somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঢেউ

০৮ ই এপ্রিল, ২০১৯ রাত ৮:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



তিন বছর প্রেম করে ছ্যাকা খাওয়ার পর আমার প্রায় মজনু হালত। সেই দুরাবস্থা কাটানোর জন্যে বড় ভাই তার ওখানে দুবাই নিয়ে যায়। প্রায় এক বছর বিদেশ থাকার পর মায়ের পীড়াপীড়িতে আবার দেশে ফিরে আসি। এখন আর মজনু টজনু না, একেবারে কঠোর পুরুষ, নারীদের শক্তভাবে এড়িয়ে চলি আর বাবার ব্যবসায়ের কাজে হাত লাগাই। আমার এইচএসসি পড়ুয়া চাচাতো ভাইয়ের বন্ধু অনিকের কাকুতিমিনতিতে অবশেষে তাকে তিন মাসের জন্য আইসিটি পড়াতে রাজি হই।

কোন এক সকালে-
অনিকের বাসা পুরান ঢাকায় তাই নির্ধারিত সময়ের এক ঘন্টা আগেই রওনা দিলাম। কে জানে ট্রাফিক জ্যামে কতক্ষণ বসে থাকতে হয়। ভাগ্য সুপ্রসন্ন বাসা কোন অলিগলির ভিতর না, বরং রোডের উপর। ওদের ফ্লোরে উঠতেই শুনি দুই ভাইবোন ঢাকাইয়া ভাষায় ঝগড়া করছে। ওর বোনের ফাটা বাঁশের মত গলার আওয়াজ আমার কানে কাটার মত বিঁধতেে লাগলো। আমি কলিংবেল বাজাতেই অবস্থা সহনশীল হয়। অনিকের বোন এসেই দরজা খুললো। দেখতে খুব বেশি সুন্দর না সেই সাথে রাগে চেহারা হিংস্রভাব ধরেছে। রাগত স্বরে আমার পরিচয় জিজ্ঞেস করে অনিকের রুম দেখিয়ে দিল। মেয়েটির নাম অধরা, মাস্টার্সে পড়ে সেই সাথে একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের টিচার। আমেরিকান প্রবাসীর সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে । দুই মাস পরে বিয়ে। টিউশনে গেলে প্রায়ই দুই ভাইবোনের ঝগড়া শুনতে পাই।। মেয়েটি যে বাসায় যাবে আগুন লাগবে না উনুন এমনিই জ্বলবে।

এক মাস পর-
টিউশনে যেয়ে শুনি অধরার স্কুলে আজ পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। তাই ও আজ ওর মায়ের সাদা রঙের একটা শাড়ি পড়েছে। এই শাড়িটা যদি আমার প্রাক্তন প্রেমিকা পড়তো তাহলে ওকে ঠিক একটা ডানাকাটা পরী লাগতো। সারাদিন শেষে সন্ধ্যায় বাসায় এসে খবরে দেখি অধরা যে স্কুলের টিচার সেই স্কুলে আগুন লেগেছে। সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ক্যান্টিনের দুইজন পাচক নিহত ও পাঁচজন টিচার আহত, বাচ্চাদের কোন ক্ষতি হয় নি। সাথেসাথে অনিককে ফোন দিলাম। ফোন দিয়ে শুনি ওর আপুও আহত হয়েছে, ডান হাত ও চেহারার ডানপাশে ছ্যাকা লেগেছে। এখন বাসায়ই আছে। পরদিন পড়াতে যেয়ে অনিকের মুখে শুনি অধরার বিয়ে ভেঙে গেছে কারণ পাত্র চেহারায় দাগওয়ালা মেয়ে বিয়ে করবে না। যদিও বর্তমানে এ ধরনের দাগ দুর করা কোন কঠিন না তবে একটু সময়সাপেক্ষ কিন্তু পাত্র ততদিন অপেক্ষা করতে পারবে না। আমি ভদ্রতার খাতিরে অধরাকে কুশলাদি জিজ্ঞেস করে তার দ্রুত আরোগ্য কামনাকরে চলে আসি।


