somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চিরল কাঁটার বাতাস

২১ শে এপ্রিল, ২০১৯ দুপুর ১:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আমার গাড়িতে একটা লাশ। আমি গাড়িটা চালিয়ে যাচ্ছি। হ্যাঁ, আমিই বহন করে নিয়ে যাচ্ছি লাশটাকে। লাশটা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে না। একজন মানুষ যখন মারা যায়, তার রক্ত, বীর্য, ঘাম, সহ যাবতীয় জলীয় এবং কঠিন এবং জেলি জেলি ঘিনঘিনে পদার্থগুলি অথর্ব হয়ে যায়। তখন এগুলিকে ভাগাড়ে ফেলা দেয়াই ভালো। ফেলে দেয়া ডিমের খোসা, পচা শশা, অথবা স্রাবরঞ্জিত কাপড়ের চেয়ে তাকে কোন অংশেই পবিত্র বলা যাবে না। এমন কিছু অপবিত্র জিনিসপত্র নিয়েই আমাকে চলতে হচ্ছে, দুর্ভাগ্যজনক। গড়পড়তা মধ্যবিত্ত দুঃখবিলাসী মানুষ গাড়িতে লাশ বহন করতে দেখলে স্বাভাবিকভাবেই আমাকে ধিক্কার দেবে, এবং গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকবে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের জন্যে। তারা লাশ হতে পছন্দ করে না, তবে লাশ নিয়ে নানা কিছু ঘটতে দেখতে ভালোবাসে। আমি দোষ দিই না। আমি নিজেও হয়তো বা এর বাইরে কিছু না। কিন্তু, যে কারণে আমাকে ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে, তা হলো- অন্য সব গল্পের মত আমি এখানে খুনী নই। আমি একজন দায়িত্ববান নাগরিক হিসেবেও লাশটি বহন করে নিয়ে যাচ্ছি। লাশটা পড়ে ছিলো আমার মেঝেতে। আলগোছে। আমি অফিস থেকে বাসায় ফেরার পর দরোজা খুলেই তার দেখা পাই। লাশটি ছিলো একজন সুন্দর দেহাবয়বের মেয়ে মানুষের। তার পরনে ছিলো কালো শাড়ি, তার ধবল পেটে তখনও পিঁপড়ে ধরে নি। আমি একজন সচ্চরিত্র পুরুষ মানুষ। তাই লাশটিকে দেখে আমার মনের ভেতরে কামভাব জাগলেও তা নিবৃত্ত করতে সক্ষম হই। লাশকে দেখে কামভাব জাগাটাও একটা অসুস্থতা। আমি নির্বিরোধী, নিপাট, পরিচ্ছন্ন মানুষ। বাসায় একটা কলার খোসা, অথবা চিপসের প্যাকেট, অথবা চিনাবাদামের খোসাও আমি পড়ে থাকতে দেই না। আর সেখানে আস্ত একটা লাশ! তা কী করে হয়! আমি খুব ধর্মপ্রাণ নই, এটা স্বীকার করছি। যদি হতাম, হয়তো বা লাশ সৎকার নিয়ে ভাবতাম। আমি তন্ত্রমন্ত্র, সুরা-দুরুদ জানি না তেমন। কিছু একটা জানা দরকার ছিলো। কুলখানি ব্যাপারটা ভালো। খাবার দাবার থাকে, জমায়েত হয় অনেক মানুষের। আমাদের এলাকার বিরিয়ানির দোকানগুলি বন্ধ অনেকদিন ধরে। আমরা সবাই বাঁশপাতা মাছ এবং পালং শাক খেতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। তাই ব্যবসার ক্ষতি সামলাতে না পেরে বিরিয়ানির দোকানদাররা চলে গেছে। যেহেতু আমি ধর্মপ্রাণ নই, এবং আশেপাশে ধর্মানুরাগী তেমন কেউ নেই, তাই কবর, কুলখানি এসবের চিন্তা বাদ দিতে হলো। লাশটা গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে। এটাকে ভালো কোন জায়গায় রেখে আসতে হবে। জমানো টাকা পয়সা আছে কিছু। একটা গাড়ি কিনে ফেলতে হবে। আমাদের এলাকায় গাড়ির শো-রুম গভীর রাত পর্যন্ত খোলা থাকে। বিরিয়ানির