৫-৬ বছর আগের কথা। ডাক্তারদের একটি কর্মশালা হচ্ছে আইসিডিডিআরবিতে। শেষদিনে, মডারেটর বললেন যদি তোমাকে আমি এক মিলিয়ন ডলার দেই, তাহলে তুমি কী করবে?
সবাই অনেক কথা বললো। একজন বললো সে হাসপাতাল করবে, কেহ বিশ্বভ্রমণে যাবে, কেহ গাড়ি বাড়ি করবে।
তবে বয়সে সবচেয়ে ছোট ডাক্তার মেয়েটি বললো সে সব টাকা তার মাকে দিয়ে দেবে। সবাই ক্লাশে হো হো করে হেসে ফেললো। কষ্ট পেয়ে মেয়েটি কেঁদেই ফেললো। মডারেটর কী মনে করে জানতে চাইলেন কেন সে টাকাটা তার মাকে দিতে চায়?
মেয়েটি বলল - তার মা একটি হাসপাতাল করতে চায়, বাংলাদেশের ফিস্টুলা আক্রান্ত মেয়েদের জন্য। যেহেতু কেবল গ্রামের গরীব মেয়েদের ফিস্টুলা হয়, সে জন্য কেও এই হাসপাতাল ব্যবসায়িকভাবে করবে না। কারণ খরচ দেওয়ার মতো সামর্থ রোগীদের নেই। তার মা, যিনি বাংলাদেশে ফিস্টুলা রোগীদের খুব আপনজন এবং একজন ফিস্টুলা বিশেষজ্ঞ, তাহলে সে টাকায় হাসপাতালটি তৈরি করতে পারবেন।
দিন শেষে আমাদের ডাক্তার বাসায় ফিরে তার বাকী দুইবোন (একজন কম্পিউটার প্রকৌশলী, অন্যজন স্কুল শিক্ষার্থী) আর ভাই (ব্যারিস্টার)-কে একই প্রস্তাব দে - এক মিলিয়ন ডলার পেলে কী করবি?
-মাকে দিয়ে দেবো, ফিস্টুলা হাসপাতাল বানাবে।
২.
ফিস্টুলা একটি মেয়েদের রোগ। আমি ডাক্তার নই, কাজে সঠিকভাবে বর্ণনা নাও করতে পারি। মোটামুটি ব্যাপারটা এ রকম। আমাদের দেশে, প্রামেগঞ্জে সন্তান হওয়ার সময় হাতুড়ে ধাইরা নানান রকম উতপাত করে। এর মধ্যে একটি হলো মায়ের পেটে পাড়া দিয়ে সন্তান বের করার চেষ্টা। এর ফলে, সন্তান বের হওয়ার সময় মায়ের প্রশ্রাবের পর্দা ছিড়ে যায়। এর পর থেকে মায়ের প্রশ্রাব সারাক্ষণ ঝরতে থাকে। ফল হয় মারাত্মক। সারাক্ষণ প্রশ্রাব ঝড়ে বলে কেহ তাদের কাছে আসে না। স্বামী ত্যাগ করে, মানসিকভাবে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে।
এর চিকিতসা সম্ভব। তবে, খুবই জটিল ও সময় সাপেক্ষ অপারেশন। দুইটি অপারেশনের কথা শুনেছি কাল রাতে, দুটোতেই প্রায় ১০ ঘন্টা সময় লেগেছে!
যে অপারেশনে ১০ ঘন্টা সময় লাগে তার খরচ কেমন হতে পারে ধারণা করুন।
আমাদের গল্পের ডাক্তারের মা, যিনি নিজেও একজন প্রফেসর, আমার খালা শাশুড়ি, সরকারী হাসপাতালে ছিলেন দীর্ঘদিন। পিজিতেও ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে ফিস্টুলা নিয়ে কাজ করছেন। একজন অথরিটিও। আফ্রিকার দেশগুলোতে যান সেখানকার ফিস্টুলা রোগীদের অপারেশন করতে, ছুটে বেড়ান দেশের বিভিন্ন স্থানে এবং ফিস্টুলা অপারেশনে রোগীনীর কাছ থেকে কোন ফীসও নেন না। খালা যত দিন গিয়েছে তত ব্যাপারটা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন। সেই থেকে তিনি একটি হাসপাতাল করার জন্য চিন্তাভাবনা করছেন।
আমার খালু, তিনিও ডাক্তার, আশুলিয়াতে খালাকে তিন বিঘা জমি কিনে দেন এই হাসপাতাল করার জন্য। কিন্তু, কিসের জানি গ্যাড়াকলে পড়ে সে জমিটিও বেহাত হয়ে যায়।
৩.