পনেরো দিন পর-
আজকে রাজনৈতিক কোন একটা সমাবেশ ছিল। দিনের বেলায় রাস্তাটায় খুব ভীড় ছিল কিন্তু রাত হতে হতে সব নিরব হয়ে গেল। তাই আজকে টিউশনে সকালে যেতে পারিনি। রাতে যখন অনিকের বাসায় যাই, সেখানে গিয়ে দেখি বাসায় কেউ নেই, দরজা খোলা, সবকিছু ওলট-পালট অবস্থা,অধরা বিবস্ত্র অবস্থায় মাটিতে অচেতন পড়ে আছে। আমি তাড়াতাড়ি বিছানার চাদর টান দিয়ে ওর গায়ের উপর দিয়ে দেই। মুখে পানির ছিটেফোঁটা দিতেই ওর জ্ঞান ফিরে আসে এবং চিৎকার দিয়ে ওঠে। আমাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হয় এবং ব্যথায় কোঁকাতে থাকে। আমি ওকে তুলে বিছানায় দেই। ইতোমধ্যে ওর মা বাবা ও অনিক চলে আসে। ওরা গিয়েছিল পাশের বাড়ির অনুষ্ঠানে। মেয়েকে এই অবস্থায় দেখে তারা চমকে উঠে। মাকে ধরে অধরা কাঁন্নায় ভেঙে পড়ে এবং বলতে শুরু করে কিভাবে ওদের এলাকার ক্ষমতাসীন দলের দুইজন কর্মী নিজেদের দীর্ঘদিনের কামনা চরিতার্থ করার জন্য ওর উপর পাশবিক নির্যাতন চালায়। অনিক ওর আপুর পায়ের কাছে বসে ছোট শিশুর মত কান্না শুরু করে দেয়। স্বান্তনা দেয়ার মত আমার কোন ভাষাই ছিলো না । মাথায় হাত রাখতেই আমাকে আকড়ে ধরলো। এতোদিন শুধু খবরে কাগজ বা টিভি চ্যানেলে এমন ঘটনা পেয়েছি কিন্তু স্বচক্ষে দেখে নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। অধরাকে ঘরে রেখে আমরা সবাই বাইরে চলে এলাম। আমি আংকেলকে বললাম, আমার পরিচিত একজন পুলিশ অফিসার আছে আপনি বললে এক্ষুনি রিপোর্ট করতে পারি। সাথে সাথে আন্টি বললো , না না এই ঘটনা জানাজানি হলে আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাবে। লোকজন গালমন্দ করবে। তাছাড়া এ ধরনের অপরাধের কোন বিচার হয় না। আমি বাসায় এসে মুখে কিছু না দিয়েই ঘুমাতে চলে গেলাম। কিন্তু একটুও ঘুমাতে পারলাম না। বারবার ঘটনাটা মনে পড়ছিল।


এক সপ্তাহ পর-
সকালে নাস্তা করতে করতে মাকে বললাম , আমি বিয়ে করতে চাই। যে ছেলে গত তিন বছরে বিয়ের কথাকে তিনশত বার না করেছে, এসব থেকে পালিয়ে এক বছর দেশের বাইরে কাটিয়েছে, সেই ছেলে আজ বিয়ে করতে চাইছে। মা কোন রকম কথা না বাড়িয়েই খুশি খুশি সম্মতি দিয়ে দেয়। কিন্তু যখন অধরার ব্যাপারে বিস্তারিত বললাম তখন মা মানতে চাইলো না। আমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মা আমাকে বেশি ভালোবাসে, মায়ের কাছে আমি কোন সুপারহিরোর চেয়ে কম নই। মা সবসময়ই বলতেন আমার জন্য কোন রাজকুমারী ঘরে আনবে। কিন্তু আমি নাছোড়বান্দা। মা বাবা জানে আমি একবার যে সিদ্ধান্ত নেই তা আর কেউ বদলাতে পারে না। অবশেষে তারা রাজি হলেন। অপরদিকে অধরা বেঁকে বসেছে, কিন্তু তার মা বাবার পীড়াপীড়িতে সেও রাজি হল। একদম ঘরোয়াভাবে আমাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়।

এক বছর পর-
দেখতে দেখতে এক বছর হয়ে গেল। আগামীকাল আমাদের বিবাহ বার্ষিকী। বিছানায় শুয়ে ভাবছি সেই দিনের কথা যেদিন প্রথমবার দেখেছিলাম অধরাকে। দুই ভাইবোন ঝগড়ায় মেতে উঠেছিল কিন্তু এখন বুঝি ওদের মধ্যে কতটা ভালোবাসা আছে। এখন ঝগড়া করে আমার সাথে। এই একটা বছরে স্বামী স্ত্রীর পাশাপাশি আমরা খুব ভালো বন্ধু হয়ে গেছি । চার বছর আগে ছ্যাকা খেয়েছিলাম বটে কিন্তু ভালোবাসতে শিখেছি অধরার সংস্পর্শে এসে। কখনও ভাবতে পারিনি কেউ একজন এভাবে মনে বসে মনের রাজ্য দখল করে নিবে কিন্তু অব্যক্ত কথাটি আজও বলা হয়নি। অধরাও কখনও মুখে বলেনি । আগামীকাল বলবো ঠিকই, অধরাও বলেছে কি একটা সারপ্রাইজ দিবে।


পরদিন বিকেলবেলা-
আমি অধরার স্কুলের বিপরীত পাশের শপিং মলের সামনে দাঁড়িয়ে ওর জন্য অপেক্ষা করছি। স্কুল ছুটি হলে আমরা একটু শপিং করে কিছুটা সময় ঘোরাঘুরি করবো, ডিনার করে তারপর বাসায় ফিরবো। এইতো ঘণ্টার আওয়াজ আসছে । তার মানে ছুটি হয়ে গেছে, দেখতে দেখতে অধরাও বেরিয়ে এলো । বাহ ভালোই তো আজকেও একটা সাদা শাড়ি পড়েছে, সেই সা্থে চোখে সুরমা দি্য়েছে। ওর এই জিনিসটা আমার খুব ভালো লাগে যে , ও মেকাম টেকাপ করতে পছন্দ করে না।জানি না কি সারপ্রাইজ দিবে। এই যা আমার তো ফুল কিনা উচিত ছিল। আচ্ছা দেখি পরে কোথাও পাই নাকি। আমি ওকে এপার থেকে হাত নাড়িয়ে ডাক দিলাম। রাস্তাটা পাড় হওয়ার সময় আমার চোখের সামনে ঝড়ের বেগে একটা বাস এসে........।


