somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শিশুদের খেলনায় বিষাক্ত উপাদান-অভিভাবকদের সচেতনতা জরুরি

২১ শে মে, ২০২০ বিকাল ৪:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


শিশুদের অন্যতম প্রিয় জিনিস হলো খেলনা।আর বাবা-মায়েরাও তাদের সন্তানদের খেলনা কিনে দিতে বেশ আগ্রহীই থাকেন।কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হলো খেলনা তৈরির বিভিন্ন উপাদান যেমন প্লাস্টিক, কাঠ, মাটি এবং রঙে রয়েছে নানাবিধ ক্ষতিকর উপাদান যা শিশু স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।এ বিষয়ে বিশ্বের উন্নত দেশগুলো সচেতন হলেও আমাদের দেশে এ বিষয়ে জনসচেতনতা কম থাকায় বিষয়টি আড়ালে থেকেই সর্বনাশ করে যাচ্ছে।বাংলাদেশে খেলনার বিষাক্ততা নিয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করেছেন বাংলাদেশকে বিষ মুক্ত রাখতে নিয়োজিত এনজিও Environment and Social Development Organization(ESDO)।এই সংস্থাটি ঢাকা শহরের বিভিন্ন মার্কেট থেকে প্রায় ৪০ধরনের খেলনা সংগ্রহ করে সেগুলোর কেমিক্যাল অ্যানালাইসিস করে প্রাপ্ত তথ্য ৬ই ডিসেম্বর,২০১৩ তে প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ করে।ESDO’র প্রতিবেদনে বাংলাদেশে প্রাপ্ত খেলনায় বিষাক্ত পদার্থের উপস্থিতির এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে।পাঠকদের সুবিধার্তে এ প্রতিবেদনের কিছু চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো-

১)ঢাকা শহরের ৯৭% খেলনায় বিষাক্ত ধাতুর (toxic metal) উপস্থিতি পাওয়া গেছে যা ইউরোপিয় ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্টের সর্বনিম্ন গ্রহণযোগ্য মাত্রার মানদন্ডের চেয়েও অনেকগুণ বেশি।

২)৬৪% পিতামাতা জানেন না তারা শিশুদের জন্য যে খেলনাটি কিনছেন তা শিশুটির জন্য নিরাপদ কি না।

৩)৮৮% পিতামাতার খেলনায় থাকা বিষাক্ত ধাতুর ব্যাপারে কোন ধারণা নেই।

৪)২০% পিতামাতা লক্ষ্য করেছেন তাদের সন্তানেরা খেলনা নাড়াচাড়া বা মুখে দেওয়ার কারণে স্বাস্থ্য সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন।

৫)৭০% এরও বেশি পিতামাতা স্বীকার করেছেন যে তারা পরিত্যক্ত খেলনা সরাসরি ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দেন।





শিশুদের খেলনায় প্রধান প্রধান যেসব ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গেছে সেগুলো হলো-

১)ভারী ধাতুঃ ESDO কর্তৃক ঢাকা শহরের বিভিন্ন মার্কেট থেকে প্রায় ৪০ধরনের সংগৃহীত খেলনার কেমিক্যাল অ্যানালাইসিস করে যেসব ক্ষতিকর ভারী ধাতু পাওয়া গেছে তা নিচের ছকে উল্লেখ করা হলো-



২)থ্যালেটস(Phthalates):নমনীয় প্লাস্টিক (soft/flexible plastic) তৈরিতে ব্যাপকভাবে থ্যালেটস ব্যবহৃত হয়।কয়েক ধরনের থ্যালেটস (সবচেয়ে ক্ষতিকর থ্যালেটস হলো DEHP) মানবদেহে হরমোনের কার্যকারিতায় বাঁধা প্রদান করে (Endocrine Disrupting Contaminants) যার ফলে দৈহিক গঠন ও প্রজননতন্ত্রের কার্যকারিতা ক্ষতির সম্মুখীন হয় এবং পরবর্তীতে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়ে।খুবই স্বল্প মাত্রায়ও থ্যালেটস ও বিসফেনল হরমোনের মত কাজ করে বিধায় ১৯৯৯ সাল থেকে এসব উপাদানকে U.S. National Academy of Science (NAS) “hormonally active agents” (HAAs) হিসাবে সংঙায়িত করেছে।ক্ষতিকর থ্যালেটসের ভয়াবহতার কথা চিন্তা করে অনেক দেশই এর ব্যবহার নিষিদ্ধ এবং ক্ষেত্রবিশেষে নিয়ন্ত্রিত করেছে।



