somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছুরি

০৯ ই নভেম্বর, ২০১৮ সন্ধ্যা ৬:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


‘এই তর আওনের টাইম হইলো! না আইলেই পারতি! ম্যালা দাম বাড়ছে তর...তাই না?’
শুলি’র দিকে কটমটে চোখে তাকিয়ে ছদ্মরাগ দেখালো মজিদ।
শুলি আদুরে ভঙ্গিতে কাছে ঘেঁষে বসে। এদিক সেদিকে চেয়ে মজিদের চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে বলে,
‘রাগ কর ক্যান? মাইনষের বাড়িত কাম করি। এট্টু দেরি ত হইবারই পারে!’
মজিদের রাগ তবু পানি হয় না। দুই ঘন্টা ধরে নিজের কাজকর্ম ফেলে রেখে মাঠের মধ্যে বসে আছে সে। সন্ধ্যা হব হব করছে! দোকান বন্ধ রেখে এখানে বসে মশামাছি তাড়াচ্ছে সে। তার মালিক যদি জানতে পারে সে এখন দোকানে নেই, তাহলে আর আস্ত রাখবে না। এই দুই ঘন্টার লোকসান কড়ায় গণ্ডায় আদায় করে তবেই ছাড়বে তার মালিক। সাথে কিছু গালমন্দ ফ্রি। মালিক তো নয়... সাক্ষাৎ যমদূত!

অবশ্য মালিকের আর দোষ কী! মজিদ যদি দু’দিন পরে পরেই এভাবে তার দোকানের লালবাতি জ্বালিয়ে দেয়, তাহলে তার খুশিতে বগল বাজানোর কথা নয়। এই সময়টাতো তার দোকানেই থাকার কথা! মাঠের মধ্যিখানে বসে হাওয়া খাওয়ার সময় তার কবে থেকে হলো?
অথচ এমন ফাঁকিবাজ ছিল না মজিদ। যেদিন থেকে ছুরির ফলার ঝিলিক দেখলো, সেদিন থেকেই মনটাও তার উচাটন হয়ে পড়লো।

মোটামুটি বড় একটা মুদি দোকানে কাজ করে মজিদ। কথাবার্তায় চটপটে বলে নিজের অবস্থান সে নিজেই তৈরি করে নিয়েছে। কাজে ঢোকার দু’মাস পরে থেকেই মালিক আব্বাস উদ্দীন গায়ে পড়েই তাকে অনেক সুযোগ সুবিধা দিয়ে রেখেছে।
প্রথম প্রথম মালিকের উপস্থিতিতে দোকানদারী করতো সে। দোকানের মালপত্রের পাশে একটা কাঠের চেয়ারে যুতমত বসে থাকতো আব্বাসউদ্দীন। বসে বসে মজিদের দোকানদারী দেখতো। প্রতিটি জিনিসের পাই পয়সা হিসাব নিত। তীক্ষ্ণচোখে মজিদের উপস্থিত বুদ্ধির ধার দেখতো। মনে মনে খুশি না হয়ে তার উপায় ছিল না।

ক্রেতা একবার তার দোকানে এলে মজিদের হাত থেকে তার নিস্তার পাওয়া কঠিন হয়ে যেত। মিষ্টি কথায় রসে কষে ডুবিয়ে দিয়ে মজিদ তার কাছে দোকানের জিনিস গছিয়েই ছাড়তো। কথার তোড়ে ক্রেতার একসময় আর মনেই থাকতো না, ঠিক কী খুঁজতে দোকানে এসেছিল সে।
এহেন চালু ছেলে জোগাড় করতে পেরে আব্বাসউদ্দীন বেজায় খুশি হয়ে উঠেছিল। পাড়ার আশেপাশের ছোটখাট মুদি দোকান, যারা এতদিন টুকটাক করে কর্মে খাচ্ছিলো...মজিদের আগমনে তাদের সকলেরই দোকান উঠিয়ে ফেলার উপক্রম হয়েছে। কাজেই এই করিৎকর্মা ছেলেকে ধরে রাখার জন্য যা যা করনীয়, আব্বাসউদ্দীন তার কিছুই করতে বাদ রাখেনি।

