somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দিনবদলের লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক

১৩ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ রাত ২:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :







আওয়ামী লীগের ২৩ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা
ইখতিয়ার উদ্দিন : মূল্যসন্ত্রাসী সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কমানো, দুর্নীতি নির্মূল, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মতো ৫টি লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে ২৩ দফা অঙ্গীকার সংবলিত নির্বাচনী ইশতেহার ‘দিনবদলের সনদ’ ঘোষণা করেছে আওয়ামী লীগ। ২৪ পৃষ্ঠার এই ইশতেহারের ২৩ দফায় জঙ্গিবাদ দমন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ, বিশ্বমন্দা মোকাবেলায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, কর্মসংস্থান, দলীয়করণমুক্ত গণমুখী প্রশাসন প্রতিষ্ঠা, ২০১৩ সালের মধ্যে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, ২০১৪ সালের মধ্যে নিরক্ষরতামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা ও রংপুরে একটি বিভাগ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্র"তি রয়েছে। নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় গেলে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার অঙ্গীকার করেছেন দলের সভানেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পাশাপাশি ‘ভিশন-২০২১’ শিরোনামে সংকট মোচন ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নির্মাণে আওয়ামী লীগের ৮ দফা রূপকল্পও প্রকাশ করেছেন তিনি। এসব কর্মসূচি নতুন ভোটার হওয়া তর"ণ-তর"ণীদের উদ্দেশে উৎসর্গ করেছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। রাজধানীর হোটেল শেরাটনের উইন্টার গার্ডেনে গতকাল শুক্রবার সকাল পৌনে ১১টায় আনুষ্ঠানিকভাবে দলের ইশতেহার ঘোষণা করেন শেখ হাসিনা। ২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এ দেশকে জনগণ যেভাবে দেখতে চায় সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এ ইশতেহার তৈরি করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের ২৩ দফার মধ্যে ৫টি বিষয়কে সর্বো"চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এই ৫ দফার মধ্যে রয়েছে : দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও সার্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, দুর্নীতির বির"দ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ, বৈষম্য নির্মূল করে দারিদ্র্য বিমোচন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা।
২৪ পৃষ্ঠার ইশতেহারে মূল পাঁচটি অঙ্গীকার ছাড়াও ২৩টি দফায় ৯৩টি করণীয় চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে স্থানীয় সরকার, কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন, পরিবেশ ও পানি সম্পদ, শিল্প-বাণিজ্য, শিক্ষা ও বিজ্ঞান, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার কল্যাণ, নারীর ক্ষমতায়ন, শিশু-কিশোর কল্যাণ, যুব সমাজ ও কর্মসংস্থান, যোগাযোগ ও ভৌত অবকাঠামো, শ্রমনীতি, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, অনুন্নত সম্প্রদায় ও অনগ্রসর অঞ্চল, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও অবাধ তথ্য-প্রবাহ, প্রতিরক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া, সরকার ও এনজিও এবং পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কিত কর্মসূচিগুলোর বিবরণ দেয়া হয়।
ইশতেহার ঘোষণাকালে শেখ হাসিনা প্রতিশ্র"তি দিয়ে বলেন, আপনাদের মূল্যবান ভোটে আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কমিয়ে আপনাদের জীবনে স্বস্তি ও আস্থা ফিরিয়ে আনবে।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, নিছক ক্ষমতার রদবদলের জন্য নয়, দেশকে ভয়াবহ সংকট থেকে উদ্ধার করে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী উন্নয়ন, গণতন্ত্র, শান্তি ও প্রগতির পথে অগ্রসর করে নিতে আওয়ামী লীগ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এজন্য আমরা আমাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য বা রূপকল্প, আগামী পাঁচ বছরে বাস্তবায়নযোগ্য কর্মসূচি এবং আশু ও জর"রি করণীয়সমূহ সংক্ষিপ্ত আকারে হাজির করেছি।