More phthalates banned in children's toys by US government

EU EXPANDS RESTRICTION OF PHTHALATES UNDER REACH

৩)পিভিসি(PolyVinyl Chloride):বিশ্বে উৎপাদিত খেলনার ৮০%ই চীনে তৈরি হয় এবং প্রায় সকল নরম প্লাস্টিকের খেলনাই পিভিসি থেকে তৈরি করা হয়।আর আমাদের দেশেও খেলনা তৈরিতে পিভিসির ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।নরম প্লাস্টিক তথা পিভিসি তৈরিতে প্লাস্টিসাইজার ব্যবহার করা হয়।অনেকক্ষেত্রে পিভিসিতে প্লাস্টিসাইজারের পরিমাণ থাকে প্রায় ৫০% এর কাছাকাছি।আর প্লাস্টিসাইজারের হিসাবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় থ্যালেটস (Phthalates) যা অত্যন্ত ক্ষতিকর পূবেই উল্লেখ করেছি।

৪)বিসফেনল(BisPhenol-A):খেলনায় যে স্বচ্ছ ও শক্ত পলিকার্বোনেট প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয় তা তৈরিতে বিসফেলন প্রয়োজন হয়।এই বিসফেনল স্ত্রী সেক্স হরমোন ইস্ট্রোজেনের মত কাজ করে।আশা করি কোন বাবা-মা’ই চাইবেন না তার অপরিণত শিশুটি স্ত্রী সেক্স হরমোনের ক্ষতিকর প্রভাবে উন্মুক্ত হোক।দূর্ভাগ্যজনকভাবে বাস্তবতা হলো নব্বইয়ের দশকে যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্টে বিসফেনল উৎপাদিত হতো বছরে ১৬মিলিয়ন পাউন্ড সেখানে তা বৃদ্ধি পেয়ে ২০০৭ সালে উৎপাদিত হয়েছে ২.৩বিলিয়ন পাউন্ড!

৫)সুগন্ধি(Fragrance):খেলনা তৈরির মূল উপাদানের গন্ধ ঢাকতে ও খেলনাকে শিশুর কাছে আরও আকর্ষণীয় করতে নানাবিধ সুগন্ধি ব্যবহার করা হয় যার বেশিরভাগই ক্ষতিকর ও নিষিদ্ধ ঘোষিত।ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০শে জুলাই,২০১১ থেকে তার সদস্য দেশগুলোতে বাধ্যতামূলকভাবে ৫৫টি সুগন্ধি ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে এবং ১১টি সুগন্ধির ব্যবহার একটি নির্দিষ্ট মাত্রার অতিরিক্ত ব্যবহারেও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে(2009/48/EC)।

