কোন পাশেই না পেয়ে সে মাটিতে কোন ইট গেঁথে আছে কি না তা দেখতে লাগল। মোটামুটি আধ-ভাঙ্গা তিনটি ইট একটার উপর অন্যটি বসিয়ে দেয়ালের পিঠে পা দিয়ে তার ছাদে উঠে গেল সে।
তারপরই লম্বা লাফ। আর তাকে দেখা গেল না।
৯ টা ৩০ এ মসজিদের সামনে সবাইকে থাকতে বলা হয়েছিল। কে জানে বেজে গেছে কি না!
২
মসজিদের সামনে ৫ জন ছিল। খেলা শুরু হবে ১০ টা ৩০ এ। যেতে সময় লাগবে আধা ঘণ্টারও বেশি। কিন্তু সবাই এখনও আসেই নি। বৃন্তকে দেখেই একজন বলল, অধিনায়ক! এত পরে কেন?
বলিস না আর। বাবা বাসায়। চুরি করে বের হয়েছি। গা ঝাঁড়তে ঝাঁড়তে বলল বৃন্ত।
অস্থিরতার এই পর্যায়ে আরো ৩ জন এল। ৯ টা ৪০ বাজে। সিদ্ধান্ত হল আর ৫ মিনিট অপেক্ষা করা হবে। এরপরও ১১ জন না হলে অন্য কাউকে নিয়েই স্কোয়াড পূরণ করা হবে।
শেষ ৫ মিনিটেই আরও ৩ জন এল। সবারই প্রায় একই রকম অবস্থা – পড়া ফাঁকি দিয়ে, বাসায় না বলে অথবা নিষেধ স্বত্ত্বেও বেরিয়ে পড়েছে।
সবাই রওনা দিল। তারা সবাই হাই স্কুলে পড়ে – ক্লাস সেভেন থেকে টেনের ছাত্র। তাদের কাছে ৪ টা ব্যাট। তাদের মধ্যে ২ জন হাফ প্যান্ট পরা।
দলটির নাম ‘নবপাড়া ক্রিকেট ক্লাব’।
৩
ট্রাক চালকদের নির্মমতার কথা আমরা সবাই জানি। বিশালদেহী ট্রাকগুলো সম্পর্কে অজানা ভয় থেকেই হয়ত চালকদের প্রতিও আমরা অনর্থক ভীত হয়ে যাই। কিন্তু বাংলাদেশের খুব কম মানুষই জানে যে ট্রাকই একমাত্র বাহন যেটি কোন মানুষ হাত দেখালেই থামে। অবশ্যই তারা থামে এবং শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে, কোথায় যাবেন?
এই ব্যাপারটি সবাই না জানলেও জানে ‘নবপাড়া ক্রিকেট ক্লাব’।
হাতে টাকা থাকে না বলে সবসময়ই খেলার সময় তারা ট্রাকের পেছনে উঠে এই জায়গায়-ঐ জায়গায় যায়। এবং টাকা ছাড়াই যায়।
এর ব্যতিক্রম হল না আজও। ধর্মপুর বাজারে পৌছাতে তাদের ২৫ মিনিটের মত সময় লাগল। মাঠ তারা আগেই চিনত। নেমেই সবাই হাঁটতে শুরু করল।
৪
দল দেখে অবাক কমিটি। অবাক হয়ে গেল অপোনেন্ট টিমও। এরা যে সবাই রীতিমত বাচ্চা ছেলেপেলে!
টুর্নামেন্ট কমিটির একজন টস করতে যাওয়ার সময় বৃন্তকে বলল, তোমরা ‘নবপাড়া জুনিয়র ক্রিকেট ক্লাব’ নাম দিলে না কেন? আমরা তো ভেবেছিলাম সিনিয়ররা। তোমাদের সিনিয়ররা যেহেতু জেলা সেকেন্ড ডিভিশানের রানার আপ, তাই তোমাদের গ্রুপের দলগুলোও সেরকম প্রস্তুতি নিয়েছে। তোমাদের আজকের অপোনেন্টও জেলা দলের খেলোয়াড় হায়ার করেছে।
বৃন্ত বলল, সিনিয়র দল কি এত ভেতরের সাদামাটা একটা টুর্নামেন্টে আসবে?