ধর্ম-বর্ণ, শ্রেণী ও দলমত নির্বিশেষে সমগ্র দেশবাসীর সুদৃঢ় ঐক্য এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এসব কর্মসূচি ও অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ইশতেহারের শুর"তেই ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেন শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে বিগত বিএনপি-জামাত চারদলীয় জোট সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, চারদলীয় জোটের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের জন্যই ‘ওয়ান ইলেভেন’ ঘটেছে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করা এবং জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস কঠোর হস্তে দমন করা হবে Ñ শেখ হাসিনার এই ঘোষণাকে উপস্থিত সবাই করতালি দিয়ে স্বাগত জানান। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের রায় কার্যকর ও জাতীয় চার নেতা হত্যাকাণ্ডের পুনর্বিচার, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার বিচারসহ সকল গ্রেনেড ও বোমা হামলার বিচার করার প্রতিশ্র"তিকেও একইভাবে স্বাগত জানান অভ্যাগতরা।
ইশতেহারে আওয়ামী লীগ বেশ কিছু অমীমাংসিত বিষয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। একটি ‘কয়লা নীতি’ প্রণয়নের অঙ্গীকার করে ইশতেহারে বলা হয়, এ যাবৎ প্রাপ্ত কয়লার অর্থনৈতিক ব্যবহার এবং কয়লাভিত্তিক শিল্প নির্মাণে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হবে। নতুন কয়লা ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণে বিশেষ গুর"ত্ব দেয়া হবে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সড়ক ও রেল যোগাযোগ এবং গভীর সমুদ্র বন্দরের বিষয়ে আওয়ামী লীগ তাদের অবস্থান এই ইশতেহারের মাধ্যমে পরিষ্কার করেছে। তাদের ১৫ নম্বর দফায় বলা হয়েছে, এশীয় রেল ও জনপথের আওতায় পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে রেল ও সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করা হবে। গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ এবং চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরকে আধুনিকায়ন করে এশিয়ার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। স্থলবন্দর আধুনিকায়ন করা হবে।
দ্রব্যমূল্য কমানের উদ্যোগ হিসেবে ‘মজুদদারি ও মুনাফাখোরি সিন্ডিকেট’ ভেঙে দেয়া এবং চাঁদাবাজি বন্ধের উদ্যোগ নেয়ার প্রতিশ্র"তি দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ভোক্তাদের স্বার্থে ভোগ্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গড়ে তোলা হবে। সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য সৃষ্টি করে দ্রব্যমূল্য কমানো হবে ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা হবে।
বিশ্বমন্দা মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় নীতি, পরামর্শ প্রদান, তথ্য ভাণ্ডার গড়ে তোলা ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য জর"রিভিত্তিতে একটি টাস্কফোর্স গঠন করার অঙ্গীকার করা হয়েছে এই ইশতেহারে। শেখ হাসিনা বলেছেন, ২০১২ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে পুনরায় খাদ্যে স্বনির্ভর করে তোলা হবে।
দুর্নীতি কমানের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিতের মাধ্যমে আরো শক্তিশালী করা, ক্ষমতাধরদের বার্ষিক সম্পদ বিবরণ দেয়া নিশ্চিত করা এবং সরকারি কর্মকাণ্ডের ব্যাপকভাবে কম্পিউটার চালিত করাসহ বেশ কিছু পদক্ষেপের কথা বলেছেন হাসিনা।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ব্যাপারে ইশতেহারে বলা হয়েছে - আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে তিন বছর মেয়াদি ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রামের’ আওতায় বর্তমানে নির্মাণাধীন ও গৃহীত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র দ্র"ত বাস্তবায়ন, জর"রি ভিত্তিতে ১০০-১৫০ মেগাওয়াট গ্যাস টারবাইন প্রকল্প, বৃহৎ ও ক্ষুদ্র বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণসহ বেসরকারি খাতে ১০, ২০ ও ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। এছাড়া পুরোনো বিদ্যুৎ কেন্দ্র মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও ওভারহোলিংয়ের ব্যবস্থা করে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। আগামী তিন বছরে অর্থাৎ ২০১১ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৫ হাজার মেগাওয়াটে, ২০১৩ সালের মধ্যে ৭ হাজার মেগাওয়াটে এবং ২০২১ সালে ২০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা হবে।
