আমার শ্রদ্বেয় শিক্ষকগণ
আমার আজকের লেখা আমার পরম শ্রদ্বেয় শিক্ষকদের স্মরণ ও শ্রদ্বা জানানোর জন্যে। ক্যাডেট কলেজে পড়ার সুবাদে এমন কিছু শিক্ষকের সান্নিধ্যে এসেছি যে, আমি মনে করি এটা সেই সব শিক্ষকদের স্বার্থহীন কাজেরই প্রতিফল, যে আজ এতোদিন পরেও তাদের কথা প্রায়ই মনে পড়ে, আর মনে পড়ে তাদের প্রতি সেভাবে কৃতজ্ঞতা বা নিদেনপক্ষেও ধন্যবাদটুকুও দিতে পারিনি। আজ তারই প্রায়শ্চিত্ত করার জন্যেই এই লিখা। জানি যে আমার শিক্ষকদের চোখে এই লিখা পড়বে না, তারপরেও যারা এই ব্লগ পড়বে তারা অন্তত জানুক তাদের প্রতি আমার এই বিনম্র শ্রদ্বা জ্ঞাপন।
প্রথমেই আমার প্রথম ভাইস্ প্রিন্সিপাল আবুল আশরাফ নূর স্যার। চমৎকার ভাজ ভাঙা ইস্ত্রী করা সাদা শার্ট পড়ে থাকতেন সবসময় আর চমৎকার আবৃত্তি করতেন ইংরেজী কবিতা। আমরা জানতাম তিনি নাকি ইংরেজী কবিতাও লিখতেন, কিন্তু আমাদের সেই বালক বয়সে ওই কবিতার রস আস্বাদন সম্ভব হয়নি স্বাভাবিক ভাবেই, পরে বড় হয়ে বিভিন্ন ইংরেজী দৈনিকে দেখেছি তার কবিতা। আমাদের ছোট ক্লাসে তিনি অবশ্য ক্লাস নিতেন না, কেবল মাঝে মাঝে ক্লাসে এসে পয়েন্টার স্টিকটা রাইফেলের মতো চোখের সামনে ধরে কীভাবে জীবনের এইম ঠিক করতে হবে সেই উপদেশ দিতেন।
তারপর উল্লেখ করবো আমাদের হাউস মাস্টার মাজহার স্যারের কথা, এত্তো সুন্দর বাংলায় এত্তো সুন্দরভাবে ইতিহাস পড়াতেন যে, মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। হয়তো তার উৎসাহেই আমরা ক্লাস সেভেন-এইটে পড়ার সময়েই বিএ ক্লাসের ইতিহাস বই থেকে নোট তৈরী করতাম। আমাদের হাউসটাও ওনার শৈল্পিক নির্দেশনায় খুব সুন্দর করে সাজানো ছিল, প্রতিটি রুমে বড় করে এক একটা নীতিবাক্য লিখা থাকতো, যেমন A Single Leak will sink a great ship, Talkers are not good Doers ইত্যাদী।
আমাদের ফর্ম মাস্টার ছিলেন ইংরেজীর শফিকুল ইসলাম স্যার, চমৎকার ইংরেজী পড়াতেন, আমার ইংরেজীর ভিত্তি প্রথমত আমার আব্বা আর দ্বিতীয়তঃ উনার হাতেই গড়া। আমার শিক্ষা জীবনের প্রায় প্রতিটি স্তরেই ইংরেজীতে ভাল নাম্বার পেয়ে এসেছি মূলতঃ এই কারণেই।