৬)রঙ(Dye):খেলনা প্লাস্টিকের হোক কিংবা মাটি, কাঠ বা কাপড়-সূতার হোক সেটাকে আকর্ষণীয় করতে রঙের ব্যবহার অবিসংবাদিত।কিন্তু এসব কৃত্রিম রঙ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ক্ষতিকর।এসব রঙে বহুল ব্যবহৃত হয় অ্যাজো (Azo) ডাই, অ্যানিলিন ডাইসহ নানাবিধ বিষাক্ত ধাতু।এসব রঙ ত্বকে অ্যালার্জি, শ্বাসতন্ত্রের অ্যালার্জিজনিত অসুখ (যেমন নাক দিয়ে পানি পড়া,সর্দি-কাশি ইত্যাদি),ভবিষ্যতে সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস এমনকি ক্যান্সারও করতে পারে।সবচেয়ে ক্ষতিকর হিসাবে হলুদ রঙকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।উন্নত বিশ্বে খেলনায় এসব রঙের ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত হলেও আমাদের দেশে এ বিষয়ে সচেতনতা ও নিয়ন্ত্রণ কোনটাই নেই।উল্লেখ্য ESDO’র প্রতিবেদনেও দেখা গেছে মাটির তৈরি হলুদ রঙের খেলনা কাপ বা বাটিতে পাওয়া গেছে বিষাক্ত সীসা ৮৩০৫.৮ পিপিএম (ইউরোপীয় গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে ৬১৫ গুণ বেশি),বিষাক্ত ক্যাডমিয়াম ৪৯০.৫ পিপিএম (ইউরোপীয় গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে ২৫৮ গুণ বেশি) এবং ক্রোমিয়াম ২৫০২.২ পিপিএম (ইউরোপীয় গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে ৬৬ গুণ বেশি)।




বাচ্চারা প্রায়শই খেলনা মুখে দেয় এবং ক্ষেত্রবিশেষে চিবিয়েও থাকে।ফলে খেলনায় থাকা বিভিন্ন বিষাক্ত ধাতু ও অন্যন্য উপাদান সহজেই বাচ্চার শরীরে প্রবেশ করে নানাবিধ স্বল্প মেয়াদী ও দীর্ঘ মেয়াদী অসুখ বা উপসর্গ তৈরি করতে পারে।এসব বিষাক্ত উপাদান শিশুর শরীরে কী কী ক্ষতি করতে পারে তা এক নজরে দেখে নিই-



থ্যালেটস(Phthalates):শিশুদের উপর থ্যালেটসের সম্ভাব্য ক্ষতিগুলো হলো-

ক)শিশুদের হাঁপানিসহ শ্বাসতন্ত্রের অনেক অসুখ-বিসুখ বিশেষত অ্যালার্জিজনিত সর্দি-কাশির জন্য থ্যালেটসকে দায়ী করা হচ্ছে।

খ)কয়েক ধরনের থ্যালেটস (সবচেয়ে ক্ষতিকর থ্যালেটস হলো DEHP) মানবদেহে হরমোনের কার্যকারিতায় বাঁধা প্রদান করে (Endocrine Disrupting Contaminants) যার ফলে দৈহিক গঠন ও প্রজননতন্ত্রের কার্যকারিতা ক্ষতির সম্মুখীন হয় এবং পরবর্তীতে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়ে

গ)মেয়ে শিশুরা দ্রুত সাবালিকা হতে পারে।পোর্তোরিকোর এক স্টাডিতে দেখা গেছে যেসব মেয়ে শিশু অকালপক্কতা অর্জন করেছে (premature sexual development) তাদের দুই তৃতীয়াংশেরই রক্তে থ্যালেটসের পরিমাণ বেশি ছিলো।তাছাড়া সময়ের আগেই যাদের স্তনের গঠন পরিবর্তন হতে শুরু করেছে তাদের রক্তে থ্যালেটসের মাত্রা ছিলো কন্ট্রোল গ্রুপের (যাদের স্তন অসময়ে পুষ্ট হওয়া শুরু করেনি) তুলনায় ৭গুণ বেশি।

ঘ)রক্তে থ্যালেটস (DEHP) এর মাত্রা বেশির সাথে রক্তে থাইরয়েড হরমোনের নিম্নমাত্রার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।অথচ পর্যাপ্ত পরিমাণ থাইরয়েড হরমোন ছাড়া শিশুর দৈহিক ও ব্রেনের স্বাভাবিক বিকাশ অসম্ভব।