কমিটির সদস্য রকিব বলল, আমরা তাই তোমাদের নাম দেখেই অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। জেলা পর্যায়ের আরও ৫ টি দল এসেছে শুধু তোমাদের নাম দেখে।
যাহোক, টস জিতে ব্যাটিং নিল বৃন্ত। নেমেই ত্রাহী অবস্থা। ২০ ওভারের খেলায় অলআউট হয়ে গেল তারা ৭৮ রানে।
বিপক্ষ দলকে কোন বেগই পেতে হল না। ৮ ওভার বাকি থাকতে, ৭ উইকেট হাতে রেখেই তারা জিতে গেল।
এমন পারফরম্যান্সের পরও নবপাড়ার কয়েকজন খেলোয়াড় খুশি হয়ে গেছে। জেলা পর্যায়ের খেলোয়াড়দের বিপক্ষে তারা খেলেছে, এবং তাদের উইকেটও ফেলতে ফেরেছে – এই যুক্তিতে তারা খুশিতে গদগদ করতে লাগল বরং!
৫
ম্যাচ শেষে সবাই যখন ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন মোর্শের চুপিচুপি বৃন্তকে একপাশে টেনে আনল। বলল, বন্ধু, ওরা যেহেতু আমাদের নবপাড়া মেইন দল ভেবেছিল তার মানে বাকি দুটি খেলাও কঠিন প্রতিপক্ষের সাথে হবে। আয় একটু কথা বলে দেখি।
তারা দুজন কমিটির সেই সদস্যকে ধরল – ভাইয়া, আমাদের গ্রুপ চেঞ্জ করে দিন না প্লিজ? সিনিয়র টিম ভেবে আপনারা নিশ্চয়ই পরের খেলা গুলোও কঠিন দলের সাথে ফেলেছেন।
কমিটির সদস্য রকিব বলল, আমরা তো ফিকচার করে ফেলছি। এখন তো সম্ভব না আর ভাইয়া।
কূটচালে মোর্শেদ অতি দক্ষ। সে বলল, কই আমরা তো ফিকচার পেয়েছিলাম পরশু। A গ্রুপের দলগুলো যদি পরশু ফিকচার পায়, তাহলে তো পরেরগুলো এখনও পায় নি!
রকিব একটু ক্ষেপে গেল। সে জবাব দিল, ফিকচার কাকে কখন দেই তা আমাদের ব্যাপার। খেলা শিডিউল অনুসারে হলেই তো তোমাদের হল।
গলার সুর মোলায়েম করে মোর্শের বলল, ভাই দরকার হলে কিছু টাকাও দিব!
বৃন্ত অবাক হয়ে মোর্শেদের দিকে তাকাল। আর মাথা নেড়ে হাসল রকিব, বলল ঠিক আছে, তবে এন্টি ফির সমান টাকা দিতে হবে – ৫০০।
মোর্শেদ বলল, এত! তাহলে তো নতুন দল নামালেই পারি।
রকিব বলল, দল নেয়া বন্ধ হয়ে গেছে ৪ দিন আগেই। টাকা দিতে না পারলে এই গ্রুপেই খেল!
মোর্শেদ বলল, ঠিক আছে। আগামী ম্যাচে পেয়ে যাবেন। আর আমাদের খবর দিবেন আগে।
মোর্শেদ ও বৃন্ত এগিয়ে তাদের দলের সাথে হাঁটতে শুরু করল। হঠাৎ মোর্শেদ বলে উঠল, শালা ৫০০ টাকা চায়! দাঁড়া টাউনে তোকে পেয়ে নেই, তারপর দেখাচ্ছি!
৬
না বলে অথবা পড়া ফাঁকি দিয়ে বের হওয়ার জন্য বাসায় যাওয়ার পর সবাইকে যথারীতি বকা খেতে হল। মফস্বলের বাবা-মাদের কাছে সন্তান পেটানো সহজ বলে দুই একজনকে চড়-থাপ্পড়ও খেতে হল। তবে কারোরই তেমন আঁতে ঘা লাগে নি। ওরা এতে অভ্যস্ত, পরবর্তী ম্যাচেও তারা আবার যাবে।
দলের সবাই ৫০০ টাকায় গ্রুপ পরিবর্তনের ব্যাপারটা জেনে ক্ষেপে গেল। আগের ৫০০ টাকা দিতেই তাদের প্রচণ্ড বেগ পেতে হয়েছিল। কোনমতে দুই বা তিনশ টাকা হয়ত চাঁদা তোলা যায়, এরপর আর জোগাড়ই হয় না। শেষমেশ তারা গ্রামে বেড়াতে আসা এক দুলাভাইকে ধরল। খেলার কথা বলে ওনার থেকে এন্ট্রি ফির টাকা নেয়া হয়।
মোর্শেদকে সবাই গালাগালি করতে লাগল। কিন্তু সে কখনো নিজের দোষ স্বীকার করে না স্বভাবের। বলল, তাহলে এসব আধ-বুড়োদের সাথে খেলতি? সেকেন্ড রাউন্ডেই তো যেতে পারব না এরকম হলে।
শামিম বল, এখন যে যেতে পারব তার নিশ্চয়তা কী?
