ঢাকা ওয়াসার সচিব মজিবর রহমান আল মামুন পাম্প মেশিনের কারখানা পরিদর্শনের জন্য গত ৬ এপ্রিল জার্মানিতে যান। সেখানে ১১ দিন অবস্থানকালে তিনি কোনো কারখানা পরিদর্শন করেননি। ওই সময় তিনি জার্মানির বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়িয়েছেন। এ জন্য তাঁর পেছনে ঢাকা ওয়াসার ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকা। চার মাস পর গত ১ আগস্ট একই উদ্দেশ্যে তিনি আবারও জার্মানি যান। সেবারও কোনো কারখানা পরিদর্শন না করে গত ৮ আগস্ট দেশে ফেরেন। ফেরার পর কারখানা পরিদর্শনসংক্রান্ত কোনো প্রতিবেদনও জমা দেননি ওয়াসায়। কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন না হয়েও চার মাসের ব্যবধানে দুবার তাঁর কারিগরি বিষয় পরিদর্শনে যাওয়ার মতো ঘটনায় ওয়াসাতেই সৃষ্টি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ।
মজিবর রহমান আল মামুন সরকারের একজন উপসচিব। প্রেষণে ঢাকা ওয়াসায় সচিব পদে কর্মরত। কেবল তিনিই নন, গত দুই বছরে তাঁর মতো প্রায় দুই শ কর্মকর্তা-কর্মচারী এভাবে বিদেশ সফর করেছেন। আবার একই কর্মকর্তার ১০-১২ বারও বিদেশ ভ্রমণ হয়েছে। ওয়াসার স্থায়ী কর্মকর্তা নন, এমন ব্যক্তিও বিদেশ সফর করেছেন। পরে দুই মাসের মধ্যে বদলি হয়ে ওয়াসা ভবন ছেড়েছেন। ওই প্রশিক্ষণ ওয়াসার কোনো উপকারে আসেনি। কিন্তু ওয়াসার গচ্চা গেছে কোটি কোটি টাকা।
ওয়াসার এক কর্মকর্তা বলেন, ঢাকা ওয়াসার কর্মকর্তারা নানা অজুহাতে বিদেশ ভ্রমণে যাচ্ছেন। কাগজে-কলমে সফরের উদ্দেশ্য কর্মশালা-সেমিনার-প্রশিক্ষণ হলেও বাস্তবে সেটা হয় না। যে কারণে পরিবেশবিদ না হয়েও পরিবেশবিষয়ক কর্মশালার মতো কাজে যোগদানের সুযোগ করে দেওয়া হয়।
এ ব্যাপারে ঢাকা ওয়াসার সচিব মজিবর রহমান আল মামুন কালের কণ্ঠকে বলেন, 'সাধারণত যে বিষয়ের ওপর কর্মশালা, ওই বিষয়ের বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিকেই মনোনীত করা হয়। এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই। তবে প্রশিক্ষণের জন্য গেলে ইআরডির একটি অনুমোদন নিতে হয়।' কিন্তু নিজের ও অন্য অনেকের সামঞ্জস্যহীন বিদেশ ভ্রমণ সম্পর্কে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. তাকসিম এ খান গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করায় তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। চলতি মাসের শেষ দিকে তিনি দেশে ফিরতে পারেন। তবে ঢাকা ওয়াসার একাধিক কর্মকর্তা জানান, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের স্ত্রী-পুত্র যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করায় তিনিও গত তিন বছরের ব্যবধানে প্রায় ২০ বার যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন। এর মধ্যে কয়েকবার নিজস্ব ব্যয়ে গেলেও বেশির ভাগ সময় ওয়াসার সেমিনার-ওয়ার্কশপের নামে চালিয়ে দিয়েছেন। এমনকি অন্য কোনো দেশে সেমিনার হলেও যুক্তরাষ্ট্রকে ভ্রমণের তালিকায় যুক্ত করে নিয়েছেন। গত এক বছরের মধ্যে তিনি অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, ফিলিপাইন, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র (একাধিকবার), সিঙ্গাপুর, উগান্ডা, কেনিয়াসহ আরো কয়েকটি দেশ সফর করেছেন। বিদেশভ্রমণকারীদের তালিকায় তিনিই শীর্ষে।
