somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ক্ষণিকের অশান্ত নিকেত (ভৌতিক গল্প)

০৬ ই জুলাই, ২০১২ রাত ১০:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দুপুর ২ টা। কোন কিছুরই উপযুক্ত নয় বলে সময়টা শাম্মার অপছন্দ। অফিসে থাকলে এতক্ষণে তার লাঞ্চ আওয়ার শেষ হত। কিন্তু মাতৃত্বকালীন ছুটিতে সে এখন বাসায়। নতুন এপার্টমেন্টে উঠেছে বলে তারা গতকাল রাতে বাসায় বড় করে পার্টি দেয়।

বেশির ভাগ ধকলই শাম্মার উপর দিয়ে গেছে। সে এখন পুরোপুরি ক্লান্ত। বেলা ১০ টায় ঘুম থেকে ওঠার পরও যেন তার ঘুম শেষ হয় নি, বিছানায় শুলে আবার কয়েক মিনিটের মধ্যে সে ঘুমিয়ে পড়বে। কিন্তু ঘুমানো এখন সম্ভব নয়। তার ৯ মাসের বাচ্চা নিহারের সেরেলাক বানিয়ে মাত্র নিজের বেডরুমে ঢুকেছে সে। আর তখনই বেজে উঠল ল্যান্ডফোন। সেরেলাকের বাটি রেখে সে ফোন ধরতে গেল।

বার কয়েক হ্যালো বলার পরও কোন প্রত্যুত্তর আসল না। রিফাতকে টিএন্ডটির লাইন কেঁটে দিতে অনেকবার বলেছে শাম্মা। কিন্তু দরকার না থাকলেও ব্যবসায়ীর বাসায় টিএন্ডটি রাখতে হয় – এই অযুহাতে লাইনটা টিকে গেছে।

ফোন রেখে নিহারের কাছে গিয়েই চমকে গেল শাম্মা। সেরেলাকের বাটি উধাও। ভাঁজহীন চাদরের বিছানা সম্পূর্ণ এলোমেলো হয়ে গেছে। নিহারের কাঁথা-বালিশ সব পশ্চিমমুখী কেন? সে তো উত্তর-দক্ষিণ হয়ে শোয়া ছিল! বাসায় বুয়াও নেই, আধা বা এক মিনিটের মধ্যে কে করেছে এসব?

হঠাৎ করেই দক্ষিণের জানালার পর্দাও অস্বাভাবিকভাবে উড়ে, প্রায় সরে গিয়ে, আবার ঠিক হয়ে গেল।

ভরদুপুরে এসব দৃশ্য দেখতে কোন মানুষই প্রস্তুত থাকে না। শাম্মাও একই, ভয়ে জড়সড় হয়ে গেল সে। দৌড়ে গিয়ে নিহারকে সারা শরীর দিয়ে ঢেকে রইল সে।

নিহারের কোন ভাবান্তর নেই। চুপচাপ মায়ের দিকে সে তাকিয়ে আছে। ঘর এখন আগের মতই শান্ত।




রিফাত গাজীপুরের ফ্যাক্টরিতে যাওয়ায় তার ঘণ্টা ২ মত লাগল আসতে আসতে। ততক্ষণে ভয় কেটে গেছে শাম্মার। অনেকটা সে স্বাভাবিক হয়ে এল।

সব শুনে রিফাত অবাক হয়ে গেল। এই যুগে ভূত! তাও ঢাকা নামক শহরে, লিফট ও জেনারেটরবেষ্টিত এপার্টমেন্টে?এরই মধ্যে শাম্মার মা, খালা ও কাজিন এসেছে বাসায়। কাজিন কয়েক দিন থাকবে।

আপাতত রহস্যের কোন আগা-মাথা পাওয়া গেল না। রুমে যদি মানুষ ঢুকত, তার মুভমেন্ট অবশ্যই টের পাওয়া যেত। তাছাড়া এত দ্রুত একটা মানুষ এত কিছু করল কীভাবে? করে উধাও-ই বা হয় কীভাবে? কাজেই এটা মানুষ না। তবে অন্য কিছুও হতে পারে না।

কিন্তু তাহলে কী তা? উত্তর পাওয়া সম্বব নয় বলে বিষয়টা বরং ভুলেই যেন যেতে চাইল সবাই।

বিকেলে মায়াবী আলো আর মানুষের কোলাহলে ভয় নামক অনুভূতি খুব দ্রুতই উবে গেল। বরং মা-খালা-মেয়ে-নাতি এবং এই উপলক্ষে বাসায় আসা রিফাতের ২ বন্ধুর তুমুল গল্পগুজব আর হাসাহাসিতে বাসা জমে গেছে।

কে বলবে আজ দুপুরেই সত্যিই এসব ঘটেছিল এই বাসায়?