বিসফেনল(BisPhenol-A):বিসফেনল স্ত্রী সেক্স হরমোন ইস্ট্রোজেনের মত কাজ করে।অর্থাৎ শিশুদের এসব প্লাস্টিকের তৈরি খেলনা দেওয়া মানে প্রকারন্তারে তাদেরকে স্ত্রী সেক্স হরমোন সেবন করতে দেওয়া যা তাদের দৈহিক বৃদ্ধি ও প্রজননতন্ত্রের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।

লেড বা সীসা:সীসা মূলত স্নায়ুতন্ত্রের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে থাকে।সীসার বিষক্রিয়ায় শিশুদের যেসব সমস্যা হতে পারে তা হলো-

১)স্থায়ীভাবে ব্রেন তথা স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি হতে পারে।

২)আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়।

৩)শেখার ক্ষেত্রে ধীরগতি ও সমস্যা দেখা দেয়।

৪)আইকিউ কম হয়।

৫)কানে শোনার সমস্যা হতে পারে।

৬)দেহের বৃদ্ধি বাঁধাগ্রস্থ হয়।

ক্যাডমিয়াম:ক্যাডমিয়ামযুক্ত খেলনা মুখে দেওয়ার কারণে এ বিষাক্ত ধাতুটি শিশুর দেহে প্রবেশ করে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা তৈরি করতে পারে-

১)তাৎক্ষণিক সমস্যা-পেট ব্যাথা,পেটে অস্থির লাগা,বমি হওয়া ইত্যাদি।

২)দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা- কিডনিতে পাথর হওয়া ও কিডনি নষ্ট হওয়া।মনে রাখা দরকার ক্যাডমিয়াম শরীরে প্রবেশ করার পর তা অনেকদিন পর্যন্ত দেহের অভ্যন্তরে থেকে যায় এবং এ ধরনের সর্বনাশ ধীরে ধীরে করতে থাকে।

ব্রোমিন:ব্রোমিনযুক্ত খেলনা মুখে দেওয়ার কারণে পেট ব্যাথা,বমি হওয়া,অস্থির লাগারি কারণে কান্নাকাটি করা,রক্তচাপ কমে যাওয়া এমনকি দীর্ঘমেয়াদে কিডনি নষ্ট হওয়া ও ব্রেনের নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ক্রোমিয়াম:ক্রোমিয়ামের ক্ষতিকর প্রভাব ব্যাপক-

১)ক্রোমিয়ামযুক্ত খেলনা নিয়ে খেলার কারণে শিশুর চামড়ায় চুলকানি ও অ্যালার্জি হতে পারে।

২)পেট ব্যাথা,বমি ও পেটে অস্থির লাগতে পারে।

৩)কিডনি ও লিভার নষ্ট হতে পারে।

৪)দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে।

সুগন্ধি(Fragrance):খেলনাতে দেহের জন্য ক্ষতিকর ও নিষিদ্ধ ঘোষিত অনেক ধরনের সুগন্ধি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।এসব ক্ষতিকর সুগন্ধির কারণে বাচ্চাদের অ্যালার্জি ও শ্বাসতন্ত্রের নানাবিধ অসুখ-বিসুখ বিশেষত সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

রঙ(Dye):খেলনাকে আকর্ষণীয় করতে ব্যবহৃত রঙে অ্যাজো (Azo) ডাই, অ্যানিলিন ডাইসহ নানাবিধ বিষাক্ত ধাতু থাকে।ফলে এসব রঙের উপাদান ত্বকে অ্যালার্জি, শ্বাসতন্ত্রের অ্যালার্জিজনিত অসুখ (যেমন নাক দিয়ে পানি পড়া,সর্দি-কাশি ইত্যাদি), ভবিষ্যতে সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস এমনকি ক্যান্সারও করতে পারে।




