স্বদেশ ছেড়ে পরে আছি বহুদুরে। তারপরও মনটা পরে থাকে দেশে। দেশের খবরের জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে থাকে। কিন্তু গত এক মাসের দুসংবাদ গুলো মনটাকে করে দিয়েছে বিষণ্ণ। চারিদিকে শুধু মৃত্যু আর মৃত্যু। প্রতিটা মৃত্যুর জন্য আমাদের দেশের সরকার দায়ী। এইসব দেখে শুনে ধাপে ধাপে আমার দেশে যাওয়ার ইচ্ছেটা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
আমার শুধু দেশে যেতে ইচ্ছে করে...দেশে গিয়ে অনেক কিছু করতে ইছে করে আমি অতি সাধারন তাই আমার ইচ্ছেও অতি সাধারন...বাংলাদেশের অধিকাংশ ছেলেই আমার ইচ্ছায় তাদের ইচ্ছার সহিত মিল খুঁজে পাবে...
কিন্তু এই সাধারন ইচ্ছে গুলই আজ আমার মাতৃভূমিতে অকাল মৃত্যুর কারন এক একটা যেন মায়ের বুক খালি করার বাবার স্বপ্ন কেড়ে নেয়ার মৃত্যুকূপ ।
ইচ্ছে আমার রাতের বেলা বন্ধুরা মিলে শান্ত নগরির নিস্তব্ধতা অনুভব করা...একপারা থেকে আর একপারা হেঁটে হেঁটে গল্প করা, ঠিক কাক ডাকা ভোর হওয়ার আগে চৌরাস্তার টং দোকানে গিয়ে চা খাওয়া। কিন্তু
ইচ্ছে আমার হুট করে বন্ধুরা মিলে বিশাল ওই সমুদ্র দেখতে যাওয়া, সমুদ্রের জলে নিজেকে একটু ভিজিয়ে নেয়া...সন্ধা নামলে বিশাল সমুদ্রের গর্জন শুনতে শুনতে সৈকতে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়ানো
ইচ্ছে করে চটগ্রামের হালিসহর বড় খালার বাড়ির দেয়াল টপকে পেছন দরজা দিয়ে ঢুকে চমকে দিতে। ইচ্ছে করে আগাম খবর না দিয়ে নানুকে দেখতে যেতে।
কিন্তু এই ইচ্ছাগুলো মরতে বসেছে...মরতে বসেছে দেশে যাবার ইচ্ছা...কেন দেশে যাব যদিনা আমার যা ইচ্ছে আমি করতে না পারি? আমিতো ঘরে বসে থাকার মত ছেলেনা।
আমি জানি আমার মা আমাকে আর রাতে বের হতে দিবেনা...এখনত আর ওই বয়সটা নাই না বলেই বের হয়ে যাব। আর বলে বের হতে চাইলে নিশ্চিত “না” শুনতে হবে। আমার মা আমাকে আর বের হতে দেবেনা। আমার মায়ের মনে দাগ কেটে আছে শবেবরাতের রাতে গণপিটুনিটে নিহত, রঙ্গিন সপ্নে ভেসে বেড়ানো ৬ টি নিরপরাধ কিশোরের ক্ষত বিক্ষত লাশ। প্রশাসনের অবহেলা আর নিরাপত্তা না দিতে পারার কারনে নিজেদের হাতেই নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব তুলে নেয়া আমিন বাজার এলাকার মানুষের অনেক অনেক দিনের ক্রোধের শিকার এই নিরপরাধ কিশোরগুলো। আমার দেশের আজ প্রতিটা মানুষ ক্রোধ পুশে আছে অন্তরে...অনিরাপত্তা থেকেই এই ক্রোধ মানুষকে করে তুলেছে নৃশংস, আর তারই শিকার এই নিরপরাধ কিশোর গুলো। দেশ মানুষ আমরা সবাই হয়ত ভুলে যাবো এই ঘটনা কিন্তু মায়ের মন কি তার সন্তানের কথা ভুলতে পারবে? পারবেনা। জানিনা আমার নিরপরাধ ভাইগুলো কতটা কষ্ট পেয়ে মরেছে আর তাদের মায়েরা কি পরিমান কষ্ট নিয়ে বেঁচে আছে।