পরদিন দুপুরে খেয়ে সবাই বিদায় নিল। শাম্মার কাজিন অন্ত থেকে গেছে।
দুপুরে আজ কোন সমস্যা হয় নি। সব কিছু আবার স্বাভাবিক প্রায়।

খাওয়ার ঘণ্টাখানেক পর অন্ত বলল, আপু, তোমাদের পরশুর পার্টিতে দেখলাম অনেকে গিফট দিয়েছে। নতুন বাসায় ওঠার পার্টিতে কেউ গিফট দিতে এর আগে আমি শুনি নি!
শাম্মা বলল, তোর ভাইয়া প্রচুর গিফট দেয়, দিতে পছন্দ করে। আমাদের প্রোগ্রামগুলোতে তাই গিফট আসেও বেশি।
- সুইট তো! আমিও এরকম কাউকে দেখেই বিয়ে করব!


কাউকে নিজের নতুন কেনা বা উপহার পাওয়া জিনিসপত্র দেখাতে মেয়েদের কোন ক্লান্তিবোধ নেই। শাম্মা নিজ আগ্রহেই পরশু পাওয়া গিফটগুলো অন্তকে দেখাতে লাগল। শো-কেইসে এগুলো সেদিন রাতেই সে সাজিয়ে রেখেছিল।

একটা ক্রিস্টালের বড় গিটার, এক ফুট সমান কালো রং এর একটি চমৎকার লোহার নাকি অন্য কিছুর মূর্তি, টাইটানের একটা হ্যান্ডওয়াচসহ আরও অনেকগুলো শো-পিস গিফট পেয়েছে তারা। দেখাদেখি শেষে সব আবার আগের মত সাজিয়ে রাখা হল।

সাজানো শেষে কাজ নেই দেখে একটা ছোটখাটো ঘুম দেয়ার প্রস্তুতি নিল তার্‌ নিহার তখন ঘুমে। বিপত্তি ঠিক তখনই।

মাস্টারবেডের সাথে লাগোয়া রুমে কিছু নড়ার শব্দ হচ্ছে। থেমে থেমে বা গতকালের মত কোন লুকোচুরি নেই, আজ সম্পূর্ণ জানান দিয়ে শব্দ হচ্ছে। ফ্লোরে রাখা স্টিলের ফুলদানি শব্দ করে নিচে পড়ল, বুকশেল্ফ থেকে বই পড়ার শব্দ। ঘড়ির বেল, যেটি বড় কাঁটা বারোর ঘরে আসলে বেজে উঠে তা আধ-ঘণ্টা আগেই কারণ ছাড়াই বাজতে লাগল।

ধড়াম করে শব্দ করে সে রুমের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। তারপর আবার শান্ত সবকিছু।

মাস্টারবেডে দুই ভয়ার্ত নারী আর এক ঘুমন্ত শিশু – শাম্মা, অন্ত এবং নিহার।




এরপর আর কারও বুঝতে বাকি রইল না যে এখানে লোকাতীত কিছু জড়িয়ে আছে। আত্নীয়-স্বজনরা আবার আসল। এসেই অধিকাংশ বাসা বদলানোর প্রস্তাব তুলল।

যেই অন্তকে সাহস দিতে শাম্মার কাছে রেখে যাওয়া হয়েছিল, সেই সবচেয়ে বেশি ভয় পেয়েছে। তার মা আসার পর মাকে জড়িয়ে ধরে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে সে বলল, মা, আমি আর এই বাসায় থাকতে পারব না। এখানে ভূত আছে!
ভূত কি আসলেই আছে? – রিফাত চিন্তায় পড়ে গেল। সে নাস্তিক নয়, আবার উৎসাহী ধর্মপ্রাণও নয়। ভূত-প্রেত যে নেই এ নিয়ে ছাত্রাবস্থায় বন্ধুদের সাথে বহু তর্ক-বিতর্ক করেছে। আজ তার বাসাতেই হচ্ছে এসব।