নাজিমউদ্দীন রোডে তার নিজের দোতলা একটা বাড়ি আছে। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া। এই শক্ত দুর্মূল্যের বাজারে এই বাড়িখানা থাকাতে একরকম প্রাণে বেঁচে গেছে আব্বাসউদ্দীন। সেই বাড়ির একতলা ভাড়া দিয়ে সে তার পরিবার নিয়ে দোতলায় থাকে।
মজিদকে সে একতলার ছোট একটা ঘরে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। একটা ঘর ছেড়ে দেওয়ার জন্য ভাড়াটিয়ার বেশ অনেকখানি ভাড়া কমিয়েও দিয়েছে আব্বাসউদ্দীন। তবু মজিদকে তার চাই। সুযোগ সুবিধা পেলে আর অন্য কোথাও উড়াল দেওয়ার চিন্তা করবে না সে।

শুধু ঘর দিয়েই ক্ষ্যান্ত হয়নি আব্বাসউদ্দীন। মজিদ তার বাসাতেই সকাল, দুপুর আর রাতে খায়। বাসার টুকটাক ফাইফরমাশও অবশ্য তার গিন্নি মজিদকে দিয়ে খাটিয়ে নেয়।
এই চট করে বাজারটা করে দেওয়া, বিশেষ কিছু দরকার পড়লে একটু দূরের মার্কেট থেকে কিনে আনা...নিয়মিতই এসব ফরমাশ তাকে খাটতে হয়। মজিদ সেসব খুশিমনেই করে। ঢাকা শহরে ফ্রি তে থাকা খাওয়া আর টাকা উপার্জনের এমন একটা সুযোগ পাওয়া রীতিমত ভাগ্যের ব্যাপার। আব্বাসউদ্দীনের প্রতি সে কৃতজ্ঞ বোধ করে। লোকটা তার মরা বাপের কাজ করেছে।

মন দিয়েই এতদিন নিজের কাজ করছিল মজিদ। ঝামেলা বাঁধলো একদিন, যেদিন পাড়ারই এক বাসায় কাজ করা শুলি এলো মজিদের দোকানে মশুরের ডাল কিনতে। তাকে দেখেই মনটা কেমন যেন আনচান করে উঠলো মজিদের।
শুলি...মানে সুলোচনা। আল্লাহ্‌ মালুম, এই মহা ভাবের নাম তাকে কে দিয়েছে!
বাপ-মা তার মরে গেছে ম্যালাদিন আগে। শুলির তখন ভালোমত বুদ্ধিই ফোটেনি। এক দূরের সম্পর্কের মামার কাছে খেয়ে না খেয়ে কোনমতে বেঁচেবর্তে ছিল। যে বাসায় সে এখন কাজ করে, সেই বাসার খালাম্মাই তাকে নিয়ে এসেছিল গ্রাম থেকে। শুলির মামা তখন তাকে ঝেড়ে ফেলতে পারলেই বাঁচে। তবু খদ্দের পেয়ে শুলির মতো ফ্যালনা জিনিসেরও দাম হাঁকিয়েছিল সে। যে জিনিসকে আস্তাকুড়ে ফেলে এলেই ল্যাঠা চুকে যায়, তাকে নগদমূল্যে গছাতে পেরে শুলির মামা’র একটা দাঁতও আর ভেতরে ছিল না।

খালাম্মা গাড়িতে উঠেই শুলির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল,
‘ঐ ছেড়ি, তর নাম কী রে?’
শুলি তখন গাড়িতে চড়ে চোখ বড় বড় করে দুনিয়া দেখছিল। মামা যে তাকে নগদমূল্যে বেঁচে দিয়েছে এটা নিয়ে তার মাথাব্যথা ছিল না কোনো। লাথি ঝ্যাঁটা খেয়ে আসা জীবনে পাঁকে পড়লো নাকি গর্তে, তা তার ভেবে দেখার অবকাশ ছিল না। প্রয়োজনও পড়তো না বিশেষ একটা। দিনশেষে ঘুমাতে যাওয়ার জন্য একটুখানি স্থান আর পেটে আগুন লাগলে অল্পকিছু খোরাক...এটুকু পেলেই সে খুশি।
খালাম্মা তীক্ষ্ণচোখে ভাবগতিক লক্ষ্য করে এবারে একেবারে খেঁকিয়ে উঠলো,
‘কী রে, কানে হুনোচ না নাকি? তর মামায় কি বোকা পাইয়া বোবা কালা ধরাইয়া দিলোনি? হুনবার পাইতাচস না? নাম কী তর?’

