আমানত ও ঋণের সুদের ব্যবধান তথা মুনাফা: ব্যাংকের প্রধান আয়ের উত্স ঋণের উপর অর্জিত সুদ যা আমানতের উপর সুদ অপেক্ষা অধিক। এ ব্যবধান যত বেশি হবে, ব্যাংকের মুনাফাও তত অধিক হবে। দ্বিতীয় আয়ের উত্স বিনিয়োগের উপর মুনাফা। তারল্য স্থিতিশীল রাখার উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বারা নির্ধারিত বিনিয়োগ যেমন ব্যাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত নগদ (CRR) ট্রেজারী বিল, সরকারি বন্ড (SLR) ইত্যাদি বিনিয়োগ করা বাধ্যতামূলক। বাকি বিনিয়োগ ব্যাংক নিজেই বেছে নিতে পারে, তবে তালিকাভুক্ত কোম্পানীর শেয়ারে আমানতের ১০%-এর অধিক বিনিয়োগ করতে পারবে না। অতিরিক্ত ঋণ প্রদান বা অবৈধ ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করার ফলে যে তারল্য সংকটের সৃষ্টি হয় সেটা কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময় লাগে না যদি ঐ ব্যাংকের কু-ঋণ অনাদায়ী না থাকে। কু-ঋণ থাকলে তার বিপরীতে Provision বা সঞ্চিতি থাকতে হবে যাতে মুনাফা ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো না হয়। কু-ঋণ বাবদ সঞ্চিতির পরিমাণ যত বেশী হবে মুনাফা এবং তারল্য তত কমবে। ২০১০ সালে প্রায় প্রত্যেকটি বেসরকারি ব্যাংক আশাতীত মুনাফা অর্জন করায় লভ্যাংশ ও বোনাস শেয়ার প্রদান করেছে। নগদ লভ্যাংশ তারল্য কমালেও বোনাস শেয়ার তারল্যের উপর প্রভাব ফেলে না। ২০১০ সালে অধিকাংশ ব্যাংক বোনাস শেয়ার ঘোষণা করেছে যা তারল্যের উপর কু-প্রভাব ফেলেনি। তাহলে অনুমান করা যায় যে বর্তমান তারল্য সংকট সৃষ্টি হয়েছে হয়তো দুটি কারণে ব্যাংকগুলো যে অতিরিক্ত তহবিল শেয়ারে বিনিয়োগ করেছিল, তার কিয়দংশ এখনো বিক্রি করতে পারেনি, অথবা যে তহবিল দিয়ে অতিরিক্ত ঋণ প্রদান করেছিল তার কিয়দংশ কু-ঋণে পরিণত হয়েছে অথবা ঋণ গ্রহণকারী রুগ্ন হয়ে পড়েছে। অথবা শেয়ার ব্যবসায়ী আমানতকারী বা কারসাজি করে যে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করেছিল তা ব্যাংক থেকে উঠিয়ে বিদেশে পাচার করেছে। নিরীক্ষা পরিচালনা করলে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ প্রকৃত অবস্থা ধরা পড়ে যাবে।
শিল্পায়নে পুঁজি বাজার তথা ব্যাংক ঋণ:দেশের শিল্প-কারখানা স্থাপন, উন্নয়ন ও সমপ্রসারণে ব্যাংক এবং পুঁজি বাজারের ভূমিকা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক অবস্থায় শিল্প-কারখানা স্থাপনে উদ্যোক্তাকে শুধুমাত্র নিজের পুঁজির উপর নির্ভর করতে পারেন না, স্বভাবতই পুরো পুঁজি ও কার্যকরী মূলধন যোগানোর জন্য উদ্যোক্তাকে ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে হাত পাততে হয়। অতঃপর ব্যবসা বা কারখানাটি যথেষ্ট মুনাফা অর্জন করলে তার উন্নয়ন ও সমপ্রসারণের জন্য উদ্যোক্তা পুঁজি বাজারে শেয়ার বিক্রি করে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে পারে না। কিন্তু প্রাথমিক অবস্থায় ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। সুতরাং ব্যাংকিং সেক্টরে তারল্য সংকট বা মূলধন ঘাটতি দেখা দিলে ব্যাংকের ঋণ প্রদানের ক্ষমতা সংকুচিত হয়। ফলে দেশে শিল্পায়ন ও ব্যবসা পরিচালনা বাধাগ্রস্ত হয়। ব্যাংক অতিরিক্ত ঋণ বিতরণ করলে তারল্য ঘাটতি দেখা দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদী ঋণ কু-ঋণে পরিণত হলে মূলধন ঘাটতি দেখা দেয়। উভয় ক্ষেত্রে ব্যাংক উচ্চহারে সুদ প্রদান করে হলেও আমানত সংগ্রহ করে। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর বর্তমান অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তা শুভ লক্ষণ নয় । কারণ, উচ্চ সুদের হারে আমানত সংগ্রহ করলে উচ্চ সুদে ঋণ বিতরণ করতে হবে, কিন্তু শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করতে ইতঃস্তত করবে, ব্যবসার খরচ বাড়বে, যার ফলে মুনাফা কমবে। নতুন উদ্যোক্তারা শিল্প-কারখানা স্থাপনে এগিয়ে আসবে না। ফলশ্রুতিতে জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাবে। এজন্যই ব্যাংকিং সেক্টরের বর্তমান তারল্য সংকটের প্রকৃত কারণ অতি শীঘ্র উদঘাটন করে তার প্রতিকার করতে হবে যাতে ব্যাংকগুলো স্বাভাবিক তারল্য ফিরে পায় এবং ন্যায্য সুদে ঋণ দিতে পারে।
তাত্ক্ষণিক প্রতিকার:ব্যাংকের তারল্য সংকট আরও প্রকট হওয়ার পূর্বেই সরকার তথা বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রতিকারমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের CRR কমিয়ে দেয়া উচিত যাতে ব্যাংকগুলোকে মরিয়া হয়ে উচ্চহারে আমানত সংগ্রহ করতে না হয়। দ্বিতীয়ত, যেহেতু পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ রয়েছে সেহেতু পুঁজিবাজারকে চাঙ্গা করার জন্য অবিলম্বে তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা উচিত এবং দোষীদের বিচারের সম্মুখীন করা উচিত। তৃতীয়ত, ৫,০০০ কোটি টাকার তহবিল দিয়ে অবিলম্বে শেয়ার ক্রয় করা শুরু করা উচিত। ঋণ খেলাপীদের ঋণ আদায় বেগবান করাসহ মানিলন্ডারিং আইনে শেয়ার বিক্রির অর্থ পাচারকারীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত। ব্যাংকিং সেক্টরকে বাঁচানোর অর্থ সমগ্র দেশের বিনিয়োগ, শিল্প-কারখানা, ব্যবসাকে মন্দার হাত থেকে বাঁচানো এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে রক্ষা করা। আশা করি সরকার এগিয়ে আসবে।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জুন, ২০১১ সকাল ১০:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