উত্তর দিল না মোর্শেদ। এই বিষয়ে সে আগে ভাবে নি, ঝোঁকের মাথায় আসলে কাজটা করে ফেলেছে।
৭
পরের ম্যাচ পড়ল বিকেলে - বৃহস্পতিবার ৩ টা ৩০ মিনিটে। এই সময়ে অন্য সমস্যা। সবার প্রাইভেট বিকালে। দেখা যায় স্যারকে অন্য দিন আসতে বলে, অথবা ব্যাচে পড়লে সেদিন পড়ার নাম করে বের হয়ে খেলতে যেতে হয়।
সেদিনের প্রতিপক্ষ 'সূর্যমুখী তরুণ সংঘ'। এই দলের খেলোয়াড়রা নবপাড়ার চেয়ে একটু বয়সী। মূলত কলেজের ছেলেদের হলেও, বেশ কজন স্কুলের ছাত্রও আছে। তাদের দেখে আশ্বস্ত হল নবপাড়া এবং সাথে সাথেই মনে হল তাদের আজকে তারা জিততে পারে।
নবপাড়া আজও টসে জিতল এবং ব্যাটিং আগে নিল। পিচে শামীম ও রণির কড়া শাসনে, পাশাপাশি আরও কয়েকজনের ১৫-২০ রানে তারা ২০ ওভাবে ১৪৮ রান করে। জেতার জন্য মোটামুটি নিরাপদ স্কোর।
ব্যাটিং এর চেয়ে তারা ভাল বেশি বোলিং এ। সবসময় বোলিং শুরু করে বৃন্ত - খুবই নিয়ন্ত্রিত বোলার। একটা সিজনে সে ৪ বা ৫ টির বেশি ওয়াইড বল করে না। ঠিক তার মানের না হলেও ভাল বোলার রায়হানও। এই দুজনের ৪ ওভারের প্রথম স্পেলে দলের অবস্থান সবসময়ই ভাল থাকে। এরপর দিদার বা আবিরও ভালই।
সূর্যমুখী ১০৭ রানে অলআউট হয়ে গেল। মোটামুটি একপেশে ভাবেই ম্যাচ জিতেছে নবপাড়া। হাফপ্যান্ট পরিহিত ক্লাস সেভেনে পড়া মনসুর মাঠেই ডিগবাজি দিয়ে দিল।
৮
গ্রুপ পর্বে আর একটা মাত্র ম্যাচ বাকি। এটা জিতলেই ২য় রাউন্ড। সবার মধ্যে উৎসাহ বেড়ে গেল।
প্র্যাকটিস যেটাকে বলা হয়, এই ছেলেগুলো তা করে না। তাছাড়া টেপটেনিসে সেভাবে প্র্যাকটিসের প্রয়োজনও পড়ে না। এমনিতে তারা প্রতি বিকেলে খেলে। আগে সেই খেলায় সময় মত সবাই আসত না। এলেও গাছাড়া ভাবে খেলত অধিকাংশই। কিন্তু টুর্নামেন্টের এই অবস্থায় সিরিয়াস এখন সবাই।
তারা চরম অর্থসংকটে থাকে সবসময়। বল-স্কচটেপ যা নিয়মিত কিনতে হয় অথবা ব্যাট-স্ট্যাম্প অনিয়মিত অনুষঙ্গ, সবকিছুই তারা নিজেদের দেয়া ৫-১০ টাকার চাঁদায় কেনে। সিনিয়ররা ক্লাবের ফান্ড থেকে কোন টাকা-পয়সা দেয়া না। এমন কী তাদের খেলাধূলার কী অবস্থা তা জানার আগ্রহও কারও নেই।
সিনিয়রদের ভূমিকা নিয়ে তাদের অসন্তোষ থাকলেও তারা খেলা চালিয়ে যাচ্ছে। এই টুর্নামেন্টের ২য় দফায় ৫০০ টাকা নিয়েও তারা বিপদে পড়েছিল। পরে ধরে অন্য আরেক দুলাভাইকে!
দুলাভাই থেকে টাকা নেয়ার আইডিয়াটা নতুন। গ্রামে বেড়াতে আসা, মোটামুটি অবস্থাসম্পন্ন দুলাভাইদের কাছে ৩ বা ৪ জন গিয়ে সুন্দরভাবে অর্থসংকটের কথা বলে। অবস্থা যা, তারচেয়েও করুণ করে বলে। প্রয়োজন যতটুকু তাই নেয়া হয়। তবে টাকা নেয়ার সময় বড় কাউকে না বলতে অনুরোধ করা হয়।
তারা ঠিক করেছে বড় কারও কাছে ধরা খাওয়ার আগ পর্যন্ত এই পদ্ধতিতে চালিয়ে যাবে। আর যেই দুলাভাই বড় কাউকে বলে দিবে সবাই মিলে তার কাছে যাবে। গিয়ে ১১ জন একসাথে গলা মিলিয়ে বলবে, সরি দুলাভাই! খেলার জন্য আপনার থেকে টাকা নেয়া ঠিক হয় নি।
এই লজ্জা দেয়ার চেয়ে বেশি আর কী-ই বা তারা করতে পারে!