শুলি জানতো তার নাম সুলোচনা। যদিও সে তার মামা-মামীর কাছে ছিল নামবিহীন। তারা তাকে প্রয়োজনমত ছেমড়ি, ছেড়ি...এসব দিয়েই চালিয়ে নিয়েছে। তবু নিজের নামটা সে জানতো। দূরের কোনো অস্ফূট ধ্বনির মতো যখন মা’র কণ্ঠস্বরটা কানে ভেসে আসে...তখনই এই নামটা শুনতে পায় সে।
‘সুলোচনা...’
‘কী কইলি? আরিব্বাবা...ছুলোচনা! মইরা গ্যালামগা! কেঠায় রাখচে এই নাম? হুন ছেড়ী...আমি কইলাম ছু...লোচনা মুলোচনা কইবার পারুম না! শুলি কইয়া ডাকুম...ঠিক আচে?’

সেই থেকেই সুলোচনা হয়েছে শুলি। নামের হেরফেরে মনে তেমন কষ্ট ছিল না তার। তবু তো যাহোক একটা কিছু নামে তাকে ডাকা হচ্ছে এখন!
দেখতে দেখতে পাঁচ পাঁচটি বছর সে কাটিয়ে দিয়েছে এই বাসাতে। বারো বছরের অপুষ্ট শরীর শহরের আলো বাতাসে একটু একটু করে খোলতাই ছেড়েছে। এখন সুলোচনাকে দেখলে আর মশামাছির মতো অগ্রাহ্য করা যায় না। ঘাড় ঘুরিয়ে আরেকবার তাকাতেই হয়। কদমছাঁট খাড়া খাড়া চুলগুলো নেমে এসেছে পিঠ ছাড়িয়ে, ঠিক যেন সুমসৃণ জলধারা। গায়ের রঙ চাপা হলেও নাক চোখের ছাঁদ ভালো। সবচেয়ে সুন্দর শুলির ছোট ছোট দাঁতগুলো, ঝকঝকে শঙ্খের মতো। সেই পরিপাটি সারিবাঁধা দাঁতে একটা দাঁত আবার বেরসিকের মতো দুটো দাঁতের মাঝখান দিয়ে তেড়েফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে। সেই বেরসিক দাঁতটিই শুলির সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ। শুলি যখন হাসে, চোখ ফেরানো দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে।

প্রথমদিন দেখে মজিদও কাজ ফেলে তাকিয়ে ছিল হাভাতের মতো। মনের মধ্যে জ্বলে উঠেছিল হাজার হ্যাজাকবাতি। কেন যেন সেই হাসির ঝিলিক দেখে একটা কথাই মাথায় এসেছিল তার,
‘কী হাসি মাইরি! এক্কেবারে য্যান ফলাখোলা নতুন ছুরি!’
সেদিন থেকেই কাজেকর্মে আর মন বসে না মজিদের। ক্রেতার চাহিদামত জিনিস বের করতে না পারলে কথার মারপ্যাঁচে আর ভোলাতে পারে না তাকে। ক্রেতা দোকান ছেড়ে বের হয়ে যেতে যেতে পেছন ফিরে দেখতে থাকে তাকে। এই দোকান থেকে জিনিস চাইলে পাওয়া যাবে না, এই অভিজ্ঞতা তাদের ইতিপূর্বে হয়নি। সেই দৃষ্টির ভাষা বুঝতে পেরেও মজিদের হুঁশ হয় না। তার বহুল চর্চিত পারদর্শীতা ফিরে আসে না।
বারবার মেলানো হিসাবপত্রে ইদানীং তালগোল পাকিয়ে যায় প্রায়ই। মালিকের কাছে গিয়ে আমতা আমতা করতে থাকে মজিদ। আব্বাসউদ্দীন সন্দিগ্ধ চোখে মজিদের ভাবগতিক লক্ষ্য করে বলে,
‘কী রে মজিদ্যা কী হইছে তর? শরীল ভালানি?’

