নারায়নগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে সর্বপ্রথম মেয়র হওয়ার গৌরব অর্জন করলেন ডঃ সেলিনা হায়াত আইভি। অভিনন্দন তাকে। পাশাপাশি ভরাডুবি হয়েছে শামীম ওসমানের। আশাআকরি তার বোধোদয় হবে যে পেশীশক্তিই বড় কথা নয়। এই নির্বাচন নিয়ে নারায়নগঞ্জবাসী যেমন সন্তুষ্ট তেমনি সন্তোষ প্রকাশ করেছে সমগ্র দেশবাসী। কিন্তু এই নির্বাচনের পিছনেই যে আওয়ামীলীগ সরকারের কতবড় একটি রাজনৈতিক কৌশল বাস্তবায়িত হয়ে গেল তা মনে হয় অনেকেই টের পেল না। আমি কোনো রাজনৈতিক ব্যাক্তি না এবং বিশ্লেষকও না, তবে আমি আমার কিছু ধারনার কথা জানাচ্ছি।
অনেকেই মনে করছেন এই নির্বাচনে শামীম ওসমানের পরাজয়ের সাথে সাথে ভরাডুবি হয়েছে আওয়ামীলীগেরও। বিএনপিও হয়ত টাঈ মোনে করছে। কিন্তু কৌশল্গত ভাবে সবচেয়ে বড় জয় কিন্তু পেল আওয়ামীলীগই। আমি একটু ব্যাখ্যা করছি ব্যাপারটা।
এই নির্বাচনে তিনজন প্রার্থী ছিলেন প্রথম থেকে। বিএনপির তৈমুর, আইভি ও শামীম। তৈমুর বলতে গেলে প্রথম থেকেই ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা ছিলেন। মূল প্রতিযোগী ছিলেন আইভি আর শামীম। আইভি জনগনের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়। আমি এই নির্বাচনের আগেও শুনেছি আইভি বলতে নারায়নগঞ্জের সাধারন মানুষ পাগল। বিশেষ করে মহিলারা তার অসম্ভব ভক্ত। তিনি নাকি ব্যাক্তিগত ভাবে সাধারন মানুষের সাথে যোগাযোগ রাখেন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোজ খবর নেন, রান্নাঘরে ঢুকে খ্যে আসেন, এমন আর কি। এই না হলে নেত্রী। এখন কথা হলো আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা কি এসব জানতেন না? অবশ্যই জানতেন। তাহলে আইভির নিশ্চিত জয় জেনেও তারা কেন গডফাদার শামীমকে সমর্থন দিলেন। আসল খেলাটা এইখানেই।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক সময়ে বড় একটি ঘটনা হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল ঘোষনা। এই একটি ইস্যুকেই এখন প্রধান বিরোধী দল সবচেয়ে বড় করে দেখছে। বিরোধী দলের অভিযোগ দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন কখনো নিরপেক্ষ হবে না। বিরোধী দলের এই অভিযোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এই নারায়নগঞ্জ নির্বাচনকে একটি প্লাটফর্ম হিসেবে গ্রহন করে সরকার। আইভি জনপ্রিয় এইটা আওয়ামীলীগ জানতো। তারপরও তারা শামীমকে সমর্থন দেয় এটা জেনেও যে তার ভরাডুবি হবে। সরকার সমর্থিত প্রার্থী হারলে স্বাভাবিক ভাবেই সবাই ধরে নেয় যে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। আওয়ামীলীগও এই এই পন্থাই অবলম্বন করেছে। তাদের প্রমান করার দরকার ছিল যে দলীয় সরকারের অধীনেও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়। আবার তাদের সমর্থিত প্রার্থী হেরে যাওয়ায়ও তাদের কোনো ক্ষতিই হয়নি কারন আইভিতো আওয়ামীলীগেরই মদদপুষ্ট। একঢিলে দুই পাখি।
আরেকটি কৌশল হল সেনাবাহিনী মোতায়েন না করা। নির্বাচন কমিশন চিঠি পাঠানো সত্ত্বেও সরকারের তরফ থেকে এ ব্যাপারে কোনো সাড়াই দেওয়া হয়নি। সেনা মোতায়েন শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। এই সিদ্ধান্তের সাথে সাথেই নাকি শামীম তার এলাকায় মিষ্টি বিতরন করেছিলেন। সবাই ধরেই নিয়েছিল আওয়ামীলীগ তার সমর্থিত প্রার্থী গডফাদার শামীমকে সুযোগ দিতেই সেনা মোতায়েন করেনি। সবাই ভেবেছিল নির্বাচন সুষ্ঠু হবেনা এবং কারচুপির মাধ্যমে শামীম জিতে যাবেন। কিন্তু সরকারের মনে ছিল অন্য ভাবনা। তাদের মোটেও শামীমকে জেতানোর চিন্তা ছিল না। তাদের শুধু প্রমান করার দরকার ছিল নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। এর ফলে আওয়ামীলীগ সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পক্ষে পেয়ে গেল শক্ত এক সাফাই। এ দিকে আমার আশঙ্কা আওয়ামীলীগ এটাও প্রমান করতে চাইছে যে নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের কোনো দরকার নেই।
এই ফাদে সব থেকে বোকার মতো পা দিয়েছে বিএনপি। তারা নির্বাচন সফল হবেনা এই ভাবে শেষ মুহুর্তে ইস্তফা দেয়। তারা মনে করেছিল নির্বাচনে কারচুপি হবে এবং তারা বড় একটি ইস্যু পাবে। কিন্তু তাদের সেই আশায় গুড়ে বালি হলো। এখন তাদের আমও গেল ছালাও গেল। তারা কোনো ইস্যুই এখন তুলতে পারবেন না। তার থেকে নির্বাচনে অংশ নিলে হয়তো তারা কারচুপির অভিযোগ তোলার একটা সুযোগ পেতেন।
এই নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে যেমন তেমন আওয়ামীলীগের একটি পরিকল্পনাও সফল হয়েছে। বিএনপির সামনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনার সব দরজা একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমি নিশ্চিত যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গে এর পর বিরোধী দলের সব প্রশ্নের জবাবে আওয়ামীলীগ এই নির্বাচনের উদাহরনই দিবে।
এখন কথা হলো- নারায়নগঞ্জ নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে সেনাবাহিনী ছাড়া সুষ্ঠু হ্যেছে এটা খুবই ভালো কথা। আর এখানে আওয়ামীলীগের হারানোরও কিছু নেই। কারন শেষ মেশ প্রার্থী তাদেরই। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচন আর জাতীয় নির্বাচন আলাদা কথা। সেই জাতীয় নির্বাচন কি দলীয় সরকারের অধীনে এবং সেনা বাহিনী ছাড়া ( আশঙ্কা করছি) সুষ্ঠু হবে?
থাক সেই বিতর্কে নাই বা গেলাম।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে অক্টোবর, ২০১১ সন্ধ্যা ৬:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