৯
এখন একটু মূল ‘নবপাড়া ক্রিকেট ক্লাব’ এর কথা হালকা করে বলা প্রয়োজন।
ক্লাবের জন্ম ১৯৮৭ সালে। তখন থেকেই জেলা পর্যায়ে তাদের শক্ত অবস্থান – ক্রিকেট, ফুটবল ও ব্যাডমিন্টনে। তবে সেই মান দিনকে দিন পড়ে যাচ্ছে। এখন দলে ২ জন ছাড়া সবাই হায়ার করা। স্থানীয় এমপি তাদের এলাকার হওয়ায় তাদের ক্লাবের ফান্ড বেশ ভারি। প্রতি বছর এমনকি তারা বড় করে ইফতার পার্টিও দিয়ে থাকে। সেখানে জেলার মান্যগণ্য সবাই থাকে।
খেলার মান অথবা ক্লাবের ফান্ডের যে অবস্থাই হোক না কেন, জুনিয়রদের ব্যাপারে তারা সবসময় উদাসীন। জুনিয়ররা আলাদা খেলে। এমনকি তাদের কারও ক্লাবের মেম্বারশিপও নেই।
তাদের কথা হল, মেম্বারশিপ দিলেই সমস্যা। পরীক্ষায় কেউ খারাপ করলেই অভিভাবকরা ক্লাবকে দোষ দিবে। বলবে ক্লাবই যত নষ্টের গোড়া। এখন এসব শুনতে হয় না। তাছাড়া ওরা খেলতে থাকুক, যারা ভাল করবে একটা সময় শেষে মূল দলে ঢুকে যাবে। ওদের টাকা দেয়া হয় না কারণ দিলেও এর স্বদ্যবহার হবে না, তারচেও বড় কথা টাকা দিলেই তাদের দায়-দায়িত্ব নেয়ার মত হয়ে যায় ব্যাপারটা। এরচেয়ে তারা পড়াশোনার পাশাপাশি এভাবেই চালিয়ে যাক।
বড় ও ছোটদের কেউই নিজেদের যুক্তি অন্যকে জানায় না। একটা গ্যাপ বা ভুল বোঝাবুঝি তাই সবসময়ই থেকে যায়।
১০
গ্রুপ পর্বের আজ শেষ ম্যাচ। ২য় রাউন্ডে যেতে হলে জিততেই হবে নবপাড়া জুনিয়রকে। ট্যুর্নামেন্ট ইতিমধ্যে খুব জমে গেছে।
নবপাড়া মাঠে এসে অবাক হয়ে গেল – তাদের প্রতিপক্ষ 'পূবালী ক্রিয়া চক্র'। এরা এই বছর সেকেন্ড ডিভিশানের সেমি-ফাইনালিস্ট। এদের সাথে কী খেলবে তারা?
আজ টস হেরে গেল বৃন্ত। প্রবলভাবে ভাগ্যে বিশ্বাসী আবির বলল, আগের ম্যাচে টস জেতায় জিতেছিলাম, আজ টস হেরেছি। অর্থাৎ ম্যাচও হারব।
বৃন্ত বলল, প্রথম ম্যাচেও তো টস জিতেছিলাম। ওই ম্যাচে হারলাম যে তাহলে?
আবির জবাব দিল না।
আসলে পূবালীকে দেখেই সবাই ফিট, খেলবে তো পরে।
যাহোক, ২০ ওভারে পূবালী ক্রিয়া চক্র ১৭০ রান করে ফেলল। বাচ্চাদের সাথে হিসেবে এই রান কিছুটা কমই।
মাঠে নেমে শুরুতেই ২ উইকেট পড়ে গেল নবপাড়ার। আজ লজ্জার চূড়ান্তই হতে হবে তাদের। এই অবস্থায় হাল ধরল আবির। সে ৩৮ রান করেছে। যে ছেলে ৪ মারতেই অনভ্যস্ত, সে আজ ৬ পিটাল – এক বা দুটি নয়, তিনটা!
