somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত

১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ সন্ধ্যা ৬:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আমি একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মানুষ, না নিজেকে আসামি হিসেবে দাবি করতে চাই না। মূলত তিনটি কারণে মানুষ ফাঁসির আসামি হয়-
১ গুরুতর অপরাধ করলে
২. বলির পাঠা হলে
৩. চক্ষুশূল হলে।
আমি কোনটার কারণে দণ্ডিত তা বলবো না, যার যেটা খুশী ভেবে নিতে পারেন। এক মাস আগেও ভাবিনি মৃত্যু আমার সন্নিকটে আর এখন আমার অচেতন দেহটি এখন লাশ হয়ে আমার পরিবার পরিজনের সামনে কাঠের তক্তায় পড়ে আছে। আর তারা আমার জন্য চোখের জল বিসর্জন দিয়ে যাচ্ছে।

এক সপ্তাহ আগে আমার ফাঁসির আদেশ হয়। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে এই কথাটা শোনার পর চারপাশটা আমার অন্ধকার হয়ে এসেছিল। আমার মা ও স্ত্রী সাথে সাথে মূর্ছা যায়। আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় কনডেম সেলে। না কোন সাধারণ জেল নয় আমার কাছে মনে হচ্ছিল যেন এক মৃত্যুপুরী। শরীরের সব ভার পায়ে এসে জড়ো হলো, পা যেন আগে বাড়তে চায় না। বাতি জ্বালানো থাকা সত্ত্বেও আমার কাছে এক অন্ধকার গুহা মনে হতে লাগলো। অবশেষে আমার কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো। রক্ষীরা যখন তালা দিয়ে চলে যাচ্ছিলো আমার মন চাইছিলো চিৎকার করে বলি আমাকে একা রেখে যাবেন না কিন্তু মুখ দিয়ে কোন আওয়াজ বের করতে পারলাম না। হঠাৎ অনুধাবন করলাম চোখের কোণ বেয়ে বারিধারা ছুটেছে। যতই হাত দিয়ে মুছতে লাগলাম ততই গাল ভিজে যাচ্ছিল। ভাবছিলাম কতো মানুষই তো অবাধভাবে অপরাধ করে বেড়ায়, সাক্ষী প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তাদের কোন শাস্তি হয় না তবে আমি কেন এতো বড় শাস্তি পাচ্ছি? কেন নতুন করে জীবন শুরুর একটা সুযোগ পাবো না? আমার বয়সই বা কত, এখনও চল্লিশ পেরোয় নি। এমনকি চল্লিশের ধারে কাছেও না। আল্লাহ তো সবই পারেন, তিনি কি পারেন না আমার মুক্তির ব্যবস্থা করে দিতে। চোখের সামনে আমার নবজাতক ভাগ্নির মৃত মুখটি ভেসে উঠলো। ও তো সবে পৃথিবীতে এসেছিল তবুও তো দিনের আলোয় এসে রাতের আঁধার দেখার সময়টুকু পায়নি। আমি তো অসংখ্য দিনরাত দেখেছি, জীবনের কত রূপ দেখেছি। তবুও আজ জীবনটা সংকীর্ণ মনে হচ্ছে। এতো সময় পাওয়ার পরও কি করলাম। প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। কারও আগে কারও পরে কিন্তু যেতে হবে এটা তো নিশ্চিত। চোখের