পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডটিতে দিনভর রিকশা-ভ্যানের বেল বাজে। বাজে এমনকি রাত-বিরাতেও। আশেপাশের ঐতিহ্যবাহী সব খাবারের দোকান, সংকীর্ণ চিপাগলিতে মানুষের ঝঞ্ঝাটপূর্ণ বাণিজ্য আর স্বেচ্ছাচারী নগরায়ন সমস্ত এলাকাকে ভয়াবহ করে ফেলেছে। তারপরও কেমন জানি একটা বনেদি ভাব।
আজ মাসের শেষ শুক্রবার। নাজিমউদ্দিন রোড পার হয়ে ছোট্ট জনি তার মায়ের হাত ধরে জেলখানা রোডের দিকে এগুচ্ছে। হাঁটতেই কষ্ট হয় – বারবার রিকশাগুলো বেপরোয়াভাবে গায়ে উঠে যেতে চায়। ক্রমাগত চেঁচিয়ে যাচ্ছে রিকশাওয়ালারা, এই বাঁয়ে চাপেন, বামে বামে...
আমরা যদি জনির গল্পটা আরও বছর দুই বা তিনেক আগে করতাম, তাহলে জনিকে এখন হাঁটতে হত না। রিকশাতে করেই সে তার মাসহ আসতে পারত।
ভুল বলেছি, এখানে কোন দিন আসতে হবে এ কথা তারা কেউ চিন্তাই করত না তখন।
২
আঁখি এখানে আসে নি গত ৬ মাস। এই সময়ে কর্তৃপক্ষ তাকে আসার সুযোগ দিয়েছিল ৬ বার। কীভাবে আসবে সে? বুক ফেঁটে চৌচির হয়ে যায় যেখানে আসলে, লজ্জায় যেখানে মাথা হেট হয়ে যায়, যেখানে আসার কথা মনে হলেই চিৎকার করে জগৎ জুড়ে কান্না করতে ইচ্ছে করে; এবং যেখানে তার আসার কথা সে বা আমরা যারা গল্পটা পড়ছি তারা কেউই কখনও কল্পনা করি না – সেখানে সে কীভাবে আসবে?
আজ যে সে যাচ্ছে, তাও তার ইচ্ছে নেই। কিন্তু জনি, শুধু জনির প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে, ছোট্ট একটা বাচ্চাকে একটু মানসিক প্রশান্তি দিতেই আঁখি আজ যাচ্ছে সেখানে।
আচ্ছা, মানসিক প্রশান্তি কি সেখান থেকে পাওয়া সম্ভব আসলে?
৩
-বাবা, তুমি বাসায় আস না কেন?
চুপ করে রইল সোহেল। অনেকক্ষণ পর কোনমতে বলল, আসব বাবা, তুমি বড় হও, আমি আসব।
-কেন? বাসায় শুধু এখন দুইটা রুম দেখে? তুমি আস, আমরা আবার আগের মত বড় বাসায় থাকব। জান বাবা, আমাদের নতুন বাসাটা একদম ছোট, খুব পচা। আমি, মা আর কুসুম থাকি। আম্মু অফিসে গেলে আমি সারা দিন কুসুমের সাথে থাকি। বের হতে পারি না। আম্মু নিষেধ করেছে। একদিন বের হয়েছি দেখে আম্মু থাপ্পড় দিয়েছে। তুমি একটু আম্মুকে বলবে আমাকে বাইরে খেলতে দিতে?
আবারও চুপ করে থাকল সোহেল। এত সুন্দর করে তার ছেলে কথা বলছে, অথচ জবাব দেয়ার মত মানসিক সামর্থ্য তার নেই। মনে হচ্ছে সেই অধিকারও নেই।
আঁখিই নিরবতা ভাঙল এবার, আশকোণায় ২ রুমের বাসায় উঠেছি। বাবা-মা, আত্নীয়স্বজনের কাছে এই মুখ নিয়ে যেতে চাই না। আর অফিসে এখন মাসে ১৪ হাজার টাকা দেয়। এই টাকায় ভাল কোথায় থাকব। টেনে-টুনে চালাই।
সোহেল আঁখির দিকে তাকিয়ে অবাক হল। এই প্রথম তাকে বোরখা পরিহিত অবস্থায় দেখছে সোহেল। এখন কি পরে নিয়মিত? একটা স্বাধীনচেতা, ব্যক্তিত্বসম্পূর্ণ মেয়ে, যাকে অনার্স শেষ করার আগেই পালিয়ে বিয়ে করেছিল সোহেল, সহপাঠী সেই বন্ধু-এখন স্ত্রী - আঁখির মত অসাধারণ একটা মেয়ে এখন বোরখা পরে বাইরে চলাফেরা করে। একটি ঘটনা জীবনচক্রকে কি দ্রুতগতিতেই না বদলে দিয়েছে!
সোহেল বলল, তুমি এত বছর কীভাবে একা থাকবে? তুমি বোধহয় অন্য কাউকে দেখতে পার। জনিও ছোট, সমস্যা হবে না। একটা খুনীর জন্য অপেক্ষার কোন মানে হয় না।
হঠাৎ করেই চিৎকার দিয়ে যেন এত দিনের পূঞ্জিভুত কষ্টগুলোকে ঝেড়ে ফেলতে চাইল আঁখি। বলল, ভগবান সাজছো? খুব বীরের মত কথা বলছ। তোমার কী মনে হয়, খুনীর বউকে বিয়ে করতে মানুষ বসে আছে?
৪
কষ্টে বুক ফেঁটে যাচ্ছে আঁখির। কেঁদে মনে হচ্ছে সে ঢাকা শহরে বন্যা নামিয়ে ফেলবে। সোহেলের সাথে এমন কেন করল সে? কেন এভাবে কথাটা বলল? যত কষ্টই হোক, কোন দিনই সে সোহেলকে ছাড়বে না – তার এই চিরায়ত সত্য কথাটা না বলে কেন এভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাল সে?
৫
বিকেল ৫ টা। কয়েদীদের সঙ্গে দেখার সময় শেষ। জনি আবার তার মাকে নিয়ে হাঁটছে। সে জানে না, বড় একটা ব্যবসায়িক ঝামেলার কারণে রাগের মাথায় তার বাবা ব্যবসায়ের এক অংশীদারকে মেরে ফেলে। খুনের মামলায় বাবার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। ২৪ বছরের মধ্যে মাত্র দেড় বছর শেষ হয়েছে।
সে এ্টাও জানে না যে তার বাবা যেদিন বের হবে, তার প্রতি সেদিন আজকের মত ভালবাসা বজায় থাকবে কিনা? - আমরা যারা বড়, যারা এই গল্প পড়ছি এখন, তারাই তো জানি না। জনি তো কেবল ৪ বছরের বাচ্চা, সে কীভাবে জানবে?
---0---
Sazib
11.05.2012

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



