somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্বপ্নোত্থিত শঙ্কা (গল্প)

২৭ শে জুন, ২০১২ রাত ২:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রতিদিন খেলায় ইনিংস শুরুর আগে দলের সবাই ওপেনিং এ নামার জন্য বলতে গেলে ঝগড়া লেগে যায়। কিন্তু আজ আমি নামতে চাওয়া মাত্রই সবাই মেনে নিল। এরপর ওপেনিং এর নন-স্ট্রাইকিং প্রান্তে সে-ই যে নামলাম, আর আউট-ই হচ্ছি না। আমার সাথের প্রত্যেকে এক এক করে উইকেটে গিয়ে আবার বিদায় নিচ্ছে, কিন্তু আমি বহাল তবিয়তে ব্যাট করেই যাচ্ছি।

হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, এই যে শুরু থেকে ব্যাট করে যাচ্ছি, রান নিচ্ছি, এবং ক্রমাগত উইকেটে দৌড়ে যাচ্ছি – আমার মধ্যে কোনরকম ক্লান্তিবোধ নেই। শুধু ক্লান্তিবোধ-ই না, খেলায় খেলোয়াড়দের যে স্বাভাবিক চেতনাবোধ থাকে, আমার তার কিছুই নেই। আমি আসলে কোন অনুভূতি-ই পাচ্ছি না। কোন একটা সমস্যা অবশ্যই হয়েছে আমার।

আমার সাথে যারা খেলছে, যারা আমার এত ঘনিষ্ঠ এবং সবাই যারা আমার প্রিয় অথবা আমি যাদের সবার প্রিয়, তারাই বা আমাকে আজ এত এড়িয়ে চলছে কেন? একটা কোন সমস্যা ওদেরও হয়েছে নিশ্চয়ই।

খেলা শেষ হতে হতে সন্ধ্যা নেমে যায় প্রতিদিন। আজ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেল। বাড়ির দিকে দ্রুত পা বাড়াতেই মসজিদের সামনে ভাইয়াকে দেখে আমার সাথে বাসায় ফিরতে বললাম।
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, আমি বাড়ি গেলে ফিরব কখন? অথবা এসে কুলোব না – এসব কারণ দেখিইয়ে ভাইয়া আমাকে যেতে অনেকটা নিষেধ করল।
আমি অবাক হয়ে তাকে জানালাম যে সন্ধ্যা দেখেই তো ফেরা দরকার। মা দেরি হলে বকা দেবে।

কথা না বাড়িয়ে হাঁটতে শুরু করল ভাইয়া আমার সাথে।

বাড়ির বিশাল পাকা উঠোনে মা, দাদু এবং চাচীরা বসে আছেন। আসরের পরপর প্রতিদিন তাঁরা এভাবে বসেন। মা আমাকে দেখেই বলল, বাবা মাগরিবের আযানের তো সময় হয়ে গেছে। কেন এসেছিস তুই এখন? কাল সকালে আসিস।

আমি হতবাক হয়ে মাকে জিজ্ঞেস করলাম কেন তারা শুধু সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার কথা বলছে? আমি বাড়িতে আসব না? তাহলে কোথায় থাকব!

তখনই মাইকের শব্দ হল, মাগরিবের আযান দেয়া হবে। মা ভয়ার্ত গলায় ভাইয়াকে বলল, আযান দিয়ে দিচ্ছে, তাড়াতাড়ি ওকে রেখে আয়!

ভাইয়া আমাকে নিয়ে দৌড়াচ্ছে - সন্ধার আগেই কবরস্থ করার প্রাণান্ত চেষ্টা।


গত সন্ধ্যার নিষ্ঠুর ভাই সকালে এসে আবার আমাকে তুলল কবর থেকে। আমার চোখ খোলা দেখে কবরে কষ্ট হয় কি না তা জিজ্ঞেস করল।
রাগ দেখিয়ে কথার জবাব দিলাম না। কিন্তু নিজের অসহায়ত্বের তীব্রতা হেতু অর্থহীন মনে হল এই রাগকে। বললাম, মাটি শক্ত। ঘুমোতে আরাম নেই।
নিচের দিকে তাকিয়ে একদমই শীতল গলায় ভাইয়া বলল, তুই তো মারা গেছিস। এভাবে একটু কষ্ট করতে হবে।
আমি মারা গেছি? কীভাবে মারা গিয়েছিলাম কিছুই মনে পড়ছে না।

আমি ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করলাম, আমাকে পুরোপুরি কবর দিচ্ছ না কেন?
সে বলল, বাবা ঢাকা থেকে ফিরলেই দিব।
- আমি মারা গেছি, বাবা ঢাকায় কেন বসে আছে?
- তুই মারা যাওয়ার দিন ভোরে ব্যবসায়ের কাজে বাবা ঢাকা গিয়েছিল। মেঘনা নদীতে ফেরী আটকে গেছে দেখে দেরি হচ্ছে আসতে।




আমি ঠিক করেছি আজ বাড়িতে যাব না। মায়ের সাথে দেখা করব না আর। যেই মা আমাকে মারা যাওয়ার পরও রাতে পাশে রাখল না, তার কাছে যাব কেন? ভাইয়াকে চলে যেতে বললাম। আর বললাম সন্ধ্যার আগে এসে আবার 'সাময়িক' কবর দিয়ে যেতে।

