গাছের একটা ডাব যার ভেতর আধা লিটারও পানি থাকে না- নেহায়েত জরুরি প্রয়োজনেও তা কিনতে মূল্য পরিশোধ করতে হয় চল্লিশ টাকা! বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকতেও এ হেন অবস্থা। খেতে চাইলে একটা তরমুজ কিনতে হয় তিনশো টাকায়। অন্যায় মূল্য বৃদ্ধিতে কেউই যেন পিছপা হবার নয়। এ অশুভ প্রতিযোগিতায় একজন চুন-পানওয়ালা থেকে শুরু করে গরু-মহিষওয়ালা প্রত্যেকেরই যেন জয়ী হওয়া চাই। চুপি চুপি শলা-পরামর্শ চলে, গোপন বৈঠক চলে এই বক্তব্যে: সরকার বেতন বাড়িয়েছে, সবাই বেশি বেশি নিচ্ছে, আমরা বসে থাকবো ক্যান? ক্ষুদ্র একটা লিচু! তার দাম তিন টাকা করে পড়ে। সাধারণ মানুষের সস্তা লাল রক্ত যেন অসংখ্য রক্তচোষার হাতে প্রতিনিয়ত শোষিত হবার জন্য। একদিকে মূল্যওয়ালারা চুষছে, অন্যদিকে চুষছে ভাড়াওয়ালারা। রিকশা, বাস, ট্রাক, সিএনজি ভাড়া বার বার বাড়ে।
সবচেয়ে দুঃখজনক ভেনিস শাইলক বাড়িঅলাদের বছর বছর হাজারে-বিজারে ভাড়া বৃদ্ধি; তার ওপর নিদারুণ অসৌজন্যমূলক আচরণ— যা ডাকাতি-ছিনতাইকেও হার মানায়। কী করে একটা ফ্ল্যাটের ভাড়া বছরে দু’তিন হাজার টাকা করে বৃদ্ধি পায়? ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে আপত্তি করলে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বৃদ্ধির সঙ্গে তুলনা দেয়া হয়, না পোষালে অন্যত্র দেখতে বলা হয়, চাঁচাছোলা নোটিস করা হয়। একজন চাকরিজীবীর বেতন বছরে ক’টাকা বাড়ে? স্কেল পরিবর্তনই বা জীবনে ক’বার ঘটে? কোনো যুক্তিই খাটে না বিবেকহীন পাইলকদের কাছে। প্রতিবাদ করতে গেলে মাস্তানির দু’ঘা জুটবে কপালে সন্দেহ নেই। কোথায় যাবে সাধারণ মানুষ—তাদের হাত-পা বাঁধা ভদ্রতা নামক অসহায় সত্তা নিয়ে। এতসব অসঙ্গতির মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের ‘সবকিছু ঠিক আছে, স্বাভাবিক আছে’ বিবৃতি নিদারুণ পীড়াদায়ক। কেউ কেউ আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধির অজুহাত দেখান। তার সঙ্গে আমাদের আয়-রুজির সম্পর্ক কী? আমাদের মাথাপিছু আয় আর তাদের মাথা পিছু আয় কি এক? ওদিকে মজুতদারি, কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টির প্রয়াস ও ব্যাপক রয়েছে বাঁকাচোরা পথে। সবই জানেন জনগণ, সবই বোঝেন যথার্থই। তদুপরি অসহায় তারা। কিছুই যেন করার নেই। জনগণের জীবন-মান, সুখ-দুঃখ নিয়ে এসব নিষ্ঠুর পরিহাসের কোনোই কি প্রতিকার নেই? কোথায় বাস করছি আমরা? স্বাধীন দেশ, অথচ চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে শত প্রতারকের বীভত্স মুখচ্ছবি। কেউ মূল্য বাড়ায়, কেউ ভেজাল মেশায়, কেউ বুকে ছুরি মারে, কেউ ফাইল ঠেকায়, জীবন রক্ষাকারী ওষুধে বিষ, প্রাণদায়ী সিরিঞ্জে ভেজাল-শঠতার এমন নির্মম দৃষ্টান্ত কোথায় আছে আর? বিদেশি কোনো শক্তি সরাসরি বেয়োনেট ঠুকছে না আমাদের বুকে- এইটুকু ছাড়া আমরা সাধারণ মানুষরা কী পাচ্ছি স্বপ্ন বোনা সেই স্বাধীনতার কাছে? যেটুকুও বা পাবার থাকে তাও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় শত দানবের উদ্ধত গোগ্রাসে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