দোকানদাররা চলে যাবার পর এসেছে গাড়ির ব্যবসাদাররা। প্রথমদিকে এটাকে আমাদের এক উৎকট রসিকতা মনে হয়েছিলো। একটা মধ্যবিত্ত মহল্লায় এতগুলি গাড়ির দোকান দিয়ে কী হবে? তবে সুদক্ষ সেলসম্যানরা আমাদের গাড়ির প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে সক্ষম হলো। তারা আমাদের বোঝালো, বিরিয়ানি এবং স্বাদু পানীয় খেয়ে আমরা যে টাকা ব্যয় করি, তা বাদ দিলেই কয়েক বছরের মধ্যে আমরা গাড়ি কিনে ফেলতে পারবো। আমি বছর পাঁচেক হলো বিরিয়ানি খাই না। অনেক টাকা জমে গেছে। ক্ষয়েছে চর্বি আর মেদ। গাড়ি এখন কেনা যেতেই পারে। গাড়িতে করে মেয়েটাকে নিয়ে যাবো আমি। চমৎকার রোদ ওঠে এমন জায়গায় রেখে আসবো।
-এতদিনে আসলেন?
সেলসম্যান এখনও আছে। এই রাত্তিরে।
-হ্যাঁ, চলে আসতে হলো।
-জানতাম, আসবেন। কী ধরণের গাড়ি চাই আপনার স্যার?
-লাশবাহী গাড়ি। আমি একটা লাশ নিয়ে যাবো।
আমার কথা শুনে সে চমকালো না। আমাদের এলাকায় এ ধরণের রসিকতা খুব চলে।
-লাশ নিতে হলে যে লাশবাহী গাড়িই নিতে হবে এমন তো কথা নেই স্যার! একটা জিনিস নিচ্ছেন, ভালো দেখেই নেন। বারবার তো আর নেবেন না। আর এখন থেকে আপনি পাশের এলাকায় গিয়ে বিরিয়ানিও খেয়ে আসতে পারবেন।
তার কথা আমার যুক্তিসঙ্গত মনে হলো। অনেকদিন বিরিয়ানি খাওয়া হয় না। আমি আর বেশি কথা না বলে একটা রূচিসম্মত, সুন্দর গাড়ি কিনে নিলাম। আমি একবার গাড়ি চালানো শেখার কোর্সে ভর্তি হয়েছিলাম। ইচ্ছে ছিলো, চাকরি-বাকরি না পেলে বিকল্প উপায় একটা হয়ে যাবে। তবে তার আর দরকার পড়ে নি। আমি খারাপ রোজকার করি না একদম।
গাড়ির ট্রাংকে লাশটাকে ঢুকিয়ে ফেলার পর আমি বেশ স্বস্তি পেলাম। এতক্ষণের গুমোট ভাবটা কেটে গেলো। যা একটা দমবন্ধ অবস্থা ছিলো! গাড়িটা হাল আমলের নয়। পুরোনো ঘরানার। রেডিও আছে, সিডি আছে। আমার কি শোকাবহ কোন সঙ্গীত চালিয়ে দেয়া উচিত? নাহ, রেডিওটা সিগন্যাল পাচ্ছে না। সিডিও নেই কোন। গান শুনবো কীভাবে? আমার মন খারাপ হলো। গাড়িটার জন্যে, রেডিওটার জন্যে, রেডিও স্টেশনের কর্মচারীদের জন্যে, এবং ফর্সা পেটের মৃত মেয়েটার জন্যে। তাকে কোন বড় ভাগাড়ে ফেলে আসার চেয়ে একটা ভালো গর্ত খুড়ে কবর দেয়ার মত দয়ার্দ্র সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম আমি।
অনেকদিন গাড়ি চালাই না। ড্রাইভিং লাইসেন্সটিও নেই সাথে। সাবধানে চলতে হবে। হুট করে পুলিশ ধরে বসলে সমস্যা। একে তো ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই, তার ওপর সাথে রয়েছে লাশ! গোয়েন্দা কাহিনীগুলোতে দেখা যায় লাশ নিয়ে বের হলেই পুলিশ কীভাবে কীভাবে যেন বুঝে যায়। নানারকম ঝামেলায় ফেলে। আমি এ ধরণের কোন ঝামেলায় পড়তে চাইছি না। তাই যথাসম্ভব সাবধানতার সাথেই গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছি। গাড়ি চালানোর জন্যে চমৎকার একটি রাত আজ। ট্রাফিক জ্যাম নেই খুব একটা। কিছু জায়গায় সিগনালে দাঁড়াতে হচ্ছে বটে, কিন্তু সেখানে কোন ভিখারী বা ফুলঅলা মেয়ে বিরক্ত করছে