পদার্থবিজ্ঞান পড়াতেন অমিতাভ স্যার, খুব সুন্দর ও সহজ ভাবে বুঝিয়ে দিতেন যে কোন সমস্যা। ক্লাসে কোন প্রশ্নের জবার দিতে পারলে খুব খুশি হতেন আর আমাকে বলতেন আমি নাকি ক্লাসে চুপচাপ এন্টিনা উঁচু করে বসে থাকি। উনি আর কেমিস্ট্রির বদরুদ্দোজা স্যার মিলে ফিজিক্স ল্যাবে সম্ভবতঃ পাকিস্তান আমল থেকে পরে থাকা একটা পুরনো Wireless Set মেরামত করে ফিজিক্স ল্যাব থেকে আমাদের ডাইনিং হল পর্যন্ত যোগাযোগ স্থাপন করে দেখিয়েছিলেন। আমাদের নিজেদের গলা ওই Set এ শুনতে পেয়ে আমরা তো মহাখুশি। বদরুদ্দোজা স্যারের কেমিস্ট্রি ক্লাসের জন্যে আমরা সবাই অপেক্ষা করতাম। এত্তো মজা করে স্যার ক্লাস নিতেন।
কেমিস্ট্রির আরেকজন শিক্ষক ছিলেন বেলাল হোসেন স্যার। উনি অবশ্য একটু ত্রাস সৃষ্টি করেছিলেন কলেজে। আমার এখনও মনে পড়ে আমাদের ক্লাসের হালকা পাতলা জহিরুল ক্লাসের ভেতরে ডেস্কের আনাচে-কানাচে ছুটে বেড়াচ্ছে আর বেলাল স্যার একটা স্কেল নিয়ে ওর পেছনে পেছনে ছুটছেন আর ওকে শাসাচ্ছেন তোকে নিয়ে আমি ফুটবল খেলবো, বাস্কেটবল খেলব। উনি সবসময় ক্লাসে একটা ব্রীফকেস নিয়ে আসতেন, আমরা বলাবলি করতাম যে উনার ব্রীফকেসে সবসময় একটা বাস্কেটবল আর একটা ফুটবল থাকে। এই বেলাল স্যারও কেমিস্ট্রি ল্যাবে আমাদেরকে সাবান, মুখে মাখার ক্রীম তৈরী করে দেখিয়েছিলেন। অন্যান্যদের জন্যে ত্রাস হলেও ক্লাসে আমরা যারা পড়া বলতে পারতাম তাদেরকে খুব স্নেহ করতেন। আমার মনে আছে আমাদের এস এস সি পরীক্ষার প্রাকটিক্যালের সময় সিলেট পাইলট হাইস্কুল ( যেটা আবার আমারও প্রাক্তন স্কুল) থেকে আসা পরীক্ষক ভাইভা’র সময় আমাকে বেশ নাস্তানাবুদ করে ছাড়লেন। আমি ভাবলাম যে যাহ্ প্রাকটিক্যাল এ মনে হয় ২০ এর কাছাকাছিও পাবো না (২৫ এর মধ্যে)। কিছুটা মন খারাপ করেই রুম থেকে বেড়িয়ে আসার জন্যে চেয়ার ছেড়ে উঠছিলাম। বেলাল স্যারও ছিলেন ওই ভাইভা বোর্ডে, উনি আমাকে উঠে যেতে দেখে দাড় করালেন,
- দাড়া, এখনই যাচ্ছিস্ কোথায়? আমার প্রশ্ন তো শেষ হয় নি।
বলেই আমাকে উনার প্রিয় কিছু প্রশ্ন করলেন, যেগুলো মূলত গত দুই বছর উনি আমাদেরকে ক্লাস রুমে, কেমিস্ট্রি ল্যাবে করতেন এবং যে প্রশ্নগুলোর জবাব দিতে না পারলে তিনি জহিরুলের পেছনে স্কেল হাতে ছুটতেন। ফটাফট এরকম গোটা দশ-বারো প্রশ্নের জবাব দেবার পর উনি আমাকে ছাড়লেন,
- এখন তো ভালোই জবাব দিচ্ছিস্ এতোক্ষণ পারছিলি না কেন?
