মেহেরুন রুনি-সাগর সারওয়ার জোড়া খুনের তদন্তকারী গোয়েন্দাদের এখন ব্যাপক কৌতূহল খোয়া যাওয়া একটি ল্যাপটপকে ঘিরে। তারা অনেকটাই নিশ্চিত, হত্যারহস্যের কেন্দ্রে রয়েছে ওই ল্যাপটপ। সাংবাদিক দম্পতি খুনের পর বিশেষ মহল থেকে উদ্দেশ্যমূলক নানা মুখরোচক কিচ্ছা-কাহিনী রটানো হলেও রহস্যের গভীরে এখন আলো ফেলছেন চৌকস গোয়েন্দারা। বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য।
হত্যাকাণ্ডের রাতে রুনি-সারওয়ারের ফ্ল্যাট থেকে অলঙ্কার, বিদেশি মুদ্রা, টাকা-পয়সা কোনো কিছুই নেয়নি খুনিরা; কিন্তু খোয়া গেছে সারওয়ারের নতুন ল্যাপটপ, আইপ্যাড ও মোবাইল ফোন। গোয়েন্দারা ধারণা করছেন, ল্যাপটপে এমন কিছু স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে�যা হাতিয়ে নেয়াই ছিল খুনিদের মিশন। ল্যাপটপ খোয়া যাওয়ার তথ্যটি তদন্তকারীদের নজরে আসতেই তাদের টেবিলে আসে বেশ কিছু প্রশ্ন।
খুনিচক্রের কী প্রয়োজন রয়েছে ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোনের? কী রয়েছে ল্যাপটপে? খুনিরা মূল্যবান জিনিসপত্র রেখে কেন নিয়ে যাবে তার রিপোর্টিংয়ের জন্য ব্যবহৃত ল্যাপটপ-নেটবুক? রুনির মোবাইল ফোনটি পাওয়া গেলেও সাগরের ব্যক্তিগত মোবাইলটি পাওয়া যায়নি। সাগর ও রুনি হত্যাকাণ্ডের পর গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়গুলো নিয়ে তদন্ত শুরু করেছেন গোয়েন্দারা। এ বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে এরই মধ্যে তদন্ত কর্মকর্তারা কাজ শুরু করেছেন বলে জানা যায়। এর মধ্যে এসব দিক সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়। যথাযথ ও আন্তরিকতার সঙ্গে এই মামলার তদন্ত হলে দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী হত্যারহস্য অন্যদিকেও মোড় নিতে পারে।
গোয়েন্দা পুলিশের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, সাগর-রুনি দম্পতি হত্যার পর প্রথমদিকে ঘটনার বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে তদন্ত করা হলেও এ মুহূর্তে অনালোচিত বিষয়কেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। তারা বলছেন, এটি তাত্ক্ষণিক কোনো হত্যাকাণ্ড নয়। চারদিনের তদন্তে মনে হয়েছে হত্যাকাণ্ডটি ছিল সুপরিকল্পিত। র্যাব, পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার স্থানটিতে (শয়নকক্ষে) জিনিসপত্র এলোমেলো এবং স্টিল আলমারি, ওয়্যারড্রবের ড্রয়ারগুলো খোলা থাকলেও সেখান থেকে কিছু খোয়া যায়নি। বেডরুমে অন্য একটি নষ্ট ল্যাপটপ, দুটি আইফোন, বিপুল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা ও ক্যামেরাসহ বেশকিছু দামি জিনিসপত্র পড়ে থাকলেও ঘাতকরা সেগুলো স্পর্শ করেনি।
ফ্ল্যাটের অন্য কোনো কক্ষে তারা মালামাল তল্লাশিও করেনি। গোয়েন্দাদের ভাষ্য, ডাকাতি বা চুরির উদ্দেশে কেউ ঘরে ঢুকলে এগুলো তারা নিয়ে যেত। এমনকি পরকীয়া বা নারীঘটিত বিষয়েরও আলামত পাওয়া যায়নি। রুনির লাশের ফরেনসিক পরীক্ষায় ময়নাতদন্তকারী চিকিত্সক নারী সংঘটিত অপরাধের আলামত পাননি বলে উল্লেখ করেছেন। খুনের ধরন দেখেও এটি স্বাভাবিক কোনো হত্যাকাণ্ড মনে হয়নি। তাদের পথ পরিষ্কার ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতেই প্রচণ্ড ক্ষোভে ওই দম্পতিকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় বলেই মনে হচ্ছে।