সুশাসন নিশ্চিত করতে অনেকগুলো অঙ্গীকার করেছে আওয়ামী লীগ। ইশতেহারে বলা হয়েছে, ক্ষমতায় গেলে বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা হবে; বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা হবে; জাতীয় সংসদকে কার্যকর ও সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে; প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সম্পদের হিসাব ও আয়ের উৎস প্রতি বছর জনসমক্ষে প্রকাশের ব্যবস্থা নেয়া হবে; রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংক্রান্ত কতিপয় সুনির্দিষ্ট বিষয় ছাড়া সাংসদরা দলের সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ পাবেন; রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নিষিদ্ধ করা এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা হবে।
‘ভিশন-২০২১’ এর অংশ হিসেবে ইশতেহারে বেশ কিছু লক্ষ্যমাত্রার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে : ২০১০ সালের মধ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রাথমিক স্তরে ভর্তির হার ১০০ শতাংশে উন্নীত করা; ২০১১ সালের মধ্যে সবার জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা; ২০১২ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা; ২০১৩ সালের মধ্যে প্রতিটি বাড়িকে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থার আওতায় আনা; ২০১৩ সালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশে উন্নীত করা এবং ২০১৭ সালে এই হার ১০ শতাংশে উন্নীত করা; ২০১৩ সালে বাংলাদেশে বিদ্যুতের সরবরাহ ৭ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০১৫ সালে ৮ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা; ২০২১ সাল নাগাদ দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা ২০ হাজার মেগাওয়াট ধরে নিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ; ২০১৪ সালের মধ্যে নিরক্ষরতামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা; ২০১৫ সালের মধ্যে সবার জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করা; ২০২১ সাল নাগাদ বেকারত্বের হার এখনকার ৪০ থেকে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা; একই সময়ের মধ্যে দারিদ্র্যের হার এখনকার ৪৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা; ২০২১ সালের মধ্যে সব ধরনের সংক্রামক ব্যাধি সম্পূর্ণ নির্মূল করা; ২০২১ সালের মধ্যে জনগণের গড় আয়ু ৭০-এর কোঠায় উন্নীত করা; ২০২১ সালের মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ব্যবহারের হার ৮০ শতাংশে উন্নীত করা ইত্যাদি।
বক্তৃতার শেষ পর্যায়ে শেখ হাসিনা নতুন ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, ভিশন ২০২১ বাস্তবায়নে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সম্পৃক্ততার ওপরই এর সাফল্য বহুলাংশে নির্ভর করছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলে চাল-ডাল-তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কমিয়ে জনজীবনে স্বস্তি ও আস্থা ফিরিয়ে আনা হবে। সকল ভেদাভেদ ভুলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জেগে ওঠার আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ‘আসুন দিনবদলের সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ হই। শোষণ-বঞ্চনা, বৈষম্য ও দুঃশাসনের চিরঅবসান ঘটাই। একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক ও সহিষ্ণু সমাজ গড়ে তুলি। সুখী-সমৃদ্ধিশালী সোনার বাংলা গড়ে তোলার সংগ্রামে নবজাগরণ সৃষ্টি করি, গড়ে তুলি বাঙালি জাতির আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।’
অভ্যাগতদের আসন গ্রহণের সময় সকাল সাড়ে ৯টা হলেও ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সকাল ৮টার পর থেকেই অতিথিরা হোটেল শেরাটনের উইন্টার গার্ডেনে আসতে থাকেন। মিলনায়তনের ডান দিকের চেয়ারগুলো সংরক্ষিত ছিল কূটনীতিক ও বিশিষ্ট নাগরিকদের জন্য। মাঝের সারির চেয়ার রাখা ছিল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের জন্য। আর বাম সারিতে গণমাধ্যম কর্মীদের বসার জায়গা রাখা হয়।
মঞ্চের দুদিকে দুটি প্রজেকশন স্ক্রিনে পুরো অনুষ্ঠানের ভিডিও তাৎক্ষণিকভাবে প্রদর্শন করা হয়।
অনুষ্ঠান শুর"র আগেই অতিথিদের জন্য প্রতিটি চেয়ারে একটি করে ফোল্ডার রাখা হয়। এতে ছিল দলের ইশতেহার, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত বিএনপির ৩০৩টি হরতালে ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ সংবলিত একটি প্রতিবেদন, বিগত জোট সরকারের বিভিন্ন অপকর্মের সমালোচনাসহ একটি পুস্তিকা এবং ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের হাতে নির্যাতিত সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ছবিসহ পোর্টফোলিও ‘ধর্ষিত বাংলাদেশ’।