ওয়াসার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, প্রশিক্ষণ বা পরিদর্শনের নামে যাঁরা বিদেশে যান, প্রমোদভ্রমণ বা বিনোদনই থাকে তাঁদের মূল উদ্দেশ্য। এ জন্যই দেখা যায়, নির্দিষ্টসংখ্যক কর্মকর্তা বিদেশ ভ্রমণের জন্য মুখিয়ে থাকেন এবং ঘুরেফিরে তাঁরাই বিদেশ যাওয়ার সুযোগ পান।
ওয়াসার এক কর্মকর্তা বলেন, প্রশিক্ষণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাজের সাযুজ্য না থাকায় প্রশিক্ষণে যোগ দিয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। আলোচনায় তিনি অংশ নিতে পারেন না। চুপ করে তাঁকে বসে থাকতে হয়। পরে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে বা ভ্রমণ করে সময় কাটিয়ে দেন। এতে দেশের মর্যাদার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
ওয়াসার একাধিক কর্মকর্তা জানান, অনেক সময় বিদেশ ভ্রমণের খরচ ঠিকাদারের কাছ থেকেও আদায় করা হয়। পণ্যের মান পরীক্ষার নামে ঠিকাদাররা কর্মকর্তাদের বিদেশে নিয়ে যান। তাঁদের বিনোদনের সব ব্যবস্থা করা হয়। দেশে ফিরে পণ্যের সাফাই গেয়ে ঠিকাদারকে ধন্য করেন। পণ্যের উচ্চমূল্য ধরে ঠিকাদার ভ্রমণ-খরচ সুদে-আসলে তুলে নেন।
বিদেশ ভ্রমণ করা এক কর্মকর্তা জানান, এত বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী বিদেশে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন, কর্মশালায় যোগ দিচ্ছেন অথচ তার প্রতিফলন ঘটছে না। ওই সব ভ্রমণকাজে আসলে স্বল্প বৃষ্টিতেই ঢাকা শহরে জলাবদ্ধতা হতো না, শুকনো মৌসুমে পানি সংকট দেখা দিত না। এতেই বোঝা যায়, বিদেশে ওয়ার্কশপের আড়ালে আসলে কী হয়।
নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, গত দুই বছরে ঢাকা ওয়াসার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, ইতালি, ব্রাজিল, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, চীন, ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। এক কর্মকর্তা জানান, নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুন্নাহার লাইলী ও সহকারী প্রকৌশলী আক্তার হোসাইন গত ফেব্রুয়ারিতে চীনে যান সাধারণ পাম্পমোটর পরীক্ষা ও কারখানা পরিদর্শনের জন্য। বেইজিং-সাংহাই-কুনমিং ঘুরে পাম্পমোটরের পক্ষে যুৎসই রিপোর্ট দিয়ে দেন। ঠিকাদার সেই সুযোগে নিম্নমানের চীনা পাম্পমোটর সরবরাহ করে ফায়দা লুটে নেন।
আরেক কর্মকর্তা জানান, শুধু অভিজ্ঞতা অর্জনের নামে ভাণ্ডার বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হোসেন ভুঁইয়া গত ১৩ থেকে ২২ জুন যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ করেছেন। অথচ ওই ভ্রমণে তাঁর কী অভিজ্ঞতা হয়েছে সেটা জানে না ওয়াসা।
বিএনপি সমর্থক ঢাকা ওয়াসা অ্যামপ্লয়িজ ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান একজন রাজস্ব পরিদর্শক। কিন্তু তাঁকে পাঠানো হয়েছে অর্থনৈতিক নগরায়ণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে চীনে। তাঁর সঙ্গে মোহাম্মদ নাজমুল হক নামের আরেকজন রাজস্ব পরিদর্শকও যোগ দেন। আবার বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক উত্তম কুমার রায়কে গত মার্চে যুক্তরাজ্যে পাঠানো হয় আরবান ওয়াটার ও স্যানিটেশন-বিষয়ক কর্মশালায়। এ রকম উদাহরণ পাওয়া যাবে আরো অনেক। কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন না হয়েও প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা অহিদুল ইসলাম গত আগস্ট মাসে মিটার পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা অর্জনে তুরস্ক ভ্রমণ করেছেন। ওয়াটার সাপ্লাই ও স্যানিটেশন প্রকল্পের পরিচালক হয়েও গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে জলবায়ুবিষয়ক কর্মশালায় যোগ দেন মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। এর কিছুদিন পর গত জুন মাসে তিনিই আবার ইতালিতে যান কর্মব্যবস্থাপনাবিষয়ক সম্মেলনে। ওই কর্মশালায় আরো যোগ দেন একই প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের স্টাফ অফিসার রফিকুল ইসলাম।