না। অবশ্য ফুলঅলা মেয়ে এলে আমি খুব একটু বিরক্ত হতাম না আজ। সমাধিতে ফুল দেয়াটা ভালো একটা চর্চা। ফর্সা পেটের মেয়ে যদি খুব বেশি গন্ধ না ছড়ায়, তবে আমি খুশি হয়ে তার জন্যে কিছু ফুল রাখতেই পারি! এর আগে আমি কাউকে কবর দেই নি। কবর খুড়তে কোথাও যাওয়া যায় তাও জানি না। কাউকে কি জিজ্ঞেস করবো, কবর খোড়ার জন্যে ভালো মাটি কোথায় পাওয়া যেতে পারে? নাহ, সেটা মনে হয় ঠিক হবে না। উদ্দেশ্যবিহীনভাবে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছি। এভাবে আর কতক্ষণ? ক্ষুধা পেয়েছে। পাশেই একটা কমিউনিটি সেন্টার। বিয়ের জমজমাট আয়োজন। প্রচুর খাবার দাবার এবং আলো। নেমে যাবো নাকি? একটু ধীর করলাম গতি।
-গাড়ি থামান।
একজন পুলিশ সিগনাল দিচ্ছে। এর কোন মানে হয়? কিছু টাকা দিয়ে মিটিয়ে ফেলতে হবে। এর আগে এমন অভিজ্ঞতা হয় নি কখনও। কত দিতে হতে পারে?
-কোথায় যাচ্ছেন?
এই প্রশ্নের জবাব কী দেবো আমি! করিৎকর্মা হিসেবে কখনই সুখ্যাতি ছিলো না আমার। মাথার ভেতর জট পাকিয়ে যাচ্ছে।
-এই তো, আজকেই গাড়িটা কিনলাম, আমি টেস্ট ড্রাইভ করছি।
শেষ পর্যন্ত একটা ভালো উত্তর দেয়া গেলো! এবার সে নিশ্চয়ই গাড়ির কাগজপত্র দেখতে চাইবে? গাড়ির বৈধ মালিক আমি, এ সংক্রান্ত সব কাগজ আমার আছে। কিন্তু লাইসেন্স দেখতে চাইলেই বিপদ।
-লাশ আছে সাথে?
ঘাবড়ে গেলাম তার প্রশ্ন শুনে।
-জ্বী?
-বৈধ লাশ থাকলে দেখান। লাশবিহীন গাড়ি যেতে দেয়া হবে না।
যাক, পুলিশটা ভালো। আমার কাছে যা আছে তাই দেখতে চাইছে। আমি আন্তরিকতার সাথে বললাম,
-হ্যাঁ, নিশ্চয়ই! গাড়ির পেছনে চমৎকার তরতাজা একটা লাশ রাখা আছে।
-দেখান।
আমি সোৎসাহে গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে ট্রাংকের দরোজা খুললাম।
-এই দেখুন, আজকেই মরে পড়ে ছিলো আমার দরোজার পাশে। একদম টাটকা লাশ।
কিন্তু আমার জবাবে তাকে সন্তুষ্ট মনে হলো না। সে আরো ভালো করে পরীক্ষা করে দেখবে। লোকটাকে বেশ খুঁতখুঁতে মনে হচ্ছে। ঝামেলা করবে মনে হয়। সে গম্ভীরমুখে টর্চের আলো ফেললো মেয়েটার মুখে, চোখে, চুলে। কোন একটা খুঁত বের করে ফেলবেই মনে হয়! আমার আশঙ্কাই সত্যি হলো।
-এই লাশে সমস্যা আছে। এইটার পেটের কাটা চিকন। রক্ত খুবই অল্প বাইর হইছে। আর কোথাও কোন আঘাতের চিহ্ন নাই। ভেজাল লাশ নিয়া গাড়ি চালানো আইনবিরুদ্ধ। আপনাকে গ্রেফতার করা হবে।
এই রাতের বেলা আমার গ্রেফতার হবার কোনই ইচ্ছে ছিলো না। ব্যাপারটার সুরাহা করা দরকার।
-দেখুন স্যার, লাশটাকে সৎকার করা দরকার, পচে গন্ধ ছড়াবে, পরিবেশ দূষিত হবে।
-লাশ সৎকার করতে চান, করবেন। কিন্তু তাই বলে আপনি অবৈধ এবং অনুমোদনবিহীন লাশ নিয়ে যেতে পারেন না। এ ব্যাপারে সম্প্রতি কঠিন আইন করা হয়েছে।
-তাই, স্যার? আমি আসলে জানতাম না। আমাকে এবারের মত একটু কনসেশন করুন না!
-আপনি জানেন না? কোথায় থাকেন আপনি?
-স্যার, আমি ঐ যে গাড়ির শো-রুম গুলো আছে না, ওখানে থাকি। ঐ যে যেখানে আগে বিরিয়ানীর দোকান ছিলো, সেগুলো এখন গাড়ির শো-রুম হয়েছে, ঐ এলাকা।
