somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কুটুম

১৭ ই আগস্ট, ২০১৯ রাত ১১:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


শেষরাতে ঘুম ভেঙে গেলে আমার বেহালার সুর শুনতে ইচ্ছে করে। বেহালা যে আমি খুব ভালোবাসি তা নয়। তবে শেষ রাত সময়টা রহস্যময়। এ সময় মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, পছন্দ-অপছন্দের ভার নিজের ভেতরে থাকে না। কোন এক রাতের শেষ প্রহরে ঘুম ভেঙে আমি বেহালার অপার্থিব এক সুর শুনতে পেয়েছিলাম। সুরটা মনে রাখার চেষ্টা করতে করতেই ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। আর কখনই শুনতে পাই নি সেই সুর। সেদিন দুপুরবেলা বন্ধু অথবা সহকর্মী অথবা ভাই, কোন একজনকে আমার এই অভিজ্ঞতার কথা বললে সে তার সংগ্রহের উৎকৃষ্টতম বেহালার সুরগুলি শোনাতে লাগলো। সে ছিলো সঙ্গীতানুরাগী। আমি খুব মাথা নাড়িয়ে সমঝদারের ভঙ্গি করে আমার আবিষ্টতা বুঝিয়ে যাচ্ছিলাম, কিন্তু সে সময়ে ঝাল করে রাধা মুরগীর মাংস দিয়ে গোগ্রাসে দু প্লেট ভাত খাওয়ার কথা ভাবতেই আমার বেশি ভালো লাগছিলো। এরপরে প্রায় প্রতিদিনই রাতের শেষ প্রহরে আমার ঘুম ভেঙেছে, কিন্তু সেই বেহালার সুরটা আর শুনতে পাই নি। আমার ঘুম গভীর। শেষ রাতে ঘুম ভেঙে গেলে তা আদতে ঘুমটাকে আরো গাঢ়ই করে। এই মুহূর্তে আমি শুনতে পাচ্ছি নারীকন্ঠের টুনটুনে হাসি, আর বাসনকোসনের শব্দ। আজকে আর ঘুম ভাঙার পর বেহালার শব্দ শুনতে ইচ্ছে করছে না। এ শব্দটা ভালো, এ শব্দটা আপন। এ শব্দটা চলুক।

ত্রিশ সেকেন্ড হয়ে গেছে। এতক্ষণে আমার ঘুমিয়ে পড়ার কথা আবার। এই জায়গাটা ঘুমের জন্যে চমৎকার। গ্রামের রাত বেশ ঘন আর গভীর হয়। চোখ বুঁজলেই ঘুম নেমে আসে। গ্রামে কেউ ঘুমের সমস্যায় ভোগে এমন কথা আমার জানা নেই। এই গ্রামটা সুডৌল এবং স্বাস্থ্যবতী। এখানে আছে টলটলে জলের ছায়াঘেরা গভীর পুকুর, চঞ্চল গৃহপালিত পশু, এবং ঝলমলে ফুলের দল। এখানে মেঠোপথ ধরে চলে যাওয়া যায় গোধূলির নিজস্ব ভূবনে। নাহ, দুই মিনিটের বেশি হয়ে গেছে আমি জেগে আছি। ঘুমটা কি আর জোড়া লাগবে না? এভাবে শুয়ে থেকে ঘুমের জন্যে অপেক্ষা করার চেয়ে বরং ভোর দেখে ঘুমোনো ভালো হবে। অনেকদিন ভোর দেখা হয় না। ভোর হতে কত দেরি আমি জানি না, তবে রান্নাঘরে মহিলাদের আলাপ শুনে বোঝা যায়, ভোর হতে খুব বেশি দেরি নেই। আমি বিছানা থেকে নামলাম। মহিলাদের সাথে একটু আলাপ করে আসা যাক।
রান্নাঘরের কাছে যেতে একটা নোনতা-মিষ্টি গন্ধ শরীরকে অধিকার করে নিলো। একটা আটপৌরে, আপন গন্ধ। হতে পারে সেটা এলাচের, হতে পারে রসুনের, হতে পারে নুনের, হতে পারে ভাতের মাড়ের। এই মিশ্র গন্ধ আমাকে করে স্নিগ্ধচেতন। আমি নৈকট্য অনুভব করতে থাকি রান্নাঘরের সাথে। রান্না করছেন আমার আত্মীয়া এবং বাসার ঝি। তাদের দেখে মনে হচ্ছে কাজটা তারা বেশ উপভোগ করছেন। শেষরাতে ঘুম থেকে উঠে রান্নাবান্না করার ভেতরে কী আনন্দ আছে সেটা আমি কখনই বুঝবো না।
-কী, ঘুম ভাঙিছে? আপনেরা শহরের মানুষেরা তো সকাল নয়টার আগে ঘুমেরথে উঠেনই না। আইজ এত সক্কাল সক্কাল?
-এই তো ঘুম ভেঙে গেলো। আপনারা এত আগে উঠেছেন? ঘুমালেন কখন আর উঠলেনই বা কখন? নাকি ঘুমান নি? ভোর হতে তো এখনও বেশ বাকি আছে মনে হচ্ছে। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার।
-আরে কুটুম আসবে, কুটুম! এখন কি আর অত ঘুমের হিসেব কইরলে চলে?
-ও আচ্ছা, কুটুম আসবে! কে আসবে?
-সেই তা আসলিই দেখতি পাবা। এই নুরি, পেঁয়াজগুলা আরেকটু কুচিকুচি কইরে কাটতি হবি।
আমি চলে এলাম সেখান থেকে। তারা তাদের মত কাজ করুক। আমি বরং দূর থেকে তাদের কথা শুনি। সেই হারিয়ে যাওয়া বেহালার শব্দটা তো আর ফিরে পেলাম না, এটাও হারিয়ে ফেললে মোটেও ভালো ব্যাপার হবে না। ভোর হতে নিশ্চয়ই আর বেশি দেরি নেই! আমার চোখের পাতা ভারি হয়ে আসবে কিছুক্ষণের ভেতরে। আমি ঘুমোবো।

