পর্ব ২:
মালেশিয়ান এয়ারবাস আমাদের কুয়ালালামপুর থেকে সিউলে নিয়ে যাচ্ছে। খাবার-দাবার যেসব দিল, তেমন খেতে পারলাম না। দেখলাম, এয়ার হোস্টেসরা বিয়ার/মদও অফার করছে স্বল্প পরিসরে। কেউ চাইলে দিবে, না চাইলে দিবে না, অনেকটা এরকম। তারপরও, একটি মুসলিম দেশের এয়ারবাসে এসব দেখে আমি কিছুটা মন:ক্ষুন্ন হলাম। আমার মনে হচ্ছিল, ব্যবসার জন্য হলেও তাদের এটা করা উচিত হচ্ছে না।
এরপরে আরও খারাপ লেগেছে, ফজরের নামাজ পড়ার জন্য যখন কোন জায়গা পেলাম না। সাধারণত, এয়ারবাসে হয়ত: নামাজের জায়গা থাকেনা। তবে আমি আশা করেছিলাম, মডারেট মুসলিম দেশ মালেশিয়ার এয়ার বাসটিতে থাকবে। মিডিয়া থেকে মালেশিয়ার মানুষদের ধর্মপরায়নতা সম্পর্কে কিছুটা জেনেছি। মাহাথির মোহাম্মদ তখনও প্রধানমন্ত্রী। আমার কাছে খুব সম্ভব একটি পাতলা জায়নামাজ সঙ্গে ছিল। আমি একাধিক কর্মচারীকে বললাম, যেকোন জায়গায়, এমনকি ওরা যেখানে থাকে বা খাবার-দাবার রাখে সেখানে, ৫ মিনিট নামাজের জন্য জায়গা দিতে। তারা দেয়নি। হ্যাঁ-না করে এড়িয়ে গেল। খুব কষ্ট পেলাম।
যা হক, সকাল সাতটার দিকে (২০ অক্টোবর ২০০৩) সিউলের আন্তার্জাতিক বিমান বন্দর incheon এ এসে মালেশিয়ান এয়ার বাস থামল। আমার কনফারেন্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান (প্রথম দিন) সকাল ৯ টায় শুরু হওয়ার কথা। আমি আশান্বিত হলাম যে নির্দিষ্ঠ সময়ের মাঝে কনফারেন্সের জন্য নির্দিষ্ট Ellui হোটেলে পৌঁছতে পারব।
উল্লেখ্য, সিউলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়ার আগে ইন্টারনেটের মাধ্যমে আমার থাকার ব্যবস্হা করেছিলাম উত্তর সিউলের (অনেকটা পুরান ঢাকার মতো) একটি ব্যাগ-এন্ড-ব্যাগেজ (bag&baggage) হোটেলে। Ellui হোটেলেটি দক্ষিণ সিউলের ঝাঁকঝমকপূর্ণ এলাকায়, যেখানে থাকা-খাওয়া অনেক expensive । ভাবলাম কনফারেন্সের হোটেলে গিয়ে নাস্তা সারব, কারণ ওখানে সকালের নাস্তা ও দুপুরের লাঞ্চ সহ ২টি চা বিরতির ব্যবস্হা ছিল। কনফারেন্সের প্রথম দিন শেষে বিকেলে bag&baggage hotel এ উঠব রাতে থাকার জন্য। পরেরদিন ট্রেন বা বাসে আবার Ellui হোটেলে এসে কনফারেন্সে এটেন্ড করব।
আমি বিমান থেকে নেমে প্রাত:ক্রিয়া সেরে ও দাঁত ব্রাশ করে হাত-মুখ ধুয়ে নিলাম। এরপর ইমিগ্রেশনের দিকে এগিয়ে গেলাম। হাতে ছিল ২ টি ব্যাগ। একটি ব্যাগ থেকে পাসপোর্ট, কনফারেন্সের invitation letter, ও আরো ২-১ টি দরকারী কাগজ হাতে নিলাম। নির্দিষ্ট লাইনে দাঁড়িয়ে একটি রুমের ভেতর থাকা ইমিগ্রেশন অফিসারের মুখোমুখি হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি। সময়মত ডাক আসলে একজন ইমিগ্রেশন অফিসারের কাছে গেলাম। তিনি অল্প ভাঙ্গা ইংরেজিতে আসার কারন জানতে চাইলেন। আমি কনফারেন্সে যোগ দেয়ার কথা বলে পাসপোর্ট ও কনফারেন্সের invitation letter এগিয়ে দিলাম। উনি ওগুলো হাতে নিয়ে পাসপোর্টের দিকে একনজর দেখে বললেন, come । ঐ রুম থেকে বেরিয়ে সকলের সামনে দিয়ে আমাকে অন্য দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। লজ্জা লাগছিল, অন্যরা হয়ত: আমাকে অপরাধী ভাবছে মনে করে। আমি বুঝতে পারলাম কোন ঝামেলা করবে। তাই তাকে কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, What is the problem with my papers? তিনি কোন উত্তর না দিয়ে শুধু বললেন, come.
