somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

—— এই তো জীবন!! —-

১৩ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ দুপুর ২:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



হেমন্তের হিমেল হিমেল হাওয়ায় গাছের পাতাগুলো একে একে ঝরে যাচ্ছে, আস্তে আস্তে দিনগুলো ছোট হয়ে আসছে ।এই সময়ে মনটা এমনিতেই উদাস উদাস লাগে রাইনার। ইউরোপের ব্যস্ত জীবনে আজকে একটু সময় পেয়ে লাঞ্চের পর একটু শুয়েছিল ঘুম ভাংগার পর রাইনা খাট থেকে নেমে কিচেনে ঢুকে এক মগ কফি নিয়ে বারান্দায় রাখা চেয়ারে বসে প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে পাতাশূন্য গাছ গুলোর দিকে তাকিয়ে তার মনটা আরো বেশী উদাস হয়ে যায় সে ভাবনার জগতে চলে যায় আজ থেকে প্রায় বিশ বছর আগে …।

অনার্স শেষ করতেই অনেকটা হুট করেই বিয়ে হয়ে যায় প্রবাসী পরিবারের ছেলে আয়ানের সাথে। ছয়মাস পরেই বাবা মাকে ছেড়ে চলে আসতে হয় ইউরোপে । আয়ান শিক্ষিত, স্মার্ট, মানুষ হিসাবেও খুবই ভাল । আয়ানের পুরো পরিবারসহ অনেক আত্বীয় স্বজন এখানে সেটেল্ড। অনেক বছর দেশের বাহিরে থাকায় এদের মন মানসিকতা অনেক উদার। সবাই খুব সহজে আমাকে আপন করে নেয়। আমার তো আপন বলতে কেউ ছিল না তারা ছাড়া কাজেই তাদেরকেই আপন ভেবেই তো এখানে এসেছি কিন্ত আমার মনটা পরে থাকত বাংলাদেশে।

আজকের মত তখন স্কাইপ, ভাইবার,ইমু ম্যাসেন্জার ছিল না কলিং কার্ড দিয়ে দেশে ফোন করতে হত, এটাও ছিল একটু কষ্টলি। আয়ান মাসে তিন/চারটা কার্ড এনে দিত। কার্ড কোম্পানিগুলোও ছিল চূড়ান্ত অসৎ! প্রথম বার কল করার সময় ৪০০-৫০০ মিনিট কথা বলা যাবে বল্লেও দেখা যেত ৬০-৭০ মিনিটের বেশি কখনোই কথা বলা যেত না ।

একটু হলেও প্রায় প্রতিদিন আম্মুর সাথে কথা হত , আব্বুর সাথে শুধু সালাম বিনিময় হত। আত্বীয় স্বজন , পারা প্রতিবেশী স্কুল কলেজের বান্ধুবীদের কথা মনে পরত খুব। কলেজের প্রিয় বান্ধবীদের সাথে কথা বলতে ইচ্ছা হত খুব কিন্ত যেটুকু সময় পেতাম তাতে আম্মুর সাথে কথা বলেই মন ভরত না অন্যদের সাথে কি ভাবে বলব! আম্মুর কাছ থেকেই যতটুকু পারা যায় অন্যদের খোঁজ খবর নিতাম। আয়ানকে বল্লে অবশ্যই আরো কার্ড কিনে দিত কিন্ত তীব্র একটা সংকোচের কারনে কার্ড শেষ হলেও আমি কখনোই কার্ডের কথা আয়ানকে বলতে পারতাম না আয়ানই খোঁজ করে করে কার্ড এনে দিত।

***
আয়ানদের এক আত্বীয়ের মাধ্যমে যখন বিয়ের প্রস্তাব আসে, তখন বয়স কম থাকাতে মনে মনে ইউরোপের রংগিন স্বপ্নে বিভোর হয়েছিলাম, মুখে আব্বু আম্মুর সিন্ধান্তই আমার সিন্ধান্ত বল্লেও মনে মনে চেয়েছিলাম বিয়েটা যেন হয়। বিয়েটা না হলে হয়ত কষ্ট পেতাম অনেক।
আব্বু আম্মু কি ভাবে তাদের একমাত্র সন্তানকে এতদূরে বিয়ের প্রস্তাবে কেমন করে এমন সিন্ধান্ত নিল সেটা এখনো ভেবে পাই না । আচ্ছা!! আব্বু , আম্মু কি আমার মনের কথা বুঝতে পেরেছিল!!