পানি মুছে হৃদয়কে শক্ত করলাম। ভাবলাম মরতে হবে এটা আগে থেকেই জানতাম কিন্তু কখনও কথাটিকে গুরুত্ব দেয়নি। রাস্তায় প্রতিদিন কত মানুষ মারা যায় তারা কি কেউ এই ভেবে রাস্তায় বের হয় যে আজকে বাসায় নাও ফিরতে পারে। কিন্তু আমি তো জানি আমি আর ফিরবো না তাই মৃত্যুর আগে যা করার তা ই করার সিদ্ধান্ত নিলাম। এই সুযোগ সবাই পায় না, মৃত্যু নিশ্চিত জানা সত্ত্বেও কেউ প্রস্তুতি নেয় না, নিজের দায়িত্বগুলো পালন করার চেষ্টা করে না, নিজের ভুলগুলো অনতিবিলম্বে শুধরে নেয় না। আমার জীবনের যে কতটুকু সময় বাকি তার কোনটাই আর নষ্ট করবো না। যেই ভাবনা সেই কাজ। যাদের যাদের দেখার ইচ্ছা তাদের সকলকে খবর দিলাম। যারা এসেছে তাদের সকলের কাছে নিজের ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা চেয়েনিলাম। কত সময় কত খারাপ ব্যবহার করেছি। যারা আসেনি তাদের জন্যও চিঠি লিখে দিয়েছি। একদিন মা বাবা ও আমরা স্ত্রীকে একসাথে আসতে বললাম। অপরূপা আমার স্ত্রীর দিকে কেউ তাকালে সহ্য করতে পারতাম না সেই আমি মা বাবাকে বললাম, আমার চলে যাওয়ার পর যথাশীঘ্র ওকে একটা ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিতে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও ও আমাকে কথা দিতে বাধ্য হলো। কারণ আমি দেখেছি অনেক বিধবাই লোকলজ্জার ভয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করতে চায় না আবার অনেক শ্বশুরবাড়ির লোক সম্পদের জন্য পুত্রবধুকে অন্যত্র বিয়ে দিতে চায় না। যেখানে যত কর্জ ছিলো সব শোধ করে দিতে বললাম।
জুম্মা আর ঈদ ব্যতিত পশ্চিম মুখী হতে চাইতাম না। আর এই সাত দিনের প্রতি ওয়াক্তের নামাজ জীবনের শেষ নামাজ মনে করে আদায় করেছি। জীবনে কৃত অগণিত পাপের জন্য অবিরত চোখের জল বিসর্জ্জন দিয়েছি। আর সেই সাথে এও আশা করেছিলাম হয়তো কোনভাবে যদি মুক্তি পেয়ে যাই। আমার জীবনের সবচেয়ে ভালো সময় ছিলো এই সাতদিন যদিও কোন প্রিয়জন কাছে ছিলো না তবুও বলতে পারি খুব স্বচ্ছ সময় কাটিয়েছি। যদি জীবনের প্রতি মুহূর্ত আসন্ন মৃত্যুর কথা ভেবে কাটাতাম তাহলে খুব সহজ হত। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের অলীক কল্পনায় সবসময় বিভোর ছিলাম তাই হাতের কাছের সময়টুকু ঠিক মত ব্যয় করতে পারিনি। কত যে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কত অন্যায় করেছি তার কোন ইয়ত্তা নেই। তবুও এই সাতদিনে যতটুকু পেরেছি শোধরানোর চেষ্টা করেছি। তার জন্য আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি।

