প্রথমাংশ এখানেঃ Click This Link
১৫
পরদিন ফয়েজ চেয়ারম্যানকে ঘাটের সমস্যার কথা জিজ্ঞেস করল এরফান।
তিনি বললেন, গ্রামের লোকদেরকে ৩ টা ভাগে ভাগ করব। একেক অংশ একেক রকমের কাজ করবে, কেউ ধান, পাট বা অন্য সবজি করবে। কেউ তাঁত শিল্প। কেউ অন্য কিছু। সমিতির মত সেই ৩ অংশের আউটপুট কেন্দ্রীয়ভাবে সংগ্রহ করা হবে। সেখান থেকে আমরা পার্টি ধরে বড় চুক্তি করে বিক্রি করলে মুনাফা বেশি আসবে। কৃষকদের যার যার অংশ অনুযায়ী তাক বণ্টন করে দেয়া হবে। এসবের জন্য টাকা দরকার। চাষ বা তাঁতের জন্য হাতে বানানো যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য পুঁজির খরচ সেখান থেকে দিব। বল, একটা গুণ্ডার দলকে টাকা দেয়ার চেয়ে গ্রামের মানুষের উন্নয়নে টাকাটা খরচ করাই কি সঙ্গত নয়?
তা তো অবশ্যই। কিন্তু আংকেল, আমাদের এখানে তো ট্রেন্ড-ই উল্টো। সরকার থেকে শুরু করে আমরা সাধারণ মানুষ প্রত্যেকে যেভাবে হোক নিজে পেতে চাই। সুন্দর সব যুক্তিকে অগ্রাহ্য মনে হয় যার যার অবস্থান থেকে। আপনি যে এত বড় সংগঠিত একটি গ্রুপের সাথে ঝামেলায় জড়াচ্ছেন, ওরা কিছু করলে কী করবেন? গ্রামবাসীরা পারবে এর প্রতিবাদ করতে? বাংলাদেশে ইউপি চেয়ারম্যান হত্যার শত শত রেকর্ড আছে। এর কয়টার সুবিচার হয়েছে বলেন? আপনি আগে গ্রামের মানুষকে আপনার প্রজেক্ট সম্পর্কে বোঝান। তারা সাথে আসলে কামাল বাহিনীর বেপরোয়া ভাব কমবে।
-ভাল বলেছ। আমি কাউকে জানাতে চাচ্ছিলাম না, কারণ এরপর শত রকমের শলা-মতভেদ দেখা দিবে। শুরুই করা ঝামেলা হত। যাহোক, দেখি। তোমার কাজের কতটুকু হল।
প্রায় শেষ। নিজের ঘরের দিকে যেতে শুরু করল এরফান।
১৬
৩ দিন পর পূর্ণিমা। রাতের আকাশ এখন আলোকিত করে রাখে ভুমিকে। আলোকিত বিশাল ভু-প্রান্তরের নগণ্য একটি অংশে বসে আছে এরফান ও প্রান্তিক। এভাবে প্রতিদিনই কিছুক্ষণের জন্য হলে বসে প্রতিদিন। এই কয়েক দিনে তারা আরও একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে গেছে। এই ঘনিষ্ঠতা হৃদয়ের, যার মধ্যে নীরবতা বিদ্যামান।
আর পাঁচদিন লাগবে আমার। সপ্তাহের শেষে চলে যাব। এরফান বলল। নীরবতা ভাঙ্গতে এরফান এই কথা বলেছিল, কিন্তু তা যেন আরও গাঢ় হয়ে গেছে।
ছাত্রলীগ-ছাত্রশিবিরের রক্তারক্তি ক দিন পরে হলেই হত। আমি আমার মতই থাকতাম - নির্বিকার প্রান্তিকের স্বগতোক্তি।
১৭
আজ পূর্ণিমা। চেয়ারম্যান বাড়ির বাইরে এলে দিগন্তের শেষ পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা যায়। এরফান সন্ধার পর বের হয় নি। পূর্ণিমা দেখে সে মধ্য রাতে। এখন কেবল সন্ধ্যা।
বসে বসে সে অনেক কিছু মেলাল, কী কী সব কাগজপত্র দেখল। ঘন্টাখানেক এসব করে পুরোপুরিভাবে সব ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলল। তার কাজ শেষ। আর দুই দিন থাকবে সে, তাও প্রান্তিকের জন্য। আবার কবে তার সাথে দেখা হয় কে জানে!
চেয়ারে হেলান দিয়ে পা টেবিলের উপর তুলে চোখ বন্ধ করে রইল এরফান। তার সামনে ডায়েরি। সে কি ক্লান্ত?
ঠিক তখনই নিঃশব্দে প্রথমবারের মত প্রান্তিক এরফানের ঘরে ঢুকল। রুমে সিগারেটের গন্ধ। সব যথেষ্ট গোছানো। কিন্তু এরফানকে এত বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে কেন?
