আমার দৃষ্টিতে ইরানের ইসলামী বিপ্লব মুসলিম বিশ্বে তথা সমগ্র বিশ্বে গণজাগরণের একটি প্রতীক বা সিম্বল। বর্তমান বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদীদের যে দাপট বা হুমকী চলছে তার কাছে আসলে আরব বিশ্বসহ কেউই প্রায় দাঁড়াতে সাহস পাচ্ছে না । আমি আরো একটু স্পষ্ট করে বলবো - আরব বিশ্বের দেশগুলো বা নেতৃবৃন্দ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোকে সমীহ করে চলছে । তারা এমন ভাবে চলছে যাতে পরাশক্তিগুলো কোনোভাবে তাদের উপর রাগান্বিত না হয় । আর সেদিক থেকে ইরান অবশ্যই একটি ব্যতিত্রুমী এবং ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে। সাম্রাজ্যবাদীদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইরানের একক ভূমিকা বিশ্ববাসীর সামনে খুবই স্পষ্ট । একটু লক্ষ্য করলেই আমরা দেখব মুসলিম বিশ্বের দেশ ফিলিস্তিন , ইরাকে সাম্রাজ্যবাদীদের আগ্রাসন কত তীব্র আকার ধারণ করেছে । সসব আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আরব দেশগুলো কোনরকম প্রতিবাদ করছে না । আসলে প্রতিবাদ তো দূরের কথা টু শব্দটি করছে না । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ এসব সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোকে আরব বিশ্বের এসব দেশ প্রভূ হিসেবে মেনে নিয়ে চুপচাপ বসে থাকছে । কিন্তু আমরা বিশ্ববাসী সেক্ষেত্রে দেখছি ইরান এসব দেশের বিরুদ্ধে ন্যায়সঙ্গতভাবে যে কথাটি বলা দরকার ,যতটুকু প্রতিবাদ জানানো দরকার সেটি করছে । ইরান অন্যায়ের বিরুদ্ধে , আগ্রাসনের বিরুদ্ধে স্পষ্ট প্রতিবাদ জানাচ্ছে । ইরান তার এ স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে থাকতে পারছে তার কারণ হচ্ছে - ইরান সেদেশে একটি ইসলামী বিপ্লব ঘটিয়েছে । গণজাগরণের মাধ্যমে একটি সার্থক ইসলামী বিপ্লব ঘটিয়ে সেখানকার রাষ্ট্র কাঠামো , সমাজ কাঠামোতে সত্যিকার পরিবর্তন ঘটিয়ে ইসলামী বিপ্লবের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যগুলোকে বাস্তবায়ন করেছে । আর সে কারণে ইরানের ইসলামী বিপ্লব অত্যন্ত সফলতার সাথে টিকে আছে এবং ত্রিশ বছর পার করেছে । ইরানের ইসলামী বিপ্লবের চেতনার কারণে বিশ্বের প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দেশটি অত্যন্ত সোচ্চার ও কঠোর ভূমিকা পালন করতে পারছে এবং মুসলমানদের পক্ষে নিজেদের ভূমিকা রাখতে পারছে । ইসলামী ইরানের ত্রিশতম বিপ্লবের বিজয় বার্ষিকীর প্রাক্কালে আমি এ ধরনের অনুভূতি ব্যক্ত করছি
আসলে ইরানের এই সফলতা গোটা ইরানবাসীর সফলতা এবং ইরানের মুসলমানদের সফলতা হিসেবে অভিহিত করা যায় । আপনি যে বিষয়টি প্রশ্নের মধ্যে বল্লেন যে, বিপ্লবের সময় থেকে শুরু করে বিপ্লব বিজয়ের পর এবং আজও ইহুদীবাদীরা বিশেষ করে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো এ বিপ্লবকে নিয়ে নানা অপপ্রচার শুরু করে । তারা দাবী করে এ বিপ্লব বেশী দিন টিকবে না । এ প্রসঙ্গে আমি আরো একটি বিষয় তুলে ধরছি । ইরানের ইসলামী বিপ্লব সম্পর্কে আমরা যারা বাংলাদেশে আছি তারা প্রথম দিকে একটি কথা শুনতাম । সেটি হচ্ছে - ইরানের এই বিপ্লব ছিল একটি শিয়া বিপ্লব । শিয়া সম্প্রদায়ের আলেমরা মিলে একটি মাজহাবগত বিপ্লব ঘটিয়েছে । এটি আম মুসলমানদের জন্যে , বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর জন্যে কোনো দৃষ্টান্ত হতে পারে না । ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এ বিপ্লব কোন প্রতীক হতে পারে না । কিন্তু পরে বিপ্লবের সত্যিকার বিষয়টি অনেকের কাছে স্পষ্ট হয়েছে । মরহুম ইমাম খোমেনী (রহ: ) এর নেতৃত্বে ইরানে যে ইসলামী বিপ্লব ঘটেছে সেটি একতরফা কোনো শিয়া বিপ্লব নয় ; এটি ছিল ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠার এবং শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে মানুষের অধিকার আদায়ের বিপ্লব । বিপ্লবে যে গণজাগরণ ঘটেছে তা হাজার বছরের শাহ সরকারকে উৎখাত করে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে । আর এ বিপ্লবের সবচেয়ে বড় যে দিকটি ছিল সেটি হচ্ছে নেতৃত্ব। ইমাম খোমেনীর মতো এমন আধ্যাত্মিক মহান ব্যক্তিত্বের নেতৃত্বই ছিল মুখ্য বিষয় । ইমাম খোমেনীর আহবানে কেবলমাত্র উলেমারা নয় গোটা ইরানবাসী এক কাতারে জড়ো হয়েছিলেন । যারা ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত নয় বা কম লেখাপড়া জানা মানুষও এ বিপ্লবে অংশ নিয়েছেন । বহু মানুষ এ বিপ্লবে অংশ নিয়ে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন । ফলে এ বিপ্লবের সফলতা শুধু মাত্র ইরানের জন্যে নয় বিশ্বে এর প্রভাব পড়েছে।