আমি দেশে গিয়ে রাতে আর ঘুরতে বের হতে পারবোনা, মা যে যেতে দিবেনা। আমি জানি আমার অন্য বন্ধুরাও এখন আর রাতের নগরীতে হাঁটতে বের হয়না।
তারপর ভাবি রাতে না হয় ঘুরবনা ঘরেই থাকবো। প্রয়োজনে রাতে ঘুরার ইচ্ছাটা কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে গিয়ে মেটাবো। সমুদ্র আমাকে অনেক টানে। আমি ভালবাসি সমুদ্রের বিশালতা চঞ্চলতা...দেশে যাওয়ার ইচ্ছে জাগে মনে...কিন্তু যখনি ইচ্ছেটা উঁকি দিল সেই কিছুদিনের মধ্যেই শুনি ক্লোজ আপ এর আবিদ শাহরিয়ার ভেসে গেছে সমুদ্রে...কাঁদিয়েছে দেশের মানুষকে...খালি করে দিয়েছে স্নেহময়ি মায়ের বুক চিরতরে
আমি জানি আমার মা আমাকে সমুদ্র দেখতে যেতে দিবেনা...কোন নিরাপত্তা নেই জীবনের...আবিদের মৃত্যুতে আমার মা অনেক শোকাহত...সে যেন তাঁর ছেলে হারিয়েছে...আবিদ আমাদের সমসাময়িক একটা ছেলে এই বয়সের সব ছেলেকেই আমার মা তাঁর ছেলের মত করে দেখে...তারউপর সে রবীন্দ্র সংগীতের ভক্ত...সেই আবিদ সমুদ্রে ডুবে যাওয়াতে তাঁর অনেক কষ্ট হচ্ছে...সেই কষ্ট বুকে চেপে রেখে সেতো আর তাঁর গর্ভের সন্তানকে সমুদ্রে যেতে দিবেনা। আমিও পারবোনা মায়ের কথাকে উপেক্ষা করে তাকে অস্থিরতা ও অশান্তির মধ্যে রেখে সমুদ্র স্নানে যেতে। ইচ্ছেটাও দমে যায় আবার দেশে যাওয়ার।
বাবা ফোন করে বলে দেশে আসার দরকার নাই...দেশের অবস্থা ভালো না। তুমি ওখানেই থাক আব্বু, তুমি ভালো আছ এটাই আমাকে ভালো রাখে আমাকে শান্তি দেয়। আমার মা বলে তোর বাবা সারাক্ষণই তোর ছবি দেখে, ছেলে বলতে নাকি সে পাগল। গতবার যখন দেশে গেলাম আমার বাবাই ছিল যার পর নাই খুশি। তারপরও আমার বাবাই আমাকে দেশে যেতে বারন করে।
এতকিছুর পরও দেশে যাওয়ার ইচ্ছে আবার জেগে ওঠে। দুসংবাদ গুলো ফিকে হয়ে আসার পর আবার মন নেচে ওঠে দেশে যাব বলে... ফাইনাল ডিসেশান টা নিয়েই ফেলি এইবার ঈদে দেশে যাব। বাবাকে চমকে দেব। দেশের চেনা মুখগুল আমার চোখে ভাসতে থাকে কাজের মাঝেও কেমন যেন একটা ফুরতি অনুভব করি।
রাতে বের হবনা, সমুদ্রেও যাবনা, এইসবকিছু বাদ, মা বাবা কে নিয়ে নানু কে দেখতে যাব, চিটাগং এ আমার ছোট খালা বড় খালাকে দেখতে যাব। ঢাকা-নোয়াখালী কিম্বা ঢাকা-চিটাগং এর জার্নি টা উপভোগ করা যাবে।
কিন্তু ১৩ই আগস্টের ঘটনা আমার এই ইচ্ছেটাকে গলা টিপে হত্যা করলো।
তারেক মাসুদ এবং মিশুক মুনির দুজন উজ্জল মানুষ হারিয়ে গেল আমাদের জীবন থেক অনিরাপদ সড়ক ব্যবস্থার কারনে। অথর্ব অসভ্য গোঁয়ার এমপি মন্ত্রীগুলো গাড়ীর বহর নিয়ে চলাফেরা করে। অথচ এই দুটি নক্ষত্র ঝরে পড়লো সময়ের অনেক বেশী আগে তাদের অতি আপন মাতৃভূমিতেই । যারা কিনা দেশকে ভালবেসে দেশের জন্য কাজ করবে এই মনোভাব নিয়ে দেশে ফিরে গিয়ে নিজের অজান্তে মৃত্যুকে