মজিদ বোঝে এভাবে নিজের পারদর্শীতা খুইয়ে বসলে চলবে না তার। এই বিশাল দুনিয়াতে ওটুকুই তার সম্বল। ওটাও যদি বেঘোরে হারায়, পথে পথে ঘুরে বেড়াতে হবে তাকে।
ধীরে ধীরে আয়ত্তে আনতে থাকে নিজেকে। ছুরির ধারে ঘায়েল হলে তো তার চলবে না! সারাজীবন সে ই ঘায়েল করে এসেছে অন্যদের। আজ নিজেই অক্কা পেলে চলবে?
কথার জাদুতেই জাল বিছাতে হবে। তারপরে সেই জাল আস্তে আস্তে গুটিয়ে আনতে হবে। ঘরে তুলতে হবে রুপোলী ঝিলিক দেওয়া ইলিশ!

তক্কে তক্কে থাকে মজিদ। একদিন আবার মুখোমুখি হয় শুলির। আদা রসুন কিনতে এসেছে আজ। এবার আর ক্যাবলার মতো তাকিয়ে থেকে সময় নষ্ট করে না মজিদ। বরং অপরপক্ষের সময়ের বারোটা বাজিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে বলে,
‘আইজকাল আদা রসুনের বাটা পাওন যায় গো! খামাখা আদা রসুন পাটায় পিষবার যাইবা ক্যা?’
শুলি কথা না বলে দাঁত বের করে অল্প হাসে। ছুরির ফলা আবার একটুখানি ঝিলিক তোলে। মজিদ আবার নিয়ন্ত্রণ হারাতে বসে। তাড়াতাড়ি আত্মসংবরণ করে বলে,
‘খালি খালি হাসো ক্যা? ভুল কিছু কইছিনি?’
শুলি এবারে মুখ খোলে। আস্তে আস্তে মিহি সুরে বলে,
‘বাটা কিনলে আপনার ক্ষতি হইবো নাকি লাভ?’
‘আমার ত ক্ষতিই হইবো গো মাইয়া! কিন্তু তুমারও যে সোনার লাহান হাতগুলান কালা হইয়া যাইবো গো! হেই চিন্তায় ত করতাছি আমি!’

মুখটাকে করুণ বানিয়ে কাঁচুমাচু মুখে কথাগুলো বলে মজিদ। দেখে মনে হয় যেন সত্যি সত্যি শুলির হাতের সম্ভাব্য করুণদশার চিন্তায় সে অস্থির।
মজিদের বলার ধরনে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে শুলি...চারদিকে ছড়িয়ে যায় তীক্ষ্ণ ক্ষুরধার ছটা। মজিদ কাজ ফেলে আবারো হাঁ করে সেদিকে তাকিয়ে থাকে। শুলি অপরূপ ভঙ্গি করে বলে,
‘আমার হাতের রঙ সোনার লাহান দ্যাহেন আপনি? আহহারে! জিন্দেগীতে মুনে হয় সোনা চক্ষেও দ্যাখেননি!’

কথাবার্তা এই পর্যন্তই হয় সেদিন। তবু এরপরে থেকে শুলিরও খুব ঘনঘনই আসতে হয় মজিদের দোকানে। কখনো আটা...কখনো মুড়ি, কখনোবা এমনি এমনি! কিন্তু বেশিক্ষণ থাকতে পারে না কখনো । দু’একটি কথা বলেই যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়ে। মজিদ অন্য ক্রেতা সামলাতে সামলাতে চোখের ইশারায় শুলিকে দাঁড়াতে বলে। শুলি তবুও দাঁড়ায় না। আশেপাশে কেউ না থাকলে বলে,
‘খালাম্মায় জানবার পারলে আমার গলা কাইটা ফালায় দিব!’
মজিদ আঁতকে উঠে বলে,
‘ম্যালা রাগ নাকি তুমার খালাম্মার?’
‘বাবারে! আগুনের লাহান রাগ!’
‘ক্যা এত রাগ ক্যা? পোলাপান নাই কিছু নাই...এত রাগ ক্যা মাইয়া মাইনষের? মারধর করে না তো তুমারে?’
এই কথায় শুলির মুখ নীচু হয়। চোখের কোণে চিকমিকিয়ে ওঠে কিছু একটু। পরক্ষণেই হাসতে হাসতে বলে,
‘বাপ-মায় না থাগলে রাস্তার কুকুর বিড়ালের হাতেও মার খাওন লাগে! আমারে ত তাও মাইনষে মারে!’

