'আমরা জন্ম নেই মরে যাওয়ার জন্য। না, জন্মের মত মহান বিষয় নিয়ে হালকা বক্তব্য হয়ে গেল। অবশ্য, জন্ম কি সত্যিই মহান? সূচনাতে তো কোন চিন্তাই থাকে না, বরং কামই মানব জন্মপ্রক্রিয়ার একমাত্র কারণ।
কিন্তু জন্ম দিয়ে শুরু করলাম কেন? আমি তো জন্ম নিয়ে আমি ভাবিত নই। বরং মৃত্যুচিন্তায় উদ্বিগ্ন। খুব জানতে ইচ্ছে করছেঃ মারা যাওয়ার সময় মানুষ কি জানতে পারে যে সে মারা যেতে চলেছে? একটু পরই সে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস নিয়ে নিবে?
জানা তো উচিত - দীর্ঘ কিংবা স্বল্প মেয়াদের জীবন তার শেষ হয়ে যাচ্ছে, সে চলে যাচ্ছে জীবনমঞ্চ ছেড়ে; এটা সে জানবে না? চলেই যখন যাচ্ছে, আর কোন জীবন যেহেতু এরপর অবশিষ্ট নেই, তাহলে কেন তাকে জানানো হবে না?
আচ্ছা, যদি তাকে জানানো হয়, তখন তার অনুভূতিটা কেমন হয়? মনে মনে সে নিজেকে কীভাবে প্রস্তুত করে? অসম্ভব সুন্দর এই পৃথিবী থেকে পুরোপুরি বিদায় নিতে সে কি রাজি হয়? ভাগ্যবিধাতার কাছে আরেকটু সময় কি চায় না সে? চায় কি না আর কিছু দিন বেশি বাঁচতে?
যদি তাকে এই সুযোগ না দেয়া হয়, তাহলে কেন দেয়া হয় না? একটা মানুষ জগত ছেড়ে চলে যাবে, কেন তার শেষ ইচ্ছেটা পূরণ করা হয় না?
যদি না-ই দেয়া হয়, সৃষ্টিকর্তা কি তাহলে সত্যিই মহান? কীভাবে?'
লেখা বায়াসড হয়ে যাচ্ছে। আমি বোধহয় উত্তেজিত হয়ে গেছি। সৃষ্টিকর্তার মহানুভবতা এই এক বিষয় দিয়ে পরিমাপযোগ্য নয়। নাহ, এখন চা-বিরতি।
- গণি মিয়া, চাঁ দিয়ে যাও।
২
টেবিলে মাথা গুঁজে বসে আছি। এবং বিক্ষিপ্ত মনে চিন্তা করছি উপন্যাসের প্লট নিয়ে। গুছিয়ে কিছু ভাবতে পারছি না। কালকের মধ্য জমা দেয়ার কথা। পারব বলে মনে হচ্ছে না।
'স্যার চা নেন।' - গণি মিয়ার আগমনে মাথা ওঠাই। সে এত কাছে রাখে কাপ যে টেবিল থেকে হাত-মাথা তুলতে গিয়ে কাপটা উল্টে গেল। মেজাজ হঠাৎ প্রচণ্ড খারাপ হল, চড়ই বসিয়ে দিলাম তার গালে!
আর বললাম, আরেক কাপ চা আন। দ্রুত। গর্দভের মত কাজ করবে না।
৩
গণি মিয়াকে ইচ্ছাকৃতভাবে মারি নি। আগে কখনও হাত তুলি নি গায়ে। অন্য কারও গায়েও কি তুলেছিলাম কখনও? খারাপ লাগছে এখন।
সে আবার আসে, চা নিয়ে। উঠে দাঁড়িয়ে নিজ থেকেই এগিয়ে যাই। চা একপাশে রেখে তাকে নিচে বসতে বলি। এরপর সিগারেট ধরাই। অনুশোচনায় কাতর হয়ে আগ্রহ নিয়ে কথা বলতে শুরু করি তার সাথে।
- গণি মিয়া, আরেক কাপ চা নিয়ে আস। তুমিও খাও।
- না স্যার, আমি খাইসি আগে।
- ও। একটা উপন্যাস লিখছি, বুঝলে? কাল জমা দেয়ার কথা, অথচ শুরুই করেছি একটু আগে। তাও কীভাবে প্লট সাজাবো নিশ্চিত নই।
- স্যার, আপনি চাইলে দুই ঘণ্টায়ও লিখা ফেলতে পারেন।
গণি মিয়া না বুঝেই বলেছে, তারপরও কথাটা ভাল লাগল। আমি তৃপ্ত হয়ে বললাম, এক পাতাও লেখি নি এখনও, দাঁড়াও পড়ে শোনাই তোমাকে।
গণি খুশি হয়ে বলল, জী স্যার! স্যার চা খাইতে খাইতে বলেন, ঠাণ্ডা হয়ে যাইতেসে।
গণি মিয়া যেন খুব সাহিত্য সমঝদার, এভাবে পড়ছি আমি। ধীরে ধীরে, অনেকটা আবৃত্তি করে।
শেষ করা মাত্রই সে বলল, স্যার একটা কথা বলি?
- হ্যাঁ, বল।
- স্যার মানুষরে যদি মরার আগে সুযোগ দিত, তাইলে মাইনষে আর মরতেই চাইত না। যেই বজ্জাতের বজ্জাত !
হাহাহা। কথাটা একপেশে হলেও, খারাপ বলে নি সে। বিশ্লেষণ শেষে এই-ই দাঁড়ায়।
৪
আমার চা প্রায় শেষ। আমি ভাবার চেষ্টা করছি। কিন্তু প্রচণ্ডভাবে মাথা ধরেছে, একদমই হঠাৎ করে - যেন কেউ টান দিয়ে মস্তিষ্ক বের করে ফেলবে মাথা থেকে। বুকেও হঠাৎ ব্যাথ্যা করছে, আস্তে আস্তে সে ব্যাথা গলার দিকে যাচ্ছে, ব্যাথার চোটে ছোট হয়ে বসেছি, তবুও হাতে কলম - খাতার উপর।
গণি মিয়া দূর থেকে তাকিয়ে দেখছে। একটু বোধহয় মিটিমিটি হাসছেও। একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে বলল, স্যার কেমন লাগে? মরণের আগে কি বোঝা যায়? কিছু বোঝা যায়? যাইতে ইচ্ছে করে? রেডি হন স্যার!
ওর কথার অগ্রপশ্চাৎ কিছুই বুঝতে পারছি না। এক চড় খেয়েই কি বেচারা আউলে গেল? অবাক হয়ে বললাম, মানে? কী বল এসব?
গণি হেসে বলল, চাতে বিষ মিশাইছি। ভাল কইরা মিশাইছি!
আমি তাকিয়ে আছি - হিংস্র, লোলুপ ও অশান্ত চেহারার গণির দিকে। চোখ বন্ধ করব এরপর।
====০০০====
Sazib
20.10.2012
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে অক্টোবর, ২০১২ রাত ১২:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