পরপর দুদিন এমন হওয়ার পর একটা মেয়ের যে তীব্র প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা ছিল, শাম্মার তা হল না। সে স্বাভাবিকই আছে অনেকটা, তার সব চিন্তা ছেলেকে নিয়ে – এসব ঘটনা বাচ্চাটা হওয়ার আগে হল না কেন? অথবা বাচ্চাটা আরেকটু বড় হওয়ার পর হলে কী হত? কেন এখনই? ম্যাটারনিটি লিভ সাধারণের চেয়ে সে অনেক বেশি সময়ের জন্য পেয়েছে। কিন্তু তা শেষ হয়ে যাবে এ মাসেই। কী হবে এরপর নিহারের?

সেদিন সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় সবাই থেকে গেল। ৩ টা বেড রুম, ড্রইং রুমে ফ্লোরিং – এসব করে সহজেই জায়গা হয়ে গেল সবার। বাসা মানুষে ভর্তি।

রাতে হঠাৎ মোবাইলের রিংটোনে ঘুম ভেঙ্গে গেল অন্তর। রিসিভের আগেই কেটে গেছে ফোন। কোন ফ্রেন্ড বোধহয় ফাজলামো করে ঘুম ভাঙ্গাতে কল দিয়েছিল। মোবাইলের ডিসপ্লেতে সময় তখন প্রায় ৪ টা ছুঁই ছুঁই।

ঘুম যত সহজে ভাঙ্গে, তত সহজে আসে না। অন্ত এপাশ-ওপাশ করতে লাগল বেডে। হঠাৎ চোখ চলে গেল রুমের কর্নারে।

কেউ একজন অস্বাভাবিক আকৃতির বসে আছে ঘরের কোণায়, সম্পূর্ণ অনড় অবস্থান, সামনের দিকে তাকিয়ে আছে সে। মাথাটা শরীরের তুলনায় অনেক অনেক বড়। ডিমলাইটের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এ দৃশ্য। না, এ কোন বিভ্রম নয়।

সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠল অন্ত।




এরপর নির্ঘুম কাটল সবার সেই রাত।

পরদিন হুজুর নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত হল। আরও সিদ্ধান্ত হল, কিছু না থাকলেও এই বাসা ছেড়ে দিতে হবে। এ বাসাটা বহু টাকা, অর্ধ কোটিরও কিছু বেশি দিয়ে হয়ত তারা কিনেছে; হয়ত বাসার টাইলস, কিচেন কেবিনেট, সুইচবোর্ড এবং বাসার দরজা সব নিজেরা দেখে-বাছাই করে কিনেছে। কিন্তু যেই বাসায় সুখ নামক অনুভূতিই অনুপস্থিত, সেখানে এসব দিয়ে কী হবে? বরং শাম্মা ও নিহারের উপর প্রভাব পড়বে ভয়াবহ এসব ভূতুড়ে ঘটনার।

পরদিন সকালে এলাকার মসজিদের ইমামকে নিয়ে আসা হল। ইমাম বাসায় ঢুকে কিছু বললেন না, বরং স্বাভাবিকভাবে গল্প করতে লাগলেন।
বাসা কত স্কয়ার ফিটের, দাম কেমন নিয়েছে, ইদানিংকার এপার্টমেন্টেগুলোর অবস্থা তেমন ভাল না। উচ্চমূল্য নিলেও মানে খারাপ জিনিস দেয়, ১১০ টাকা নিয়ে সলিড পাথরের বদলে ৬০ টাকার ২ নাম্বার ইট মেশানো পাথর দেয় – এমন সব অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তা বলতে লাগলেন তিনি।

শাম্মার বাবা একসময় বিরক্ত হয়ে বললেন, হুজুর এসব আলাপ অন্যদিন হবে। আজকে আপনি বাসার মানুষদের দিকে তাকান। ভয়াবহ সব কাণ্ড ঘটছে।

হুজুর চুপচাপ সব শুনলেন। তাঁকে বাসায় আনার আগেই এসব বলা হয়েছে, তারপরও তিনি যেন আগে শুনেন নি এভাবে শুনলেন। শুনেও কিছু বললেন না। সবাই অবাক হয়ে রইল। হুজুর বললেন, যোহরের সময় হয়ে আসছে। আমি পরে আসব।