দেড় বছর পর-
আমার অব্যক্ত কথাটা অধরাকে আর বলতে পারিনি। ওর সারপ্রাইজটা ঠিকই জানতে পেয়েছি। কিন্তু ও তো অধরা তাই ধরে রাখতে পারিনি। অন্তঃসত্তা অধরা আমার অনাগত সন্তানকে নিয়ে হারিয়ে গেছে কালের স্রোতে। সেই সাথে হারিয়ে গিয়েছিলো আমার মানসিক ভারসাম্য। আজকে প্রায় ছয়মাস হল আমি মেন্টাল হসপিটাল থেকে বাসায় এসেছি। আর এই ছয়মাসে বাবা ,ভাইয়া ,ভাবী, অধরার মা বাবা অসংখ্য বার আমাকে পুনরায় বিয়ে করতে বলেছে। কিন্তু আমার মা শুধু একবারই বলেছিলেন । মা সহজেই বুঝতে পেরেছেন আমি আর বিয়ে করতে পারবো না। মজার ছলে ও একবার একটা কবিতা লিখেছিলো তা ই যেন আমার জীবনের পরবাস্তব।

যখন একা র'বে,
থাকবো আমি পাশে।
যখন ভিড়ে র'বে,
ডাকবো আমি কাছে।
যখন শুয়ে র'বে,
স্বপ্ন হবো চোখে।
যখন কষ্ট পাবে,
জড়িয়ে যাবো মনে।
যখন কথা ক'বে,
গল্প হবো মুখে।
যখন খুশি হবে,
হাসি হবো ঠোঁটে।
যখন আমি থাকবো না,
থাকবো তোমার মাঝে।


উৎসর্গঃ ব্লগের অন্যতম গল্পের জাদুকর নীল আকাশ বোনাইকে আমার কাঁচা হাতের গল্প লেখার এই চেষ্টা নিবেদন করছি।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে এপ্রিল, ২০১৯ রাত ২:৫৯
৪২টি মন্তব্য ৪২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অবৈধ উপার্জনের সুযোগ ও উৎস বন্ধ করুন - মদ, জুয়া, পতিতাবৃত্তি এমনিতেই কমে যাবে ।

লিখেছেন স্বামী বিশুদ্ধানন্দ, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ সকাল ৭:২৯

দুর্নীতিই বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা | আমরা যেমন অক্সিজেনের মধ্যে বসবাস করি বলে এর অস্তিত্ব অনুভব করতে পারি না, আমাদের গোটা জাতি এই চরম দুর্নীতির মধ্যে আকণ্ঠ নিমজ্জিত রয়েছে বিধায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রভাতী প্রার্থনা

লিখেছেন ইসিয়াক, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ দুপুর ১:৫৫


প্রভাত বেলার নব রবি কিরণে ঘুচুক আঁধারের যত পাপ ও কালো ,
অনাচার পঙ্কিলতা দূর হোক সব ,ভালোত্ব যত ছড়াক আলো ।

আঁধার রাতের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের কাশ্মীর ভ্রমণ- ১৫: যবনিকা পর্ব

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৩:৪১

এর আগের পর্বটিঃ আমাদের কাশ্মীর ভ্রমণ- ১৪: বেলা শেষের গান


শ্রীনগর বিমান বন্দর টার্মিনালের মেঝেতে বিচরণরত একটি শালিক পাখি

টার্মিনাল ভবনের প্রবেশ ফটকে এসে দেখলাম, তখনো সময় হয়নি বলে নিরাপত্তা প্রহরীরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আত্মপক্ষ সমর্থন

লিখেছেন স্বপ্নবাজ সৌরভ, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৩:৫৯



আর কিছুদিন পর সামুতে আমার রেজিস্ট্রেশনের ৮ বছর পূর্ণ হবে।রেজিস্ট্রেশনের আগে সামুতে আমার বিচরণ ছিল। এই পোস্ট সেই পোস্ট দেখে বেড়াতাম। মন্তব্য গুলো মনোযোগ সহকারে পড়তাম।... ...বাকিটুকু পড়ুন

কালোটাকা দেশে বিপুল পরিমাণে বেকারত্বের সৃষ্টি করছে

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ রাত ১০:০৫



কালোটাকা হলো, দেশের উৎপাদনমুখী সেক্টর ও বাজার থেকে সরানো মুদ্রা; কালোটাকা অসৎ মালিকের হাতে পড়ে স্হবির কোন সেক্টরে প্রবেশ করে, কিংবা ক্যাশ হিসেবে সিন্ধুকে আটকা পড়ে, অথবা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×