somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নিরালা দুপুর

১৬ ই মে, ২০১৯ রাত ৮:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




প্রিয় রাতজোনাকি,
ভালো আছিস নিশ্চয়ই? আমি কিন্তু বেশ আছি! স্বামী, সন্তান, সংসার, চাকরি……….বেশ কেটে যাচ্ছে আমার ব্যস্ত দিনগুলো! আর এই ব্যস্ততার জন্যই তোকে লিখি লিখি করেও আর লেখা হয়ে উঠে না! কতগুলো বছর পেরিয়ে গেছে সে দিনটার, যে দিনটায় মাথায় এসেছিল তোকে একটা চিঠি লিখি! ঠিকানাহীন চিঠি! যে চিঠির প্রাপকের ঘর শূন্য থাকবে আর যে চিঠিটা কখনো পোস্ট অফিসের ছায়াও মাড়াবে না! অবশ্য এখন আর সেই পোস্ট অফিসের যুগ নেই, মেইলের যুগ! তাও……! এই চিঠিখানা না হয় আমার ডাইরির এক ভাঁজেই পড়ে থাকুক? অজানাই থাকুক তোর কাছে সেই জানা দিবস-রজনীর স্মৃতিচারণগুলো?
জানিস, স্কুলের সেই রঙিন দিনগুলোর কথা ভীষণ মনে পড়ে!!!! আমাদের সেই পাঁচটা ভিন্ন জীবনের কোনো এক অদৃশ্য সুতোর বাঁধনে বাঁধা পড়ার গল্প! কিভাবে পাঁচটা ভিন্ন গল্প এক হয়ে গিয়েছিল……. এক হয়ে আবার সেই আলাদা হয়ে গেল……. বারবার মনে পড়ে! কখনো কখনো কোনো এক নিরালা দুপুরে ছোটটাকে ঘুম পাড়িয়ে যখন খোলা বারান্দায় হাওয়া খেতে এসে দাঁড়াই, মনে পড়ে যায় সেই স্বপ্নের মতো দিনগুলোর কথা! কোনো এক বৃষ্টির সকালে তুই বিশাল এক গাড়িতে চড়ে আমাদের নতুন দালানের বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিলি বাবার হাত ধরে। আমরা সবাই দূর থেকে লক্ষ্য করছিলাম। ডিসি সাহেবের মেয়ে আমাদের সাথে পড়বে! কেমন হবে কে জানে? আমাদের সাথে মিশবে তো? কথা বলবে? আচ্ছা, সে নিশ্চয়ই পড়াশোনায় ভীষণ ব্রিলিয়ান্ট?.......আমাদের মনে কত প্রশ্নের আনাগোনা যে ছিল সেদিন! তখন কি আর জানতাম, তুই এত উচ্ছল, এত চঞ্চল, এত প্রানবন্ত, এত মিশুক? যেদিন জানলাম, বিশ্বাস কর, আমরা প্রতিটা মেয়েই ভীষণ খুশি হয়েছিলাম! একজন আরেকজনের দিকে চেয়ে চোখে চোখে নিজেদের তৃপ্তির কথা জানিয়ে দিয়েছিলাম! তারপর চলতে লাগল আমাদের নতুন জীবন! তোকে ঘিরে রাখা আমাদের বিচ্ছিন্ন সেই চারজনের জীবন, যে চারজনকে কাছে টেনে নিয়েছিলি তুই নিজেই!