বলাই বাহুল্য সিলেট পাইলট থেকে আসা ওই শিক্ষকও ততক্ষণে আমার রসায়ন জ্ঞান এর পরিচয় পেয়ে চমৎকৃত। আমাদের প্রয়োজনে এবং বিপদে-আপদে এভাবে পাশে এসে দাড়াতেন আমাদের শ্রদ্বেয় শিক্ষকেরা।
বাংলার রকিবুল ইসলাম স্যারের কথা না বললে আমাদের কলেজ জীবনের অনেক মজার কথাই বলা হবে না। উনি খুব প্রিয় ছিলেন জুনিয়র ক্লাসের মধ্যে (সেভেন,এ ইট) সিনিয়র ক্লাসের ভাইয়ারা আমাদের বোধের অগম্য কোন কারণে উনাকে ততোটা পছন্দ করতেন না, সম্ভবত উনাদের সাথে উনি একটু বেশি কড়াকড়ি করতেন এই কারণে। উনার ক্লাসও আমার খুব ভালো লাগতো। কলেজে ক্লাস টেস্ট বলে একটা টেস্ট হতো, একবার সম্ভবত স্যার নেক্সট ক্লাসে একটা ক্লাস টেস্ট নেবেন এরকম কোন ঘোষণা দিয়েছিলেন যেটা কোন কারণে আমরা কেউই অতোটা গুরুত্ব দিয়ে নিইনি, ভেবেছিলাম স্যারকে বলে পরীক্ষা পিছিয়ে দেব। কিন্তু স্যার সেদিন পরীক্ষা নেবেনই। তখন জীবনানন্দ দাশের ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতা পড়াচ্ছিলেন তিনি, আমাদেরকে ওই কবিতার প্রথম দশ লাইন লিখতে বললেন, ওটাই পরীক্ষা। তখন আমরা যে যার মেধা কাজে লাগিয়ে যা লিখেছিলাম সেটা যদি স্বয়ং জীবনানন্দ দেখতেন তাহলে হয়তো কবিতা লিখাই ছেড়ে দিতেন। কবিতাটার এক জায়গায় আছে, “... দেখিবে ধবল বক...”, সে জায়গায় আমাদের একজন লিখেছিল, “...দেখিবে ধবল কাক...”। পরদিন পরীক্ষার খাতা দিলেন রকিব স্যার, একজন ( কে মনে নেই) সম্ভবতঃ পাস করেছিল, বাকি সবাই ফেল, রকিব স্যার আবার আমাদের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেবার জন্যে মুখে মুখে একটা কবিতাও রচনা করে ফেললেন,
“ ফেলটু সবাই ফেল করেছে, ফেল করবে আরো
ঠিকমতো পড়াশোনা যদি না করো...”
এরকমই আরও কি সব কথা ছিল কবিতাটাতে। উনার জন্যেই আমার ভালো মুভি দেখার আগ্রহ এবং রুচি তৈরী হয়। কলেজে প্রতি সপ্তাহে বৃহস্পতিবারে ডিনারের পর মুভি শো হতো। রকিব স্যারই ছিলেন ওই মুভি শো’র দায়িত্বে। অনেক ক্লাসিক মুভি ওই সময়ে দেখিয়েছেন তিনি, যেমন Bridge on River Kawai, All Quiet on the Western Front, Cranes are Flying, The Good the Bad and the Ugly, Guns of Navaron, Platoon, The Sunflower এরকম আরও অনেক।
আরও অনেকের কথাই বলতে ইচ্ছা করছে কিন্তু এর ভেতরেই দেখি লেখাটার কলেবর চার পৃষ্ঠা হয়ে গেছে এরচে’ বড় করে ফেললে হয়তো কেউ পড়বেই না এই দীর্ঘ লেখা। তাই আজকে এখানেই শেষ করছি, আবার হয়তো একদিন লিখবো।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে অক্টোবর, ২০১২ রাত ১০:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



