নিজ হাতে কয়েকজন শিক্ষার্থীর চুল কেটে দেওয়া, ছাত্রের মাথা ফাটানো, প্রশ্নপত্র তৈরিতে দায়িত্বহীনতাসহ রমরমা কোচিং-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী এক শিক্ষক মনসুর ইকবাল। স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম আর শিক্ষকতার নীতিবিরুদ্ধ কাজ করে আসছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিভাবকসহ গোটা শিক্ষক মহলে প্রশ্ন উঠেছে_একজন শিক্ষক যদি এসব কাজ করেন, তবে তাঁর কাছ থেকে শিক্ষার্থীরা কী শিখবে?
জানা গেছে, শিক্ষা বোর্ড নির্দেশিত নিয়ম না মেনে নিজের ইচ্ছামতো প্রশ্নপত্র তৈরি করেন তিনি। অষ্টম শ্রেণীর পরীক্ষায় ইংরেজি দ্বিতীয়পত্রের ব্যাকরণ অংশে ১২টি প্রশ্নে মোট নম্বর থাকতে হবে ৬০ আর কম্পোজিশন অংশে ৪০। কিন্তু ব্যাকরণ অংশে তিনি রেখেছেন ৪০ নম্বর আর কম্পোজিশন অংশে ৬০। তাতে ভুল শব্দ ব্যবহারসহ বানানেও অসংখ্য ভুল ছিল। তিনি নিজের ক্ষমতা দেখানোর জন্যই এ কাজ করেছেন বলে তখন অভিযোগ ওঠে। এদিকে গত ১৩ জুলাই ভিক্টোরিয়া স্কুলে ক্লাস নিতে গিয়ে নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী তানভির হোসেন, মোয়াজ হোসেন, রকি দেব, রাশেদ মিয়ার চুল নিজ হাতে কেটে দিয়েছেন মনসুর ইকবাল। এই ন্যক্কারজনক বিষয়টি জানাজানি হলে তানভির হোসেনের মা-বাবা স্কুলে এসে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। স্কুলের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে এ ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে তাঁদের বাসায় গিয়ে ক্ষমা চেয়ে বিষয়টির সুরাহা করেন মনসুর। গত বছর স্কুলে মোবাইল ফোনসেট আনার অপরাধে নবম শ্রেণীর 'গ' শাখার ছাত্র আবদুল গফুর খানকে দেয়ালের সঙ্গে ঠুকে দিলে তার মাথা ফেটে যায়। এর আগে ২০০৮ সালে মনসুর ইকবাল দশম শ্রেণীর ছাত্র শুভংকর পালকে স্কুলের নির্দিষ্ট নোট বই না নেওয়ায় বেদম পেটান। এতে তার কান দিয়ে রক্ত বের হয় এবং একপর্যায়ে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। ওই ছাত্রের বাবা উত্তরসুর কুলচন্দ্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সত্যেন্দ্র কুমার পাল জানান, শুভংকরের চিকিৎসায় প্রায় ১০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। তার কান এখনো পুরোপুরি ভালো হয়নি। শ্রীমঙ্গল পৌর পাঠাগার ও জনমিলন কেন্দ্রে এক সালিসে ওই চিকিৎসার অর্ধেক টাকা মনসুর ইকবাল দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও আজ পর্যন্ত তা দেননি। মনসুর ইকবাল স্কুলের চেয়ে শহরের কলেজ রোডের প্রেসক্লাবের বিপরীতে নিজের কোচিং সেন্টার ব্রিলিয়ান্টেই বেশি সময় দেন। ছাত্রছাত্রীদের তাঁর কোচিং সেন্টারে পড়তে তিনি বাধ্য করেন বলেও জানা গেছে। তাঁর বিরুদ্ধে সময়মতো স্কুলে না আসা এবং ছাত্রদের ব্যক্তিগত কাজে লাগানোরও অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া গত বছর এসএসসি পরীক্ষায় দেরিতে হলে ঢোকার কারণে হল সুপার দেরির কারণ জানতে চাইলে তিনি 'সো-হোয়াট' বলে ওঠেন। এ নিয়ে হল সুপারের সঙ্গে তাঁর বাগ্বিতণ্ডা হয়। পরে উপস্থিত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাঁকে সেদিন ডিউটি থেকে বিরত এবং ওই পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কমনরুমে বসিয়ে রাখেন। এ বিষয়ে ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক মনসুর ইকবালের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অষ্টম শ্রেণীর ইংরেজি প্রশ্নপত্র সিলেবাস অনুযায়ী না হওয়া এবং অসংখ্য ভুল বানান থাকার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, 'এটি বড় মিসটেক হয়ে গেছে। তবে তা আমার ইচ্ছাকৃত ভুল ছিল না।' ছাত্র নির্যাতনের বিষয়ে তিনি বলেন, 'আবদুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে আমি হারুন সাহেবের বাসায় গিয়ে বিষয়টি শেষ করেছি। এখন এ বিষয়গুলো নিয়ে আমার বলার কিছু নেই।' ছাত্রদের দিয়ে পরীক্ষার খাতা দেখানোর বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, 'ছাত্রদের দিয়ে শুধু খাতায় দেওয়া নম্বরগুলো যোগ করানো হতো, এর বেশি কিছু নয়।' নিয়মিত দেরিতে স্কুলে আসার অভিযোগটি তিনি অস্বীকার করেন।
ওই বিদ্যালয়ের সদ্য অবসরে যাওয়া প্রধান শিক্ষক মো. আবদুন নুর বলেন, 'মনসুর ইকবালের ছাত্রদের চুল কাটার ঘটনা সুস্পষ্টভাবে সরকারি বিধিমালার লঙ্ঘন। আমি দায়িত্বে থাকাকালে তিনি এক শিক্ষার্থীর মাথা ফাটানোর ঘটনাও ঘটিয়েছিলেন।' স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি এ এস এম ইয়াহিয়া বলেন, 'ছাত্রদের চুল কাটার ঘটনাটি এখনই শুনলাম। মনসুর ইকবালের ঘটনাগুলো স্কুলের সুনাম মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।' এ ব্যাপারে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবদুল মজিদ বলেন, 'এ ঘটনাগুলো আমি জানতাম না। মনসুর ইকবাল যদি এসব করে থাকেন, অবশ্যই অন্যায় করেছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
সূত্রঃ কালের কন্ঠ।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০১১ সন্ধ্যা ৭:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