-আচ্ছা। হ্যাঁ, আপনাদের না জানারই কথা। আপনাদের ওখানে সূর্য ওঠে না, রোদ নেই, বিচ্ছিরি জায়গা।
-জ্বী স্যার, ঠিকই বলেছেন। এবার কি আমি যেতে পারি?
-আমি একজন সৎ এবং নীতিবান পুলিশ অফিসার। আপনাকে এভাবে যেতে দিলে আমার ভীষণ অনুশোচনা হবে। আমি বিবেকের দংশনে জর্জরিত হবো। এ কারণে আপনাকে আমি ছাড়তে পারছি না। তবে যেহেতু আপনি জানতেন না আগে, তাই আপনাকে আমি সুযোগ দিতে চাই।
আশার আলো দেখে ব্যগ্র হয়ে উঠলাম আমি।
-বলুন স্যার, কী সুযোগ দিবেন?
-পেটের কাটা দাগটা বড় করতে হবে আরো। মুখে একটা ভোঁতা কিছুর আঘাতের চিহ্ন থাকবে, জিহবা বেরিয়ে থাকবে। এভাবে সংশোধন করে আনুন, আমি আপনাকে ছেড়ে দিবো।
-স্যার, আইনের প্রতি আপনার শ্রদ্ধাশীলতা সত্যিই প্রশংসনীয়। কিন্তু কেন এরকম করতে হবে আমাকে একটু বুঝিয়ে বলবেন প্লিজ?
-যেসব এলাকায় নারী নাই, বিরিয়ানি নাই, খালি গাড়ি আছে, সেসব এলাকার পুরুষদের গাড়ি নিয়ে বের হবার সময় লাশ বহন করা বাধ্যতামূলক, কারণ আমাদের জৈবসার দরকার। বিরিয়ানি জৈবসার হিসেবে চমৎকার, কিন্তু আপনাদের তো বিরিয়ানি খাওয়া শেষ। আপনারা করেন গাড়ির বিজনেস। গাড়িতে কোন সার নাই। এদিকে জ্যান্ত মানুষকে জৈবসার হিসেবে ব্যবহার করা অমানবিক, এবং বিজ্ঞানসম্মত না। কিন্তু এখন টাটকা, সুন্দর, সিনেমার মত দেখতে, শৈল্পিক লাশ নিয়ে গেলে আপনাদের মনের মধ্যে দুর্বলতা তৈরি হতে পারে। আপনাদের এই চঞ্চলতা দূর করার জন্যে, লাশকে লাশের মত দেখানোর জন্যে এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। লাশকে লাশের মত দেখুন। লাশকে কামনার দৃষ্টিতে দেখা আবহমান সংস্কৃতির পরিপন্থী, অনৈতিক।
-জ্বী স্যার, বুঝতে পেরেছি। আমাকে এখন কী করতে হবে?
-আপনি লোহার রড, বা ইট এই জাতীয় কোন পদার্থ দিয়ে যথাযথ ভাবে লাশকে বিকৃত এবং বিদ্ধস্ত করবেন।
-এত রাতে এইসব কোথায় পাবো স্যার?
-গাড়ির দোকানের ফোন নাম্বার আছে? ফোন নাম্বার দেন। আমি দেখতেছি বিষয়টা।
এই পুলিশটির মত আমিও নীতিবান এবং আইন মানা নাগরিক। প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র সাথে নিয়েই ঘুরি। হাতরে বের করে ফেললাম গাড়ির প্রয়োজনীয় কাগজ। পুলিশটি যা খুঁজছিলো তা পেয়ে গেলো। একটি ফোন নাম্বার। গাড়ির দোকানের। আমাদের ওখানে গাড়ির দোকানগুলি সারারাত খোলা থাকে।
-আপনারা আজকে রাতে কয়টি গাড়ি বিক্রি করেছেন?
-একটিই স্যার। ব্যবসার অবস্থা ভালো না।
-ক্লায়েন্টকে যথাযথ সেফটি প্রিকশন না জানানোর কারণে আপনাকে গ্রেফতার করা হবে।
-কেন স্যার? আমি কী করেছি!
-আপনি গাড়ি বিক্রি করেছেন, কিন্তু গাড়ির মেরামতের জন্যে প্রয়োজনীয় টুলবক্স দেন নি। এই মুহূর্তে আমাদের একটি মেটাল অবজেক্ট আর শাইনি কিছু দরকার।
-ওহ স্যার! সেটা তো গাড়ির পেছনে একটা ছোট্ট বক্সে আছে। ট্রাংকটা খুললেই পেয়ে যাবেন ফার্স্ট এইড বক্সের মত দেখতে ছোট্ট একটা বক্স। সেখানে যা যা দরকার সবই পেয়ে যাবেন। কেন স্যার, গাড়িতে কোন সমস্যা হয়েছে?
-না, একটা তাজা লাশ নিয়ে যাচ্ছে, আপনার ক্লায়েন্ট। সেটা কাটতে হবে।
