সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সংসদে 'অন্তর্বর্তীকালীন' সরকারের নতুন 'ফর্মুলা' তুলতে পারে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। সংসদের চলতি অধিবেশনের মেয়াদ বাড়ালে এ অধিবেশনেই যোগ দেবে তারা। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধ নিরসনে সমঝোতার উদ্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে নমনীয় হতে পারে প্রধান বিরোধী দল। আগামী ১২ মার্চ মহাসমাবেশ থেকে তারা বড় ধরনের কর্মসূচি নাও দিতে পারে। দলের একাধিক নীতিনির্ধারক নেতার সঙ্গে আলাপ করে এ তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, 'অন্তর্বর্তীকালীন' সরকারের নতুন 'ফর্মুলা'য় মূলত প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের বিষয়টিকেই বেশি 'গুরুত্ব' দিচ্ছে বিএনপি। সাবেক প্রধান বিচারপতিকে আর 'তত্ত্বাবধায়ক' বা 'অন্তর্বর্তীকালীন' সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পদে মানবে না তারা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দাবি মেনে নিলে মূলত 'প্রধান উপদেষ্টা' নিয়োগের বিষয়টি নিয়েই সরকারি দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে 'দরকষাকষি' করবে দলটি। বিলুপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের বিষয়টি ছাড়া বাকি উপদেষ্টা নিয়োগ, কার্যক্ষমতা, মেয়াদকালসহ প্রায় সব বিষয় আগের মতোই থাকছে বিএনপির 'ফর্মুলায়'।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যরিস্টার মওদুদ আহমদ সমকালকে বলেন, তারা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তীকালীন যে কোনো নামেই সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন চান। এক্ষেত্রে সরকারি দলকেই আগে 'ফর্মুলা' দিতে হবে। তিনি মনে
করেন, বিএনপি আগে কোনো ফর্মুলা দিলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকারি দল তা বাতিল করে দেবে। তবে রাজনৈতিক সমঝোতা হলে তারাই আগে ফর্মুলা দিতে পারেন।
বিএনপির নতুন ফর্মুলায় কী থাকছে_ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা বলার এখনও সময় আসেনি। সময় হলে সংসদে বা আলোচনার টেবিলে তাদের প্রস্তাব উত্থাপন করবেন।
নতুন 'ফর্মুলা'য় প্রধান উপদেষ্টাকে প্রাধান্য দেবে : সূত্র জানায়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তির বিরোধিতা করলেও বিচার বিভাগকে 'বিতর্কের ঊধর্বে' রাখতে বিচারপতিদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা না করতে উচ্চ আদাতের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একমত বিএনপি। তারাও বিচার বিভাগকে 'বিতর্কে'র ঊর্ধ্বে রাখতে সাবেক প্রধান বিচারপতিদের আর প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে চায় না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নতুন ফর্মুলায় 'অন্য পেশা' থেকে অবসরপ্রাপ্ত নির্দলীয়-নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগের প্রস্তাব করবে বিএনপি।
১৯৯৬ সালে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিরোধী দলের আন্দোলনের মুখে ২৮ মার্চ সংবিধানে ১৩তম সংশোধনী এনে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি। ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় 'বিকল্প' থাকলেও এক নম্বরেই ছিল সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিধান। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর উচ্চ আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হলে বিএনপি তা পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন করছে।
দলের নীতিনির্ধারকদের মতে, সাবেক প্রধান বিচারপতিদের মধ্য থেকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ দেওয়ায় বিচার বিভাগ 'বিতর্কিত' হয়ে যাচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তির রায়ের পর্যবেক্ষণেও উচ্চ আদালতকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে বিচারপতিদের উপদেষ্টা করে রাজনীতিতে জড়িত না করার পক্ষে মত দেওয়া হয়েছে। অতএব, ন্যায়বিচারের আশা-আকাঙ্ক্ষার 'একমাত্র স্থল' উচ্চ আদালত 'বিতর্কিত' হয়ে পড়লে মানুষের কোথাও গিয়ে দাঁড়ানোর জায়গা থাকবে না।