১১ ওভারে রান হল ৮১, উইকেট পড়ল ৪ টা। ৯ ওভারে প্রায় ৯০ লাগবে আরও। ক্রিজে আছে তাদের মূল ব্যাটিং স্তম্ভ শামিম। ওর উপরই ভরসা সবার। তার সাথে আছে রায়হান। স্বাভাবিক গতিতে খেলে যাচ্ছে তারা। খেলার ১৪ ওভার শেষ, রান ৯৮। ৬ ওভারে ৭৩ রান প্রায় অসম্ভব, বিশেষ করে স্কুলের ছাত্রদের কাছে তো আরও। তারপরও চাপে পড়ে গেল পূবালী ক্রিয়া চক্র। অন্য দিকে আবির ছক্কা মারার পর থেকেই সাহসী হয়ে গেল নবপাড়া। তারা যেন বুঝতে পারল – হারব যখন খেলেই হারি।
খেলে তারা হারল না। অবিশ্বাস্যভাবে জিতে গেল। ইনিংসের ৩ বল বাকি থাকতে ৬ পিটিয়ে যখন শামিম ম্যাচ শেষ করল, নবপাড়ার সবাই মাঠে নেমে তাকে কাঁধে নিয়ে নিল। সে অবস্থাতেই হাঁটা দিল বাড়ির পথে।
বৃন্তকে একপাশে কমিটি জানিয়ে দিল যে কোয়াটার ফাইনালের ফিকচার পরে দেয়া হবে।
ম্যাচ হেরে পূবালী ক্রিয়া চক্রের তেমন কিছু আসে-যায় নি। কারণ তারাই গ্রুপ চ্যাম্পিয়ান, আগে থেকেই তাদের সেকেন্ড রাউন্ড নিশ্চিত ছিল।
১১
২য় রাউন্ডে যাওয়ার পর সবাই আরও সিরিয়াস হয়ে গেল। দলের মধ্যে একতা বেড়ে গেছে, সবাই যেন এখন আরও ঘনিষ্ঠ এবং আরও সতর্ক - কারণ নক আউট পর্ব শুরু হতে যাচ্ছে।
স্কুল শেষে প্রাইভেট পড়ে এসে সবাই মাঠে আসে। প্রতিদিনকার খেলা বাদ দিয়ে তারা দুই পিচে বোলিং-ব্যাটিং প্র্যাকটিস শুরু করল। উঁচুতে বল ছুড়ে ক্যাচও প্র্যাকটিস করতে লাগল।
ট্যুর্নামেন্টে পূবালীকে হারানোর পর তাদের নিয়ে মাতামাতি শুরু হয়ে গেছে। এই খবর সিনিয়ররাও জানল। ঝামেলাও শুরু হল এরপর।
কয়েকজন সিনিয়র বলল, যেহেতু পূবালীকে তারা হারিয়েছে কাজেই চ্যাম্পিয়ন হওয়াও তাদের পক্ষে সম্ভব। তাই ওদের দলে এখন ২-৪ জন সিনিয়র খেলানো উচিত। শুধু উচিত বলেই থামল না তারা। ঠিক করল আগামী ম্যাচে ৪ জন সিনিয়র নামানো হবে।
এ নিয়ে মতভেদ দেখা দিল। কয়েকজন সিনিয়র বল, কী দরকার আমরা খেলার? নিজেরা খেলে যাই পারুক, তাই ভাল। ওরা জিতলে ভাল। না জিতলেও সমস্যা কী?
অন্য পক্ষ অনড়। তারা খেলবেই। বাচ্চাদের টিম নিয়ে কখনও মাথা ব্যাথা না থাকলেও, এখন হঠাৎ করেই সেই দলকে জেতানোর ভূত তাদের মাথায় চাপল।
১২
পরের ম্যাচ পড়ল সোমবার সকালে। সে সময় সবার স্কুল! তারা কমিটিকে অনুরোধ করল যেন ম্যাচ বিকালে ফেলা হয়। আর সকালে হলে শুক্রবার ছাড়া তারা পারবে না। কমিটি খেলা দু দিন পিছিয়ে বিকেলে দিল।
নক আউট পর্ব শুরু হয়ে গেছে। জিতলেই সেমি-ফাইনাল, হারলে শেষ। মাঠে ডেকোরেশান বাড়ানো হল, মাইক এনে ধারাবর্ণনাও যুক্ত করা হল। এসব ট্যুর্নামেন্টের মূল আয় কিন্তু এন্ট্রি ফি থেকে আসে না। আসে স্থানীয় বিভিন্ন বিত্তবান ও প্রভাবশালী থেকে নেয়া চাঁদায়।