আমি, জ্যোতি, প্রিয়া---- তিনজনই ছিলাম ছা পোষা মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। কিন্তু তিনটে মানুষ ছিলাম সম্পূর্ণ ভিন্ন তিন ধরনের! তাও তুই কেমন নিজেকে আমাদের সাথে মানিয়ে নিয়েছিলি?! আমরা তিনটে বিচ্ছিন্ন মানব প্রাণী স্কুল জীবনের মাঝামাঝিতে এসে একে অপরকে খুঁজে পেলাম যেন শুধু তোরই কারণে! তোকে ঘিরেই আমাদের যত দিন যাপন! জানিস, তুই যেদিন খিলখিলিয়ে বাচ্চা মেয়ের মতো হাসতি, সেদিন আমরা তিনজন কি শান্তিতেই না দিন পার করতাম! আর যেদিন তুই কোনো এক গোপন দুঃখে চোখে দু’ফোঁটা চোখের জল ফেলতি, সিক্ত হয়ে উঠত আরো তিন জোড়া নয়ন!! তুই হয়তো কখনো তা লক্ষ্য করেছিস, কিংবা কে জানে! হয়তো সেই জলেরাও লুকোচুরি খেলেছিল তোর দৃষ্টির সাথে!
আচ্ছা, তোর রজতের কথা মনে আছে? একটি অভিন্ন লাল টকটকে ফুলের পাঁচটি পাপড়ির আরেকটি? যে আমাদের বন্ধুত্বের বন্ধনে পুরুষ সমাজের একমাত্র ব্যক্তি ছিল! যার ধর্ম, ধ্যান-ধারণা, জীবন-দর্শন সমস্তটাই আমাদের থেকে ভীষণ রকম ভিন্ন ছিল! কিন্তু তাও সে ছিল আমাদের অতি এক আপনজন, আমাদের দাদা!!! ক্লাসের আর কোনো ছেলের সাথে এই মানুষটার কোনো মিল ছিল না! জগতের আর কোনো সমবয়সীর সাথে এই মানুষটার চিন্তাভাবনার কোনো মিল খুঁজে পেতাম না! শুধু মনে মনে শ্রদ্ধা করতাম তাকে! আর ভালোবাসতাম ঠিক নিজের বড় একটা ভাই থাকলে যতটা বাসতাম হয়তো তার চেয়েও বেশি! কিন্তু, নিয়তি দেখ! সেই মানুষটাও তোর থেকে…………

হাহ! যাই হোক! অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গেল না? জানিস, মাধ্যমিকের পরে যখন তোর স্বপ্নের কলেজে আমি চান্স পেলাম, কিন্তু শুনলাম তোর হয় নি…. খুব আফসোস হয়েছিল! কারণ আমি জানতাম, তুই পদার্থবিজ্ঞানকে ভীষণ ভালোবাসতি! গনিত ছিল তোর অবসরের সঙ্গী! রসায়নটাকে যা একটু ভয় পেতি, বায়োলজিতে তা ১৬ আনা পুরিয়ে নিতি! তাও যখন ওই কলেজটায় তোর চান্স হল না………… আমি প্রায়ই টিফিন ব্রেকে একা একা হাঁটতাম আর ভাবতাম, এটা তোর স্বপ্নের কলেজ! আজ যদি তুই এখানে চান্স পেতি, হয়তো কোনো এক শুভলগ্নে আমাদের আবার দেখা হতো! হয়তো বাস্কেটবল মাঠে বা ট্রোজান-স্পার্টানস লড়াইয়ে! আচ্ছা, তখন আমরা কি করতাম? কথা না বলে থাকতে পারতাম? তোর কি একবারো আমার মাথায় টোকা দিতে ইচ্ছে করতো না? একবারো আমার নামের বিকৃত উচ্চারণ আমার শুনতে ইচ্ছে করতো না? হাহা! জানি না! সত্যি জানি না! গত পনেরোটা বছর একই শহরে থেকেও যখন একটি বারের জন্যও তোর ওই মিষ্টি মুখটা দেখতে পাই নি, এখন আর আশা করি না! কি জানি, এখন দেশের বাইরে গিয়েছিস কি না! হয়তো অনেক আগে থেকেই দেশের বাইরে, তাই আর খুঁজে পাই নি তোর মুখখানা! জানি, ভাবছিস, ফেসবুক ইনস্ট্রাগ্রামের কথা! কিন্তু বিশ্বাস কর, আমার খুঁজতে ভীষণ বাঁধে! তাই আর খুঁজি না! ভয় হয়, যদি পেয়ে যাই!