মজিদের হাজার জেরাতেও এর বেশি মুখ খোলে না শুলি। কখনো মুখে ওড়না প্যাঁচিয়ে দেখা করতে আসে। কখনোবা কুন্ঠিত মুখে হাত লুকোতে ব্যস্ত থাকে।
মজিদ চোখের কোণ দিয়ে দেখে নেয়, শুলির মুখের কালসিটা আর হাতের দগদগে পোড়াদাগ। মজিদ কিছু বলে বিব্রত করতে চায় না তাকে। থাক! শুলি যদি নিজের কষ্ট লুকিয়ে রেখেই খুশি থাকে, তাহলে সে তাকে উন্মুক্ত করবে কোন স্পর্ধায়?

ধীরে ধীরে ডালপালা ছড়ায় তাদের সম্পর্ক। একজন দু’জন করে আব্বাসউদ্দীনেরও কানে আসতে থাকে ওড়া ওড়া কথা। সাবালক ছেলে। নিজে থেকে কাউকে পছন্দ করলে আব্বাসউদ্দীনের কিছু বলার নাই। তবু মুরুব্বি হিসেবে সাবধান করে দিয়ে বলে,
‘তর পিয়ারের মাইয়া যেই বাড়িত কাম করে, হ্যার মালকিন কিন্তুক বহুত বদ! হুঁছ রাখিচ! পরে বিপদে পড়লে কইলাম আমি কিছু করবার পারুম না! তর বিপদ তুই ছামলাবি!’
বিপদ আর কী! বেশি তেড়িবেড়ি করলে বিয়ে করে ফেলবে। সে তো আর জোর করে কিছু করছে না! মজিদ যাকে ভালোবাসে, সেও তাকে ভালোবাসে।
মিয়া বিবিই রাজি...কী আর করবে কাজি?

ইদানীং কাজে কর্মে একেবারেই আর ঢুকতে পারছে না মজিদ। বিয়ের বয়স হয়ে গেছে। হাতের কাছেই বিয়ের পাত্রী ঘুরঘুর করছে। আর সে কী না বসে বসে আখ চিবুচ্ছে! গোল্লায় যাক ঘোড়ার ডিমের দোকানদারী!
আজ শুলি বিকেলের আগেই দেখা করবে বলে পাড়ার মাঠে অপেক্ষা করতে বলেছিল তাকে।
মজিদও মনে মনে ভেবে রেখেছিল, আজ সে শুলির কাছে বিয়ের কথা পাড়বে। মালিককে না জানিয়ে দোকান বন্ধ করে মাঠে এসে বসেছিল সেজন্যই। আব্বাসউদ্দীনের বৌ বহুদিন ধরেই একটা জিনিস কিনতে বলছিল। সেটাও কিনে এনে কাপড় দিয়ে প্যাঁচিয়ে পাশে রেখে দিয়েছিল। শুলির সাথে কথা শেষ করেই গিয়ে দিয়ে আসবে।
এদিকে বিকেল গড়িয়ে যখন সন্ধ্যা হয় হয়, তখন দেখা মিললো শুলির।