সুযোগ পেলেই আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ভিতরে খুব শান্তি অনুভব করতাম। প্রকৃতিকে আমরা শুধু ভোগের জন্য ব্যবহার করি, উপভোগ করার শান্তি এই কয়দিনে বুঝেছিলাম।

অবশেষে সেই অন্তিম মুহূর্ত ঘনিয়ে এলো। খুব যত্ন করে আজকে গোসল করে নিলাম। আমাকে খেতে দেয়া হলো। বাড়িতে সামান্য একটু লবণ বা মসলা কমবেশি হলে কি রাগ করতাম।। কিন্তু আজকে খাবারের মর্যাদা বুঝতে পারলাম। আর কোনদিনই খেতে পারবো না তাই বেশ তৃপ্তি সহকারে আহার করলাম। তারপর আমাকে তওবা পড়ানো হলো। জীবনের অনেক অপরাধ চোখের সামনে ভেসে উঠলো। আমার শেষ ইচ্ছা মোতাবেক আমার ডায়েরিটা বাসায় পাঠানোর কথা দেয়া হল। অবশেষে আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো সেই কক্ষের দিকে।


ধীরে ধীরে আমাকে মঞ্চে উঠানো হলো। সামনে তাকিয়ে দেখি একজন ডাক্তার, একজন ঘড়ি হাতে একটা রুমাল নিয়ে দাড়িয়ে আছে। মঞ্চের পাশে দাড়ানো জীবন হরণকারী জল্লাদ। আমি চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিলাম। একজন মানুষের জীবন নেয়ার জন্য কত আয়োজন করা হয়েছে। সবকিছু কত গুছানো। আমার পা দুটো ও হাত দুটো পিছন থেকে বেধে দিলো। মুখে কালো টুপি পড়িয়ে মালার মতো ফাঁসির দড়িটা পড়িয়ে দিল। কিছুক্ষনের মধ্যেই ঘড়ির দিকে তাকিয়ে রুমালটা ফেলে দিলো। আমি জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে জীবনের মূল্য বুঝতে পারলাম। কখনো সময়কে গুরুত্ব দেইনি, সবসময় দায়িত্বে অবহেলা করেছি কিন্তু জল্লাদ তার দায়িত্বে বিন্দুমাত্র অবহেলা করে নি। রুমালটা পড়ে যাওয়ার সাথে সাথেই লিভারটা টান দিয়ে আমার জীবনের ইতি টানলো।

আর কিছু সময় পরই আমাকে দাফন করে ফেলে রেখে আসবে একা অন্ধকার মাটির নিচে। প্রাকৃতিক নিয়ম অনুসারে ক্ষুধার্ত রাক্ষুসে মাটি আমার প্রিয় দেহটিকে কুড়ে কুড়ে খাবে। নশ্বর দেহ মিলে যাবে মাটির সহিত। পরিবার পরিজনের চোখের জল কিছুদিনের মধ্যেই শুকিয়ে যাবে। ধীরে ধীরে আমার স্মৃতিগুলো মলিন হয়ে যাবে। মাঝেমধ্যে কথা প্রসঙ্গে আমাকে মনে করবে এই আর কি।

প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ রাত ২:৩৩
১৬টি মন্তব্য ১৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রাস্তায় পাওয়া ডায়েরী থেকে-১১০

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ সকাল ১০:০২



১। সারা পৃথিবী জুড়ে- সভা, সেমিনার, গোলটেবিল বৈঠক, অনশন, মানব বন্ধন অথবা কনফারেন্স করে কিছুই করা যাবে না। এগুলোতে অনেক আলোচনা হয়- কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না।... ...বাকিটুকু পড়ুন

হে মানব হিতৌষি রমনী, শুভ জন্মদিন একজন জনকের কথা

লিখেছেন সেলিম আনোয়ার, ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ সকাল ১০:০৭



জানা আপু— আমাদের প্রিয়জন,
কোথায় আছো কেমন আছো?
তোমায় খোঁজে এ দু'নয়ন—এই কৌতুহলি মন।
হায়! দেখি—না ক তো দি ন!!!
আশা করি ভালোই আছো
অশ্বস্তি গেছে কেটে
... ...বাকিটুকু পড়ুন

ও ঠাম্মি কাঁদছো কেন

লিখেছেন সাহিনুর, ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ দুপুর ২:২৫



ও ঠাম্মি কাঁদছো কেন
আগলে রেখে ঘরখানা?
সবাই এখন উল্লাসেতে
তোমার কথা ভাবছে না ।
রক্তে এখন ধম্ম সবার
মানবতার কথা শুনছে না ।
নিজের স্বাথে সিদ্ধি হওয়ায়
মানবতার খেয়াল রাখছে না... ...বাকিটুকু পড়ুন

আলো আঁধার

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৩:৪২


দূর দিগন্তে চেয়ে দেখি
বাঁশ বাগানের ছায়
জলপরীরা খেলা করে
আলোর মায়ায় ।।

নারকেলের পাতার ফাঁকে
শুক্ল পক্ষের চাঁদ
আলো ঝলমল সৌন্দর্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

উপরে উঠা

লিখেছেন সাইন বোর্ড, ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:১৩


আমি সব সময়'ই উপরে উঠতে চেয়েছি, কিন্তু
চিলেকোঠাতে আমার বড্ড ভয়, তাই
রুবির মত স্কুল পড়ুয়া মেয়ে যেদিন আমাকে ছাদে ডেকেছিল
সেদিন রাতে আমি পবিত্রযানে চেঁপে দেবদূত হয়েছিলাম
মেঘ আর আকাশের মাঝে ভাসতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×