নবপাড়ার প্রতিপক্ষ এবার মণিপুর স্পোর্টস। বৃন্ত শামিমের সাথে কথা বলে ৪ জনকে বাদ দিয়ে সিনিয়র ৪ জনকে নিয়ে স্কোয়াড লিখে দিল। বাদ পড়াদের দলে মোর্শেদও ছিল। সে সিনিয়র এবং বৃন্তকে কিছুক্ষণ ইচ্ছামত গালিগালাজ করল প্যাভিলিয়নে বসে। খেলার শুরু হওয়ার পর ধীরে ধীরে সে স্বাভাবিক হতে শুরু করল।
আজ আবার টস জিতেছে নবপাড়া। স্লথ গতিতে এগুচ্ছে তারা। সিনিয়ররা দলে আসায় এক-দুজনের আত্নবিশ্বাস বেড়েছে, তবে বেশির ভাগেরই নিজেরা যে তারা অনেক ছোট এ কথা মনে পড়ে গেল। বৃন্ত আজ দল চালাচ্ছে না। সবাই আজ বড়দের উপর নির্ভর হয়ে গেছে, মনে সবার অস্বাভাবিক ভীতি। এ কয়দিনে গড়ে ওঠা দলটি হঠাৎ করেই প্রাণহীন হয়ে গেল।
১১৩ রানে অল আউট হয়ে গেল নবপাড়া।
সিনিয়ররা আগে করাতে প্রথম স্পেলের বোলাররা আজ ২য় স্পেলে বোলিং করল। নিয়ন্ত্রিত বোলিং এবং তারচেয়েও বেশি ভাগ্য জোরে ২ রানে ম্যাচ জিতে সেমি ফাইনালে চলে গেল নবপাড়া।
ম্যাচ শেষে ৪ সিনিয়র সবাইকে খাওয়াল। তারা ম্যাচ নিয়ে বিভিন্ন কথা বলতে লাগল। তবে জুনিয়রদের সবার মধ্যে গুমোট ভাব। ম্যাচ জয় কিংবা সেমি ফাইনালে যাওয়ার আনন্দ নেই কারোরই।
১৩
দলে সিনিয়রদের আগমন সম্পর্কে তীব্র বিভাজন দেখা দিল। কেউ বলল, সারা বছর কেউ কোন খোঁজ রাখে না, একটা টাকা কেউ দেয় না; ওই দিনও খেলতে গিয়েছি ট্রাকে করে, ওনারা তো ঠিকই সিএনজিতে করে গেছেন, কেন আমাদের টুর্নামেন্টে তারা খেলবে? আমাদের নিয়ে তো কোন কালেই তাদের মাথা-ব্যাথা ছিল না, এখন আমরা হারি-জিতি তাদের কী?
বৃন্ত চিন্তা করতে লাগল অন্য বিষয়। বড়রা খেললে সবাই নিজেদের খেলা ভুলে যায়, কাউকে চেনাই যায় না - যেন যাত্রা পথে কেউ খেলতে নামিয়ে দিয়েছে এমন। অথচ কী কষ্ট করেই না তারা প্র্যাকটিস করছে। বাসায় এত খেলাধুলার জন্য সবাইকে ঝাড়ি খেতে হয়।
সিনিয়রদের নিয়ে সবার অভিযোগ বা চেঁচামেচি শুনেও বৃন্ত কিছু বলল না। সে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে।
সেমি ফাইনাল পড়ল এক সপ্তাহ পর। আপাতত প্র্যাকটিস চলতে লাগল। আগের মত করেই।
বুধবার ৩ টা ১০।
সবাই মাঠে। প্রতিপক্ষ 'ফ্রেন্ডশিপ ক্রিকেট ক্লাব'। জেলার অন্যতম বড় ক্রিকেট দল। স্কোয়াড দেয়ার জন্য ৩ টা ২০ এ ডাকা হল বৃন্তকে। সবাই প্যাভিলিয়নে। ৪ জন ছাটাই পড়লেও এমনিতেই দলকে সঙ্গ দিতে আসে।
মাইকে নবপাড়ার স্কোয়াড ঘোষণা করা হল। সেখানে কোন সিনিয়রের নাম নেই। আগের ম্যাচে ছাটাই করা ৪ জনই আছে মূল দলে। স্কোয়াড দিয়েই বৃন্ত টস করতে চলে গেল। টস হেরে সেখান থেকেই দলকে মাঠে নামতে বলল।
হতভম্ব হয়ে গেল সবাই-ই।
১৪
আকাশ ভর্তি মেঘ। খেলা আজ পুরোপুরি হয় কি না কে জানে!