আসলে এ বিষয়টির মূল্যায়ন করা একদিকে যেমন কঠিন আবার সহজও । আমি ব্যক্তিগতভাবে ইরান সফর করিনি এবং ওখানকার আলেম সমাজের যে দৈন্দন্দিন কাজকর্ম সে সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা খুবই কম । তবে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নেতৃত্বে ছিল সেখানকার আলেম সমাজ । তাদের প্রতি জনগণের অগাধ বিশ্বাস ও ভক্তি ছিল বলেই আম জনতা বিপ্লবকে সমর্থন জানিয়েছে । এছাড়া আমি যতটুকু জানি সেখানকার সমাজ কাঠামো গড়ে উঠেছে এলাকাভিত্তিক মাজ্জাকে কেন্দ্র করে । কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য দেশে আলেম সমাজের অবস্থা সে রকম নয় , আলেম সমাজের প্রতি জনগণের আস্থা বিশ্বাসও কম । উপমহাদেশে বাংলাদেশ , ভারত , পাকিস্তান ও আফগানিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্যের আলেম সমাজকে যদি আমরা দেখি তাহলে দেখবো এসব দেশের আলেম সমাজ কেবলমাত্র ধর্মীয় বিষয়ে মানুষকে নসিহত করছে বা পথ দেখানোর চেষ্টা করছে । তাদের কাছে রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক বিষয়ের তেমন কোনো গুরুত্ব নেই বলে মনে হয় । সাধারণভাবে এসব দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে আসেন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষেরা । আলেম সমাজ রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে আসছে না বা পারছে না । এ প্রসঙ্গে আমি বলবো মরহুম ইমাম খোমেনী (রহ
ইরানের ইসলামী বিপ্লবসহ নানা বিষয়ে বাংলাদেশে অবস্থানরত ইরানী নেতৃবৃন্দসহ অনেকের সাথে আমি আলোচনা করি । তো এসব আলোচনা থেকে বা বাস্তবতা থেকে যে উপলব্ধিটি এসেছে সেটি হচ্ছে ,ইরানের ইসলামী বিপ্লব কেবলমাত্র ইরানের জন্যেই নয় ; এ বিপ্লব সারা বিশ্বের জন্যে একটি আদর্শ বা মডেল । ইরানের এ বিপ্লব সমগ্র মুসলিম বিশ্বসহ বিশ্বের জন্যে একটা আইডিওলজি হতে পারে যে, কিভাবে ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করা যায় বা ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সংযুক্ত করা যায় । দেখুন, বিশ্বে এখন দুটি ধারার বেশ চল । একটি হচ্ছে প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা । সেখানে মার্কা থাকে, নির্বাচন হয় ক্ষমতায় আসে রাজনৈতিক দল । তবে সেসব নির্বাচনে দেখা যায় ইসলামী দলগুলো ব্যর্থ হয় । এমনকি তাদের জামানাত পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত হয় । এসব নির্বাচনের মাধ্যমে কিন্তু কোনভাবেই ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না । আরেকটি ধারা আমরা দেখি যেটি আফগানিস্তানে হয়েছে । সেটি হচ্ছে, অস্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল । আফগানিস্তানের ইসলাম পন্থীরা মনে করছিল কায়েমী স্বার্থবাদী বা সরকার কাঠামোতে যারা আছে তাদেরকে অস্ত্রের মাধ্যমে উৎখাত করে ইসলাম কায়েম করা যাবে মুসলিম রাষ্ট্র গঠন করা যাবে । আসলে এ দুটি পথই ইসলামের জন্য সম্পূর্ণ ভ্রান্ত পথ । কোরআন হাদীস এসব ভ্রান্ত পথকে পরিহার করার কথা বলেছে। আর ইরানের ইসলামী বিপ্লবও কিন্তু প্রমাণ করেছে এই দুই পথে নয় একটি সৎ যোগ্য ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমে জনগণকে সাথে নিয়ে বা জনগণের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি অভ্যুত্থানের দ্বারা এ ধরনের একটি বিপ্লব সফল করা সম্ভব ।আর ইরান তা করে দেখিয়েছে । আমরা এ ধরনের আন্দোলন কিছুটা লক্ষ্য করছি তুরস্কে ।পাকিস্তানে এবং বাংলাদেশেও এ ধরনের কিছু চেষ্টা আমরা লক্ষ্য করি । বাংলাদেশের মানুষ ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে সমর্থন করেন । ইরান সেদেশে ইসলামী বিপ্লব ঘটিয়েছিল বলেই আজ বিশ্বের বুকে স্বমহিমায় টিকে আছে । শুধু টিকে আছে বল্লে খুবই কম বলা হবে - ইরান প্রতিনিয়ত অর্থনৈতিক ও জ্ঞান বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন দিকে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করছে । তারা জনগণকে সাথে নিয়ে এই বিপ্লব সফল করেছিল বলেই এ ধরনের সাফল্য তারা অর্জন করতে পারছে । তো আমি সবশেষে এ কথা বলবো যে , ইরানের এই ইসলামী বিপ্লবের সুদূর প্রসারী ভবিষ্যৎ রয়েছে এবং তারা সব অপশক্তির বিরুদ্ধে জয়ী হবে ।
বাংলাদেশের বিশিষ্ট রাজনৈতিক চিন্তাবিদ মোস্তফা তারেকুল হাসানের সাথে কথপকথন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


