somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

তবুও ধ্রুবতারা…

৩০ শে এপ্রিল, ২০২০ দুপুর ১:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আমি রূপা। খুব ছোট্ট একটা জীবন আমার, বড় অদ্ভুত! আর এই ছোট্ট, অন্ধ জীবনের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রেই ছড়িয়ে আছে সে। আমার অবুঝ শৈশব, কৈশোর, যৌবনের প্রারম্ভ- প্রতিটি পর্বেই যেন কীভাবে কীভাবে সে আমার জীবনের সাথে জড়িয়ে পড়ল! আর আমি যুক্ত হলাম তার জীবননাট্যে!
আজও চোখের সামনে ভেসে ওঠে…



সাল ২০০৬। তৃতীয় শ্রেণিতে উঠলাম। একদিন এক কাকভেজা কুয়াশামাখা সকালে প্রথম পিরিয়ডে দেখলাম ক্লাসে এক নতুন ছাত্রের আবির্ভাব। একটু যেন সবার চাইতে আলাদা। চুপচাপ, স্বল্পভাষী। শ’খানেক ছেলের মাঝে রইলেও যেন তাকে বিশেষভাবে আলাদা করা যায়। তার বিনয়, নম্রতা, ভদ্রতা তাকে আর সকলের চেয়ে পৃথক করে রাখে। ক্লাসে সে অবস্থান করে এক স্বতন্ত্র স্বত্তা নিয়ে। টিফিন পিরিয়ডে সবাই যখন হৈ হৈ করে বেড়ায়, স্কুলের সামনের খোলা মাঠে ছুটে বেড়ায়, তখন তাকে দেখি ক্লাসের এক পাশে ড্রয়িং খাতা আর রংপেন্সিল নিয়ে আত্মনিমগ্ন।
বড় ইচ্ছে করত তার সাথে কথা বলতে, বন্ধুত্ব করতে। কিন্তু তার স্বলভাষী স্বভাব আর আমার জড়তা চুম্বকের মতো পেছন থেকে টেনে রাখত। তবুও হয়তো কখনো কখনো তাকে পেতাম যখন পাশাপাশি সিটে বসতাম, আমার বাকি বন্ধুদের সাথে- গল্প আর আড্ডায়, হাসি আর আনন্দে।


পরের বছর আমি হঠাৎ সরকারি স্কুলে চলে যাই। সেই আগের মতো আর তাকে দেখতে পাই না, আগের মতো হঠাৎ হঠাৎ আমাদের কথাও হয় না। তবুও সে যেন সারাক্ষণ আমার সাথে ছায়ার মতো রয়। আমি প্রতিটা মুহুর্ত, প্রতিটা ক্ষণ তাকে অনুভব করি। আর গভীর রাতে বালিশ ভেজাই কোনো এক না পাওয়া, অব্যক্ত, অবুঝ বেদনায়।
ক্ষণে ক্ষণে আমার কেবলই মনে হয়, এ আমার আপন কেউ। এ আমার খুব আপন কেউ, ভীষণ আপন!
বছর দুই পরে মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি হয়েই আবার তার দেখা পাই। আমি যেন আমার শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অঙ্গটুকু আবার ফিরে পেলাম।শান্তি! প্রাপ্তির শান্তি! সম্পূর্ণ হয়ে ওঠার শান্তি! কিন্তু জীবন যে কখনো সহজ সরল হতে শেখে নি। নিজের অঙ্গে সমস্ত জটিলতা জড়িয়ে নেওয়া তার একমাত্র শখ! তাই আমাদের জীবনও তার শখ পূর্ণ করল। আমরা কেউ রুখতে পারলাম না- জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতসারে।
আমি তার নাম সইতে পারি না, সে আমায় দেখতে পেলে মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে পথ চলে- ক্লাসের সবাই জানে আমরা দা-কুমড়োর সম্পর্ক বজায় রাখি। দেখতে দেখতে স্কুল জীবনটাও শেষ হয়ে গেল। কেবল শেষ হল না আমাদের মান-অভিমান, ভুল বোঝাবুঝির পর্ব!....


তবে সময় বদলায়। বদলায় মানুষ, তার চারিপাশ আর তার চারিপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জীবনগুলো। অনেকটা পরিণত আমি আগের মতো আর সেই ঝগড়া করি না, ঝগড়ায় হেরে গেলে ঠোঁট ফুলিয়ে চোখের পাতা ভেজাই না। বরং ছুটিতে বাড়ি গেলে বেরিয়ে পড়ি আড্ডায়। কফিশপে বন্ধুদের সাথে মেতে উঠি হাসি-আড্ডা আর কবিতায়। তবুও আমার জীবনে সেই মানুষটার অবস্থান অবিকল আগের মতোই রয়ে যায়। বরং সময়ের সাথে সাথে যেন একটু বেশি ফিকে হয়ে যায়।
কিন্তু….
আমার জীবনের ধ্রুবতারা আবার ফিরে আসে আমার আকাশে। এবার আর শত্রু নয়, বন্ধুরূপে!
জীবনের এক হঠাৎ দমকা হাওয়ায় বিষণ্নতার আঁধারে নিমজ্জিত হই আমি। ঠিক সেই সময় আমার সে আবার ফিরে আসে, একদমই অকস্মাৎভাবে, প্রদীপের শিখা হাতে! জীবনের রূঢ়তম সময়ে এতসব অগণিত মানুষের ভীড়েও আমি তাকেই খুঁজে পাই। বন্ধুর মতো অভয় দেয় আমায় প্রতিটা মুহুর্তে। ক্লিনিকাল কাউন্সিলিং এর পাশাপাশি তার এই অদ্বিতীয় বন্ধুত্ব আমায় আবার নতুন জীবন দেয়। স্বপ্ন দেখায় নতুন করে বেঁচে থাকার, নতুন করে ভালোবাসার।
ছেলেবেলার পুরনো সব মান অভিমান ঝেড়ে ফেলে আমরা একে অপরের কাছাকাছি আসি। ভালোবাসি, নতুন করে, সে আমাকে আর আমি তাকে।
তবে… ভাগ্য এবারও আমাদের কাছে আসার গল্পটা অসমাপ্তই রেখে দিল। তার নিতান্ত জেদের কাছে আমি বশ স্বীকার করে ফিরে এলাম আমার আপন আঁধারে।আর তার এত এত প্রশ্ন নিয়ে সে চলে গেল দূরে।আমার থেকে বহুদূরে। সে নাকি আমার যোগ্য না! তার পরিবার আমায় কখনো মেনে নেবে না! তাই এক আকাশ সমান ভালোবাসলেও সে আমায় সারা জীবনের সঙ্গী করতে পারবে না! তার এই বানোয়াট অযুহাতগুলো নিয়ে সে চলে গেল নিজের জীবনে, আমায় একলা ফেলে।



