(৯৮% সত্যি ঘটনার অবলম্বনে)
স্পট : দৈনিক যায় যায় দিন
বিশ্বনাথ প্রামানিক : বর্তমান নিউজ এডিটর অরুণ কুমার দে
সময় : ২০০৯ সাল
বিশ্বনাথ প্রামাণিক অফিসের কাঁচঘেরা ঘরে তার বসার চেয়ারটা টেবিলের উল্টোমুখি করে বসে জানালা দিয়ে বাহিরের বিল্ডিং-এর দৃশ্য দেখতে দেখতে ভাবছেন আজকের মিটিং-এ যা বলেছেন তার পরিণতি কি হবে? ওদেরকে কি তাড়ানো যাবে? যদি যায় তাহলে কত দিনে? আর তার জন্য কি কি করতে হবে? এ সব ভাবনা-চিন্তা করতে করতে এক সময় তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। এটা অবশ্য নতুন কোনো ঘটনা নয়, দুপুরে মিটিং-এর পর প্রায় প্রতিদিনই চেয়ার ঘুরিয়ে টেবিলের উল্টো দিকে জানালা মুখি করে চোখ বুঁজে ঘুম দেন। দেড়টা দুটো থেকে চারটা সাড়ে চারটা পর্যন্ত ঘুমিয়ে চোখ-মুখে পানি দিয়ে ফ্রেস হয়ে ওয়ার্কস্টেশনে এসে বসেন। শুরু করেন দিনের কাজ। পাঁচটা থেকে টানা দশটা পর্যন্ত। অবশ্য পুরোটা সময়টা চেয়ারে বসে কাজ করেন তা নয়, মাঝে-মধ্যে উঠে ছুরি, কাঁচি নিয়ে কাটাকুটি করে ড্যামি তৈরি করেন। তুহিন বলে এক তরুণ সাবএডিটর তার এ কাজে সহযোগিতা করে। পেনসিল, ড্রইংপেন, ছুরি, কাঁচি, টেপ, গাম এগিয়ে দেয়। গাম দিয়ে ড্যামিসিটে হেডলাইন ও কম্পোজ আইটেম বসাতে সাহায্য করে। সংবাদপত্রে এই ডামি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোন নিউজ কোথায যাবে এবং কিভাবে যাবে তা এই ডামিতেই মার্ক করা হয়। তুহিন শুধু যে ড্যামি তৈরিতে সাহায্য করে তা নয়, সাহায্য করে মেকআপ রুমে ঢুকে মেকআপ করতে। সাহায্য করে রাতে হাঁটার সময় সঙ্গ দিয়ে। বিশ্বনাথ প্রামাণিক প্রতিদিন রাতে হাঁটেন। পত্রিকার ফাস্ট এডিশন ছেড়ে দিয়ে নির্বাহী সম্পাদকের কাছে সহকর্মীদের বিরুদ্ধে একগাদা অভিযোগ করে ১১টা নাগাদ হাঁটতে বের হন। হাঁটেন তুহিন ও শামিমকে নিয়ে। এরা দু’জনই পত্রিকার সাব-এডিটর, বয়সে তরুণ। এরা নিজেদের প্রয়োজনে নয়, হাঁটে বিশ্বনাথ প্রামানিককে সঙ্গ দিতে। খুশি করতে। অনুগত্যের প্রমাণ দিতে। তেজগাঁও শিল্প অঞ্চলের রাস্তায় ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ মিনিট হেঁটে ঘেমে-নেয়ে অফিসে ঢুকে আবার কাঁচঘেরা ঘরের চেয়ারে বসে বিশ্রাম নেন প্রামানিক। এই সময় এমন একটা ভাব করেন যেন টেলিভিশনে চোখ রেখে সর্বশেষ সংবাদ দেখে নিচ্ছেন।