খুবই ধীরে ধীরে প্রান্তিক এরফানের সামনের ডায়েরিটা হাতে নিয়েছে। হাতে নেয়া মাত্রই এরফান চোখ খুলে ফেলল। রুমে প্রান্তিককে দেখে সে অবাক হয়ে গেছে। তারপরও বলল, এই ডায়েরি পরা যাবে না।
হাসতে হাসতে প্রান্তিক বলল, না না পড়ব।
-না, দাও দাও।
-না দেখব আমি।
এরফান চেয়ার থেকে উঠে ডায়েরির জন্য প্রান্তিকের দিকে এগোল। অনেকটা দৌড়ে প্রান্তিক রুমের অন্য পাশে চলে গেল। এরফান একটু গিয়ে পেছন থেকে তাকে ধরে ফেলল। তখনও সে ডায়েরি দিবে না। এরফানকেও তা নিতেই হবে। পেছন থেকে ধরেই রইল এরফান। প্রান্তিক বুঝতে পেরে ধীর লয়ে একবার এদিক যাচ্ছে। অন্যবার ওদিক।
পূর্ণিমার আলোতে সারা ঘর ভরে গিয়েছে। বাইরে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক সঙ্গীতের ঝংকারের মত বাজছে যেন।
তারপর।
শব্দশূন্য একটি কক্ষে দুজন মাত্র মানুষ - এরফান ও প্রান্তিক।
১৮
পূর্ণিমার আলো রাত বাড়ার সাথে সাথে বাড়ছে। সে আলোয় রাস্তায় হাঁটা পথিকের ছায়া স্পষ্ট প্রতিফলিত হয়। ফুলেশ্বর গ্রামের মাটির রাস্তায় এক তরুণের অস্থির ছায়া সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আর কিচ্ছুক্ষণের মধ্যেই যা গ্রাম পেরিয়ে নয়নহাট বাজারের দিকে এগিয়ে যাবে।
সেদিন মধ্যরাতে কাউকে কিছু না জানিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেছে এরফান।
১৯
ঘুম থেকে উঠে অবাক হয়ে গেল চেয়ারম্যান বাড়ির সবাই। এরফান নেই। নেই তো কোথাও নেই। রুমে তার সব জিনিসপত্র নিয়ে চলে গেছে।
কেউই কিছু বুঝতে পারছে না। এমন কি প্রান্তিকও না। তার মনে একটাই প্রশ্ন - এত দিনের সব কিছু কি তাহলে শুধু ধোঁকাবাজি ছিল? আসলেই কি এরফান কোন স্কিলড ফ্রড?
একসময় সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল। হল না শুধু প্রান্তিক। রুমের দরজা বন্ধ করে সে ইচ্ছেমত কাঁদল দু ঘণ্টা ধরে।
২০
মালিবাগ মোড় পেরিয়ে সিআইডি হেড কোয়াটারে কালো রঙ এর একটি করলা এক্স গাড়ি ঢুকছে। ৩১ তম বিসিএসে পাস করা এসপি সাইদুর রহমান এরফান গাড়ি থেকে নেমে অফিসে ঢুকল। তাকে ধর্মপুর উপজেলার এনজিওগুলোর উপর কাজ এসাইন করা হয়েছিল। এনজিওগুলো আসলে সেখানে কী করছে, সরকারের কাছে সাবমিট করা পেপারসগুলোর সত্যতা কতটুকু এসব দেখাই ছিল তার কাজ। অফিসে ঢুকেই সে গেল এডিশনাল এসপি রিফাত বিন কিবরিয়ার রুমে।
কিবরিয়া সাহেব তাকে দেখেই বললেন, আরে কেমন আছ? বস।
হাতের ফাইল এগিয়ে দিয়ে এরফান বলল, এই তো আছি স্যার। দা মিশন হ্যাজ বিন কমপ্লিটেড।
-কী বল! হাতে তো এখনও ৮ দিনের মত সময় আছে?
-হয়ে গেল।
-তারপর, এক্সপেরিয়েন্স কেমন?
-ভাল। কিন্তু আমার একটি প্রশ্ন স্যার - এই কাজে তো ৩০ দিন দরকার হয় না। আমাকে এত সময় কেন দেয়া হয়েছিল? তাছাড়া স্যার যা দেখে এসেছি সেগুলো সম্পর্কে তো ঢাকায় বসেই আমরা অনুমান করে নিতে পারি।
-এটা ছিল তোমার প্রথম এসাইনমেন্ট। বাসা থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে কাজ শেখানোই ছিল মূল উদ্দেশ্য। আর তুমি যে বললে ঢাকায় বসে অনুমানের কথা, এই অনুমান তো সাধারণ মানুষ করবে। আমরা গিয়ে, অবজার্ভ ও ইনকয়ারি করে তারপর ফ্যাক্ট পাব।
-বুঝতে পেরেছি স্যার।
-রেস্ট নাও দুই দিন। পরের কেইসটা জটিল, রাজনীতির বিষয় আছে।
-ঠিক আছে স্যার। একটা অনুরোধ...