আবারো সময় বদলেছে। বদলেছে আমাদের জীবনের, চারিপাশ আর চারিপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষগুলো। এখন আমি ভীষণ ব্যস্ত- অফিস, সংসার, আমার একমাত্র পরী আর অনেক বছর আগের সেই দমকা হাওয়া যে আবার আমার জীবনে ফিরে এসেছে, আমার পরীর বাবা… এই নিয়েই আমার নতুন জীবন! হ্যাঁ, সেও নিজের জীবনটা নিজের মতো করে গুছিয়ে নিয়েছে। বোধ হয় ভালোও আছে বেশ। মাঝে মাঝে ফেসবুকের নিউজ ফিডে তার ও তার স্ত্রীর সুখী দাম্পত্য জীবনের চিহ্ন খুঁজে পাই। আমার হাত চুপিসারে লাইক বাটনটাকে নীল করে দিয়ে মোবাইলের স্কীন স্ক্রল করে। তখন হঠাৎ আমার পরী এসে লুটোপুটি খায় আমার কোলের মাঝে।

তবুও… এই সুখী দাম্পত্য জীবনের ফাঁকে যখনই কিছুটা সময় নিজের করে পাই, হঠাৎ বুকের মাঝে মুচড়ে উঠে। মনে পড়ে যায় সেই অনেক দিন আগের কথা। তখন মনের মাঝের ছটফটানো পায়রাটা চিৎকার করে বলতে চায়, তুমি আমার আপন কেউ। অনেক অনেক আপন। আমার জীবনের অংশ। আমার জীবনের ধ্রুবতারা… তোমায় আজও অনুভব করি, আজও…


সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জুন, ২০২০ সকাল ৯:৫৭
১০টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশে নিয়ানডার্থাল জিন: করোনার প্রাদুর্ভাব

লিখেছেন কলাবাগান১, ০৫ ই জুলাই, ২০২০ সকাল ১১:১১


ঘন্টা খানিক আগে একটা সাইন্টিফিক পেপার প্রকাশ হয়েছে.....পড়ে মাথা বন বন করে ঘুরছে....এত দেশ থাকতে কেন শুধু বাংলাদেশে????? এশিয়াতে তো করোনার প্রাদুর্ভাব কম এবং সেটা ব্যাখা করে ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নারী পুরুষ সম্পর্ক

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৫ ই জুলাই, ২০২০ সকাল ১১:৫৭




একজন পুরুষের জীবনে অনেক নারী আসে।
কমপক্ষে পাঁচ জন নারী। এরকম নারী জীবনের যে কোনো সময় আসতে পারে। বিয়ের আগে বা পরে। কিন্তু তারা জীবনে আসে। জীবন থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাটির চুলা

লিখেছেন সোহানাজোহা, ০৫ ই জুলাই, ২০২০ বিকাল ৩:৩১


ছবি কথা বলে: আজ হাটবার আপনে দেড়ি না করে বাজারে যান গা, নাতি নাতনি ছেলে বউ শহরের বাসায় নদীর মাছ খায় কিনা আল্লাহ মাবুদ জানে! (মাটিরে চুলাতে দাদীজান পিঠা ভাজছেন,... ...বাকিটুকু পড়ুন

উত্তর মেরুতে নিশি রাতে সূর্য দর্শন - পর্ব ৪

লিখেছেন জোবাইর, ০৫ ই জুলাই, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:০১

বিভিন্ন ঋতুতে ল্যাপল্যান্ড: শীত, বসন্ত, গ্রীষ্ম ও শরৎ

রেন্ট-এ-কার' কোম্পানীর সেই মেয়েটি কুশলাদি জিজ্ঞাসা করে আগে থেকেই পূরন করা একটা ফরমে আমার দস্তখত নিয়ে কিরুনা স্টেশনের পাশের পার্কিং এরিয়াতে নিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নন্দের নন্দদুলাল : স্বপ্ন রথে

লিখেছেন বিদ্রোহী ভৃগু, ০৫ ই জুলাই, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:০৬

স্বপ্নের অশ্বারোহী
দূরন্ত ইচ্ছেতে ঘুরে বেড়াই, নন্দ কাননে
তাম্রলিপি থেকে অহিছত্র
পুন্ড্রবর্ধন থেকে উজ্জয়িনী, স্বপ্ন সময়ের নন্দদুলাল।

আমাদের শেকড়
বাংলার আদি সাম্রাজ্যে যেন
পতপত ওড়ে পতাকা সবুজ-লাল,
মিলেনিয়াম নন্দ ডাইনাস্টির স্বপ্ন সারথীর স্বপ্নরথে

মানচিত্র: নন্দ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×