গত্কাল রাতে খালা আমাদের, মানে তার ভাই-বোন আর তাদের সন্তান-সন্ততিদের ডেকেছিলেন। বলেছেন তাঁর স্বপ্নের হাসপাতালের কথা। বলেছেন এখন তিনি এই হাসপাতালটি গড়তে চান। আপাতত মগবাজারের একটি ভাড়া বাড়িতে। আমি আগেই লিখেছি এটি কোন ব্যবসায়িক উদ্যোগ হবে না, কারণ এই হাসপাতালের রোগীরা কখনো তাদের বিল দিতে পারবে না। কাজে এটি করতে হবে ভিন্নভাবে। সে জন্য একটি ফাউন্ডেশন তিনি করতে চান, আমাদের সবাইকে নিয়ে। আমাদের পক্ষে যা যা করা সম্ভব তা তা করে সেটা চালাতে হবে। আলাপ আলোচনাতে ফাউন্ডেশনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যগুলো সেট করা হল--
ক. ফিস্টুলারোগীদের চিকিতসা সেবা দেওয়া
খ. যে সকল ফিস্টুলা রোগী অপারেশন করলেও সম্পূর্ণ সুস্থ হবেন না, তাদের জন্য পুনর্বাসন ব্যবস্থা করা
গ. প্রিভেনশন, একটু উদ্যোগ নিলে, সচেতনতার মাধ্যমে ফিস্টুলা প্রতিরোধ করা সম্ভব। এজন্য গ্রামে গঞ্জে ব্যাপক প্রচারণা চালানো।
বোঝাই যাচ্ছে, এটি টাকার অংকে একটি অনেক বড়ো প্রকল্প। তবে, আমরা ঠিক করেছি আমরা নেমে পড়বো।
শুরু করার জন্য আমাদের প্রায় কোটিখানেক টাকা লাগবে। আমরা এখনো ঠিক জানি না কেমন করে টাকাটা যোগাড় হবে। তবে, এই টাকাটা আমরা যোগাড় করতে পারবো বলেই আমার বিশ্বাস।
তবে, আমাদের খালি এককালীন টাকা যোগাড় করলেতো হবে না, মাসে মাসে হাসপাতাল চালানোর টাকাও যোগাড় করতে হবে। মাসে যদি ১০টা অপারেশন করতে হয় তাহলে শুধু অপারেশন খরচই আসবে কয়েকলক্ষ টাকা।
তবে, আমরা পেছাতে চাই না। সে কারণে গতকালই আমরা ফাউন্ডেশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।
এখন পরের কাজগুলো।
৪.
গতকাল এই আলোচনা চলতে চলতে কোনফাঁকে ঘড়ির টাকা ১২টা ছুয়েছে খেয়াল করিনি। বাসায় ফেরার সময় আমার ছোট মেয়ে বিদুষী যখন বললো - হ্যাপি বার্থ ডে, তখন বুঝলাম, মহাকালের পরিক্রমায় আমার আর একটি বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। আমার স্মরণকালে এতো সুন্দর করে আমার জন্মদিন শুরু হয়েছে কী না আমি বলতে পারি না।
গণিত অলিম্পিয়াড, ওপেন সোর্স, কর্মসংস্থান, তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার, বিজ্ঞান আন্দোলন, আহমদ চৌধুরী ফাউন্ডেশন ইত্যাদি অনেক দোকান আমার আছে। এর সঙ্গে জন্মদিনে একটি নতুন দোকানের জন্ম হলো। এই নতুন দোকানখানি কতদূর আমরা টেনে নিতে পারবো জানি না।
তবে, আমি কেবল জানি থেমে গেলে চলবে না।
সবার সেকেন্ড ডিফারেন্সিয়াল নেগেটিভ হোক।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