মজিদের রাগ তাই আর পড়তেই চায় না। এদিকে শুলিও আজ অন্যমনষ্ক। কথা বলতে বলতেই অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে অকারণে।
মজিদের এমনিতেই মেজাজ খাট্টা হয়েছে। তার ওপরে শুলির ব্যবহারও আজ কেমন যেন ভালো ঠেকছে না তার কাছে। স্বভাববিরুদ্ধ ক্ষিপ্ত কণ্ঠে সে বলে ওঠে,
‘আইবার না চাইলে আইয়ো না! আমি কি জোর করছি নাকি তুমারে?’
শুলির অবরুদ্ধ অশ্রু আর বাঁধা শোনে না। ঝরঝরিয়ে গড়িয়ে পড়ে তুমুল বেগে। তা দেখে মুহূর্তকাল ধম মেরে বসে থাকে মজিদ। তারপরেই ধড়মড়িয়ে উঠে বলে,
‘আরে আরে...কী হইছে? কী হইছে তুমার? আমি ত এমনি কইছি পাগলি! এ্যামনে কান্দো ক্যা?’

কান্নার তোড়ে আলগা হয়ে আসে শুলির গলায় প্যাঁচানো ওড়না। বিস্ফোরিত চোখে মজিদ দেখতে পায়, কানের নীচ থেকে কাঁধ অব্দি গলার পাশ ঘেঁষে লাল টকটকে দাগ। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, গরম কিছু দিয়ে ছ্যাঁকা লাগানো হয়েছে তাতে। মজিদের দৃষ্টি লক্ষ্য করে তাড়াতাড়ি আবার ওড়না প্যাঁচাতে যাচ্ছিলো শুলি। মজিদ এক ঝটকায় তার হাত সরিয়ে দেয়। অগ্নিঝরা কন্ঠে বলে,
‘কুনোদিন জিগাইনি! আইজ জিগাইতাছি! হাছা কইরা কও...কী হইছে? কীয়ের ছ্যাঁকা খাইছো গলায়?’
মজিদের চোখের দিকে চেয়ে ভয় পায় শুলি। এই মজিদকে সে চেনে না। এর কাছ থেকে পালানোর সুযোগ নেই তার। হাল ছেড়ে দিয়ে তাই বলেই ফেলে,
‘খালাম্মার গলার চেন খুঁইজা পাইতাছিল না। মনে করছে আমি সরাই ফ্যালছি! তাই রাগ কইরা খুন্তি গরম কইরা...
পরে বালিশের নীচে খুঁইজা পাইছে। খালাম্মার গলা থিইকা ছিইড়া পইড়া আছিল!
মজিদ আর একটাও কথা বলে না। চুপচাপ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে শুলির পাশে।

আকাশে ঘন করে মেঘ করেছিল। সেই মেঘ কখন অশ্রুধারা হয়ে বড় বড় ফোঁটায় ঝরতে শুরু করেছে, খেয়ালই ছিল না ওদের দুজনের। হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পেয়ে শুলি দৌঁড় দেয় তার খালাম্মার বাসার ছাদের উদ্দেশ্যে। যেতে যেতে বলতে থাকে,
‘আইজ আর বাঁচোন নাই আমার! খালাম্মা আইজ একগাট্টি কাপুড় ছাদে দিছিলো শুকান দিতে! আমার ত মনেই আছিলো না! আইজ মরছি আমি। আমি গ্যালাম গা...’
দূরে ভেসে যেতে থাকে শুলির কণ্ঠস্বর। সম্মোহিতের মতো মজিদও উঠে দাঁড়ায়। কিছু না ভেবেই এগিয়ে যেতে থাকে সামনে।

সেদিন সন্ধাবেলায় শুলির চিৎকারে ছুটে আসে আশেপাশের ফ্ল্যাটের মানুষ। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ভয়ার্ত মুখে চেঁচিয়ে চলেছে শুলি।
তার খালাম্মা চিত হয়ে পড়ে আছে ড্রইংরুমে। গলা থেকে নেমে আসা লাল রক্তে ভেসে যাচ্ছে ড্রইংরমে বিছানো সবুজ কার্পেট। চোখদুটো খোলা, বিস্ফোরিত...যেন কিছু একটা দেখে বিস্ময় আর ভয়ে তাকিয়ে আছে। কান আর কাঁধের মাঝামাঝিতে লম্বা লম্বা কয়েকটি কোনাকুনি পোঁচ। আর সেই পোঁচগুলোর পাশেই একেবারে মাঝ অব্দি গেঁথে আছে একটি নতুন চকচকে ছুরি!