পারিবারিক সূত্র জানায়, সাগর দুটি ল্যাপটপ, একটি আইপ্যাড ও দুটি মোবাইল ফোন ব্যবহার করতেন। রুনি ল্যাপটপ ব্যবহার করতেন না। সাগরের ব্যবহার করা একটি ল্যাপটপ নষ্ট। এ কারণে সেটি তিনি কিছুদিন ধরে ব্যবহার করতেন না। হত্যাকাণ্ডের পর বাসা থেকে উদ্ধার করা ল্যাপটপটি ছিল নষ্ট। এটি অন্য কক্ষে ছিল। উদ্ধার করা দুটি মোবাইল ফোনের মধ্যে একটি ছিল সাগরের, অন্যটি রুনির। সাগরের এই মোবাইল ফোনটি কিছুদিন আগে মাছরাঙা টেলিভিশন দিয়েছিল। এটি তিনি অফিসের কাজে ব্যবহার করতেন। ফোন দুটি ও নষ্ট ল্যাপটপটি পুলিশ জব্দ করেছে। কিন্তু তার অন্য একটি ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নেই। একইসঙ্গে জার্মানিতে থাকাকালে কেনা আইপ্যাড ও ল্যাপটপটি খোয়া যাওয়ায় সন্দেহ ঘনীভূত হয়। এছাড়া বাসায় অনেক মূল্যবান জিনিস ছিল। রুনির ব্যবহার করা স্বর্ণালঙ্কারও যথাস্থানে পাওয়া যায়। তবে বাসার ওয়্যারড্রব, স্টিলের আলমারি ও টেবিলের ড্রয়ারগুলো খোলা অবস্থায় ছিল। ড্রয়ারের কিছু কাগজপত্র ছিল তছনছ অবস্থায় এবং ছড়ানো-ছিটানো। মনে হচ্ছে, ওই চক্র আরও কিছু কাগজপত্র খুঁজছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাগরের ল্যাপটপে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য ছিল। সম্প্রতি তিনি কিছু তথ্যউপাত্ত সংগ্রহ করেছিলেন। এসব তথ্য গোপনে তিনি ব্যক্তিগত ল্যাপটপে ধারণ করে রাখেন। দুর্বৃত্তদের টার্গেটই ছিল ওই তথ্যউপাত্ত। তারা যে কোনো উপায়ে সেগুলো নিজেদের দখলে নিতে ফাঁদ পাতে। তার ল্যাপটপ থেকে এই তথ্য দখলে নেয়ার জন্যই পরিকল্পিতভাবে বাসায় যায় দুর্বৃত্তরা। এতে বিপত্তি ঘটায় প্রচণ্ড ক্ষোভে সাংবাদিক দম্পতিকে হত্যা করা হতে পারে বলে সূত্রটি মনে করছে। সূত্রমতে, একটি প্রভাবশালী মহল সাংবাদিক সাগরকে রিপোর্টিং সংক্রান্ত বিষয়টি চেপে যেতে বলেছিল।
এ নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে আগে থেকেই সতর্ক করে দেয়; কিন্তু তারপরও সাগর তার কাজ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। রিপোর্টিং সংক্রান্ত বিরোধেই সাগরের প্রতি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয় ওই চক্রটি। এ ঘটনায় স্বামীর সঙ্গে নির্মম পরিণতির শিকার হতে হয়েছে স্ত্রী মেহেরুন রুনিকেও।
সূত্রটি আরও জানায়, দুজন সাংবাদিককে নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ডে জড়িত খুনিচক্রটি অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং অতি ক্ষমতাধর। এমনকি হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাও দেশের বাইরে কোনো স্থানে হতে পারে। গোয়েন্দা সূত্রটি আরও জানায়, এ কারণেই সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্তে সময় লাগছে। এমনকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বেঁধে দেয়া ৪৮ ঘণ্টা সময় তো পেরিয়ে গেছে। কবে নাগাদ এ হত্যার প্রকৃত তদন্ত সম্পন্ন হবে, তা-ও নিশ্চিত নয়। কেননা খোদ রাজধানীতে নিজ ফ্ল্যাটে সাংবাদিক দম্পতি এমন নৃশংসভাবে খুন হওয়া আইনশৃঙ্খলার জন্য একটি স্পর্শকাতর ঘটনা।
নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, প্রচণ্ড কোনো বিরোধকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। তদন্তকারী এক কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, একই সঙ্গেই খুন করা হয় রুনি ও সাগরকে। পরে আলামত দেখে মনে হয়েছে, সাগরকে খুন করার সময় রুনি এগিয়ে গেলে তার পেটে আঘাত করে ঘাতকরা। সাগরের হাত-পা বাঁধা এবং শরীরে ২৫টি জখম থাকলেও রুনির রয়েছে মাত্র তিনটি। তবে প্রাথমিক তদন্তে রুনি আগে খুন হয়েছেন বলেও ধারণা করা হয়েছিল। কারণ লাশ উদ্ধারের সময় রুনির শরীর (ঘাড়) শক্ত ছিল। রক্তও জমাটবাঁধা ছিল।