এরপর তিনি আমাকে একটি রুমে নিয়ে গিয়ে চেয়ারে বসতে বললেন। অন্য একজন অফিসার কে আমার পাসপোর্ট ও কাগজপত্র দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। আমি নতুন অফিসারকে সবিনয়ে আমার আসার কারণ উল্লেখ করে ও ফিরতি টিকেট দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আমার কোন সমস্যা আছে কিনা। কেন আমাকে বসিয়ে রাখা হয়েছে। তিনি আগের অফিসারের মতো কোন কথা না বলে শুধু বললেন, sit.
আমি অসহায়ের মতো বসে রইলাম। এদিকে পেটের ক্ষিধে চরমে। মালেশিয়ান এয়ারবাসে ভালমত খেতে ও ঘুমাতে পারিনি। টেনশন হচ্ছিল। পাশের একটি ছোট রুমে দেখলাম, chinese, thai, vietnamese, indian চেহারার আরো কিছু যাত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। এদের কয়েকজন নারী। অনেকের রিটার্ন টিকেটও নেই। ওদের কেউবা হাউ মাউ করে কাঁদছে। একজন বাংলাদেশী ছাত্রের দেখা পেলাম। তিনি সিউলের কোন এক ইউনিভার্সিটিতে পড়তে এসেছেন। এদের অনেকে প্রয়োজনীয় কাগজ-পত্র দেখালেও ছাড়া হচ্ছে না। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সহ উল্লেখিত দেশের নাগরিকদের এক মেয়াদে সর্বোচ্চ ৯০ দিনের ভিজিটর হিসেবে কোরিয়াতে ঢুকা যাবে এধরনের নিয়মের কারনে আমাদের কারও পাসপোর্টে কোরিয়ান ভিসা থাকার প্রয়োজন ছিল না। আমি যাত্রার আগে কোরিয়ান হাইকমিশনে আমার গমনের কারণ বললে, তারা আমার ভিসা লাগবে না বলে জানিয়েছেন।
সময় চলে যাচ্ছে। ১০টা। ১১ টা। ১২ টা। আমি মাঝে মাঝে অধৈর্য হয়ে রাগ করে অফিসারটিকে বলছিলাম, you should say what is the problem with me? if there is any problem, let me go back. otherwise, please do not keep me waiting. my conference time is passing.