ওদিকে রাতে খাবার দিতে এসে আব্বাসউদ্দীনের বৌ কিছুক্ষণ চেঁচামেচি করে যায় মজিদের সাথে।
‘কবে থিইক্যা একডা ছুরি কিইন্যা দিতে কইবার লাগচি, কানের মইধ্যে হান্ধাইতাচে না! হাবিজাবি কাটোনের লাইগা একডা ছুরি না হইলে চলতাছে না কইয়াই তরে ঠ্যালতাচি! হুনবার পাছ না? কাল ছুরি কিইন্যা আইনবি, তাইলে খাওন পাইবি! কইয়্যা রাখলাম!’
মজিদ মনে মনে বলে,
‘কাল আরেকখান ছুরি কিনোন লাগবো! হালা...হাবিজাবি কাইটবার যাইয়াই তো আগেরডা খরচ হইয়া গ্যালো!’

(ছবিঃগুগল)
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই নভেম্বর, ২০১৮ সন্ধ্যা ৬:৩১
৭টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দু'টি ছোট গল্প বলতে চাই

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৮ ই আগস্ট, ২০১৯ দুপুর ১:২৫



১। গ্রামের নাম রসুলপুর।
একেবারে সুন্দরবনের কাছে। অন্যসব গ্রামের মতোই একটি সহজ সরল সুন্দর গ্রাম। এই রসুলপুর গ্রামই আমাকে শিখিয়েছে কি করে পৃথিবীকে ভালোবাসতে হয়। মানুষকে ভালোবাসতে হয়। এই গ্রামের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেলফোর রোড টু কাশ্মীর ! : সভ্যতার ব্লাকহোলে সত্য, বিবেক, মানবতা!

লিখেছেন বিদ্রোহী ভৃগু, ১৮ ই আগস্ট, ২০১৯ দুপুর ১:৪০

ফিলিস্তিন আর কাশ্মীর! যেন আয়নার একই পিঠ!
একটার ভাগ্য নিধ্যারিত হয়েছিল একশ বছর আগে ১৯১৭ সালে; আর অন্যটি অতি সম্প্রতি ২০১৯ এ!
বর্তমানকে বুঝতেই তাই অতীতের সিড়িঘরে উঁকি দেয়া। পুরানো পত্রিকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

চামড়ার মূল্য- মানুষ ভার্সেস গরু

লিখেছেন কাওসার চৌধুরী, ১৮ ই আগস্ট, ২০১৯ বিকাল ৩:৪৪


২০১০ সালের কথা; তখন পূর্ব লন্ডনের ক্যানরি ওয়ার্ফ (Canory Wharf) এর একটি বাসায় ক্লাস নাইনে পড়া একটি ছাত্রীকে ম্যাথমেটিকস্ পড়াতাম। মেয়েটির আঙ্কেল সময়-সুযোগ পেলে আমার সাথে গল্পগুজব করতেন। একদিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

দাদীজান ও হ্যাজাক লাইট

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৮ ই আগস্ট, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:০০



সময় ১৯৮০ এর দশক, প্রতিবছর ডিসেম্বর মাসের শেষ শুক্রবার আমার দাদাজানের মৃত্যুবার্ষিকী’তে বড় চাচা, আব্বা বেশ খরচ করে গ্রামবাসী ও আত্মীয় পরিজনদের খাবারের একটা ব্যাবস্থা করতেন, বড় চাচা আর আব্বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গত কিছু সময়ে সামুতে যা যা হয়েছে, ব্লগারদের ওপর দিয়ে যা গিয়েছে, সেসকল কিছু স্টেজ বাই স্টেজ বর্ণনা!

লিখেছেন সামু পাগলা০০৭, ১৮ ই আগস্ট, ২০১৯ রাত ৮:১৪



কনফিউশন: ধুর! কি হলো! ব্লগে কেন ঢুকতে পারছিনা? কোন সমস্যা হয়েছে মনে হয়, পরের বেলায় চেক করে যাব। বেলার পর বেলা পার হলো, সামুতে ঢোকা যাচ্ছে না! কি সমস্যা!... ...বাকিটুকু পড়ুন

×