শেখ হাসিনা সকাল সোয়া ১০টার দিকে উইন্টার গার্ডেনে এসে একবারে সামনের সারির মাঝের চেয়ারে বসেন। তার ডান দিকে ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুর রাজ্জাক এবং বাম দিকে প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসা। বাদামি পাড়ের ক্রিম কালারের শাড়ি পরিহিতা শেখ হাসিনা বক্তৃতা শুর" করার আগে শিল্পীরা জাতীয় সঙ্গীত ও দলীয় সঙ্গীত (জয় বাংলা বাংলার জয়) পরিবেশন করেন। এরপর বাহান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত পথ পরিক্রমার চিত্র তুলে ধরে একটি মিউজিক ভিডিও উপস্থাপন করা হয়। এর শিরোনামও ছিল ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’। এরপর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণআন্দোলনসহ বাংলাদেশের ঐতিহাসিক পটভূমি এবং আওয়ামী লীগের পাঁচ বছরের শাসনামলের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নের চিত্র একটি তুলে ধরা হয় স্লাইড শোতে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে জাপানের রাষ্ট্রদূত মাসাউকি ইনো, ভারতের রাষ্ট্রদূত পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী, সাবেক উপদেষ্টা রোকেয়া আফজাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এ কে আজাদ চৌধুরী, অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত, জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন বাবলু, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, শহীদ জায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, এফবিসিসিআই সভাপতি আনিসুল হক, বিজিএমইএ সভাপতি আনোয়ার"ল আলম চৌধুরী পারভেজ, বিকেএমইএ সভাপতি ফজলুল হক উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য ১৪ দল, জাতীয় পার্টি (এরশাদ), জাতীয় পার্টি (মঞ্জু), জাকের পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, ইসলামী ঐক্যফ্রন্টসহ সমমনা কয়েকটি দল নিয়ে গঠিত মহাজোটের ব্যানারে আগামী ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে আওয়ামী লীগ। গত বৃহস্পতিবার সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহঃ)-এর মাজার জেয়ারতের মাধ্যমে মহাজোটের আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারণা শুর" করেন শেখ হাসিনা।




মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দিনবদলের লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক





আওয়ামী লীগের ২৩ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা
ইখতিয়ার উদ্দিন : মূল্যসন্ত্রাসী সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কমানো, দুর্নীতি নির্মূল, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মতো ৫টি লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে ২৩ দফা অঙ্গীকার সংবলিত নির্বাচনী ইশতেহার ‘দিনবদলের সনদ’ ঘোষণা করেছে আওয়ামী লীগ। ২৪ পৃষ্ঠার এই ইশতেহারের ২৩ দফায় জঙ্গিবাদ দমন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ, বিশ্বমন্দা মোকাবেলায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, কর্মসংস্থান, দলীয়করণমুক্ত গণমুখী প্রশাসন প্রতিষ্ঠা, ২০১৩ সালের মধ্যে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, ২০১৪ সালের মধ্যে নিরক্ষরতামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা ও রংপুরে একটি বিভাগ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্র"তি রয়েছে। নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় গেলে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার অঙ্গীকার করেছেন দলের সভানেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পাশাপাশি ‘ভিশন-২০২১’ শিরোনামে সংকট মোচন ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নির্মাণে আওয়ামী লীগের ৮ দফা রূপকল্পও প্রকাশ করেছেন তিনি। এসব কর্মসূচি নতুন ভোটার হওয়া তর"ণ-তর"ণীদের উদ্দেশে উৎসর্গ করেছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। রাজধানীর হোটেল শেরাটনের উইন্টার গার্ডেনে গতকাল শুক্রবার সকাল পৌনে ১১টায় আনুষ্ঠানিকভাবে দলের ইশতেহার ঘোষণা করেন শেখ হাসিনা। ২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এ দেশকে জনগণ যেভাবে দেখতে চায় সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এ ইশতেহার তৈরি করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের ২৩ দফার মধ্যে ৫টি বিষয়কে সর্বো"চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এই ৫ দফার মধ্যে রয়েছে : দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও সার্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, দুর্নীতির বির"দ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ, বৈষম্য নির্মূল করে দারিদ্র্য বিমোচন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা।