দুপুর ১টার দিকে আমাকে এক অফিসার ডেকে কাগজপত্র দেখে তাজ্জব হয়ে গেলেন। দুই-তিনজন অফিসার নিজেদের মধ্যে অল্প ইংরেজি ও কোরিয়ান ভাষায় যা বলল, তাতে বুঝলাম, আমাকে ভুল করে আটকে রাখা হয়েছে এতক্ষণ। সম্ভবত: একজন উর্ধ্বতন অফিসারকেও ডেকে আনা হল। তাড়াতাড়ি আমার পাসপোর্টে সিল মেরে ইমিগ্রেশন পার করে সিউলে ঢুকার গেইট দিয়ে একজন অফিসার এগিয়ে দিলেন। আমি আশ্চর্য হলাম, সভ্য দেশের এসব ইমিগ্রেশন অফিসারদের কেউই তাদের এই অনকাঙ্খিত আচরণের জন্য কোন দু:খ প্রকাশ বা sorry শব্দটি পর্যন্তও বললেন না।
উল্লেখ্য, অনেক পরে কনফারেন্সে থেকে ফিরে এয়ারপোর্টে আমাকে হয়রানির সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে বন্ধুদেরকে জিজ্ঞস করলে তারা বলল, বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেখেই তারা আমাকে ধরেছে। ওদের হয়ত: আমার প্রতি সন্দেহ ছিল, কারণ অনেক মানুষ বিনা ভিসায় কোরিয়াতে ঢুকে অবৈধভাবে কাজ করা শুরু করে। ইমিগ্রেশনে বসা অন্যান্য দেশের লোকজনদেরও একই কারণে সন্দেহ করতে পারে, যেহেতু কারও ভিসা এবং কারো কারো রিটার্ন টিকেটও ছিল না। কোরিয়ান মালিকরা সরকারীভাবে শ্রমিক আনার চেয়ে এধরনের শ্রমিকদের কিছুটা কম বেতনে কাজে লাগান। এরকম অবৈধ শ্রমিকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় কোরিয়ান সরকার ও পূলিশকে বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হয়েছে।
আরেকটি সম্ভাব্য কারণও পরে জানতে পারলাম। ঐ ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা ইংরেজিতে অতি দূর্বল ছিলেন। আমি কনফারেন্সের ম্যানেজারকে এব্যাপারে পরে বিস্তারিত বললে, উনি এই কারণটি বললেন ও পরের বছর থেকে কোরিয়ান ও ইংরেজি দুই ভাষায় invitation letter পাঠাবেন বললেন। ভদ্র মহিলা আমাকে কষ্টে পড়ার জন্য দু:খ প্রকাশ করলেন। কনফারেন্স থেকে ফেরার আরও কয়েক মাস পরে পত্রিকায় পড়লাম, সিউল ইমিগ্রেশনে লাগাতার অভিযোগের প্রেক্ষিতে ইংরেজীতে দক্ষ অফিসার নিয়োগ দেয়া হয়েছে!
যা হক, আমি এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে বাসের উদ্দেশ্যে এগিয়ে গেলাম। সময় দুপুর ১টার উপরে। বাইরের কিছুটা মুক্ত বাতাস নিতে পেরে শান্তি লাগছিল। তবে ক্ষিধেয় ঠোঁট-মুখ সব শুকিয়ে গেছে। মাথা ঝিমঝিম করছিল। অনেক্ষণ পরে মনে হল, আমি গতকাল রাতে ৮-৯টার দিকে শেষবার কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্টে কিছু পেটে দিয়েছিলাম। এরপর প্রায় ১৭ ঘন্টা আমি তেমন কিছু খাইনি।
সামনে একটি বাসে উঠে ড্রাইবারকে কোথায় যাব কোরিয়ান ভাষায় ঠিকানা ও ম্যাপ দেখালাম। ড্রাইভার ম্যাপ দেখে বলল, সে আমাকে নির্দিষ্ঠ জায়গায় নামিয়ে দেবে। আমি বাসের সিটে বসে গা এলিয়ে দিলাম। উদ্দেশ্য Ellui হোটেলে গিয়ে কোন মতে লাঞ্চের প্যাকেটটি যদি পাই!
পরবর্তী পর্ব: সিউলের রাস্তায় একটি ক্ষুধার্ত দিন।
ছবির সূত্র: এখানে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