এ জন্য অবশ্য সাব-এডিটররা আছেন সার্বক্ষণিক নিউজ মনিটর করার জন্য। ব্রেকিং নিউজ হলে তা সঙ্গে সঙ্গে কম্পিউটার থেকে বের করে শিফট ইনচার্জকে দেয়। তারপরও শিফট ইনচার্জ, নিউজএডিটরকে চোখ কান খোলা রাখতে হয়। আর তাই বিশ্রাম নেয়ার সময়ও টেলিভিশন ছেড়ে রাখেন। এ সময় চ্যানেল আইসহ কম বেশি বিভিন্ন দেশি চ্যানেলে সংবাদপত্র ভিত্তিক অনুষ্ঠান হয়। এ অনুষ্ঠানে বিভিন্ন পত্রিকার হেড লাইন দেখানো হয়। সেই সঙ্গে প্রধান প্রধান সংবাদ নিয়ে আলোচনা হয়। এ আলোচনায় তার পত্রিকা দেখানো হলো কি না। দেখালে কি দেখালো তা দেখেন নিয়মিত। তারপর সেকেন্ড এডিশনের জন্য ঢোকেন মেকআপ রুমে। রাত একটার মধ্যে সেকেন্ড এডিশনের কাজ শেষ করার কথা। কিন্তু না, শেষ হয় না। শেষ করতে পারেন না। শেষ করতে কখনো ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ কখনো পঁয়তাল্লিশ-পঞ্চাশ মিনিট পর্যন্ত সময় লেগে যায়। এ নিয়ে লেট নাইটে কর্মরত অন্যান্যরা ক্ষুব্ধ হলেও বিশ্বনাথ নির্বিকার। তার এক কথা : ‘এটা সংবাদপত্র। দেরি হবেই। লেটেস্ট নিউজ না ধরালে পাঠক পত্রিকা নেবে কেন’ ইত্যাদি। কিন্তু সত্যিই লেটেস্ট নিউজের জন্য দেরি, না, তা নয়। এটা একটা অজুহাত মাত্র।
এ অজুহাত না হলে তো দেরি করা জায়েজ হবে না। অবশ্য সেকেন্ড এডিশনের দেরি করা নিয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো মাথা ব্যাথা নেই। কারণ অতিরিক্ত সময়ের জন্য এ পত্রিকা অফিসে ওটির ব্যবস্থা নেই। ওটির ব্যবস্থা থাকলে কর্তৃপক্ষ অবশ্যই ব্যবস্থা নিতো। আর এ সুযোগটাই নেন বিশ্বনাথ প্রামাণিক। নিউজএডিটর নিজে সময়ের ক্ষেত্রে এ সুযোগ নিলেও অন্যদের বেলায় অত্যন্ত কঠিন ও কঠোর। একেবারে যাকে বলে পান থেকে চুন খসার জো নেই।এ অনেকটা এরকম- কৃষ্ঞের বেলায় লিলা খেলা আর অন্যের বেলায় যত দোষ।
অফিসে রাতের শিফট শুরু হয় বিকেল সাড়ে চারটায়। শিফট শুরু হওয়ার পর কোনো সাংবাদিকের নড়াচড়ার উপায় নেই। সবাইকে সিটে বসে থাকতে হবে। চা-সিগারেট, গেস্ট কোনো কিছুই এলাও নয়। এমনকি অসুস্থতাও গ্রহণযোগ্য নয়। শুধু তাই নয়, অসুস্থ আত্মীয়কে রক্ত দেয়ার জন্য ছুটি দিতেও রাজি নন। সম্প্রতি এমনি একটি ঘটনা ঘটেছে। এক তরুণ সাবএডিটর অফিসে আসার পর খবর পান তার এক আত্মীয়ের জন্য রক্তের প্রয়োজন। এটা শুনে রক্তের গ্রুপ মিলে যাওয়ায় তরুণ সাংবাদিক রক্ত দেয়ার জন্য হাসপাতালে যাবেন এটা বলতেই বিশ্বনাথ একেবারে রেগে আগুন।
‘সারাদিন কি করলা? এখন যাবা রক্ত দিতে । এসব ছাড়। যাও বসে কাজ করো নইলে এই কলমটা দ্যাখছো, এটা একেবারে পাছায় ঢুকইয়া দিমু।’
তরুণ সাংবাদিকটি বোকা বনে গেলেন। আর একদিন এক সাংবাদিক ফোন করে জানান তিনি বুকে ব্যাথা অনুভব করছেন। ডাক্তার দেখিয়ে আফিসে আসতে তার দেরি হবে। এ কথা শুনে নিউজএডিটর ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন। বললেন, ‘এসব অজুহাত বাদ দিয়া সোজা অফিসে আসো। নইলে বিপদ হবে। কেউ তোমারে বাঁচাতে পারবে না।’