২৪ পৃষ্ঠার ইশতেহারে মূল পাঁচটি অঙ্গীকার ছাড়াও ২৩টি দফায় ৯৩টি করণীয় চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে স্থানীয় সরকার, কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন, পরিবেশ ও পানি সম্পদ, শিল্প-বাণিজ্য, শিক্ষা ও বিজ্ঞান, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার কল্যাণ, নারীর ক্ষমতায়ন, শিশু-কিশোর কল্যাণ, যুব সমাজ ও কর্মসংস্থান, যোগাযোগ ও ভৌত অবকাঠামো, শ্রমনীতি, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, অনুন্নত সম্প্রদায় ও অনগ্রসর অঞ্চল, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও অবাধ তথ্য-প্রবাহ, প্রতিরক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া, সরকার ও এনজিও এবং পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কিত কর্মসূচিগুলোর বিবরণ দেয়া হয়।
ইশতেহার ঘোষণাকালে শেখ হাসিনা প্রতিশ্র"তি দিয়ে বলেন, আপনাদের মূল্যবান ভোটে আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কমিয়ে আপনাদের জীবনে স্বস্তি ও আস্থা ফিরিয়ে আনবে।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, নিছক ক্ষমতার রদবদলের জন্য নয়, দেশকে ভয়াবহ সংকট থেকে উদ্ধার করে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী উন্নয়ন, গণতন্ত্র, শান্তি ও প্রগতির পথে অগ্রসর করে নিতে আওয়ামী লীগ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এজন্য আমরা আমাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য বা রূপকল্প, আগামী পাঁচ বছরে বাস্তবায়নযোগ্য কর্মসূচি এবং আশু ও জর"রি করণীয়সমূহ সংক্ষিপ্ত আকারে হাজির করেছি।
ধর্ম-বর্ণ, শ্রেণী ও দলমত নির্বিশেষে সমগ্র দেশবাসীর সুদৃঢ় ঐক্য এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এসব কর্মসূচি ও অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ইশতেহারের শুর"তেই ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেন শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে বিগত বিএনপি-জামাত চারদলীয় জোট সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, চারদলীয় জোটের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের জন্যই ‘ওয়ান ইলেভেন’ ঘটেছে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করা এবং জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস কঠোর হস্তে দমন করা হবে Ñ শেখ হাসিনার এই ঘোষণাকে উপস্থিত সবাই করতালি দিয়ে স্বাগত জানান। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের রায় কার্যকর ও জাতীয় চার নেতা হত্যাকাণ্ডের পুনর্বিচার, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার বিচারসহ সকল গ্রেনেড ও বোমা হামলার বিচার করার প্রতিশ্র"তিকেও একইভাবে স্বাগত জানান অভ্যাগতরা।
ইশতেহারে আওয়ামী লীগ বেশ কিছু অমীমাংসিত বিষয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। একটি ‘কয়লা নীতি’ প্রণয়নের অঙ্গীকার করে ইশতেহারে বলা হয়, এ যাবৎ প্রাপ্ত কয়লার অর্থনৈতিক ব্যবহার এবং কয়লাভিত্তিক শিল্প নির্মাণে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হবে। নতুন কয়লা ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণে বিশেষ গুর"ত্ব দেয়া হবে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সড়ক ও রেল যোগাযোগ এবং গভীর সমুদ্র বন্দরের বিষয়ে আওয়ামী লীগ তাদের অবস্থান এই ইশতেহারের মাধ্যমে পরিষ্কার করেছে। তাদের ১৫ নম্বর দফায় বলা হয়েছে, এশীয় রেল ও জনপথের আওতায় পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে রেল ও সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করা হবে। গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ এবং চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরকে আধুনিকায়ন করে এশিয়ার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। স্থলবন্দর আধুনিকায়ন করা হবে।
দ্রব্যমূল্য কমানের উদ্যোগ হিসেবে ‘মজুদদারি ও মুনাফাখোরি সিন্ডিকেট’ ভেঙে দেয়া এবং চাঁদাবাজি বন্ধের উদ্যোগ নেয়ার প্রতিশ্র"তি দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ভোক্তাদের স্বার্থে ভোগ্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গড়ে তোলা হবে। সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য সৃষ্টি করে দ্রব্যমূল্য কমানো হবে ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা হবে।