বের হওয়ার আগে মূল দরজার কাছে গিয়ে হুজুর বললেন, এই বাসায় খারাপ জ্বীন আছে। নিরীহ - ভয় দেখাবে, কিছু করবে না স্বভাবের। তবে এদের তো ঠিক নেই আবার। বাসায় ঢুকেছে সে ৩ দিন আগে।




উত্তরার ৪ নাম্বার সেক্টরের ইমাম সাহেব যোহরের পর আবার এলেন বাসায়। খেয়ে-দেয়ে তিনি কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলেন। এরপর তিনি দোয়া পড়তে শুরু করলেন। কী দোয়া? আল-কুরআনের ৩৩ আয়াত? কে জানে! অন্যও হতে পারে। বহু দোয়া বা আয়াত এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

হুজুর বললেন, বাসা আপাতত ঠিক হয়ে গেছে। অস্বাভাবিক কিছু আর ঘটবে না। যদি ঘটে তাহলে এই জ্বীন সুবিধার হবে না। আবার ব্যবস্থা নিতে হবে, কঠিন ব্যবস্থা। তবে কিছু দিন পরিস্থিতি শান্ত থাকবে।

বাসায় আর কোন সমস্যা সত্যিই হল না। শাম্মার মা-বাবা সপ্তাহখানেক ছিল বাসায়, নতুন একটা বাচ্চা কাজের মেয়ে রাখা হল যে একই সাথে নিহারকেও দেখতে পারবে। এক সময় সবই আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল। আর কোন কিছু হবে বা হতে পারে, এ ধারণাই সবার মন থেকে চলে গেল।




মাসের প্রায় শেষ। শেষ শাম্মার ছুটিও। কাজের মেয়ে লিমাও ভালই চালু। নতুন এপার্টমেন্টের যেই প্রশান্তি তা এ কিছু দিন তারা পেয়েছে। বাসায় যে গুমোট ভাব ছিল তা সম্পূর্ণরূপে কেটে গেল।

এমনই এক দুপুরে শাম্মা গোসল শেষে বের হয়ে এল। দুপুরের খাবার খেয়ে সে ঘুমিয়েছে। উঠে ফ্রেশ হয়ে হালকা কিছু খেতে বসবে। বসা মাত্রই আবার সেই ভূতুড়ে শব্দ। আজ গেস্টরুমে। রুমের দরজা বন্ধ, নূপুরের যেন অনবরত ঝঙ্কার। কেউ একজন যে নাচছে তা ডাইনিং এ বসেই বোঝা যায়। লিমা নিহারকে নিয়ে শাম্মার পাশে দাঁড়িয়ে রইল। ভয়ে সে শেষ।

নিহার আজ জেগে আছে, বাসায় যে এগুলো ঘটছে অথবা তার সামনে মানুষ দুটি যে মারাত্নকভাবে ভীত, এর কিছুই সে বুঝতে পারছে না। মানুষের শৈশব আসলেই কী নির্মল আনন্দের!




রিফাতকে বসা অবস্থাতেই ফোন দিল শাম্মা। সাহস করে মূল দরজা খুলে দিল সে। নূপুরের ঝংকার ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেছে।

আধ-ঘণ্টা পর দরজা আবার বন্ধ করে দিল শাম্মা। বাসার সব বাতি জ্বলছে। এবার শব্দ যেন ড্রইং রুমেই, শাম্মা যেখানে বসে আছে তার পাশেই। এত ভয় পেল সে যে উঠবে বা চিৎকার করবে এই বোধও চলে গেল। লিমা সম্ভবত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। নিহার চুপচাপ বসে আছে। এবার বোধহয় সেও বুঝতে পারছে যে অলৌকিক কিছু ঘটছে তার বাসায়, তার এই কক্ষেই।

নিহারকে টেনে বুকের মধ্যে ঢুকিয়ে মাথা নিচু করে রইল শাম্মা। ঘরময় বিকট শব্দের মিছিল। শাম্মা মাথা উঠাচ্ছে না।

মাথা তুলতে পারবেও কি আর?




বাসায় ইলেক্ট্রিসিটি নেই। নিশ্ছিদ্র অন্ধকার চারপাশে। শাম্মা এখন কোথায়?