আমাদের বাজারে পাওয়া শিশুদের খেলনার বেশিরভাগই প্লাস্টিকের তৈরি হলেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাটির তৈরি খেলনাও পাওয়া যায়।অনেকের ধারণা মাটি প্রাকৃতিক উপাদান হওয়ায় এটি শিশুস্বাস্থ্য বান্ধব হতে পারে।কিন্তু বাস্তবতা ভয়ংকরভাবে ভিন্ন।আমরা আমাদের অসচেতন আচরণে ব্যবহারের পর সবকিছুই ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দিই যা পরবর্তীতে মাটিতে গিয়ে মিশে।ফেলে দেওয়া ব্যাটারির ক্যাডমিয়াম, ট্যানারি বর্জ্যের ক্রোমিয়াম, থার্মোমিটারের পারদ সবকিছুই মাটিতে গিয়ে মিশে।পরবর্তীতে এই দুষিত মাটিই খেলনা তৈরিতে ব্যবহৃত হয় এবং স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।তাছাড়া মাটির খেলনা রঙ্গীন করার জন্য যেসব রঙ ব্যবহার করা হয় তাতেও রয়েছে নানা বিষাক্ত উপাদান।ESDO’র সংগৃহীত খেলনার একটি ছিলো মাটির তৈরি হলুদ রঙের কাপ বা বাটি যার মধ্যে পাওয়া গেছে বিষাক্ত সীসা ৮৩০৫.৮ পিপিএম (ইউরোপীয় গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে ৬১৫ গুণ বেশি),বিষাক্ত ক্যাডমিয়াম ৪৯০.৫ পিপিএম (ইউরোপীয় গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে ২৫৮ গুণ বেশি) এবং ক্রোমিয়াম ২৫০২.২ পিপিএম (ইউরোপীয় গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে ৬৬ গুণ বেশি)।সুতরাং মান পরীক্ষা ছাড়া মাটির তৈরি খেলনাও শিশুদের জন্য নিরাপদ নয়।






বাংলাদেশে যত খেলনা পাওয়া যায় পাওয়া যায় তার মাত্র ১৯.৭% স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয় আর বাকিটা আসে বিদেশ থেকে।এর মধ্যে চায়না থেকে আসে ৭০.৩%, থাইল্যান্ড থেকে ৪.৩%, ভারত থেকে ২.৮%, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ১%, জাপান থেকে ০.৯%, ব্রাজিল থেকে ০.৬% এবং অন্যন্য দেশ থেকে ০.৪%।আমাদের অসচেতন ব্যবসায়ীরা বিদেশ থেকে যেসব খেলনা আমদানি করেন তার সিংহভাগেও গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে অনেকগুণ বেশি বিষাক্ত উপাদান পাওয়া গেছে।সুতরাং বিদেশি খেলনা নিরাপদ এটা আর এখন বলা সম্ভব নয়।নিচে দেখুন ঢাকার বাজার থেকে সংগৃহিত বিদেশি পিস্তল ও গাড়িতে পাওয়া বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদানের মাত্রা-








জাতিসংঘসহ বিশ্বের নানা উন্নত দেশে নিরাপদ খেলনা ঘোষণার জন্য কতগুলো আদর্শ মান নির্ণয়ক বৈশিষ্ট্য আছে।কোন খেলনা এসব বৈশিষ্ট্য পূরণ করতে পারলে সেটাকে নিরাপদ খেলনা হিসাবে গণ্য করা হয়।বিশ্বব্যাপী ক্রেতাদের নিশ্চয়তা প্রদানের লক্ষ্যে অনেক উন্নতমানের খেলনা তৈরিকারী প্রতিষ্ঠান এসব মানদন্ড মেনে খেলনা তৈরি করেন এবং খেলনার গায়ে তা উল্লেখ করেন।এরূপ কিছু আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নিরাপদ খেলনার সার্টিফিকেট প্রদানকারী সংস্থার কোড নেম নিচে উল্লেখ করা হলো-






অভিভাবক হিসাবে আমরা সচেতন না হলে এ ধরনের সমস্যা থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব নয়।খেলনা উৎপাদনকারী ও খেলনা ব্যবসায়ীদেরকেও ভাবতে হবে যে আপনার সন্তানও কিন্তু এসব খেলনা নিয়ে খেলে থাকে।এক্ষেত্রে আমাদের কয়েকটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে-