খুব একটু খুঁজতে হলো না। পেয়ে গেলাম কাঙ্খিত জিনিসটা।
-একটা জিনিস লক্ষ্য করেছেন? লাশটা এতক্ষণেও গন্ধ ছড়ায় নি, অথচ কতক্ষণ হলো মারা গেছে!
-এরকম চিরল করে কাটা পেট, ঠোঁটের লিপস্টিক এখনও লাল আগুনের মত জ্বলজ্বল করছে, গন্ধ বের হবে কীভাবে? লাশটাকে থেবড়ে দিন, কাটুন, ঘষুন। লাশ হলো লাশ। লাশের কোন পরিচয় নেই। লাশের কোন নারী-পুরুষ নেই। আজকে এই লাল ঠোঁটের পুতুল পুতুল দেখতে মোমের মত সুন্দর নারীকে দেখে আপনার মধ্যে যে উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে, তার বশে আপনি তাকে সৎকার করতে যাচ্ছেন। এই জায়গায় কোন হোৎকা দেখতে প্রৌঢ় থাকলে কি আপনি এমনটা করতেন? এই ধরণের বৈষম্যপূর্ণ আচরণ সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এটা নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন।
আমি হাতে তুলে নিলাম ধাতব শক্তি। তার নরম চামড়া আর মাংসে আঘাত করতে লাগলাম একের পর এক। এর মাঝে আবারও গ্রেফতারের হুমকি পেলাম। কারণ আমি নাকি সহিংসতার আবেগ থেকে আঘাতগুলি করছিলাম। আমার এটা করা উচিত একজন সচেতন নাগরিকের অবশ্যকর্তব্য হিসেবে।
-আপনাকে যদি আরেকবার লাশের সাথে সহিংস আচরণ করতে দেখা যায়, তবে হত্যার দায়ে গ্রেফতার করা হবে।
হুমকি দিলো সে।
অবশেষে আমি গ্রেফতার এড়িয়ে সফলভাবে লাশ ধ্বংসের কাজ করতে সক্ষম হলাম।
-হ্যাঁ, এখন দেখতে লাশ লাশই লাগছে। লাল ঠোঁটের আকর্ষণীয় মেয়ে মানুষ মনে হচ্ছে না আর। এখন আর গল্প কবিতার মেয়ে বলে মনে হচ্ছে না। এখন আর আপনার মধ্যে অযাচিত আবেগ প্রকাশ পাবে না।
-মাছি আসছে। গন্ধ ছড়াচ্ছে।
-তার মানে, এটা এখন একটা সত্যিকারের লাশ। মানুষের যেমন অস্তিত্ব থাকে, লাশেরও অস্তিত্ব থাকে। লাশটা আর পরিচয়হীনতায় ভুগবে না। এখন দেখেন, আপনি চিনতে পারছেন না একে? একে কি আর রহস্যময় মনে হচ্ছে?
হ্যাঁ, এখন আমি চিনতে পারছি। খুব ভালো করেই চিনতে পারছি। এমন লাশ আমি অনেক দেখেছি। ভূমিকম্পে ধ্বসে যাওয়া ভবনে, সড়ক দুর্ঘটনায় পিষ্ট হয়ে পড়ে থাকতে, দেয়াল চাপা পড়ে মরে যাওয়া, অথবা কাঙ্গালি ভোজের ঠেলাঠেলিতে পদপিষ্ট হয়ে মরে যাওয়া মানুষগুলির সাথে এর পার্থক্য নেই। এখন এই লাশের পরিচয় আছে নিশ্চিতভাবেই।
নীতিবান পুলিশ অফিসারটি কর্তব্য পালন শেষে ফিরে গেলো তার ডেরায়। আমি দ্রুত গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছি। সামনে কোন শ্মশান, অথবা কবরস্থান, যাই দেখি না কেন, কোথাও থেমে তার একটা ব্যবস্থা করতে হবে। দাহ অথবা মাটিচাপা একটা কিছু হলেই হবে।
রাত অনেক হলো। বাড়ি ফিরতে হবে। কাজে যেতে হবে কাল সকালে। পেটে কিছু পড়ে নি। গাড়িটা আর রাখবো না। বেচে দিয়ে এক প্লেট বিরানি খেয়ে নিয়ে আমি চলে যাবো আমার কর্মক্ষেত্রে।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে এপ্রিল, ২০১৯ দুপুর ১:৪০
২০টি মন্তব্য ২০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সরকারের উচিত রোহিংগা ক্যাম্পগুলোকে 'এনজিও-মুক্ত' করা