বোধ আসার পরই নিহারের কথা মনে পড়ল তার। নিজের কোল হাঁতড়ে নিশ্চিত হল সে – নিহার আছে। শুধু আলো নয়, বাসায় কিংবা আশেপাশে কোন শব্দও নেই। মেইন রোডের পাশেই তাদের বাসা, সারাক্ষণ দ্রুত গতিতে সাঁই-সাঁই করে ছুটে চলে গাড়িগুলো। আজ কি রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে?

উঠে বাতি জ্বালিয়ে মূল দরজা খুলে দিল সে। নিহার ঠিক আছে। ফ্লোরে পড়ে আছে লিমা। কী ভয়াবহ অবস্থা।

সিঁড়ির সামনে এসে তারা তিন জন বসে রইল। রিফাত আসার আগে বাসায় আর ঢুকবে না। এত দিনের সাহসী শাম্মার সব সাহস আজ বিলীন হয়ে গেছে। আর কোনভাবেই সে এই বাসায় থাকবে না।



১০
সেদিন রাতে বাসায় তালা দিয়ে সবাই শাম্মার মায়ের কাছে চলে গেল। এই বাসা খুব দ্রুতই ছেড়ে দেয়া হবে। শাম্মা চাকরী থেকে রিজাইনের সিদ্ধান্ত নিল। টাকার দরকার তার বা রিফাতের কখনই ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ-এমবিএ ডিগ্রি নিয়ে সে বাসায় বসে থাকবে এটা অযৌক্তিক মনে হয়েছিল তখন। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতিতে তাদের বাচ্চাই আসল। যে করেই হোক, তাকে আগে সেইফ রাখতে হবে।

রিফাত বলল, ছেড়ো না এখনই। তোমার সময়ও তো পার করতে হবে। তুমি বরং তাদেরকে আরও ১ মাসের লিভ চেয়ে এপ্লিকেশান কর।

শাম্মা বলল, তারা বলবে সম্ভব না। তখন চাকরী ছেড়ে দেয়া ছাড়া আর গতি থাকবে না। তাহলে শুধু শুধু এপ্লিকেশান করে ছোট হওয়ার দরকার কি? এরচে’ এখনই ছেড়ে দেয়া ভাল।

রিফাত বলল, তোমার খুশি। চাইলে তুমি বুটিক হাউজও খুলতে পার। অথবা আমার সাথেই নেমে পড়তে পাড় ব্যবসায়। দেশে এখন পুরুষদের চেয়েও সফল অন্টারপ্রেনার অন্তত একশ জন আছে। তাদেরও এফবিসিসিআই এর মত অ্যাসোসিয়েশান আছে। নেমে দেখতে পার। জবের চেয়ে অন্টারপ্রেনার হওয়া হাজারগুণ ভাল। ফিন্যানশিয়াল আর মেন্টাল প্রেশার অনেক, but you don’t have any superior then। তবে এসব কিছুদিন পরের চিন্তা। আপাতত চল মরিশাস থেকে ঘুরে আসি। কিছুদিন সব কিছু থেকে দূরে থাকাটাই সবচেয়ে জরুরী এখন।

শাম্মা স্বাভাবিক হয়ে এল। জীবনে সে রিফাতকে পেয়েছে, কী সৌভাগ্যই না তার!



১১
স্থান মরিশাসের মারিয়ানা বিচ। সামনে শান্ত নীল সাগর। গোছানো বিচে সারি সারি নারকেল গাছ, আকাশ একদম পরিষ্কার নীল। বিকেলের আলোর তেজ কমে প্রচণ্ড মায়াময় আবহ সৃষ্টি হয়েছে। অসংখ্যা মানুষ হাঁটছে বিচে। তারপরও কী প্রশান্ত ভাব চারপাশে। রিফাত ও শাম্মা বসে আছে, সাথে নিহার।

আচ্ছা, আকাশ এত বড় কেন? আর কেন এত স্থির? ঢাকায় বসে আমরা যে আকাশকে দেখি, এখানেও সেই একই রকম। কীভাবে বল? – এমন প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যের কাছে এসে আবেগী হয়ে গেল দৃঢ়চেতা শাম্মা।