-কী?
-দয়াগঞ্জ ঘাটের ইজারাটা সেখানকার চেয়ারম্যানকে দেয়ার ব্যবস্থা করা যায় না স্যার? এই লোক খুবই সৎ। এটা নিয়ে ঝামেলা চলছে, একদিন তো পুরো রক্তারক্তি হয়ে যায় অবস্থা। আমি ওসিকে ফোন করার পর সে এসে পরিস্থিতি ঠাণ্ডা করে। গ্রামের উন্নয়নে এই লিজ চেয়ারম্যানের পাওয়া দরকার।
-হুমম, ওসিকে যে তুমি আনিয়েছিলে তা কেউ জানত?
-না স্যার। আমি ইমপেরিয়ালের ছাত্র হিসেবেই ছিলাম।
-ঠিক আছে, ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
অফিস থেকে বের হয়ে দাঁড়িয়ে রইল এরফান। সে কোথায় যাবে এখন?
তা না জানলেও সে গাড়ি চালানো শুরু করেছে। এই গাড়ির গন্তব্য কোথায়? তার বাসস্থান উত্তরা অথবা তার জন্মস্থান পুরান ঢাকার সংকীর্ণ চিপাগলি? অথবা এরফানের সাবেক বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়? নাকি অন্য কোনখানে?
২১
ফয়েজ আহমেদ দুপুরে খেয়ে কিছুক্ষণ শুয়ে ছিলেন। তিনি তাঁর স্ত্রীকে প্রশ্ন করলেন, আচ্ছা এই ছেলে এমন করল কেন?
-জানি না। মাথা আউলা কিনা আল্লাহ জানে।
-না, এই মাথা আউলা না। কথাবার্তাতেই বোঝা যায়। বিদ্যা ও বুদ্ধি দুই-ই খুব শক্ত।
-এমন করল কেন তাহলে!
-ঐটাই তো বলি।
একটু পরই ফোন বেজে উঠল ফয়েজ আহমেদের। আননোন একটা নাম্বার, তাও টিএন্ডটির। রিসিভ করতেই ওসি সাহেব বললেন, চেয়ারম্যান সাহেব, ঘাটের ইজারা বাতিল করা হয়েছে। ইজারা আপনার নামে করে দেয়া হবে। উপরের নির্দেশ।
অবাক হয়ে ফয়েজ আহমেদ বললেন, উপরে এই ইস্যু গেল কীভাবে!
ওসি হাসতে হাসতে বললেন, আপনার বাড়িতে এত দিন যিনি ছিলেন তিনি সিআইডির এসপি। সব ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। মিষ্টি নিয়ে তাড়াতাড়ি অফিসে আসেন, দামি মিষ্টি লাগবে।
ফোন রেখে কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন ফয়েজ আহমেদ সাহেব।
২২
দুপুর বেলা একসময় বিকেলে গড়াল। নয়নহাট বাজারে মানুষের আনাগোনা খুবই বেশি। বাজার ছেড়ে ফুলেশ্বরের দিকে কালো রঙ এর একটি গাড়ি এগোতে লাগল। পেছনে বাচ্চারা দৌড়াচ্ছে।
ফয়েজ চেয়ারম্যান ঘর থেকে বের হচ্ছিলেন, তার সাথে আলি হোসেন। কাচারি ঘরের সামনে চেয়ারে প্রান্তিক বসে আছে।
হর্ন দিয়ে একটা গাড়ি বোধহয় থেমেছে বাড়ির সামনে। হর্নের শব্দ অপ্রত্যাশিত। মনোয়ারা বেগমও তাই বের হয়ে উঠোনে এলেন। ফয়েজ আহমেদ ধীর পায়ে সামনের দিকে এগোচ্ছেন। হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন তিনি – গেইট দিয়ে এরফান ঢুকছে ভেতরে।
সবাই এরফানের দিকে তাকিয়ে আছে।
এরফান হেসে বলল, কেমন আছেন সবাই?
পরিষ্কারভাবে প্রশ্নটি শুনতে পেলেও কেউ জবাব দিল না। সবাই হতবাক।
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল প্রান্তিক। উঠোনের অন্য প্রান্ত থেকেও তার চোখের পানি দেখা যাচ্ছে। সেই পানি ধীরে ধীরে জলস্রোতে পরিণত হচ্ছে।
এরফান চুপ করে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। মনোয়ারা বেগম দুজনের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলেন। এমন একটা ব্যাপার তিনি এত দিন আঁচই করতে পারলেন না?
হাত দিয়ে ফয়েজ আহমেদকে মেয়ের দিকে ইশারা করলেন তিনি। স্ত্রীর হাত ধরে অভয় দিলেন ফয়েজ আহমেদ - সমস্যা নেই, এই ছেলের উপর ভরসা করা যায়।
===0===
Sazib
30.04.2012
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মে, ২০১২ রাত ১০:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