১)খেলনা কেনার সময় এগুলো “নন-টক্সিক” বা আন্তর্জাতিক কোন মান পরীক্ষায় পাশকৃত কিনা তা নিশ্চিত হওয়া দরকার।

২)প্রাকৃতিক উপাদানের তৈরি কৃত্রিম রঙবিহীন খেলনাকে কেনার সময় বিবেচনা করা দরকার।

৩)যেহেতু আমাদের দেশে আইন ও মান নিয়ন্ত্রণের অভাব রয়েছে এবং মান সম্মত বিদেশি খেলনার নকল খেলনায় বাজার সয়লাব সেহেতু সকল ধরনের প্লাস্টিকের খেলনা কেনা থেকে বিরত থাকা উচিৎ।

৪)খেলনার পরিবর্তে নিজেরাই শিশুর জন্য আনন্দের খোরাক হওয়ার জন্য শিশুতোষ বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করুন।

৫)সম্ভব হলে সূতি কাপড় ও অন্যন্য প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে খেলনা তৈরি করে শিশুকে দিন।

৬)খেলার সময় শিশু যাতে খেলনা মুখে না দেয় সে বিষয়ে যথাসম্ভব সতর্কতা অবলম্বন করুন।

৭)এ বিষয়ে গণসচেতনতা তৈরিতে নিজে এ বিষয়ে জানুন ও অন্যদেরকে সচেতন করে তুলুন।

৮)এ বিষয়ে মিডিয়া, প্যারেন্টিং নিয়ে কাজ করেন এমন গ্রুপ এবং শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করেন এমন প্রতিষ্ঠানগুলো প্রচার প্রচারণা চালাতে পারেন।







থ্যালেটস, বিসফেনল ও অন্যন্য প্লাস্টিসাইজার এবং ভারি ধাতুর (Heavy metals) আমাদের দেহের উপর ক্ষতিকর প্রভাব এখন প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা।এসব উপাদান প্রাপ্তবয়স্কদের দেহেই ক্ষতি করতে ছাড়ে না।সেখানে শিশুদের ছোট্ট কোমল দেহে এসব উপাদানের ক্ষতিকর প্রভাব সহজেই অনুমেয়।তাছাড়া শিশুদের বেড়ে উঠার বয়সে এসব উপাদানের ক্ষতিকর প্রভাবও সুদূরপ্রসারী।বারডেমের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় ২০১০-২০১৬ এই ৭বছরে বাংলাদেশে শিশুদের টাইপ-২ ডায়াবেটিস (ইনসুলিন নির্ভরশীল নয় এমন ডায়াবেটিস) বেড়েছে ৭গুণ।বেড়েছে শিশুদের মধ্যে চঞ্চলতা।সর্দি-কাশি ঘন ঘন হওয়া শিশুদের এখন সাধারণ সমস্যা।আয়োডিনযুক্ত লবণ খাওয়ানোর পরও থাইরয়েড হরমোনের সমস্যা বেড়েই চলেছে।সন্তান উৎপাদনের স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া আজ অনেকক্ষেত্রে সমস্যগ্রস্থ।আর এসকল বিষয়ের সাথে উপরোক্ত ক্ষতিকর উপাদানসমংহের সংলিষ্টতা রয়েছে।বিশ্বের বিভিন্ন দেশ শিশুদের খেলনায় এসব ক্ষতিকর উপাদানের ব্যবহার নিষিদ্ধের নানা ধরনের পদক্ষেপ নিলেও আমাদের দেশে এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপের কথা শোনা যায়নি।এমনকি মিডিয়াতেও এসব বিষয়ে তেমন কোন আলোচনা দেখা যায় না।অথচ আমাদের দেশে ক্ষতিকর উপাদান মিশ্রিত খেলনায় বাজার সয়লাব।

আমি দৃঢ়ভাবে বাংলাদেশ সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছি কোমলমতি শিশুদের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অনতিবিলম্বে “নিরাপদ খেলনা আইন” প্রণয়ন করুন ও তা কঠোরভাবে প্রয়োগ করুন।