বিশ্বমন্দা মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় নীতি, পরামর্শ প্রদান, তথ্য ভাণ্ডার গড়ে তোলা ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য জর"রিভিত্তিতে একটি টাস্কফোর্স গঠন করার অঙ্গীকার করা হয়েছে এই ইশতেহারে। শেখ হাসিনা বলেছেন, ২০১২ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে পুনরায় খাদ্যে স্বনির্ভর করে তোলা হবে।
দুর্নীতি কমানের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিতের মাধ্যমে আরো শক্তিশালী করা, ক্ষমতাধরদের বার্ষিক সম্পদ বিবরণ দেয়া নিশ্চিত করা এবং সরকারি কর্মকাণ্ডের ব্যাপকভাবে কম্পিউটার চালিত করাসহ বেশ কিছু পদক্ষেপের কথা বলেছেন হাসিনা।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ব্যাপারে ইশতেহারে বলা হয়েছে - আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে তিন বছর মেয়াদি ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রামের’ আওতায় বর্তমানে নির্মাণাধীন ও গৃহীত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র দ্র"ত বাস্তবায়ন, জর"রি ভিত্তিতে ১০০-১৫০ মেগাওয়াট গ্যাস টারবাইন প্রকল্প, বৃহৎ ও ক্ষুদ্র বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণসহ বেসরকারি খাতে ১০, ২০ ও ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। এছাড়া পুরোনো বিদ্যুৎ কেন্দ্র মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও ওভারহোলিংয়ের ব্যবস্থা করে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। আগামী তিন বছরে অর্থাৎ ২০১১ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৫ হাজার মেগাওয়াটে, ২০১৩ সালের মধ্যে ৭ হাজার মেগাওয়াটে এবং ২০২১ সালে ২০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা হবে।
সুশাসন নিশ্চিত করতে অনেকগুলো অঙ্গীকার করেছে আওয়ামী লীগ। ইশতেহারে বলা হয়েছে, ক্ষমতায় গেলে বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা হবে; বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা হবে; জাতীয় সংসদকে কার্যকর ও সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে; প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সম্পদের হিসাব ও আয়ের উৎস প্রতি বছর জনসমক্ষে প্রকাশের ব্যবস্থা নেয়া হবে; রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংক্রান্ত কতিপয় সুনির্দিষ্ট বিষয় ছাড়া সাংসদরা দলের সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ পাবেন; রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নিষিদ্ধ করা এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা হবে।
‘ভিশন-২০২১’ এর অংশ হিসেবে ইশতেহারে বেশ কিছু লক্ষ্যমাত্রার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে : ২০১০ সালের মধ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রাথমিক স্তরে ভর্তির হার ১০০ শতাংশে উন্নীত করা; ২০১১ সালের মধ্যে সবার জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা; ২০১২ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা; ২০১৩ সালের মধ্যে প্রতিটি বাড়িকে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থার আওতায় আনা; ২০১৩ সালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশে উন্নীত করা এবং ২০১৭ সালে এই হার ১০ শতাংশে উন্নীত করা; ২০১৩ সালে বাংলাদেশে বিদ্যুতের সরবরাহ ৭ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০১৫ সালে ৮ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা; ২০২১ সাল নাগাদ দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা ২০ হাজার মেগাওয়াট ধরে নিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ; ২০১৪ সালের মধ্যে নিরক্ষরতামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা; ২০১৫ সালের মধ্যে সবার জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করা; ২০২১ সাল নাগাদ বেকারত্বের হার এখনকার ৪০ থেকে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা; একই সময়ের মধ্যে দারিদ্র্যের হার এখনকার ৪৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা; ২০২১ সালের মধ্যে সব ধরনের সংক্রামক ব্যাধি সম্পূর্ণ নির্মূল করা; ২০২১ সালের মধ্যে জনগণের গড় আয়ু ৭০-এর কোঠায় উন্নীত করা; ২০২১ সালের মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ব্যবহারের হার ৮০ শতাংশে উন্নীত করা ইত্যাদি।