উচ্চ আদালতের রায়ের বিরোধিতা করলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অন্য সব ধারা-উপধারা বহাল রাখতে চাইবে বিএনপি। শুধু আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিধান অনুযায়ী প্রধান উপদেষ্টা পদে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নিয়োগ না দেওয়ার বিপক্ষে 'অন্য উদ্দেশ্য' কাজ করছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার আগের বিধান মানতে গেলে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকই প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার কথা। বিএনপি খায়রুল হককে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে যে মেনে নেবে না তা ইতিমধ্যে স্পষ্ট করা হয়েছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তীকালীন যে কোনো নামেই একটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন হতে হবে। তারা আশা করেন, সরকার এ বিষয়ে সংসদে বিল আনবে।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক সমকালকে বলেন, তারা সংসদে যোগ দিতে চান। সরকারি দল তাদের সংসদে যোগ দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করছে না।
সূত্র জানায়, সংঘাতপূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এড়িয়ে 'ইতিবাচক' মনোভাব পোষণ করে সংসদে ফিরবে বিএনপি। সংসদের চলতি অধিবেশন নির্ধারিত কার্যদিবস বাড়ালে এ অধিবেশনেই যোগ দেবে দলটি। সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে ৮ মার্চ পর্যন্ত এ অধিবেশনের কার্যদিবস নির্ধারিত হয়। অধিবেশনের কার্যদিবসের মেয়াদ না বাড়ালে বিএনপির সাংসদের সদস্যপদ রক্ষায় কোনো সমস্যা হবে না। মেয়াদ বাড়ালে সদস্যপদ রক্ষার জন্যও সংসদে যেতে হবে। বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়াসহ বেশ ক'জন সাংসদ সংসদে সর্বোচ্চ ৫৩ দিন অনুপস্থিত রয়েছেন।
কঠোর কর্মসূচি দিচ্ছে না : সমঝোতা প্রক্রিয়া ছাড়াও গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর দেশব্যাপী সহিংস ঘটনায় সৃষ্ট 'নেতিবাচক' ভাবমূর্তি থেকে দলকে রক্ষা করতে আপাতত সংঘাতের রাজনীতি এড়িয়ে চলতে চাইছেন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
ইতিমধ্যে বিএনপির পক্ষ থেকে একাধিকবার সরকারি দলের সঙ্গে আলোচনায় বসার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। এ নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। ফলে উভয় দলই কিছুটা নমনীয় হচ্ছে বলে সবার ধারণা। সম্প্রতি খালেদা জিয়াও তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসে যে কোনো নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনায় প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন। সোমবার ১৪ দল বৈঠক করে বিএনপির মহাসমাবেশের দিন কর্মসূচি না দিয়ে একদিন আগে মানববন্ধন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সমকালকে বলেন, আমরা শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করব। সরকারের মনোভাবের ওপর নির্ভর করবে আমাদের সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, তারা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করবেন। বড় ধরনের কোনো কর্মসূচি দেওয়ার বিষয়ে তারা এখনও দলীয় ফোরামে আলোচনা করেননি।
সূত্রমতে, মহাসমাবেশ সফল করতে প্রায় এক মাস আগে মাঠে নামলেও তা শুধু ব্যাপক শোডাউনের প্রস্তুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। কর্মসূচি সফলের নামে হঠকারী কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না দলটি। কেন্দ্র থেকে গঠিত ৪৫ সমন্বয় কমিটির নেতারাও সেভাবে কাজ করছেন।
বিএনপির সিনিয়র নেতাদের ক'জনের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, রাজনৈতিক সমঝোতায় বিএনপির আগ্রহ রয়েছে। কূটনীতিকদের সঙ্গে আলোচনায় তারা সমঝোতার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। সরকার থেকে নিশ্চয়তা পেলে যে কোনো সময় যে কোনো স্থানে আলোচনায় বসতে রাজি তারা। শুধু সরকারকে বলতে হবে_ নির্দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে।
সমকাল, Wed 22 Feb 2012

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



