আমাদের জীবন এখন প্লাস্টিকে জড়ানো। প্লাস্টিকময় বা প্লাস্টিক-নির্ভরও বলা যায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যবহার্য জিনিসপত্রের প্রায় সবই প্লাস্টিক-নির্মিত বা কোনো না কোনোভাবে প্লাস্টিকের সঙ্গে সম্পর্কিত। হিসাব করতে বসলে মাথা ঘুরে যাবে। অক্সিজেন ছাড়া যেমন বাঁচার উপায় নেই, প্লাস্টিক ছাড়া তেমনি জীবনও যেন যাই যাই করে। এটি সহজে ভাঙে না, মচকে না, ছিঁড়ে না, ফাটে না। এসব বৈশিষ্ট্যই একে দিয়েছে জনপ্রিয়তা, করে তুলেছে বিশ্বজয়ী।
এই রাজধানী শহরের যেকোনো রাস্তার ওপরে, পাশে কিংবা পুরো রাস্তাজুড়েই রয়েছে ‘নজরকাড়া’ ও ‘অতিশয় মনোহর’ ডাস্টবিন। হাতেগোনা দু-চারটি বাদ দিলে প্রায় সব রাস্তাতেই এই ডাস্টবিন চোখে পড়ে। যেকোনো একটি ডাস্টবিনের পাশে দুই মিনিট দাঁড়িয়ে থাকুন, দেখবেন প্লাস্টিক কিংবা পলিথিনের ছড়াছড়ি। খুব কষ্ট হলে নাকটি চেপে ধরে হলেও কাজটি করুন। ন্যূনতম বোধশক্তিসম্পন্ন মানুষও আতঙ্কিত না হয়ে পারবেন না। এ যে রীতিমতো দৃশ্যদূষণ! এজাতীয় দূষণ থেকে কত বড় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে, সেই ভাবনাও আমাদের নেই।
বড় বড় মালার মতো অণু, একটি বা দুটি পুঁতি দিয়ে গাঁথা এই প্লাস্টিক। পুঁতিগুলো হলো নানা জাতের রাসায়নিক পদার্থ, যার উত্স সাধারণত পেট্রোলিয়াম। কাজেই প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করা গেলে পেট্রোলিয়ামের ওপরও চাপ কম পড়ে। কিন্তু বিপদটা হলো, এই মালা থেকে খুলে গিয়ে দু-একটা পুঁতি বা এর ভগ্নাংশ প্রকৃতিতে মিশে যেতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা যায়। এই ছোট্ট টুকরাগুলো মানুষের শারীরবৃত্তীয় নানা কাজে গোল পাকাতে পারে।
স্বচ্ছ পেট বোতলগুলো আমাদের গৃহস্থালির অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব বোতলে প্রায়ই ব্যবহূত হয় বিসফেনল নামে একটি রাসায়নিক পদার্থ। সংক্ষেপে বিপিএ। এই বিপিএ হলো একধরনের এন্ডোক্রাইন ডিসরাপ্টার। এক গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরের নানা কাজ-কর্ম নিয়ন্ত্রণ করে বিভিন্ন অন্তঃস্রাবী রস ও হরমোন। এসব রস ও হরমোন উদ্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে কয়েকটি বিশেষ ক্ষেত্রকে উদ্দীপ্ত করে। এন্ডোক্রাইন ডিসরাপ্টারগুলো কার্যত নকল করে এই অন্তঃস্রাবী রসকে এবং আসল হরমোনের জায়গায় গিয়ে হাজির হয় এই নকলটি। ফলে যে ঘটনা ঘটার কথা ছিল না, তা ঘটতে থাকে।
গবেষকেরা বলছেন, বিপিএ গর্ভস্থ ইঁদুর শাবকের মগজে কিছুটা পরিবর্তন ঘটাতে পারে। এটি যে মানুষের ক্ষেত্রেও ঘটবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এ জন্য আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন। কিন্তু তত দিনে পৃথিবীতে জন্ম নেবে আরও বহু শিশু, যাদের মায়েরা বিপিএর প্রভাবগ্রস্ত।
পুরোনো প্লাস্টিক গলিয়ে নতুন প্লাস্টিকে লাগানোর একটি সুযোগ আছে। কাগজ বা কাচের বেলায় এমনটি করা যায়। কিন্তু পুনর্ব্যবহারের চক্রটি সব প্লাস্টিককে ফিরিয়ে আনতে পারে না। এ ছাড়া সব প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারযোগ্যও নয়। তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো খাবারদাবারের মোড়কে ব্যবহূত প্লাস্টিক। সেখানে প্লাস্টিকের সঙ্গে থাকে ধাতুসহ আরও অনেক কিছুর আস্তরণ। আজ থেকে প্রায় আড়াই বছর আগে ভারত সরকার পুনর্ব্যবহারের অযোগ্য প্লাস্টিক বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও বাংলাদেশ সরকার এখনো তা করেনি। এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের দেশে এটি হচ্ছে না, বরং পুনর্ব্যবহারের অযোগ্য প্লাস্টিক বিভিন্ন কাজে লাগানোর প্রক্রিয়া চলছে। এসব প্লাস্টিক উচ্চ তাপমাত্রায় গলিয়ে একধরনের জ্বালানি তেল উত্পাদন করা সম্ভব। আর এই কাজে ইতিমধ্যে একটি কোম্পানিকে অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে।’
ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আইন চূড়ান্ত হয়েছে। অনুমোদনও করা হয়েছে। পরিবেশ আইনের আওতায় এই আইন কার্যকর হলে যেখানে-সেখানে ময়লা ফেললে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।’

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