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২৩ শে আগস্ট, ২০১৯ রাত ৮:৪১



এনজিওগুলো ১১ লাখ রোহিংগা পালনকে 'পুরোপুরি রমরমা ব্যবসা' হিসেবে প্রতিষ্টিত করেছে, এরা এই ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখার জন্য সম্ভাব্য সব কিছু করছে, এরা কৌশলে রোহিংগাদের ফিরে যাবার ব্যাপারে ভীত... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে জানালায় বসে ভ্যান গগ স্টারি নাইট এঁকেছিল-

লিখেছেন সোনালী ডানার চিল, ২৩ শে আগস্ট, ২০১৯ রাত ৯:২০

কেউ যখন প্রজনন অঙ্গ দিয়ে সৌজন্যতা দেখায়
আমি তখন ষ্টারি নাইট শুনি আইবাডে আর
দু’টো শামুকের বিবর্তন পিরিয়ডের কেসহিষ্ট্রিতে নিমগ্ন
রই; যদিও পতাকার অন্যনাম এখানে অন্তর্বাস।
কিম্ভূত অগ্নি দাহ করে আমাজান- ব্রাত্যের লাশ ঠ্যালে... ...বাকিটুকু পড়ুন

সর্বনাশা পরকীয়া; অনৈতিক এই ফিতনা থেকে মুক্তির উপায় কি?

লিখেছেন নতুন নকিব, ২৪ শে আগস্ট, ২০১৯ সকাল ১০:১৬



সর্বনাশা পরকীয়া; অনৈতিক এই ফিতনা থেকে মুক্তির উপায় কি?

পরকীয়া আসলে কি?
ইদানিংকালে সংবাদপত্রের পাতাগুলোর অনেকটা অংশ জুড়ে থাকে পরকীয়া বিষয়ক নানান দু:সংবাদ। গনমাধ্যমে প্রচারিত সংবাদে পরকীয়া সম্পর্কে প্রায় প্রতিনিয়ত: বিভিন্ন... ...বাকিটুকু পড়ুন

খামারের জন্য ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তি বিষয়ক (ESF ও অন্যান্য):

লিখেছেন ching, ২৪ শে আগস্ট, ২০১৯ সকাল ১০:৫৯



খামারের জন্য ঋণ প্রাপ্তির উপায়/নিয়ম-কানুন না জানার ফলে ঋণ গ্রহণে ভীতি, ব্যাংক সম্পর্কে অনেকেরই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যায়। অনেকেই হয়তো ঋণের জন্য কোন দিন ব্যাংকের ধারে কাছেও যায়নি। যখনই কেউ... ...বাকিটুকু পড়ুন

রম্যরচনাঃ মোবাইল-ম্যানিয়া

লিখেছেন আবুহেনা মোঃ আশরাফুল ইসলাম, ২৪ শে আগস্ট, ২০১৯ বিকাল ৫:১৯

ল্যান্ডফোনে কথা বলা সবার জন্য সহজলভ্য ছিলনা বলে একযুগ আগে আমাদের দেশে যখন মোবাইল ফোন এলো, তখন ধনী গরিব নির্বিশেষে সবাই এই যন্ত্রটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। আমার মনে আছে, ২০০০... ...বাকিটুকু পড়ুন

×