শ্রদ্ধেয় আকিমুন রহমান,
আপনি আমার শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। আপনার একজন সুহৃদ পাঠক হিসেবে এ খোলা চিঠি লিখছি।
“বিবি থেকে বেগম” পড়লাম। বাংলাদেশের চিন্তারহিত স্থবির নগরসমাজে যে ক্ষীণভাবে হলেও চিন্তার লড়াই অব্যাহত আছে- এটা ভেবে আস্বস্ত হচ্ছি। এই বই হয়তো আরও পঞ্চাশ বছর আগেই লিখিত হওটা উচিৎ ছিল। ভীষণভাবে লক্ষ্যভেদী এবং দারুণভাবে সময়োপযোগী এই বইটির জন্যে অতএব আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। বাড়তি প্রশংসা করে এ খোলা চিঠিকে আর ভারবাহী বলীবর্দে পরিণত করতে চাই না, কেননা বইটির (প্রকাশকঃ আগামী প্রকাশনী, প্রকাশকালঃ ১৯৯৬) ভূমিকায় আপনার সৃষ্টিকর্তা, চির উপাস্য চির পূজার্হ (আরাধ্য অর্থে) শিক্ষক প্রয়াত জনাব হুমায়ুন আজাদের যোগ্য স্তুতি (সদার্থে) আর যৌক্তিক প্রশংসাই করেছেন।
বইটির অনেক জায়গায় আমার কিছু সমালোচনা আছে (যেমনঃ পৃষ্ঠা ১৪৫ এ নারীর “সহজাত ভাবে সংযত” স্বভাবের উল্লেখ। লিঙ্গভেদে নারী বলেই কি তাকে সহজাত- অর্থাৎ কিনা স্বাভাবিক, অনায়াসসাধ্য, অনায়াসগম্যভাবে ‘সংযত’ হতে হবে? কথাটা যেন দাঁড়াল নারী সম্পর্কে “সহজাতভাবে লজ্জাবনত, সহজাতভাবে ভীরু, কোমলহৃদয়”-ইত্যাদি পুরুষতান্ত্রিক চেতনাপ্লুত শব্দবন্ধের উল্লেখের মত), এ মূহুর্তে চিঠির ক্ষুদ্র পরিসরে যা উল্লেখ করা সম্ভব নয়। এর জন্য কিছু সময় ও প্রস্তুতি প্রয়োজন।
মূল যে বিষয়টি উল্লেখ করবার জন্য আমি আপনাকে এ খোলা চিঠি লিখতে বসেছি, তা হলো বইটির উৎসর্গপত্রে উচ্চারিত আপনার কিছু শব্দাবলীঃ
“আমার স্রষ্টা
চির আরাধ্য হুমায়ুন আজাদকে”
আকিমুন রহমান, আমি প্রথমত যারপরনাই বিস্মিত, পরে দুঃখভারাক্রান্ত এবং তারও পরে আপনার নারীবাদী বোধ ও মনন সম্পর্কে দ্বিধান্বিত!
রহমান, আমি মোটামুটি নিশ্চিত যে আপনি একজন বিবাহিত নারী (বইটির গ্রন্থস্বত্ব থেকে আমার এ উপলব্ধি) এবং বিবাহ নামক সামাজিক চুক্তির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন নারীর মনোজাগতিক (এবং বৈষয়িক তো বটেই) যে দাসত্বশৃঙ্খলা- সে শৃঙ্খলভাবনা সম্পর্কে সতর্ক থেকেও আপনার মধ্যে ততটা চিন্তার উল্লম্ফন ঘটেনি, যতটা ঘটলে বাংলাদেশের নির্মম সামাজিক বাস্তবতা সত্বেও হয়তো আপনি এমন এক চুক্তিতে আবদ্ধ হতেন না। এতোটা এ মূহুর্তে আমি আশাও করি না।
আপনার সার নেইম বা লাস্ট নেইম যে ‘রহমান’, সেটাও নিশ্চয়ই আপনার অগতির গতি ভর্তার কাছ থেকে আদায় করা লেজুড়সর্বস্ব নাম! বিয়ের পরও স্বনামে থিতু থাকা- চিন্তার এতোটা উল্লম্ফনও আমি আপনার কাছ থেকে আশা করতে চাই না। কিন্তু যিনি “বিবি থেকে বেগম”-এর মতো বইয়ের লেখক, তাঁর কাছ থেকে কি আমি এই আশাটুকু করতে পারি না, যে তাঁর লিখা বইটির মুখবন্ধের শেষ লাইনটির মতই তিনি হবেন “জাগ্রত, সাবলম্বী, স্বাধীন মানুষ”??? নারীর ‘ব্যক্তি’ হয়ে উঠার জন্য, ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি লাভের জন্য তার কোন আরোপিত ‘স্রষ্টা’র প্রয়োজন পরে না? ব্যক্তি হয়ে উঠার জন্য তার জীবদ্দশায় কাউকে ‘চির আরাধনা’র প্রয়োজন পরে না? তা সে পুরুষই হোক, আর নারীই হোক না কেন (যদিও আপনার কথামত সেই পরম পূজনীয় স্রষ্টা দেবতাটি হচ্ছেন হুমায়ুন আজাদ নামক একজন পুরুষ)!