শুয়ে আছি মৃত কাঠের মত। ঘুম নেই, ঘুমের মত কোন অনুভূতিও নেই। এভাবে শুয়ে থাকাটা ক্লান্তিকর। শুয়ে শুয়ে আকাশ-পাতাল ভাবনায় ডুবে যেতে আমি আনন্দ পাই না। আমি অত্যন্ত জৈবিক মানুষ। আমার বেঁচে থাকার জন্যে সবসময় খাদ্য, পানীয়, ঘুম, যৌনতা এবং গতি প্রয়োজন। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা কলধ্বণি এখন আর মিষ্টি লাগছে না মোটেও। তাদেরকে গিয়ে কড়া করে কিছু কথা বলে আসলে ভালো হতো। কিন্তু তা সম্ভব না। কারণ আমি তাদের এখানে অতিথি। এসেছি অনির্দিষ্টকালের জন্যে। আমি এখানে এসেছি দুদিন হলো। আমার জন্যে বিশেষ কোন আয়োজন চোখে পড়ে নি। অথচ কারা না কারা আসবে, তাদের জন্যে শেষ রাত থেকে রান্না শুরু করেছে! এমন অসম্মান এবং অমর্যাদা আমার প্রাপ্য নয়। যথাযথ জায়গায় থাকলে আমি এ ব্যাপারে যা করার করতাম।
বাইরে এখনও গুমোট আঁধার। সময় কি থেমে আছে? সময় কেন থেমে থাকবে? তাদের কলহাস্য তো থেমে নেই! একটু আলো ফুটলে আমি পুকুরপাড়ে যেতাম। এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে সেখানে গিয়ে বসে অতিপ্রাকৃত অনুভূতির মুখোমুখি হবার কোন দরকার দেখছি না। নারীদ্বয় কথা বলে চলেছে অনবরত। এখন যে নিশুতি রাত, এখন যে এমন শব্দ করা যায় না, সভ্যতার এই বোধ তাদের নেই। কিন্তু বাড়ির পুরুষেরা এই অনাচার সহ্য করছে কীভাবে? তাদের তো কোন সাড়াশব্দ দেখছি না!
-কী ভাইজান? রান্নাঘরের আশেপাশে ঘুরঘুর করতিছেন কীজন্যে? কিছু লাগবে?
আমি যদি বিপর্যস্ত এবং বিরক্ত না থাকতাম, তাহলে কথা বলার এই ভঙ্গিতে কোন একটা আহবান খুঁজে পেতাম হয়তো। এটা স্বাভাবিক পুরুষ প্রবৃত্তি। এতে দোষের কিছু নেই।
-আপনারা যে এমন শব্দ করছেন, বাড়ির পুরুষেরা বিরক্ত হচ্ছে না? সারাদিন কাজের পর তো তাদের ক্লান্ত হয়ে ঘুমোনোর কথা।
-তারা কেউ নেই। কুটুমের জন্যি বাজার করতি গেছে।
এই ঘন কালো রাতে বাজার? কী জানি! গ্রাম সম্পর্কে আমার ধারণা কম। এখানে হয়তো জেলেরা মাছ ধরতে যায় রাতে, সেই মাছগুলি টাটকা টাটকা কিনে নেয় গেরস্থরা। তাজা মাছের জন্যে অনেককেই এমন আদিখ্যেতা করতে দেখেছি। আমি আর কৌতূহল প্রকাশ না করে চলে এলাম। অন্য সময় হলে একটু দূরে দাঁড়িয়ে তাদের শরীরের বাঁক দেখতাম হয়তো বা কিছুক্ষণ। কোমড়ে আঁচল গুঁজে রান্নাবান্না করার মধ্যে যথেষ্ট উত্তেজনা খুঁজে পাই আমি। তবে এখন না। এখন মনটা বিক্ষিপ্ত। গত কয়েকদিনের ঘটনাপ্রবাহ আমার অনুকূলে নেই একদম। আমার আজকে ঘুমটা খুব দরকার ছিলো।