হ্যা! আমি ভাল বর, ভাল ঘর নিয়ে সুখেই আছি। কিন্ত আব্বু আম্মুর জন্য কেমন যে লাগে, বুকের ভিতর সারাক্ষন হা হা কার করে ।দেশের কথা. দেশের মানুষের কথা খুব মনে পরে, দেশে থাকলে হয়ত এই সব মানুষের কথা কখনোই মনে আসতনা, এতদুর বলেই হয়ত কাছের, দুরের কত মানুষের কথা মনেপরে ! প্রতি শুক্রবারে একটা ভিক্ষুককে আম্মু খাবার দিত তার কথাও মনে পরে মন খারাপ হয় ! বাসার সামনের রাস্তার গলিরকুকুরটার কথাও মনে পরে ।

আব্বু আম্মুর জন্য সারাক্ষন টেনশন হত, আব্বুর হাই প্রেসার ডায়াবেটিকস ঠিক মত ওষুধ খাচ্ছে তো! কাজের বুয়াটা ঠিকমত কাজ করছে তো নাকি মা একা একা সবকাজ করছে ? বুয়াটা যেই ফাঁকিবাজ ।
আচ্ছা, আম্মু কি সব সময় মন খারাপ করে আমার জন্য?
আয়ান ও ওদের পরিবারের সবার সাথে হাসি আনন্দের মাঝে থেকেও আব্বু, আম্মুর কথা মনে করে বুকের ভিতরটা ধুক ধুক করত নাজানি কখন কোন খবর আসে। মা হঠাৎ, হঠাৎ মিস কল দিত তখনবুকের ভিতরটা এত অস্থির করত না জানি কোন খারাপ খবর মনে করে এত উতালা হতাম ফোন না করে অন্য কোন কাজই করতে পারতাম না।

আগে যদি একটুও বুঝতে পারতাম এতটা কষ্ট এতটা খারাপ লাগবে তাহলে কখনোই বিদেশী ছেলে বিয়ে করে পরবাসী হতামনা।

ভাষা শিখার স্কুল শেষ করে আরো কিছু কোর্স শেষ করে জব শুরু করলাম, সংসার, সন্তান, জব নিয়ে ইউরোপের যান্ত্রিক আর ব্যাস্ত জীবন আমার ! আমার সব রাস্তা ঘাট চেনা হয়েছে হাতে এখন টাকাও আসে। চাইলে নিজেই ইচ্ছা মত কার্ড কিনতে পারে ! কিন্ত এখন আমার আর সময় হয় না I তাছারা চার, পাঁচ ঘন্টা টাইম জোনের ডিফারেন্সের কারণে দেশের সাথে সময় মিলানো কঠিন হয়ে যায় । তাই সপ্তাহে একদিন আম্মুর সাথে কথা বলা হয় I অবশ্য সেদিন একটু বেশী সময় নিয়েই কথা বলি কিন্ত আম্মু খুব কষ্ট পেত , কান্না করত প্রতিদিন কেন কথা বলি না, বলতো, সন্তান দুরে থাকলে কেমন লাগে বুঝতো না। আম্মুকে শান্ত করার জন্য বলতাম, আচ্ছা এখন থেকে করব কিন্ত সেই শনিবারের আগে আমার সময়ই হত না।