বক্তৃতার শেষ পর্যায়ে শেখ হাসিনা নতুন ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, ভিশন ২০২১ বাস্তবায়নে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সম্পৃক্ততার ওপরই এর সাফল্য বহুলাংশে নির্ভর করছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলে চাল-ডাল-তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কমিয়ে জনজীবনে স্বস্তি ও আস্থা ফিরিয়ে আনা হবে। সকল ভেদাভেদ ভুলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জেগে ওঠার আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ‘আসুন দিনবদলের সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ হই। শোষণ-বঞ্চনা, বৈষম্য ও দুঃশাসনের চিরঅবসান ঘটাই। একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক ও সহিষ্ণু সমাজ গড়ে তুলি। সুখী-সমৃদ্ধিশালী সোনার বাংলা গড়ে তোলার সংগ্রামে নবজাগরণ সৃষ্টি করি, গড়ে তুলি বাঙালি জাতির আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।’
অভ্যাগতদের আসন গ্রহণের সময় সকাল সাড়ে ৯টা হলেও ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সকাল ৮টার পর থেকেই অতিথিরা হোটেল শেরাটনের উইন্টার গার্ডেনে আসতে থাকেন। মিলনায়তনের ডান দিকের চেয়ারগুলো সংরক্ষিত ছিল কূটনীতিক ও বিশিষ্ট নাগরিকদের জন্য। মাঝের সারির চেয়ার রাখা ছিল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের জন্য। আর বাম সারিতে গণমাধ্যম কর্মীদের বসার জায়গা রাখা হয়।
মঞ্চের দুদিকে দুটি প্রজেকশন স্ক্রিনে পুরো অনুষ্ঠানের ভিডিও তাৎক্ষণিকভাবে প্রদর্শন করা হয়।
অনুষ্ঠান শুর"র আগেই অতিথিদের জন্য প্রতিটি চেয়ারে একটি করে ফোল্ডার রাখা হয়। এতে ছিল দলের ইশতেহার, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত বিএনপির ৩০৩টি হরতালে ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ সংবলিত একটি প্রতিবেদন, বিগত জোট সরকারের বিভিন্ন অপকর্মের সমালোচনাসহ একটি পুস্তিকা এবং ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের হাতে নির্যাতিত সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ছবিসহ পোর্টফোলিও ‘ধর্ষিত বাংলাদেশ’।
শেখ হাসিনা সকাল সোয়া ১০টার দিকে উইন্টার গার্ডেনে এসে একবারে সামনের সারির মাঝের চেয়ারে বসেন। তার ডান দিকে ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুর রাজ্জাক এবং বাম দিকে প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসা। বাদামি পাড়ের ক্রিম কালারের শাড়ি পরিহিতা শেখ হাসিনা বক্তৃতা শুর" করার আগে শিল্পীরা জাতীয় সঙ্গীত ও দলীয় সঙ্গীত (জয় বাংলা বাংলার জয়) পরিবেশন করেন। এরপর বাহান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত পথ পরিক্রমার চিত্র তুলে ধরে একটি মিউজিক ভিডিও উপস্থাপন করা হয়। এর শিরোনামও ছিল ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’। এরপর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণআন্দোলনসহ বাংলাদেশের ঐতিহাসিক পটভূমি এবং আওয়ামী লীগের পাঁচ বছরের শাসনামলের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নের চিত্র একটি তুলে ধরা হয় স্লাইড শোতে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে জাপানের রাষ্ট্রদূত মাসাউকি ইনো, ভারতের রাষ্ট্রদূত পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী, সাবেক উপদেষ্টা রোকেয়া আফজাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এ কে আজাদ চৌধুরী, অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত, জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন বাবলু, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, শহীদ জায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, এফবিসিসিআই সভাপতি আনিসুল হক, বিজিএমইএ সভাপতি আনোয়ার"ল আলম চৌধুরী পারভেজ, বিকেএমইএ সভাপতি ফজলুল হক উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য ১৪ দল, জাতীয় পার্টি (এরশাদ), জাতীয় পার্টি (মঞ্জু), জাকের পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, ইসলামী ঐক্যফ্রন্টসহ সমমনা কয়েকটি দল নিয়ে গঠিত মহাজোটের ব্যানারে আগামী ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে আওয়ামী লীগ। গত বৃহস্পতিবার সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহঃ)-এর মাজার জেয়ারতের মাধ্যমে মহাজোটের আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারণা শুর" করেন শেখ হাসিনা।




১০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×