বরন করে নিল, তাদের পরিবারকে, দেশের মানুষকে ভাসিয়ে দিল শোকের সাগরে। আমি জানিনা দেশের সরকার কিভাবে তাঁর দায় ঠেকাবে কিভাবে সান্ত্বনা দিবে শোকাহত পরিবারগুলকে । যেই দেশের সরকার তার মেধাবী সূর্য সন্তান দেরকে চেনেনা, তাদের নিরাপত্তা দেয়না সেই দেশে আমার মত অতি সাধারণ একটা মানুষের কিইবা নিরাপত্তা আছে? আমার ঢাকা চিটাগং মহাসড়কে যেতে ভয় হচ্ছে। যদি মরে যাই কিম্বা আমার বাবা মাকেই হারিয়ে ফেলি যদি। বাংলাদেশের মহাসড়কে দুর্ঘটনা হউয়াটা নিত্তনৈমত্তিক ঘটতনা। সাধারন মানুষ হয়ে বেঁচে থাকাটাই যেন আজ একটা স্বপ্ন।
ভিন দেশে থেকেও, অতি সাধারণ একজন মানুষ হয়েও যে নিরাপত্তার বলয়ে আমরা আছি তা আজ আমার কাছে অসাধারন মনে হয়। আমাদের দেশে আমাদের মেধাবী মানুষগুলো সেই নিরাপত্তার, নিশ্চয়ওতার সিকে ভাগটুকুও পাচ্ছে বলে আমার মনে হয়না। সাধারণ মানুষ তো আজ পিঁপড়ার মত তাদেরও আবার জীবন। আমার জীবনটাকে আমি এত তুচ্ছ তাছিল্ল করতে পারবোনা আমি নিশ্চিত মৃত্যুকে হাতে নিয়ে মহৎ হতে পারবোনা অথবা মহৎ কাজের উদ্দেশ্যে তারেক মাসুদ মিশুক মুনির এর মত বড় মনের মানুষ হয়ে আমার দেশে পা বাড়াতে পারবোনা। আমি এই অথর্ব দেশের জন্য মরতে পারবোনা। আমি জানি পুরোটাই স্বার্থপরতা হয়ে যাচ্ছে। তারপরও কথা থেকে যায় আমিও জীবন বিলিয়ে দিব দেশের জন্য যদি সেই দেশের সরকার আমার বাবা মা’র ভালথাকা নিশ্চিত করে। তবে তা সরকার কোনদিনও পারবেনা। একদিন হয়ত পারবে যেদিন মুজিব জিয়া কে ছাড়িয়ে দেশের জনগনই হবে সরকারের প্রিয়জন আবার আমার ইচ্ছে প্রান ফিরে পাবে আবার দেশের জন্য মন ছুটে যাবে। আমার মাতৃভূমী আমাকে ডাকবে হাতছানি দিয়ে। কিন্তু মনে একটি প্রশ্ন উঁকি দেয় একি সত্যি আমার মাতৃভূমির হাতছানি নাকি মাতৃভূমি রুপি মৃত্যুপুরীর হাতছানি সত্যি দেশটা যেন এক নিশ্চিত মৃত্যুপুরী।
আমার এই জীবন হয়ত দেশের কোন কাজে আসবেনা কিন্তু একজন বাবা একজন মাতো নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারবে এই ভেবে যে তার সন্তান ভালো আছে।
আমি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাই তাদের প্রতি যারা দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন, যারা তাদের মেধা ও মননকে কাজে লাগিয়ে অক্লান্ত পরিস্রম করে যাচ্ছেন দেশের কল্যাণে নিজ দেশে থেকে। পরিশেষে বলতে চাই হে মেধাবী সন্তান যদি বেচে থাক তবে দেশকে তুমি দিতে পারবে দেশের জন্য করতে পারবে, তুমি নিজে নিজের প্রতি একটু খেয়াল রেখো... তোমাকে হারানোর কষ্ট তোমার পরিবার ও ভক্তরা সইতে পারবেনা।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে আগস্ট, ২০১১ বিকাল ৫:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