রেল লাইন ধরে আমি হাঁটছি। আবাদি জমিগুলো, যেগুলোর ধান কিছু দিন আগে কাটা হয়েছে এখন সেখানে পানি। আমার বয়সী অনেকে মাটির আল বেঁধে কম পানির বিশাল ডোবা বানিয়ে তাতে মাছ ধরছে। তাদের একটা দলের সাথে যুক্তও হলাম। হাত দিয়ে পানি সেঁচে যাচ্ছি; পানি কমে এল, কিন্তু কোন মাছের লক্ষণ দেখতে পেলাম না। কর্মীরা তারপরও উৎসাহী। শেষ মূহুর্তে বাঁধ ভেঙ্গে গেলে সবাই আবার বাঁধ দিয়ে সেচতে লাগল। বুঝলাম, জলসেচনের এই পদ্ধতি শেষ হবার নয়। তাদের বিদায় জানিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলাম।

ব্রিক ফিল্ডের শ্রমিকেরা ইট বানাচ্ছে। দ্রুত গতিতে নিঁখুতভাবে তারা বক্সে মাটির দলা ভরে ইটের কাঠামো দিচ্ছে। শান্ত-মুগ্ধ হয়ে আমি সেদিকে তাকিয়ে থাকি।

হাঁটার সময় আমি তাকিয়ে দেখি ব্রিক ফিল্ডের সামনের চায়ের দোকানদারকে। একের পর এক কাপ চা বানিয়ে যাচ্ছে সে। আর সেই চা খেতে খেতে খদ্দের শ্রমিকেরা দোকানের টিভিতে বাংলা ছবি দেখছে। ডিপজলের তীব্র শ্রুতিকটু চিৎকার-চেঁচামেচিও কী আগ্রহ নিয়ে দেখছে তারা!

হাঁটতে হাঁটতে আরও দেখছি কাঠুরেদের গাছ কাটাকেও। বিশালদেহী গাছের গোড়া বড় করাত দিয়ে ধীরে-সুস্থে কাটছে তারা। দড়ি দিয়ে গাছটি বেঁধে রাখা হয়েছে চতুর্দিকে। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় ক্লান্ত রিকশাওয়ালা ঘর্মাক্ত শরীরে বসেছে তাদের সাথে। শান্ত পথে কয়েকজন মানুষ হেঁটে হেঁটে যায় মাঝে মধ্যে। রিকশা বা ভ্যান যায় ঘণ্টায় গড়ে এক বা দুটি করে।

নীরব দর্শক হয়ে এত সব যখন দেখে যাচ্ছি, তখনই হঠাৎ করে মায়ের কথা মনে পড়ল। হনহন করে হাঁটতে লাগলাম বাড়ির পথে।

আমি আজ অবাক হয়ে দেখছি মাকেও। এই যে মা এখন বড় মাছ কেটে-কুটে পিস করছে, এরও আগে যে শাক কাটছিল কুচি কুচি করে, কী নৈপুণ কলাই না যেন মিশে আছে এর মধ্যেও।

মা আমাকে দেখে কাজ ছেড়ে উঠে বলল, বাবা! কেমন আছিস? কষ্ট হয় তোর কবরে?

আমি কোন উত্তর দিলাম না। ফুট ছয়েক দূরত্ব থেকে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম মাকে। হুহু করে কাঁদতে শুরু করল মা।




দুপুরে খাওয়ার পর বাবা এসেছে। আমাকে দেখামাত্রই ধরে কাঁদতে লাগল বাবা অঝোরে। এবং সাথে সাথে আমার জাগতিক চেতনাবোধ চলে গেল। আমি শুনতে পাচ্ছি না, বলতেও না। সম্ভবত মানবসম্প্রদায়ের অন্তর্গত আর নই আমি।




শুয়ে আছি, আমার শ্রবণশক্তি ফিরে এসেছে। কিছু দেখতে বা বলতে পারছি না। শুয়ে থাকলেও বোধহয় চলন্ত অবস্থায় আছি। মানুষের কথার হালকা কিছু শব্দ শোনা যাচ্ছে, একজনের তীক্ষ্ণ চিৎকারই সবচেয়ে স্পষ্ট শুনলাম – ‘খাটিয়ার ডান পাশে আরেক জন ধর, এ পাশ বেঁকে যাচ্ছে।’

এখন আর চলন্ত অবস্থায় নেই বুঝতে পারছি। কোথাও রাখা হয়েছে আমাকে। একটু পরেই অনেকে ধরাধরি করে কোথাও রাখল। আর দুজন বলে উঠল, ‘বিসমিল্লাহি ওয়া আলা মিল্লাতে রাসূলিল্লাহ।’

কয়েক মিনিট পার হয়ে গেছে বোধ হয়। হঠাৎ আবার সমবেত কণ্ঠের শব্দ, ‘মিনহা খালাকনাকুম।’
এরপর, ‘ওয়া ফীহা নুয়িদুকুম।’
সবশেষে, ‘ওয়া মিনহা নুখরিজুকুম তারাতান উখরা।’

আচ্ছা, এগুলো কখন পড়ে মানুষ? মৃত ব্যক্তিকে দাফনের প্রথম তিন মুষ্ঠি মাটি দেয়ার পর না? একসময় হুজুরের কাছে তা-ই তো পড়েছিলাম মনে হয়।



‘সজীব, বাবা ওঠ ঘুম থেকে। স্কুলের সময় হয়ে এসেছে। কই, ওঠ!’ – মায়ের এমন ডাকের সাথে ঘুম ভাঙ্গে আমার। ভালভাবে তাকিয়ে দেখি, কোথায় ঘুমিয়েছিলাম? যাক বাবা, কবরে নয়, নিজের ঘরে!

ফ্রেশ হয়ে নাশতা করতে টেবিলে বসলাম। মাকে জিজ্ঞেস করলাম, বাবা কোথায়?


ব্যস্ত ভঙ্গিতে নাশতা রেডি করতে করতে মা জবাব দিল, ব্যবসায়ের কাজে আজ ভোরে ঢাকা গেছে।


=======০০=======
Sazib
26.06.2012
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে জুন, ২০১২ ভোর ৪:০৩
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×