ছ্যাৎ ছ্যাৎ করে শব্দ হচ্ছে। কী ভাজছে এত? শব্দের সাথে যুক্ত হয়েছে ঝাঁঝালো গন্ধ। কোন মশলা বা কোন মাছ, আমি জানি না। জানার ইচ্ছেও নেই। এমন কি আমি হয়তো আজ দুপুরে এই খাবারগুলি খাবোও না। সুজলা সুফলা গ্রামের সতেজতা নিয়ে আহ্লাদ করতে ইচ্ছে করছে না মোটেও। বিতৃষ্ণা জন্মে যাচ্ছে। মেঠোপথ ধরে চলে যাবো বড় রাস্তায়। এরপর একটা ভদ্রস্থ হোটেল না পাওয়া পর্যন্ত হাঁটতে থাকবো।
-ভাইজান, শুনতিছেন?
আমাকে আবার কী দরকার! আর এমন সুরেলা গলাতেই বা ডাকছে কেন? আমি আবার কোন অপরাধে জড়িয়ে পড়তে চাই না।
-জ্বী বলেন। শুনছি।
আমি একজন ভদ্র সভ্য নাগরিক।
-লবণ শেষ হই গিলো। একটু আইনে দিবেন?
-এই অন্ধকারের ভিতরে এখন আমি লবণ আনতে যাবো!
-ভাইজান কি ভয় পাচ্ছেন?
-না, ভয় কেন পাবো? কিন্তু এত রাতে কি দোকান খোলা পাওয়া যাবে?
-কেন যাবি না ভাইজান? কুটুম আসতিছে না? আমরা আবার কুটুমের জন্যে সেবার কোন ত্রূটি করি না বুইঝলেন!
-আচ্ছা, যাচ্ছি। বাতি দেন আমাকে।
হঠাৎ সহকারী মেয়েটি তীক্ষ্ণ হাসিতে বিদীর্ণ করলো চারিপাশ। এমন হাসিতেই বুঝি কাঁচ ভাঙে?
-কিরে নূরি এরম কইরে হাসতিছিস কীজন্যি?
-আরে লবণের কৌটো তো হেনেই আছে। তুমি না দেইখেই বইলে দিলে যে লবণ নেই। তোমার এই কান্ড দেইখে হাসতিছি!
জবাবে কর্ত্রী মহিলাটিও হাসতে শুরু করলো। একইরকম কাঁচভাঙা হাসি। হাসতে হাসতে তারা একে অপরের গায়ে গড়িয়ে পড়ছে। আমার অস্তিত্ব ভুলেই গেছে যেন। অপ্রকৃতস্থ এই দুজনের নিশুতি রাতের বিনোদনে নিজেকে যুক্ত করার কোন আগ্রহ পাচ্ছি না। তারা আমাকে নিয়ে তামাশা করছে। আমাকে নিয়ে তামাশা! এত সাহস! এই বোকা দুইজন মেয়েছেলে যদি জানতো আমি কে এবং কেন এখানে এসেছি, তাহলে এত ফূর্তি বের হয়ে যেত। বাড়ির কর্তা জানে ভালো। সে আমার কোন এক ধরণের আত্মীয়। কী ধরণের আত্মীয়, জানা নেই। জানার ইচ্ছাও নেই। আমার পরিবার থেকে এই বাসাটি ঠিক করে দেয়া হয়েছে কিছুদিন থাকার জন্যে, আমি এখানে থাকবো যতদিন প্রয়োজন, ব্যাপারটা এর চেয়ে জটিল কিছু না। এর বেশি আমি ভাবতে যাচ্ছি না।
-ও ভাইজান, একটু শুইনে যাবেন?
আবার কী হলো! বেয়াদব মেয়েছেলেগুলি কী শুরু করেছে!
-ভাইজান, আপনি তো আশেপাশেই আছেন, শুইনে যান না! বিরক্ত হচ্ছেন কীজন্যি!