কারণ আকাশ আমার মত। বিশাল, সুস্থির আর সুদর্শন! – হাসতে হাসতে বলল রিফাত।
আহারে, এত মহৎ হলে আগে নিয়ে আসেন নাই কেন? - শাম্মার পাল্টা প্রশ্ন।
রিফাত বলল, পরে এসেছ দেখেই তো এত ভাল লাগছে! সৌন্দর্যে উপভোগ করতে ধৈর্য্য লাগে, এভাবে হলে তো হবে না। পরিণত হতে শেখ!
শাম্মা বলল, তুমি তো বেশি ম্যাচিউরড, বুড়ো ধাম! মাথার চুল তো এ কারণেই পড়ে যাচ্ছে!
এখানে এই পরিবেশেও দুঃখটা মনে করিয়ে দিলে! তুমি আসলে ভাল না। রাগ করেছি, আগামী ৩ মিনিট কথা বলব না! - রিফাতের অনুযোগ।
মজা করলাম। তুমি টাক হওয়া মানে তো আমারই সমস্যা। সবাই বলবে স্টেডিয়ামের বউ! – আবার মজা করল শাম্মা।

এবার সত্যি সত্যিই রাগ করল রিফাত। বলল, না, ৩ মিনিট না, ৩০ মিনিট কথা বন্ধ তোমার সাথে।

একদিন আগে গত হওয়া পূর্ণিমার আলোর জ্যোতি সামান্যই কমেছে। এ আলোয় তাদের সামনের সাগরের প্রতিটি ঢেউইয়ের ভাঁজ স্পষ্ট দেখা যায়। কানে বাজতে থাকে তরঙ্গের অবিরত হুঙ্কার।

তারপর নিশ্চুপ তারা। তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। ধীরে ধীরে নিজের কনিষ্ঠ আঙ্গুল দিয়ে শাম্মা রিফাতের হাত ধরল। তারপর একসময় সম্পূর্ণ হাত।

এভাবেই বসে থাকলে তারা।



১২
ধানমণ্ডিতে নতুন বাসায় উঠেছে রিফাত ও শাম্মা দম্পতি। সব কিছু আগ্রহ নিয়ে গোছাচ্ছে শাম্মা। সাথে মা, খালা, অন্ত, লিমা আর তার বাবা।

মাঝ রাত। বাসায় সবাই আছে। আবার শব্দ। গেস্টরুমে কেউ নেই, সেই রুমে জিনিস পড়ার শব্দ। মাঝে মাঝে মেয়ের গলার আওয়াজ, নাচ কিংবা নুপুরের ঝংকার।

সবাই আবার ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে গেল, আর হল হতাশ। এখানেও যদি হয় এসব, তাহলে আর কেন এত শখের এপার্টম্যান্ট ছেড়ে আসা?



১৩
পরদিন সকাল ১১ টা। ঝুম বৃষ্টি নেমেছে সারা শহরে। ঘণ্টা ছয়েকের বৃষ্টিতে মেইন রোড অথবা সব অলিগলি পানিতে নিমজ্জিত হয়ে গেছে। কিছু দিন আগে পানিতে ডুবে গিয়েছিল চট্টগ্রাম শহর। এবার কি ঢাকা ডুববে?

বিছানায় বসে খেলছে নিহার। অনেকগুলো খেলনা আর শোপিস দিয়ে। শাম্মার মা ভুলে এপার্টমেন্টের পার্টিতে পাওয়া কালো মূর্তিটাও খেলতে দিয়ে দিলেন নাতিকে।

বিছানার এই প্রান্ত-ওই প্রান্ত করে একসময় নিহার জানালার পাশে চলে গেল। তার হাতে অসম্ভব সুন্দর সেই মূর্তিটি। সে পেছনে তাকাল। তার মা-নানু আপু-অন্ত খালা সবাই গল্প করছে।

মাত্র বসতে ও কিছু ধরে দাঁড়াতে শেখা নিহার জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখতে লাগল। হঠাৎ করেই হাত থেকে কালো মূর্তিটা বাইরে ছুড়ে ফেলে দিল।

তারপর হয়ত তুমুল বৃষ্টি মূর্তিটিকে ধুয়ে মুছে দূরে টেনে নিয়ে যায়। অথবা টোকাইরা। অথবা আমরা জানি না এমন কেউ।







এরপর আর কোন দিন শাম্মার বাসায় ভূতুড়ে কিছু ঘটে নি। জীবনচক্র আগের মতই স্বাভাবিক গতিতে চলতে শুরু করল।

==============

Sazib
05.07.2012
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×