***
রাইনার মনে পরে এমনিই এক হিমেল বিকেলের কথা । সেদিন ছিল শনিবার,ছুটির দিন, সকাল থেকে রাইনার কেমন যেন বুকের ভিতর অস্থির অস্থির লাগছে । বাবা,মার কথা খুব মনে পরছে। সপ্তাহে কাজের দিন গুলোতে রান্না ছাড়া ঘরের আর কোন কাজকরা হয় না তাই ছুটির দিন গুলোতে অনেক কাজ জমে থাকে । রাইনা ভাবে কাজগুলো সেরে দেশে ফোন করবে । কিন্তু সব কাজ শেষ করে দুপুরের খাবারের পর বেড রুমে যেতেই আয়ান বলে,

রাইনা এসো আমার পাশে একটু শোও আমরা একটু গল্প করি,ছুটির দিন ছাড়া তো দিনের বেলায় তোমার আমার দেখাই হয় না ।
রাইনা বিছানায় বসে, আমি একটু দেশে ফোন করব আয়ানের উদ্দেশ্যে বলে, ল্যান্ড ফোনের দিকে হাত বাড়ায়, আয়ান রাইনার হাতটা টেনে ধরে একটু পরে ফোন করো আমিও অনেকদিন হল আব্বু ,আম্মুর সাথে কথা বলি না আমিও একটু কথা বলব তখন।
ক্লান্ত শরীর রাইনা আয়ানের সাথে কথা বলবে কি শুয়েই ঘুমিয়ে যায়।
কপালে কারো হাতের পরশে রাইনা চোঁখ মেলে তাকিয়ে দেখে তার শাশুরী।
-‘ রাইনা চোখ মেলে শাশুরীর দিকে তাকাতেই, বউমা, উঠ তোমাদের বাড়ি থেকে ফোন করেছে’ রাইনার শাশুরী বলে।
- বাড়ি থেকে ফোন করেছে শুনেই রাইনার বুকের ভিতরটা ধককরে উঠে সে ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসে ।
-‘ কে ফোন করেছে মা ?’শাশুরীর দিকে তাকিয়ে জানতে চায় ।
-‘তোমার মামা ফোন করেছিল। তোমার বাবার নাকি ব্রেন ষ্ট্রোক’।
-রাইনা চিৎকার করে উঠে.’ আমার বাবা কি মারা গিয়েছে’?
- ‘সে রকম কিছু বলে নাই’ শাশুরী রাইনার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে ।
রাইনার চিৎকারে আয়ান জেগে উঠে, কি হয়েছে মা জিজ্ঞেস করে আয়ান । ‘-রাইনার বাবার ব্রেন স্ট্রোক করেছে’, তোমরা ফোন দিয়ে কথা বল।

আয়ানই রাইনাদের বাসায় ফোন করে। ফোন ধরে রাইনার খালা। কান্না করতে করতেই রাইনার খালা বলে রাইনারে তোর আব্বু আর নেই। এর পর শুধু কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে। এপাশ থেকেও রাইনা চিৎকার করে কেঁদে ওঠে ।

রাইনার মা খুব অস্থির হয়ে যায় মেয়ের জন্য, রাইনা যেন কেমন একটু এলোমেলো হয়ে যায়, সব সময় মন খারাপ করে থাকত মাঝে মাঝেই কান্না করত, একা একা কথা বলত। ,
ডাক্তারের পরামর্শে ছয়মাস পর আয়ান রাইনাকে নিয়ে দেশে যায়। বাবা ছাড়া শূন্য বাড়িতে রাইনার দম বন্ধ হয়ে আসে। বাবার ব্যবহৃত জিনিস গুলো রাইনা ছুয়ে ছুয়ে দেখে, বাবার পুরানো জামা গুলো শুকে শুকে বাবার গন্ধ নিতে চায় কিন্ত কোন কিছুতেই রাইনার মনে শান্তি লাগে না। সে চিৎকার করে কান্না করত আমার আব্বু কোথায় ?