নাহ, অনেক ভদ্রতা করা হয়েছে। এবার একটু ওদেরকে বুঝিয়ে দেয়া উচিত আমি কে এবং কী করতে পারি।
-দেখেন, আপনাদের কারণে ঘুমাতে পারছি না। রান্নাবান্না তাড়াতাড়ি শেষ করেন, এবং এইসব ডাকাডাকি, গীত গাওয়া বন্ধ করেন।
-এসব কী কথা ভাইজান? আপনি না মিয়েলোকদের কত পছন্দ করেন! কত কাছে টানেন! কত কী করেন! আর আমাগের সাথে এরম আচরণ! কুটুমেরা আসলি কী ভাববে বলেন তো!
আচ্ছা, এই ব্যাপার। তারা আমার ঘটনা জানে! কোন বেঈমান এটা ফাঁস করেছে, একবার আমি জেনে নিই, তারপর আমি তার ব্যবস্থা করবো। আপাতত এদের টিপ্পনি সহ্য করে যাই। তারা এতটা আত্মবিশ্বাসের সাথে আমাকে হেনস্থা করছে, যাতে বোঝা যায় তারা যথেষ্ট অনুকূল পরিবেশে আছে, এবং এখানে আমার তেমন কিছুই করার নেই।
-ফালতু কথা না বলে কীজন্যে ডেকেছিলেন বলেন।
-কলপাড় থেকে একটু পানি আইনে দিবেন? এক বালতি হলিই চলবে।
-না দিবো না। আপনাদের দরকার হলে আপনারাই গিয়ে নিয়ে আসেন।
আহ! এবার শান্তি লাগছে। অভদ্র মেয়েছেলেগুলি বুঝুক যেন তেন কেউ না।
-এরম করতি নেই ভাইজান। কুটুম আসতিছে, কুটুমের জন্যি আরো কত সেবা করা লাগবে! এই সামান্য পানি যদি নিয়ে আইসবের না পারেন তালি কেবা কইরে হবি কন?
-আপনেদের কুটুমের আপনারাই সেবা করেন। আমাকে এর মধ্যে আর টানবেন না খবরদার!
শাসিয়ে উঠি আমি।
তারা আবার অপ্রকৃতস্থের মত কাঁচভাঙা হাসিতে ভেঙে পড়ে। মাগী দুইটার ধারণা আমি মজা করছি। ঠিক আছে, মজা নিয়ে নে। সময় মত আমিও দেখাবো। সময় আমারও আসবে। অস্বীকার করবো না, এই গাঢ়, দীর্ঘ অন্ধকার, আর ভৌতিক নির্জনতা আমাকে কিছুটা দুর্বল করে ফেলেছে মানসিকভাবে। আপাতত ভোরের জন্যে অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।
বিকারগ্রস্ত দুই নারীর অপ্রকৃতস্থ খুনসুটি, তেল, পানি আর মশলার ছ্যাৎছ্যাৎ আওয়াজ, এবং বাসনকোসনের ঝুনঝুন শব্দকে উপেক্ষা করে আমি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। ভোরের আলো ফুটলে এখানে চমৎকার সব ফুলের গাছ দেখা যাবে। আর এর মধ্যে নিশ্চয়ই বাসার পুরুষেরাও চলে আসবে! নারীসঙ্গ এমন অনাকাঙ্খিত মনে হয় নি আমার কখনই। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। পদশব্দ শুনতে পেলাম। হৈ হট্টগোল শুনে বোঝা গেলো বাসার পুরুষেরা চলে আসছে। যাক! স্বস্তি পেলাম। কর্তা পুরুষটিকে সময় করে এই দুই অভদ্র নারীর অসংলগ্ন ব্যবহারের কথা খুলে বলতে হবে। এই লোকটি আমাদের পরিবারের কাছ থেকে নানা সময় নানারকম সাহায্য নিয়েছে। সে জানে আমার গুরুত্ব। আমি শেষবারের মত রান্নাঘরের দোরগোড়ায় গেলাম তাদের শরীরের বাঁক দেখতে। পরবর্তী হস্তমৈথুনের সময় কাজে লাগবে। এতক্ষণ সেভাবে উপভোগ করতে পারি নি।