ফিল্ডিং এ নেমে হতভম্ব ভাব কাঁটতেই সবার প্রথম দুই-তিন ওভার চলে গেল। ফ্রেন্ডশিপ ধীরে-সুস্থে খেলা দল। প্রতিপক্ষ নিয়ে তারা মাথা ঘামায় না। প্রথম কয়েক ওভার তারা বল বাই বল সিঙ্গেল নিতে লাগল শুধু। নবপাড়া চেষ্টা করল রান চেক দিতে।
মাঝপথে শুরু করল তারা পিটুনী। শেষ চার ওভারে আরও। রান হয়ে গেল ১৭৮।
সিনিয়ররা প্যাভিলিয়নেই বসে ছিল। স্থানীয় কয়েকজন আর টুর্নামেন্ট কমিটির অনেকে এবং ফ্রেন্ডশিপের সবাই তাদের পরিচিত। তারা চলে গেলে সবাই বুঝত এটা জুনিয়দের ঔদ্ধত্য। তাই তারা এখানেই আছে।
দল প্যাভিলিয়নে ফিরলে এটা নিয়ে কেউ কিছু বলল না। তারা বরং দলকে উৎসাহিত করতে লাগল। যদিও তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে টুর্নামেন্ট শেষে জুনিয়র টিমের ক্যাপ্টেন্সি থেকে বৃন্তকে সরিয়ে দেয়া হবে।
প্রথম উইকেট জুটিতেই নবপাড়া ৩৮ রান তুলল। ওভার তখন শেষ হয়েছে ৪ টি। অতিরিক্ত রান এসেছে প্রায় ১০ এর মত। ২য় উইকেট জুটিও অনেকক্ষণ ক্রিজে থাকল। ১০ ওভারে প্রায় ১০০ রান তুলে ফেলল নবপাড়া। হাতে তখনও ৭ উইকেট। প্যাভিলিয়নে আনন্দিত সবাই।
জয় মোটামুটি যখন নিশ্চিত ধরে নিয়েছে সবাই, ১২ ওভারে ১২১ রান যখন, তারপরই একসাথে ৩ উইকেট পড়ে গেল। এর মধ্যে দুটোই এলবিডব্লিউ। নবপাড়া ক্ষেপে গেল। সিনিয়ররা বলল, আর একটা এলবি দিলেই খেলা বন্ধ করে দিব। সবাই এখন একতাবদ্ধ। ততক্ষণে স্কোরবোর্ডের হাল করুণ হয়ে যাচ্ছে – ১৩৩/৬, ১৫ ওভার।
বৃন্ত আর মোর্শেদ ক্রিজে। ব্যাটসম্যান হিসেবে বৃন্ত মাঝারি মানের। আর মোর্শেদ সব পজিশানের সফলভাবে ব্যর্থ। এই অবস্থায় তারা নিতে লাগল সিঙ্গেল। আরও ২ ওভার শেষ, রান ১৪১।
১৮ ওভারের শুরুতেই বৃন্ত সিঙ্গেল নিল। স্ট্রাইকে এখন মোর্শেদ। পরের বলে ক্রিজ থেকে এগিয়ে এসে সোজা-উঁচুতে ব্যাট চালাল সে, ছয়! প্যাভিলিয়নে চিৎকার শুরু হল – মোর্শেদ, মোর্শেদ, মোর্শেদ!
পরের বলে আবার চার। শামিম হেসে বলল, আজ যদি জিতে যাই ওর চাপার জোরে দেখবি থাকাই দায় হয়ে যাবে।
রায়হান উত্তরে বলল, আল্লাহ তাও জিতি!
মোর্শেদের ৩৬ রান আর বৃন্তর ২০ রানে জিতে গেল নবপাড়া। একদম শেষ ওভাবের ৪ নাম্বার বলে।
আকাশ ফুটো করে বৃষ্টি নামল এর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। প্যাভিলিয়ন থেকে এক দল কিশোর ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল মোর্শেদ ও বৃন্তকে। পিচের উপর সবাই পড়ে আছে তারা, একে অন্যের উপর।
মোর্শেদ বোধহয় চাপে মারাই যাবে!