ধন্যবাদ যারা কষ্ট করে এ নোটটি পড়লেন।

সূত্র:
* Environment and Social Development Organization(ESDO)
* CEHN.ORG
* Kemikalieinspektionen
* Environment & Health Inc.
* Study Report on "Toxic Toys"-ESDO

ছবি:সকল ছবি ইন্টারনেট থেকে নেওয়া হয়েছে।এ আর্টিকেলটি কেবলই তথ্যমূলক;এর কোন বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য নেই।তারপরেও কপিরাইট ভায়োলেশনের কারণে কারো আপত্তি থাকলে তা জানা মাত্র সে ছবি বা ছবিসমূহ এই আর্টিকেল থেকে অপসারণ করা হবে।(All the images in this article are collected from different web sites & have been used for non-commercial purposes.If anyone has any objection of using these images,I’m assuring their removal upon getting valid complaint)।


সর্বশেষ এডিট : ২১ শে মে, ২০২০ বিকাল ৫:১৩
১২টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শুভ সকাল

লিখেছেন জুন, ২৯ শে নভেম্বর, ২০২০ সকাল ৯:৩৪


আমার ছোট বাগানের কসমসিয় শুভেচ্ছা।

আজ পেপার পড়তে গিয়ে নিউজটায় চোখ আটকে গেল। চীন বলেছে করোনা ভাইরাস এর উৎপত্তি ভারত আর বাংলাদেশে, তাদের উহানে নয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ মায়াময় ভুবন

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২৯ শে নভেম্বর, ২০২০ সকাল ১১:২৯

এ পৃথিবীটা বড় মায়াময়!
উদাসী মায়ায় বাঁধা মানুষ তন্ময়,
অভিনিবিষ্ট হয়ে তাকায় প্রকৃতির পানে,
মায়ার ইন্দ্রজাল দেখে ছড়ানো সবখানে।

বটবৃক্ষের ছায়ায়, প্রজাপতির ডানায়,
পাখির কাকলিতে, মেঘের আনাগোনায়,
সবখানে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভাস্কর্য বা মূর্তি যাই বলা হোক, রাখা যাবে না।

লিখেছেন এ আর ১৫, ২৯ শে নভেম্বর, ২০২০ সকাল ১১:৫০


ভাস্কর্য বা মূর্তি যাই বলা হোক, রাখা যাবে না।

কেন?
কারন আল্লাহ মুসলমানদের জন্য মূর্তি পূজা নিষিদ্ধ করেছেন। ভাস্কর্য বানালে এক সময় এগুলা মূর্তি হয়ে বিবর্তনের মাধ্যমে প্রতিমায় পরিনত হবে। মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

উহানের দোষ এখন বাংলাদেশ বা ভারতের ওপর চাপানোর চেষ্টা হচ্ছে

লিখেছেন শাহ আজিজ, ২৯ শে নভেম্বর, ২০২০ দুপুর ১২:১৯



আমরা বাংলাদেশীরা বাদুড়ের জিন থেকে আসিনি ভাই । না বাদুড় খাই, না খাই প্যাঙ্গোলিন বা বন রুই । আমাদের কোন জীবাণু গবেষণাগার নেই , নেই জীবাণু অস্ত্রের গোপন... ...বাকিটুকু পড়ুন

"দি সান", একটা বৃটিশ টেব্লয়েড, এদের কথায় নাচবেন না

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২৯ শে নভেম্বর, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:৩৭



বাংলাদেশে টেব্লয়েড পত্রিকা আছে, নাকি বাংলাদেশের সব পত্রিকাই টেব্লয়েড? টেব্লয়েড পত্রিকাগুলো ইউরোপ, আমেরিকায় স্বীকৃত মিডিয়ার অংশ, এরা আজগুবি খবর টবর দেয়; কিংবা খবরকে আজগুবি চরিত্র দিয়ে প্রকাশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×