-সংয়ের মত আইসে খাড়ায়ে আছেন কীজন্যি? শব্দ শুনতি পাচ্ছেন না? বাড়ির কর্তারা চইলে আয়েছে। যান, দরোজা খুইলে দেন। যান!
রীতিমত ধমকাচ্ছে আমাকে! স্বাভাবিক যুক্তিবোধ লোপ পাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার, বুঝতে পারছি। ভেতরের পশুটাকে আমি যত্ন করে লালন করি। রক্ত মাংস দিয়ে বড় করি। মাঝেমধ্যেই বের হয়ে যেতে দিই। আজ হয়তো বা আবার বের করতে হবে। সহজ কাজ। বাড়ির কর্তাকে ঢুকতে দিই আগে। তারপর বোঝা যাবে, কে আসল কর্তা।
দরোজা খুলে দেয়ার পর একটা বোটকা গন্ধ ঢুকলো ধক করে। গ্রাম্য লোকটা ব্যাগে করে কী না কী নিয়ে এসেছে কে জানে! এগুলি নাকি আবার কুটুমকে রেঁধে খাওয়াবে!
-কুটুম আসিছে। তাদের তদারকি করেন যান। মালসামালা নিয়ে আসেন।
এই অনুগত চাকরটা কী বলছে এসব! কোথা থেকে নেশা ভাং করে এসেছে কে জানে!
আমাকে ঠেলে সরিয়ে ঘরে ঢুকে গেলো সে। সামনে কিছু লোকের আনাগোনা। এখনও ভোর হয় নি। আর কতকাল ধরে এমন অন্ধকার বজায় থাকবে এই পৃথিবীতে! এই রাত কি শেষ হবে না? আমি বিপন্নের মত তাকিয়ে রইলাম অন্ধকারের দিকে। খুব ধীরপায়ে কিছু মানুষ এগিয়ে আসছে। তাদের কোন তাড়া নেই। যেন অনন্তকাল ধরে এই শ্লথযাত্রা চলতে থাকবে!
-এই শুয়োরের বাচ্চা, তোকে না বললাম কুটুমদের মালপত্র নিয়ে আসতে। কথা শুনতি পারিস না বাড়া?
বাড়ির কর্তা চিৎকার করে উঠলো।
সময় এখন অনুকূল নয়। কী ঘটছে জানি না, তবে যা ঘঠছে বা ঘটতে যাচ্ছে, তা বেশ বিপদজনক হতে পারে যদি মাথা ঠান্ডা না রাখি। আমি অন্ধকারের সমুদ্রে নিজেকে সঁপে দিলাম।
-আসুন কুটুম। আসুন আমাদের বাসায়। দিন, মালপত্র আমাকে দিন।
অন্ধকারে ওদের চেহারা বা ভাবভঙ্গি কিছু বোঝা যায় না। তারা কিছু বলে না। তারা নির্লিপ্ত এবং নীরব। ধীরপায়ে আমাকে অনুসরণ করতে থাকে। তাদের মালপত্রের ভেতরেও বোঁটকা, পচা গন্ধ। তবে এ নিয়ে আমি আর কিছু বললাম না।