পারিবারিক সূত্র আরও জানায়, সাগর এনার্জি বিটের রিপোর্টিং করতেন। এই বিটের রিপোর্টিং করতে গিয়ে তিনি প্রচণ্ড ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন বলে পরিবারকে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু এতে তিনি ভীত হননি বা কখনও হুমকি বলে মনে করেননি। বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব না দেয়ায় কারও সঙ্গে আলাপ বা নিরাপত্তাহীনতা মনে করে জিডি করেননি। কিন্তু এখন পরিবার এসব বিষয় নিয়েও ভাবছে। তারা বিষয়টি তদন্ত সংস্থাকেও জানিয়েছে। পরিবারের ধারণা, খুনিরা বাসায় সাগরের কাছে কিছু চেয়েছিল। সাগর এতে বাধা দেয়ায় তার ওপরই আগে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
এদিকে পুলিশের তেজগাঁও জোনের ডিসি ইমাম হোসেন বলেন, সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যা মামলাটি একটি স্পর্শকাতর মামলা। এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে সাগরের রিপোর্টিং সংক্রান্ত বিষয়কে। ডিসি ইমাম হোসেন বলেন, সাগর এনার্জি সংক্রান্ত রিপোর্ট করতেন। এ রিপোর্টের কারণে কোনো মহল তার ওপর ক্ষিপ্ত থাকতে পারে। এসব বিষয় মাথায় রেখে সোমবার রাতে মাছরাঙা টেলিভিশনে সাগরের কর্মস্থলে গিয়ে তার ব্যবহার করা কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। সাগরের উল্লেখযোগ্য রিপোর্টিংয়ের কিছু ডুকমেন্টও সংগ্রহ করা হয়েছে।
এগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে। রিপোর্টিংয়ের কারণে কোনো মহল তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিশোধ নিয়েছে কি-না, সেই দিকটিতে এখন বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। পুলিশ কর্মকর্তা ইমাম হোসেন আরও বলেন, রিপোর্টিং ছাড়া সাগর বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি করতেন। তার রচিত একাধিক গ্রন্থ রয়েছে। লেখালেখি ও রিপোর্টিংয়ের দিক খতিয়ে দেখে হত্যার কারণ ও ঘাতকদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। তবে অনুমাননির্ভর কোনো তথ্য আমরা দিতে পারব না। হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে এতদিন যেসব ধারণা করা হয়েছিল, হয়তো এর মোড় অন্যদিকে নিতে পারে। তিনি আরও বলেন, এখন পর্যন্ত মিডিয়ার কেউ জড়িত রয়েছে�এমন তথ্য আমাদের কাছে নেই।
তিনি বলেন, আলোচিত এই হত্যামামলা তদন্ত করতে গিয়ে অজ্ঞাত কিছু লোক আমাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। দেশের বাইরে থেকেও অজ্ঞাত ব্যক্তির ফোন আসছে। এছাড়া দেশের লক্ষ্মীপুর ও মাদারীপুর থেকে ফোন করে হত্যাকাণ্ডের তথ্য দিতে চাচ্ছে অচেনা লোকজন। এমনকি লন্ডন থেকেও ফোন করা হয়েছে বলে জানান ওই পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ড ভিন্নদিকে প্রবাহিত করতে অথবা ব্যক্তিগত কোনো কারণে দেশ-বিদেশ থেকে এভাবে তদন্তকারীদের কাছে অজ্ঞাত ফোন কি-না, খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, যেভাবেই হোক পুলিশ কোনো কিছুতে বিভ্রান্ত হচ্ছে না। সবকিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সামনে এগোচ্ছে পুলিশ।
প্রসঙ্গত, গত শনিবার সকালে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া ফ্ল্যাট থেকে মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সারওয়ার ও এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোর্টার মেহেরুন রুনির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সারওয়ারকে অসংখ্য ছুরিকাঘাতে ও মেহেরুনকে পেটে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