জানি না, সংসারি হয়েছিস কি না! আন্টির জেদে নিশ্চয়ই হয়ে থাকবি! আমি কিন্তু এখন পুরোদমে একজন সংসারি এবং মনের ডাক্তার! হাহা! হ্যাঁ, শেষ পর‌্যন্ত ওই বিএসসি, এমএসসি-টাই করতে হল! কলেজে পড়ার সময় সাইকোলোজির বড্ড প্রেমে পড়ে গেলাম যে! জ্যোতিটা কলেজে এসে ভীষণ খেটেছিল রে! তাই তো সে কষ্টের ফল পেয়েছে! সে এখন একজন গাইনোকোলোজিস্ট! আর প্রিয়া সেই ল’ তেই পড়াশোনা করে এখন একজন ব্যরিস্টার! ওর বরটা সেই ওর তুলনায় দ্বিগুণই হয়েছে রে! হাহা! ওহ! জ্যোতি কিন্তু সেই ক্রিকেটারের ঘরেই গেল! মেয়েটা বড্ড ভালো রে! ওকে যে এখনো বড় ভালোবাসি! আর রজত? নাহ্! সে পণ করেছে! সে সেই তার কথামতো সন্ন্যাসীই রয়ে গেলো এখনো পর্যন্ত! তবে আমরা সবাই এখনো চেষ্টা-চরিত্ত করছি কলেজ মাস্টারমশাইকে ছাঁদনাতলায় পাঠানোর! দেখি কি হয়…….!
জানিস, এখন না সেই আগের মতো আর কথায় কথায় কাঁদি না! অনেক শক্ত হয়ে গেছি! বাস্তবতা আমায় অবশেষে হারিয়ে দিল! তাই আর আগের মতো তোর মুখটার কাছে নতুন করে হেরে যাই না! শুধু এমন কোনো এক নিরালা দুপুরে তোর কথা মাঝেমাঝে ভাবি! আর ভাবি, জীবনটা কেমন এক অদ্ভুত খেলাঘর আর আমরা সবাই কেমন কলের পুতুল!
যাই হোক! যেমনটা আশা করেছিলাম যে খুব ভালো আছিস, ঠিক তেমনই থাকিস! হ্যাঁ, বুড়ি? আজ না হয় কলমটা রাখি, চিঠিখানা ভাঁজ করি! হয়তো আবার তোকে লিখতে ইচ্ছে করবে! তখন না হয় আবার অন্য কোনো এক নিরালা দুপুরে তোকে আবার লিখব? অনেক কথা বলার আছে….অনেক কথা………

ইতি
তোর বসন্ত
(বাসন্তী)


আমিও আমার হারানো বন্ধু সামুর কাছে!!!! B-) B-)
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মে, ২০১৯ রাত ৮:১৭
১২টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

করোনার মাঝে ভয়ংকর প্রতিবাদে জ্বলছে আমেরিকার অনেক শহর

লিখেছেন চাঁদগাজী, ৩০ শে মে, ২০২০ সকাল ৯:৪১



*** হোয়াইট হাউজের ২০০ গজের মধ্যে পুলিশ ও প্রতিবাদকারীদের মাঝে ধাক্কাধাক্কি চলছে , মানুষ হোয়াইট হাউসে প্রবেশের চেষ্টা করছে, অনেকেই আহত হয়েছে; এখনো গ্রেফতার করা হচ্ছে না।... ...বাকিটুকু পড়ুন

যেভাবে হত্যা করা হয় প্রেসিডেন্ট জিয়াকে-

লিখেছেন গিয়াস উদ্দিন লিটন, ৩০ শে মে, ২০২০ বিকাল ৩:৫৪

১/



রাতের শেষ প্রহরে তিনটি সামরিক পিকআপ জিপ এসে দাঁড়ালো চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের গেটের সামনের রাস্তায়। একটি পিকআপ থেকে একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেলের কাঁধে র রকেট লঞ্চার থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ২৯তম মৃত্যু বার্ষিকী

লিখেছেন রাজীব নুর, ৩০ শে মে, ২০২০ বিকাল ৫:৫৬



আমি জিয়াকে পছন্দ করি।
কারন উনি একজন সৎ লোক ছিলেন। ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে উনি কোনো দূর্নীতি করেন নি। কিন্তু অনেক ভুল কাজ করেছেন। রাজাকার গোলাম আযমকে দেশে ফিরিয়ে এনেছেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

অশিক্ষা, কুশিক্ষায় নিমজ্জিত, রাজনৈতিক জ্জানহীনরা সামরিক শাসনকে মিস করে।

লিখেছেন চাঁদগাজী, ৩০ শে মে, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:৪৮



১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা পরাজিত হলে, ২ কোটী বাংগালীর ঘরে জেনারেল ইয়াহিয়ার ছবি ঝুলতো সেদিন; কিছু বাংগালী আছে, মুরগীর মতো, চিলে বাচ্চা নিলে টের পায় না। নাকি আসলে মুসরগী টের... ...বাকিটুকু পড়ুন

পৃথিবী বিখ্যাত ব্যক্তিদের মা'য়েরা .............. এট্টুসখানি রম্য :D

লিখেছেন আহমেদ জী এস, ৩০ শে মে, ২০২০ রাত ৮:০৫



পৃথিবীর সব মা’য়েরাই একদম মা’য়ের মতো ।
সন্তান বিখ্যাত কি অবিখ্যাত, সে জিনিষ তার কাছে কোনও ব্যাপার নয়। তার কাছে সে কোলের শিশুটির মতোই এই টুকুন । যাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×