ব্রিটেনে পড়তে আসা এক বাংলাদেশী তরুণীকে দেশে নিয়ে জোর করে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দেয়ার অভিযোগ এনেছেন ব্রিটিশ হাইকোর্ট। হাইকোর্ট এ মহিলার অভিভাবকদের বিরুদ্ধে ফোর্সড ম্যারেজ বিষয়ক নোটিশ জারি করেছেন। গত কয়েকদিন ধরে এ ঘটনাটি ব্রিটেনের প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হচ্ছে। বিবিসি, স্কাই নিউজ, দ্য টেলিগ্রাফ, ডেইলি মিরর, দ্য ইনডিপেনডেন্টসহ মূলধারার পত্রিকাগুলোতে এ নিয়ে প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে।
২০০২ সালে হুমায়রা আবেদিন স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে ব্রিটেনে পড়তে আসেন। লিডস ইউনিভার্সিটিতে তিনি ডাক্তারি পড়েন। লেখাপড়া প্রায় শেষ পর্যায়ে। ইতিমধ্যে কয়েকটি হাসপাতালে ট্রেইনি হিসেবে কাজ করেন। সর্বশেষ তিনি ট্রেইনি জিপি হিসেবে একটি হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। আর এক বছর পর পুরোপুরি চিকিৎসক হিসেবে তিনি ছাড়পত্র পাবেন। লন্ডনের হাসপাতালে ট্রেইনি থাকা অবস্থায় পরিচয় হয় হিন্দু ধর্মাবলম্বী ৪৪ বছর বয়সী একজনের সঙ্গে। পেশায় তিনি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। দু’জনই পূর্ব লন্ডনের ইস্টহ্যাম এলাকায় বাস করতেন। পরিচয়ের সূত্র ধরে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। একসময় তাদের সম্পর্ক দৃঢ় হয়। খবর পেয়ে বাংলাদেশ থেকে হুমায়রার অভিভাবকরা লন্ডনে এসে তাকে অনেক বোঝাতে চেষ্টা করেন। এ সম্পর্ক তারা কিছুতেই মেনে নেবেন না বলে জানিয়ে দেন। কিন্তু হুমায়রা তার সিদ্ধান্তে ছিল অনড়।
গত জুন মাসে হুমায়রার অভিভাবকরা লন্ডনে তাকে ফ্ল্যাটে আটকে রেখেছিলেন। তার প্রেমিকের সঙ্গে কোনরকম যোগাযোগ করতে দেননি। পুলিশের হস্তক্ষেপে তখন ঘটনাটির সুরাহা হয়।
মায়ের অসুখের খবর দিয়ে হুমায়রাকে গত আগস্টে দেশে ফিরিয়ে নেয়া হয়। এরপর থেকে প্রেমিকের সঙ্গে তার আর কোন যোগাযোগের সুযোগ হয়নি। লন্ডনে পরিচিতজনদের সঙ্গেও তার কোন যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। এমনকি দেশে আÍীয়স্বজনরাও জানেন না হুমায়রা এখন কোথায় আছেন। বাধ্য হয়ে তার আÍীয় শিপ্রা চৌধুরী বাংলাদেশের হাইকোর্টের মাধ্যমে হুমায়রার অবস্থান জানতে আবেদন জানান। আদালত তিনবার নোটিশ পাঠিয়েছেন তার অভিভাবকের কাছে, কিন্তু নোটিশের জবাব দেয়া হয়নি। মেয়ের অবস্থান সম্পর্কে কিছুই জানাননি তারা। অবশেষে ব্রিটিশ হাইকোর্ট ঘটনাটি অবহিত হয়েছেন। বাংলাদেশের আদালতের নির্দেশ অমান্য করায় হুমায়রার অভিভাবকের বিরুদ্ধে নোটিশ জারি করেছেন ব্রিটিশ হাইকোর্ট। জোরপূর্বক বিয়ের শিকার হচ্ছেন হুমায়রাÑ এ আশংকায় তার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন ব্রিটিশ হাইকোর্ট।
হুমায়রা আবেদিনের প্রতিনিধিত্বকারী ব্রিটিশ আইনজীবী ব্যারিস্টার আন-মেরি হাচিনসন বলেছেন, ‘আমরা এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন, ধারণা করা হচ্ছে এ সপ্তাহের মধ্যেই হুমায়রাকে সেখানে জোর করে বিয়ে দেয়া হতে পারে। তিনি বলেন, ব্রিটেনের আইন তার সব অধিবাসীকে রক্ষা করে। যেহেতু হুমায়রা ব্রিটেনে বসবাস করেন তার বিষয়টি কেবল বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের ভাবার বিষয় নয়। বিষয়টির অচিরেই সুরাহা হবেÑ এমন আশা পোষণ করেন তিনি।
হুমায়রা আবেদিনের বন্ধু উল্লিখিত সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার নিজের পরিচয় প্রদানে ভীতিবোধ করছেন। তিনি একটি সংবাদপত্রকে জানান, হুমায়রার সঙ্গে তার দীর্ঘ ৫ বছরের সম্পর্ক। তিনি অভিযোগ করেন, তার প্রেমিকাকে জোর করে ঘুমের ওষুধ সেবন করানো হচ্ছে। আÍীয়স্বজনের কড়া নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
হুমায়রা তার বন্ধুর কাছে ই-মেইলে জানিয়েছেনÑ ‘আমি আশা করছি জীবনে আরও একবার তোমাকে দেখতে পারব। এখন এটাই আমার একমাত্র ইচ্ছা, তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমাকে ঘৃণা করো না। আমার জীবন শেষ হয়ে গেছে। এখন আর কিছুই করার নেই। আশা-ভরসাও কিছু নেই। আমি সবসময় তোমার কথা মনে রাখব। আমি তোমার সঙ্গে ঘর বাঁধতে চেয়েছিলাম। এখন আর তা সম্ভব নয়।’
গত ২৫ নভেম্বর জোরপূর্বক ছেলেমেয়েদের বিয়ে দেয়া বিষয়ক এক আইন ব্রিটেনে কার্যকর হয়েছে। এ ধরনের অভিযোগে অভিযুক্তদের ২ বছরের জেল হতে পারে। যেসব অভিভাবক তাদের সন্তানদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দেবেন তারা এ অভিযোগে অপরাধী হবেন। আইনটি কার্যকরী হওয়ার ২০ দিনের মাথায় বাংলাদেশী মেয়ে হুমায়রার অভিযোগটি প্রথম মামলা হিসেবে ব্রিটিশ হাইকোর্টে উত্থাপিত হয়। বাংলাদেশের হাইকোর্টে নির্দেশটি তামিল না হওয়ায় ব্রিটিশ আইনজীবীরা ব্রিটেনের হাইকোর্টকে বিষয়টি অবহিত করেছেন।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ ভোর ৪:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



