somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার মেডিকেল ডায়েরি- ২য় পর্ব

০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০১৯ সকাল ১০:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ঘটনা-৩: রেডিওলজি, কার্ডিওলজি প্রভৃতি ডিপার্টমেন্টে ক্লাস করার সময় আমরা লক্ষ্য করতাম রোগীর পরীক্ষা-নীরিক্ষায় প্রায় সব রকমের মেশিনই সরকার কর্তৃক বরাদ্ধ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তার মধ্যে কিছু মেশিন অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে ছিল। স্যারকে এর কারন জিজ্ঞেস করলে তিনি জানালেন মেশিন পরিচালনার অপারেটর নেই, তাই সেটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না! কি অদ্ভূত ব্যাপার! স্যারকে আমরা জিজ্ঞেস করলাম কেন দ্রুত অপারেটর নিয়োগ দেয়া হচ্ছে না, এভাবে অযত্নে পড়ে থাকলে তো মেশিনগুলি নষ্ট হয়ে যাবে! স্যার চুপ করে রইলেন। তার নিরবতায় যেন এক অসহায়ত্বের চিত্র ফুটে উঠলো! মেশিন নষ্ট, অপারেটর নেই- এই অভিযোগগুলো মেডিকেল হসপিটালগুলিতে নতুন কিছু না। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে মেডিকেল হসপিটালগুলির আশেপাশে ব্যাঙের ছাতার মত বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। আশ্বর্য্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, কাছেই মেডিকেল হসপিটাল থাকা সত্ত্বেও এদের ব্যবসা কিন্তু জমজমাট!

ঘটনা-৪: মেডিকেল কলেজগুলোতে মাঝে মাঝেই দুদল শিক্ষার্থীর মাঝে সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় এই খবরগুলো হয়ত আপনাদের চোখে পড়েছে কখনো। অধিকাংশ সংঘর্ষের মূল কারন কমিটি নিয়ে বিরোধ। কিন্তু একজন মেডিকেল স্টুডেন্ট কেন একটা কমিটি পেতে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিতেও পিছপা হয় না? এর সুবিধা কি? আমরা মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার পর যখন প্রথম হোস্টেলে উঠে, তখন থেকেই খেয়াল করলাম আমাদের কাছ থেকে প্রায় প্রতি মাসেই বিভিন্ন অযুহাতে কিছু টাকা আদায় করা হতো, যেমনঃ হোস্টেলের বাহিরে সাইনবোর্ড লাগানো, কলেজে কোন প্রোগ্রাম আয়োজন, শীত বস্ত্র বিতরণ, বন্যা দুর্গতদের সাহায্য, অসুস্থ কোন ব্যক্তির নামে সাহায্য ইত্যাদি। এভাবে প্রতি ক্ষেত্রে জনপ্রতি টাকা নির্ধারন করা হতো ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। এই টাকা আদায় হতো জুনিয়র হোস্টেলগুলো থেকে (১ম থেকে ৩য় বর্ষ, MBBS, BDS)। এই হোস্টেলগুলোতে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৪০০'র অধিক। যদি বছরে মাত্র ৬ বার শিক্ষার্থীদের কাছে গড়ে ৪০০ টাকা করে আদায় করা হয়, তবুও বছর শেষে মোট টাকার পরিমাণ দাড়ায় প্রায় ১০ লক্ষ টাকা! এছাড়া কলেজ প্রশাসনের কাছ থেকেও তারা বিভিন্ন অযুহাতে টাকা সংগ্রহ করে থাকে। এর বাইরে আরেকটি বড় সুবিধা হচ্ছে প্রফেশনাল পরীক্ষাগুলোর সময় তাদের নামে স্যারদের কাছে বিশেষ সুপারিশ পাঠানো হয় যেন তাদেরকে পাশ করে দেয়া হয়।

