্ত অনিচ্ছাসহকারে মেয়েটার দিকে ফিরে তেতোমাখা মুখে ভাইরা ভাই বললো,
‘ও হচ্ছে জুলি, আমার প্রাইভেট সেক্রেটারি। আর জুলি... ইনি আমার শ্যালিকার হাজবেণ্ড। এই...ছোটখাট ঠিকাদারির কাজ করে আর কী!’

জুলি তার বসের কথার প্রথম অংশটুকু শুনে সম্ভ্রম মাখা চোখে তাকিয়েছিল আমার দিকে। শেষ অংশটুকু শুনেই দপ করে নিভে গেল। গা ছাড়া ভাবে একটা সালাম জাতীয় ভঙ্গি করেই অন্যদিকে মনোযোগ ঘুরিয়ে নিল।

আমি মনে মনে ছড়া কাটলাম,
‘জুলি...সদ্য ফোটা কলি...
তোমারে ক্যামনে ভুলি?
তুমিই যে আমার বারুদের গুলি!’

আরো কিছুক্ষণ কথা বলার ইচ্ছে ছিল। এক বেয়ারা এসে খবর দিল, কেউ নাকি আমার খোঁজ করছে। বুঝলাম পার্টি এসে গেছে। অগত্যা সরে পড়তে হলো।

পার্টি আসেনি। অন্যদিন দেখা করবে বলে মেসেঞ্জার মারফত মেসেজ পাঠিয়েছে। আমি পাল্টা মেসেজ দিয়ে আবার ভাইরা ভাইয়ের সন্ধানে এসেই দেখি, পাখি ফুরুৎ!
মনটা খারাপই হলো একটু। এতবড় একটা সুযোগ এভাবে হাতছাড়া হয়ে গেল!

একটা ছোকরা মতো বেয়ারাকে সেই টেবিল পরিষ্কার করতে দেখেই মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। হাতে কড়কড়ে কিছু নোট গুঁজে দিয়ে বললাম,
‘এখানে যারা এতক্ষণ বসে ছিল তারা কি এখানকার নিয়মিত কাস্টমার?’
বেয়ারা টাকার পরিমাণ দেখে দাঁত বের করে ফেললো। বলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করলো না। মুখ নামিয়ে নীচু গলায় বললো,
‘জি স্যার। নিয়মিত কাস্টমার। প্রতি মাসে কয়েকবার করে আসে।’

খুশিতে আমার বগল বাজাতে ইচ্ছে করলো। আমিও গলার স্বর খাঁদে নামিয়ে বললাম,
‘সাথে কি এই মেয়েটাই থাকে?’
‘জি স্যার, ইনারা দুজনেই আসেন।’
‘গল্প গুজব করেই চলে যায়?’

বেয়ারা এবার তার হাতের দিকে আবার তাকালো। এই টাকাতে আর বেশি খবর দেওয়া যুক্তিযুক্ত হবে কী না সেটাই ভাবছে বোধহয়। আমি কিছুমাত্র দ্বিধা না করেই আরো কয়েকটা নোট গুঁজে দিলাম তার হাতে। এবার সে জানালো,
‘না স্যার। উনারা একটা রুমে গিয়ে সময় কাটান। উনাদের ফিক্সড একটা রুম আছে। প্রতিবার সেই রুমেই যান।’

আমি হোটেল থেকে বেরিয়েই আর সময় নষ্ট করলাম না। আমার বৌকে ফোন দিলাম।
‘শুনেছো আজ তোমার দুলাভাইকে দেখলাম শেরাটন হোটেলে। সাথে একটা মেয়ে ছিল। নাম জুলি। উনার নাকি প্রাইভেট সেক্রেটারি। মাঝে মাঝেই নাকি আসেন এখানে। সেরকমই শুনলাম।’

আর কিছু বলার দরকার নাই। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। খবর এফএম রেডিওতে প্রচার করে দিয়েছি। বাদবাকি কার্যক্রম এখন সেখান থেকেই পরিচালিত হবে।
হলোও তাই। পাঁচ মিনিটের মাথায় আমার বৌয়ের বড় বোনের ফোন পেলাম। খুঁটিনাটি সব কিছু শুনে নিয়ে বললো,
‘আমি যাচ্ছি। তুমি কি আছো?’
আমি হোটলের কাছেই ছিলাম। তবু মিথ্যা কথা বললাম।
‘এঃ হে আপা! আমি তো বেশ অনেকক্ষণ হয় বেরিয়ে এসেছি। তবে দুলাভাই হয়ত এখনো আছেন। আপনি ৩০৪ নাম্বার রুমটাতে খোঁজ করে দেখতে পারেন। খুব বেশি দেরি করবেন না। একটু তাড়াতাড়ি রওনা দেন।’

আমার বৌয়ের বড় বোন হিসহিস করে বললো,
‘আমি গাড়িতে উঠে পড়েছি।’
আমার ভাইরা ভাইয়ের বাসা খুব বেশি দূরে নয়। জ্যামে না পড়লে আধা ঘন্টার অনেক আগেই চলে আসতে পারার কথা।