ওয়াসার এক কর্মকর্তা জানান, বিদেশ ভ্রমণের স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম হলো_পর্যায়ক্রমে সবাই বিদেশ যাওয়ার সুযোগ পাবেন। কিন্তু সেটাও অনুসরণ করা হয়নি। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের স্টাফ অফিসার রফিকুল ইসলাম, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল কাশেম, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আখতারুজ্জামান, মহসীন আলী মিয়ার মতো অনেকেই গত দুই বছরে ৮-১২টি দেশ ভ্রমণ করেছেন। আবার প্রকৌশলী মো. ইমরান, মো. আবু সুফিয়ান শিহাবউল্লাহর মতো কর্মকর্তারা একবারও বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ পাননি। আবু সুফিয়ান কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আমার চাকরির বয়সও খুব বেশি না। কাজেই এটা নিয়ে আমি অতটা চিন্তিত না।' আরেকজন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. এরশাদ বলেন, 'ভাই অনেকে তো একবারও যেতে পারেননি। আমি তো একবার নেপালে গিয়েছিলাম। কর্তৃপক্ষ যাঁদের পাঠানোর মতো মনে করেছে, তাঁদের পাঠিয়েছে। ভবিষ্যতে হয়তো আমাকেও পাঠাতে পারে।'
একাধিকবার ভ্রমণ করা নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আক্তারুজ্জামান বলেন, 'বিদেশে যাওয়ার অনুমতি পাওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো নিয়ম নেই। গত তিন বছরে হয়তো যিনি যাননি, তিনি আগে হয়তো গেছেন। আবার সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত লোকেরা যার যার সরকারের সময়ে বেশি যান। কেউ হয়তো আগে না গেলে পরে সুযোগ পান। সারা জীবনের হিসাব করলে সবারই হয়তো সমান হয়ে যায়।'
বেশিসংখ্যকবার বিদেশ সফর করা কর্মকর্তা-কর্মচারী : তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আবুল কাশেম, নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুশফিকুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী আক্তারুজ্জামান খান, নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম, মোহসীন আলী মিয়া, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী তাজুল ইসলাম, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. লিয়াকত আলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবদুল মজিদ, নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল লতিফ, এ কে এম শহিদউদ্দিন, সহকারী প্রকৌশলী এ কে এম গোলাম মোস্তফা, আবুল হাসনাত, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী ওয়াজউদ্দিন, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সাখাওয়াত হায়াত খান, ম্যাজিস্ট্রেট নাসিরউদ্দিন, প্রকৌশলী মোহাম্মদ শাহজাহান, নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম ভুঁইয়া প্রমুখ।
সূত্রঃ কালের কন্ঠ।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০১১ রাত ১২:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