আকিমুন রহমান, কেন আপনার এই উৎক্রমণপ্রিয়তা? কেন? কেন? বইটির উৎসর্গে ঐ শব্দবন্ধ দিয়ে ফুটে উঠেনি কি আপনার চিন্তার ক্লীবতা? শুধু “আমার শিক্ষক”লিখলেই কি যথেষ্ঠ ছিল না?
“আমার স্রষ্টা, চির আরাধ্য” শব্দগুলোর মধ্য দিয়ে যেন পোকায় খাওয়া নষ্ট দাঁত কেলিয়ে ফুটে উঠছে বঙ্কিমীয় কোন পশ্চাৎপদ সামন্তিয় নারীর সেবাদাসী সুলভ সংলাপ! বুঝে নিতে কষ্ট হয় না যে শ্রদ্ধেয় প্রয়াত হুমায়ুন আজাদ একটা বিশাল অংশ জুড়ে কর্ষন করেছেন আপনার চিন্তার, আপনার মেধার, আপনার মননের উর্বর জমি। আপনার মননশীল জমির সৃজনশীল দো-আঁশলা মাটি তো আপনার নিজেরই সৃষ্টি! সমাজের বিভিন্ন অংশের বিভিন্ন চিন্তার জল-হাওয়া তাতে উর্বরতা দিয়েছে। একা হুমায়ুন আজাদ নামক কোন ব্যক্তির পক্ষে অপর কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের চিন্তার, মননের মৌলিকত্ব সৃষ্টি করে দেয়া ঐতিহাসিক বস্তুবাদী দিক থেকে নিশ্চয়ই সম্ভব নয়!
কাউকে ‘সৃষ্টি’ করা (সে যে অর্থেই হোক না কেন), কারও ‘চির আরাধনা’র বস্তু হয়ে উঠা নামক চিন্তাটি হচ্ছে প্রাকপুঁজিতান্ত্রিক আধা-সামন্তিয় মফস্বলী সংকীর্ণতা। এই আধাখেঁচরা মফস্বলী সংকীর্ণতায় আজকে আমাদের তাবৎ মধ্যবিত্ত শ্রেণীটি আচ্ছন্ন।
এমন প্রগতিশীল নারীবাদী গ্রন্থের তীক্ষ্ণধী লেখক তাই আমার কাছে ম্লান হয়ে যাচ্ছে উৎসর্গপত্রে আকিমুন রহমানের চিন্তার সংকীর্ণতার চাপে পড়ে। একই গ্রন্থে কেন তবে চিন্তার এই বিপ্রতীপ দ্বিত্ব? আকিমুন রহমান, খুব জানতে ইচ্ছা করে।
শুভেচ্ছা রইলো আপনার জন্য। আয়ুষ্মতি হন।
(আগামী প্রকাশনী থেকে ১৯৯৬ সনে প্রকাশিত বিবি থেকে বেগম বইটি হাতে নিয়ে এ খোলা চিঠি লিখলাম। কোলকতার গাংচিল প্রকাশনী সংস্থা থেকে ২০০৬ সনে বইটি তার পূর্ব প্রকাশনার খোলনলচে পালটে পূণঃপ্রকাশিত হয়েছে, যা এ চিঠিটির বক্তব্যের সাথে সাযুজ্য নয়)
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে ডিসেম্বর, ২০১০ ভোর ৫:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