তাদেরকে নিয়ে ঘরে ঢোকার পর গৃহকর্তাকে সন্তুষ্ট মনে হলো। সে সোল্লাসে চিৎকার করে উঠলো, “এ লাইট অফ ক্যা? আলো জ্বালা! কুটুমদের দেখুক সে!”।
আমাকে ইঙ্গিত করলো?
-রান্নাঘর থেকে দুই আবেদনময়ী নারী হিসহিসে গলায় আদেশ করলো,
-তাকা! দেখ চিনতি পারিস কি না কুটুমগের।
আলো জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। অতিথিরা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি তাদের চোখে চোখ রাখতে পারছি না। আমি তাদের পরিকল্পনা বুঝে গেছি। আজই সম্ভবত আমার শেষ দিন। প্রতিশোধ নেবার এমন সুন্দর সুযোগ পেলে কেউ ছাড়বে কেন? তারপরেও শেষ চেষ্টা করতে হবে আমাকে।
-আমি অত্যন্ত দুঃখিত, যা হবার হয়েছে। আমি আপনাদের সব চাওয়া পূরণ করবো। কোন অভাব রাখবো না।
পুরুষ অতিথি কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। দৃষ্টিতে কৌতুক ঝিলমিল করছে। সহৃদয় কণ্ঠে সে আমাকে আহবান করলো তাদের সাথে বসতে।
-আহা, অত পেরেশান হচ্ছেন কেন! আসুন, বসুন, কথা বলি!
যাক, এরা এই বাসার গেঁয়োগুলির মত চামার না।
-কী দিবেন আমাদের আপনি, বলেন? কী আছে আপনার?
চেয়ারে বসার পর শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো মহিলাটি।
যাক, আশার সলতে জ্বলে উঠেছে!
-কী নেই আমার! সব আছে! আপনারা রাজার হালে থাকবেন বাকিটা জীবন, এই নিশ্চয়তা দিচ্ছি।
-হ্যাঁ, জানি আপনার বাবা অত্যন্ত ধনী এবং প্রভাবশালী। কিন্তু তার কথা বাদ দিন। আপনার কী আছে?
-তার কথা বাদ দিবো কেন? আমার...
-তার কথা বাদ দেয়াই এখন বুদ্ধিমানের কাজ।
স্মিত হাসলো সে।
বাড়ির গৃহকর্তা এবং রমনীরাও চলে এসেছে। রমনীরা এসব আলোচনার চেয়ে অতিথি আপ্যায়নেই ব্যস্ত বেশি।
-আরে কুটুম, এদ্দিন পর আয়েছেন একটা উপলক্ষ্যে, কী এত জরুরী আলাপ শুরু করিছেন! আপনাগের জন্যে সারারাত ধইরে রান্না কইরলাম! এই ভাইজান কিন্তু রান্নাঘর আর রান্নার মহিলাদের খুব পছন্দ করে! বারবার আইসে দাঁড়াচ্ছিলো!
-হ্যাঁ, আমরা জানি!
আবার অস্বস্তিকর প্রসঙ্গ চলে আসছে। এটাকে বাদ দেয়ার উপায় কী!
-আচ্ছা, এই ব্যাগগুলির ভেতরে কী আছে! এত বোঁটকা গন্ধ? আমি ভেতরে রেখে আসবো?
অনুগত ভৃত্যের মত বিনয়ী কন্ঠস্বরে তাদের অনুমতি প্রার্থনা করলাম।
অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো সবাই। কী ভীষণ বিভৎস এই হাসি! তারা হাসছে, তারা দুলছে, তারা দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। তারা কথা বলতে চাইছে, তাদের কথা আটকে যাচ্ছে। তারা স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। আমি কী করবো? ছুট লাগাবো? কিন্তু বাইরে যে ভীষণ অন্ধকার! এই অন্ধকার ভীতিকর। এই অন্ধকারে সবাই বেরুতে পারে না। এই অন্ধকারের শাসানি টের পাচ্ছি আমি। এই রাত কি কখনও শেষ হবে না?
অতিথিদের মধ্যে প্রাজ্ঞ এবং বয়স্কজন মুখ খুললেন অবশেষে।
-ব্যাগের মধ্যে কী আছে না দেখালেও আপনি জানতে পারবেন। তবে একটি বিশেষ ব্যাগ খোলা যেতে পারে। এখানে একটি বেহালা আছে। আপনি না অনেকদিন ধরে বেহালার সুর খুঁজছিলেন? যাক, একটা ভালো গুণ আপনার মধ্যে আছে, আপনার এই নন্দনপ্রীতিকে আমরা সম্মান জানাই। শেষ সময়টায় মানুষ তার শেষ ইচ্ছেটা তো পূরণ করতে চাইতেই পারে, তাই না?
-শুধু বেহালার শব্দ শুইনে পেট ভরবি? ভাইজান ভালোমন্দ কিছু খাবে না? এতকিছু রান্না করলাম!
মুখরা রমণীদের শ্লেষ তীরের মত বেঁধে আমার বুকে। আমি ধপ করে বসে পড়ি চেয়ারটায়।
কেউ একজন বেহালা বাজাচ্ছে। সেই হারিয়ে যাওয়া সুরে আমি মোহিত হতে পারছি না কোনভাবেই! কেউ একজন অন্য ব্যাগের দড়িগুলিও খুলছে। ভক ভক করে পচা গন্ধ বের হচ্ছে। সেখানে তাকানোর সাহস আমার নেই। আমি জানি তারা কী নিয়ে এসেছে। আমি জানি, তাদের সাথে আপোষ করার মত আমার আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
কেউ একজন কিছু একটা দিয়ে আমার গলা পেঁচিয়ে ধরেছে। ভোরের সূর্যটা যেন ঠিক এই সময়ের অপেক্ষাতেই ছিলো! সাদা আলো গুটিগুটি পায়ে জানালা দিয়ে প্রবেশ করছে, আমার জন্যে নয় অবশ্যই!
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই আগস্ট, ২০১৯ রাত ১১:২৭
১৬টি মন্তব্য ১৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নির্বাচন হয়ে গেল তিউনিসিয়ায়