১৫
সিনিয়রদের ক্ষোভ প্রশমিত হয়ে এল। আনন্দে উদ্ধেলিত হয়ে আছে সবাই। এর মধ্যে বিকেলের দেড়-দুই ঘণ্টার প্র্যাকটিস চলতে লাগল। মার্চ মাসের প্রায় শেষ। সবার প্রথম সাময়িক পরীক্ষা এগিয়ে আসছে। পড়াশোনার চাপ বাড়তে লাগল।
এদিকে ফাইনালের ডেটও দিচ্ছে না টুর্নামেন্ট কমিটি। অনেক সময় দেখা যায় ফাইনাল পরের সিজনের শুরুতে হয়। এটায়ও তা করে কি না কে জানে। এখন হয়ে গেল নবপাড়ার সুবিধা হত – টিম স্পিরিট খুবই ভাল এখন, ভাল সবার পারফরম্যান্সও।
পরীক্ষা দ্রুত এগিয়ে আসছে। বিকেলের প্র্যাকটিস এখন মাঝে মধ্যে হয়। সবাই যেন ধরে নিয়েছে এই সিজনে খেলা আর হবে না।
প্রায় দিন পনের পর জানান হল যে পরবর্তী শুক্রবার ফাইনাল। এর পর দিনই সবার প্রথম সাময়িক পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে। তারা কমিটিকে বলল খেলা পেছাতে। কিন্তু সিজন শেষ হয়ে যাচ্ছে, ওয়েদার খারাপ এবং অথিতিদের আমন্ত্রণ জানিয়ে দেয়া হয়েছে – এমন সব যুক্তি দেখিয়ে তারা ডেইট ফিক্সড রেখে দিল – শুক্রবার সকাল ১০ টা।
১৬
আজ শুক্রবার। সময় এখন সকাল ৮ টা। সবাইকে সকাল ৯ টায় মসজিদের সামনে থাকতে বলা হয়েছে। কিন্তু কাল পরীক্ষা, বাসা থেকে কীভাবে বের হবে একটু পর কোনভাবেই এই চিন্তা মাথায় ঢুকছে না বৃন্তর। বাবা বোধহয় এখন বাজারে। কিন্তু ১ ঘণ্টা আগে বের হওয়া ঠিক হবে কি না তাই ভাবছে সে।
একই রকম বিপদে শামিম, আবির, রায়হান, মোর্শেদ, মনসুর সবাই-ই। ৯ টা পাঁচ বাজে যখন, যখন দিদার ও দাউদ এল মসজিদের সামনে, দেখে কেউ নেই! তারা বুঝতে পারছে না সবাই কি চলে গেছে কি না! তখন আসল মনসুরও। ৯ টা ২৫ এর মধ্যে সবাই এল। কিন্তু কীভাবে তারা পৌছাবে ১০ টার মধ্যে?
সবাই হনহন করে এগুতে লাগল। ২ মিনিট ট্রাকের জন্য দাঁড়ানোর পর সবাই বাসে উঠল। সবাই আজ এক্সট্রা টাকা এনেছে।
দুর্ভাগ্য মনে হয় শেষ ভাগেই লিখা ছিল তাদের। বাস নষ্ট হয়ে গেছে মাঝ রাস্তায়। আশে পাশে কোন স্টপেজ বা বাজার নেই। তারা হাঁটতে শুরু করল।
১০ টা ৫ বাজে। ফাইনাল এতক্ষণে শুরু হয়ে যাওয়ার কথা, অথচ নবপাড়া জুনিয়র এখনও আসেই নি মাঠে। ফাইনাল বলে অনেক গণ্যমাণ্য অথিতিরা এসেছে। তারা সবাই ভ্রু-কুঞ্চিত অবস্থায় বসে আছেন। বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে্ন সবাই। বাচ্চা একটা দল পূবালী ও ফ্রেন্ডশিপের মত দলকে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছে। তাদের দেখার আগ্রহও ছিল সবার। এখন যেন সবাই ধীরে ধীরে ওয়াকওভারের দিকে এগুচ্ছে সব কিছু।
পূবালী অন্য ফাইনালিস্ট। গ্রুপ পর্বে যেসব বাচ্চারা তাদের হারিয়েছিল আজ তাদের তুলোধুনা দেয়ার অপেক্ষা করছিল তারা। তা বোধহয় আর হচ্ছে না।
কমিটির একজন বলল, আচ্ছা ওরা জানে তো আজ খেলা যে! রকিব দৃঢ় গলায় বলল, আমি জানিয়ে এসেছি, সবার সাথে কথাও হয়েছে।
এই অবস্থায়, সময় আরও ১৫ মিনিট বাড়ানো হল।
ধর্মপুর বাজারে বড় একটা ট্রাক থেমেছে। থামতে না থামতেই এক ঝাঁক কিশোর ব্যাট-বল হাতে নামল তা থেকে। অস্থির গলায় একজন এক দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল কয়টা বাজে ভাই?
নিরাসক্ত দোকানদার জানাল, ১০ টা ২৫।
সাথে সাথে দৌড়ানো শুরু করল সবাই। ওই যে দেখা যাচ্ছে উঁচু রাস্তার ঢিবি, তার পাশেই বটগাছ। এর পাশেই তো খেলার মাঠ!
প্রাণপণ দৌড়ে যাচ্ছে ‘নবপাড়া জুনিয়র ক্রিকেট দল’।
এত যুদ্ধ করে ফাইনালে উঠে এসে কোনভাবেই কাউকে তারা ওয়াকওভার পেতে দেবে না। কোনভাবেই না।
------))((-------
Sazib
20.06.2012
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জুলাই, ২০১২ রাত ১০:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