রাইনার মায়ের পরামর্শে আয়ান রাইনাকে দেশে রেখে আসে আস্তে আস্তে রাইনা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। ছয় মাস পর আয়ান যেয়ে রাইনাকে নিয়ে আসে।

বাবার কথা ভাবতে ভাবতে দু’ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পরে গাল বেয়ে । কয়েক বছর পর এরকমই হঠাৎ করেই আম্মু ও মারা গেল তখনো পাশে ছিলাম না,| বাবা,মায়ের এক মাত্র সন্তান, কত আদরের ছিলাম আমি। তাদের মৃত্যুর সময় আমি তাদের পাশে ছিলাম না, তারাও মৃত্যুর সময় সন্তানের মুখ দেখতে পারল না। এর চেয়ে বড় দুর্ভাগ্য আর কি হতে পারে। রাইনার বুকের ভিতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে। মনে মনে বলে এই তো জীবন!!

( এখন আমাদের দিন অনেক ছোট হয়ে গিয়েছে গাছে কোন পাতা অবশিষ্ট নেই, আর বরফ ঝরা শুরু হয়েছে কিন্ত গল্পটা পাতা ঝরার শুরুতেই লিখেছিলাম বিভিন্ন কারনে পোষ্ট দেয়া হয়নি, আজকে মন চাইল তাই দিলাম)
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই এপ্রিল, ২০২০ দুপুর ১২:২১
৩০টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কাঁচপোকা লাল টিপ অথবা ইচ্ছেপদ্ম...

লিখেছেন নান্দনিক নন্দিনী, ১২ ই জুলাই, ২০২০ রাত ১২:২৯



‘হৃদয়ে ক্ষত- তা তোমার কারণেই
তাই, তুমিই সেলাই করে দেবে-
বিনা মজুরিতে।
কিছু নেই এমন যা দিতে পারি তোমাকে;
ঠান্ডা মাথায় দেখেছি অনেক ভেবে!
যদি নাও দাও তবে থাকুক এ ক্ষত
এ ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসলামে নিকাহে মুত'আ বা সাময়িক বিবাহের বিধান ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুলাই, ২০২০ সকাল ১০:৪৬

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ অন্তর্জাল।

ইসলামে নিকাহে মুত'আ বা সাময়িক বিবাহের বিধান ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

নিকাহে মুত'আ কাকে বলে?

আরবি: نكاح المتعة‎‎, English: 'wedlease'। নিকাহ মানে, বিয়ে, বিবাহ। আর মুত'আ অর্থ, উপকার ভোগ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বন্ধু, কি খবর বল...

লিখেছেন পদ্ম পুকুর, ১২ ই জুলাই, ২০২০ সকাল ১১:০১


সময়ের হাওয়া গায়ে মেখে ভাসতে ভাসতে যখন এই অব্দি এসে পড়েছি, তখন কখনও কখনও পেছনে ফিরতে ইচ্ছে হয় বৈকি। কদাচিৎ ফিরে তাকালে স্মৃতির পাতাগুলো বেশ উঞ্চ এক ওম ছড়িয়ে দেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ যা পারেনি নেপাল তা করিয়ে দেখালো!

লিখেছেন দেশ প্রেমিক বাঙালী, ১২ ই জুলাই, ২০২০ দুপুর ১২:২৭



ভারতীয় যত টিভি চ্যানেল আছে তা প্রায় সবগুলোই বাধাহীন ভাবে বাংলাদেশে সম্প্রাচারিত হচ্ছে কিন্তু বাংলাদেশে একটি টিভি চ্যানেলও ভারতে সম্প্রচার করতে দেওয়া হয়না। ভারতের কিছু কিছু চ্যানেলের মান অত্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্যবধান

লিখেছেন মুক্তা নীল, ১২ ই জুলাই, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:২৭




পারুল আপা আমাদের সকলের একজন প্রিয় আপা। তিনি সকল ছোটদের খুবই স্নেহ আদর ও আবদার পূরণে একধাপ এগিয়ে থাকতেন। অতি নম্র ও ভদ্র তার কারণে বাড়ির গুরুজনদের কাছে এই আপার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×