লিখেছেন হাসান কালবৈশাখী, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ভোর ৫:৩৫




তিউনিসিয়া আরব বসন্তের সূতিকাগার।


জাতীয় নির্বাচন হয়ে গেল তিউনিসিয়ায়। ১৫ সেপ্টেম্বর। গতকাল ফল ঘোষনা না হলেও ফলাফল জানা গেছে।

স্বৈরশাসক বেন আলীর বিদায়ের পর অন্যান্ন আরব দেশের মত মৌলবাদি বা একনায়কের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আল্লাহ্‌ কি এমন কোন অস্ত্র তৈরি করতে পারবেন যা আল্লাহকে মেরে ফেলতে পারবে?(নাঊযুবিল্লাহ)

লিখেছেন মাহমুদুর রহমান, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ সকাল ৮:৩২


============== বিসমিল্লাহির রহ'মানির রহী'ম ================
নাস্তিক ও নাস্তিক মনস্ক মানুষের করা যেকোন প্রশ্নকে আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে পছন্দ করি।আপনাদের কাছে তেমনি একজন মানুষের করা একটি প্রশ্নকে উপস্থাপন করবো উত্তর সহ।আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগে পোস্ট দেয়া বিভিন্ন ধর্মীয় বিষয় নিয়ে লেখার ব্যাপারে কিছু অপ্রিয় সত্যকথা

লিখেছেন নীল আকাশ, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ সকাল ১১:০৫



ব্লগে আজকাল বেশ কিছু ব্লগারদেরকে ইসলাম ধর্ম সর্ম্পকীত বিভিন্ন পোস্ট দিতে দেখি। কিন্তু এইসব পোস্টের জন্য যা অবশ্যই প্রয়োজন সেটা হলো, এইসব পোস্টে ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে সমর্থন। ইসলাম ধর্ম... ...বাকিটুকু পড়ুন

শরৎকালের তিনটি ছড়া/ছন্দ কবিতা একসাথে।

লিখেছেন কবি হাফেজ আহমেদ, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ সন্ধ্যা ৬:৫৩

শরতের রঙ
হাফেজ আহমেদ

বিজলী তুফান বর্ষা শেষে
ভাদ্র-আশ্বিন মাসে
ডাঙার জলে ডিঙির উপর
শরৎ রানী হাসে।

মাঠের পরে মাঠ পেরিয়ে
আমন ক্ষেতের ধুম
শরৎ এলেই কৃষাণ ক্রোড়ে
নরম নরম ঘুম।

শরৎ এলে শুভ্র মেঘের
ইচ্ছে মতন ঢং
এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

তোমাকে ভালোবাসি, নিঃশ্বাসের মতো..........।

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ রাত ৯:৩২


তোমার চোখ থেকে এক শীতের সকালে মন পাগল করা কাঁচা আলো ছড়িয়ে পড়া , যেনো নতুন যৌবনেরআগমনের প্রতিশ্রুতি।
তোমার নতুন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিত্ব ,চলনভঙ্গি ।ইঙ্গিতপূর্ণ চপলতা ..........।
হঠাৎ আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×