এরপর বেশ কয়েক সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে।
আমার শশুরবাড়িতে এখন আমার বেজায় খাতির। লুচ্চা জামাইয়ের আকাম কুকাম ধরিয়ে দেওয়ার জন্য আমার পদমর্যাদা বেশ কয়েক ধাপ বেড়ে গেছে।
ভাইরা ভাই ইকবাল সাহেব এখন চোরের মতো শশুরবাড়িতে আনাগোনা করে। শালা শালি আমার বৌ কেউই আর তার দিকে ফিরেও তাকায় না। তাদের বড়বোন গিয়ে হাতে নাতে দু’জনকে ধরেছে। ইকবালের কলার চেপে ধরে রাখা তার আর পাশে ওড়না দিয়ে ঘোমটা দেওয়া জুলির লাজনম্র ছবি এক নিউজপেপারের ব্যাক পেজেও চলে এসেছে। দুজনকে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ারও ইচ্ছে ছিল আমার বৌয়ের বড় বোনের। শশুর মশাই শেষমেষ ক্ষ্যান্ত করেছেন। ঘরের ইজ্জতের ব্যাপার!

ঘরের ইজ্জতের কথা চিন্তা করে ভাইরা ভাইয়ের ইজ্জতের যেটুকু টিকে ছিল সেটুকু ফেরত দেওয়া হয়েছে। তবে সে এখন দুধভাত। তার কথার আর দামই দেয় না কেউ! কথা তো কথা, ব্যাটা এতকিছুর পরে শ্বশুরবাড়িতে আসে কীভাবে কে জানে!

এতদিন অনেক গুঁতা খেয়েছি। সেসবের জ্বালা এখনো ভুলিনি।
শশুরবাড়ির আরেক দাওয়াতে একদিন মওকা পেয়ে ভাইরা ভাইকে একটা উল্টা গুঁতা দিলাম।
‘কী দুলাভাই্‌...দেখলেন তো? এজন্যই বুঝলেন...এজন্যই আমি ছাই দেখলেই হাত ডুবিয়ে দিই।
ময়লা থাকলেও থাকতে পারে! আবার... বলা তো যায় না...অমূল্য রতন থাকলেও থাকতে পারে!’

(ছবিঃগুগল)

সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জুন, ২০১৮ বিকাল ৫:০৮
১৫টি মন্তব্য ১৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দু'টি ছোট গল্প বলতে চাই

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৮ ই আগস্ট, ২০১৯ দুপুর ১:২৫



১। গ্রামের নাম রসুলপুর।
একেবারে সুন্দরবনের কাছে। অন্যসব গ্রামের মতোই একটি সহজ সরল সুন্দর গ্রাম। এই রসুলপুর গ্রামই আমাকে শিখিয়েছে কি করে পৃথিবীকে ভালোবাসতে হয়। মানুষকে ভালোবাসতে হয়। এই গ্রামের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেলফোর রোড টু কাশ্মীর ! : সভ্যতার ব্লাকহোলে সত্য, বিবেক, মানবতা!

লিখেছেন বিদ্রোহী ভৃগু, ১৮ ই আগস্ট, ২০১৯ দুপুর ১:৪০

ফিলিস্তিন আর কাশ্মীর! যেন আয়নার একই পিঠ!
একটার ভাগ্য নিধ্যারিত হয়েছিল একশ বছর আগে ১৯১৭ সালে; আর অন্যটি অতি সম্প্রতি ২০১৯ এ!
বর্তমানকে বুঝতেই তাই অতীতের সিড়িঘরে উঁকি দেয়া। পুরানো পত্রিকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

চামড়ার মূল্য- মানুষ ভার্সেস গরু

লিখেছেন কাওসার চৌধুরী, ১৮ ই আগস্ট, ২০১৯ বিকাল ৩:৪৪


২০১০ সালের কথা; তখন পূর্ব লন্ডনের ক্যানরি ওয়ার্ফ (Canory Wharf) এর একটি বাসায় ক্লাস নাইনে পড়া একটি ছাত্রীকে ম্যাথমেটিকস্ পড়াতাম। মেয়েটির আঙ্কেল সময়-সুযোগ পেলে আমার সাথে গল্পগুজব করতেন। একদিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

দাদীজান ও হ্যাজাক লাইট

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৮ ই আগস্ট, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:০০



সময় ১৯৮০ এর দশক, প্রতিবছর ডিসেম্বর মাসের শেষ শুক্রবার আমার দাদাজানের মৃত্যুবার্ষিকী’তে বড় চাচা, আব্বা বেশ খরচ করে গ্রামবাসী ও আত্মীয় পরিজনদের খাবারের একটা ব্যাবস্থা করতেন, বড় চাচা আর আব্বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গত কিছু সময়ে সামুতে যা যা হয়েছে, ব্লগারদের ওপর দিয়ে যা গিয়েছে, সেসকল কিছু স্টেজ বাই স্টেজ বর্ণনা!

লিখেছেন সামু পাগলা০০৭, ১৮ ই আগস্ট, ২০১৯ রাত ৮:১৪



কনফিউশন: ধুর! কি হলো! ব্লগে কেন ঢুকতে পারছিনা? কোন সমস্যা হয়েছে মনে হয়, পরের বেলায় চেক করে যাব। বেলার পর বেলা পার হলো, সামুতে ঢোকা যাচ্ছে না! কি সমস্যা!... ...বাকিটুকু পড়ুন

×