ঘটনা-৫: মেডিকেলে চান্স পাওয়ার পর যেদিন ভর্তির জন্য ডাকা হয়, ওখানে ফর্ম পূরণ, বিভিন্ন ডকুমেন্ট জমা দেয়া, টাকা জমা দেয়া ইত্যাদি কিছু ফর্মালিটি আছে। এই কাজগুলোতে নতুন চান্সপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীকে সাহায্য করতে কিছু সিনিয়রদেরকে স্বেচ্ছাই অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়। বাহির থেকে বিষয়টাকে খুব সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু এটিও এক ধরনের রাজনৈতিক কৌশল। এই সিনিয়রগুলো একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তারা নতুন ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের বিভিন্নভাবে সরকারী হোস্টেলে উঠতে নিরুৎসাহিত করে এবং নিজ উদ্যোগে তাকে বাহিরের কোন ভাল মেসে রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়। প্রতিশ্রুতি মত তাদেরকে বাহিরের একটি মেসে রাখা হয়, কিন্তু তাদের কাছ থেকে কোন ভাড়া নেয়া হয় না, হোস্টেলের মতই শুধু খাওয়া খরচ দিতে হয়। এই মেসগুলোতে ধীরে ধীরে তাদেরকে সাংগঠনিক শিক্ষা দেয়া হয়। এই শিক্ষার্থীগুলো মেসে ২-৩ বছর থাকার পর সরাসরি সিনিয়র হোস্টেলে উঠে পড়ে। ততদিনে তাদের মন-মানসিকতা অন্যরকম হয়ে যায়। তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে ব্যাচের কোন প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করে না, ট্যুরে যায় না কিন্তু তাদের নিজেদের মধ্যে শক্তিশালী বন্ধুত্ব লক্ষ্য করা যায়। যদিও এগুলো সম্পূর্ণ তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার, কিন্তু তারাই একসময় আবার সেই একই কৌশলে নতুন ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের নিজেদের দলে যুক্ত করে, যেভাবে একসময় তারা নিজেরা এই পথে এসেছিল।

[বি. দ্র.: এই সিরিজে বর্ণিত প্রতিটি ঘটনা আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে লেখা। ঘটনাগুলি অনেক বছর আগের। বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আমার তেমন কোন ধারনা নেই। আমার উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষের মাঝে ভীতি ছড়ানো নয়, বরং মেডিকেল নামক আলোকিত এক জগতের ভেতরে যেই অন্ধকার জগতটা লুকিয়ে আছে তার সম্পর্কে কিছুটা ধারনা দেয়া]
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০১৯ দুপুর ১:৫৭
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অটোপসি

লিখেছেন জাহিদ অনিক, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ দুপুর ১২:৩২

যে পাহাড়ে যাব যাব করে মনে মনে ব্যাগ গুছিয়েছি অন্তত চব্বিশবার-
একবার অটোপসি টেবিলে শুয়ে নেই-
পাহাড়, ঝর্ণা, জংগলের গাছ, গাছের বুড়ো শিকড়- শেকড়ের কোটরে পাখির বাসা;
সবকিছু বেরিয়ে আসবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গৌরব গাঁথা আমাদের ইতিহাস : ঘটনাপঞ্জি ও জানা অজানা তথ্য। [১]

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৩:১৮


আমার এ পোষ্টটি সবার ভালো না ও লাগতে পারে । যাদের মুক্তিযুদ্ধ ও আমাদের স্বাধীনতার গৌরবগাঁথা সর্ম্পকে বিন্দু মাত্র শ্রদ্ধাবোধ বা আগ্রহ নাই তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিজ দেশে অবহেলিত এশিয়া কাপে স্বর্ণ পদক বিজয়ী!

লিখেছেন ঘূণে পোকা, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৫:০৪

‘আমার দেশে আমার কোনো দাম নেই’



রোমান সানা (তীরন্দাজ) : ‘বড় পর্যায়ের কারও কাছ থেকে কোনো শুভেচ্ছা পাইনি। এটা নিয়ে কষ্ট হচ্ছে। অথচ ক্রিকেটে জিম্বাবুয়েকে হারানোর পর আফিফ হোসেনকে কত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঢাকার পথে পথে- ১৪ (ছবি ব্লগ)

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৫:২৩



ঢাকা শহরের মানুষ গুলো ঘর থেকে বাইরে বের হলেই হিংস্র হয়ে যায়। অমানবিক হয়ে যায়। একজন দায়িত্বশীল পিতা, যার সংসারের প্রতি অগাধ মায়া। সন্তনাদের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা- সে-ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছাত্রলীগ নিয়ে শেখ হাসিনার খোঁড়া সমাধান!

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ সন্ধ্যা ৬:২৫



Student League News

স্বাধীনতা যুদ্ধের পর, ছাত্র রাজনীতির দরকার ছিলো না; ছাত্ররা ছাত্র, এরা রাজনীতিবিদ নয়, এরা ইন্জিনিয়ার নয়, এরা ডাক্তার নয়, এরা প্রফেশালে নয়, এরা শুধুমাত্র ছাত্র;... ...বাকিটুকু পড়ুন

×