এমনকি নিকট আত্মীয়ের মৃত্যুতেও অফিস ত্যাগ গ্রহণযোগ্য নয়। এমনই এক ঘটনা ঘটে এক সিনিয়র সাংবাদিকের ক্ষেত্রে। অফিসে আসার পর খবর পেলেন তার শ্যালক মারা গেছে। খবর পেয়েই হতভম্ভ শোকাহত দুলাভাই বসকে বললেন, ‘দাদা আমাকে একটু যেতে হবে। এইমাত্র খবর পেলাম আমার শ্যালক মারা গেছে। আজকের দিনটা চালিয়ে নেন প্লিজ।’ একথা বলে কম্পিউটার সাট-ডাউন করতে যাবেন ঠিক এ সময়ে বিশ্বনাথ বললেন, ‘এখন গিয়ে কি করবেন? শ্যালক তো, মরেই গেছে। বরং আগে খবর নেন কখন জানাজা, দাফন হবে। তখন যাবেন। এখন যাবার কি আছে।’
একথা শুনে সিনিয়র সাংবাদিক একেবারে থ মেরে গেলেন। তার দীর্ঘ জীবনে এ রকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি কখনও হননি। তাই কোনো কথা না বাড়িয়ে অফিস ত্যাগ করলেন। পরদিন অফিসে এসে শোনেন তার এই যাওয়া নিয়ে নির্বাহী সম্পাদকের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগ করেছে । শুধু তাই নয় এ নিয়ে তিনি অনেকক্ষণ ধরে গজরগজরও করেছেন। বলেছেন সিনিয়ররা এরকম করলে অফিসের কোনো ডিসিপ্লিন থাকে? এরকম নালিশ ও অভিযোগ করা তার নিত্যদিনের কাজ।
১৬ জুলাই ২০০৯-এ ফাস্ট এডিশন ছাড়ার পর নির্বাহী সম্পাদককে নালিশ করেন রহিম ভাই নিউজ না ছেড়ে নেমে গেছে চা সিগারেট খেতে। টেবিলে কমপক্ষে দশটা নিউজ। এখন সব আমাকে দেখতে হবে। একেবারে ডাহা মিথ্যা অভিযোগ। সত্য হলোÑ ফাস্ট এডিশন ছাড়ার পর কয়েকটা নিউজ এসেছে। এরকম নিউজ সেকেন্ড এডিশনে প্রায় প্রতি দিনই থাকে। প্রতিদিন এসব নিউজ দেখা হয় ফাস্ট এডিশন ছেড়ে দিয়ে চা-নাস্তা খাওয়ার পর। রাত দশটা পর্যন্ত একটানা কাজের পর সবাই চা-নাস্তা করে। এটাই হয়ে আসছে দীর্ঘ দিন ধরে। এর কোনো ব্যাতিক্রম নেই। শুধু এই পত্রিয়ই নয় সব পত্রিকা অফিসেই এই নিয়মে কাজ হয়। আর সেই নিয়য়মতোই রহিম ভাই ফাস্ট এডিশন ছাড়ার পর চা-নাস্তা করতে ক্যান্টিনে গিয়েছেন। আর এ সুযোগে বেচারা রহিম ভাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ কাজ না করার, কাজে ফাঁকি দেয়ার। একইভাবে পরদিন চিফ রিপোর্টারের বিরুদ্ধে দেরিতে নিউজ দেয়ার অভিযোগ করে বলেনÑ তিনি যে নিউজ দিতে বলেন চিফ রিপোর্টার তা দেন না। আসলে চিফ রিপোর্টার ‘একটা অযোগ্য অপাদার্থ, ওরে ঘাড় ধরে বের করে দেন’।
চিফ রিপোর্টার একজন নিরেট ভদ্রলোক। কোন ঝামেলায় জড়াতে চান না তাই সব অভিযোগ নিরবে হজম করেন। কিন্তু কখনো যদি চ্যালেঞ্জ করেন তাহলে নিশ্চিতভাবে নিউজএডিটর ফেঁসে যাবেন। মিথ্যাবাদী হবেন। কারণ যখন যে নিউজ দেয়া হয় তা এন্ট্রি করে সময় লেখা হয়। সময় লেখা হয় শিফট ইনচার্জ যখন নিউজ ছাড়েন তখনও। এমনি এক ঘটনা ঘটে ১৪ জুলাই ২০০০৯-এর রাতে। প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির একটা রিপোর্ট চিফ রিপোর্টার যথারীতি সময় মতো দেন। কিন্তু রিপোর্টটা পরদিন পত্রিকায় না দেখে কর্তৃপক্ষ ধরলে সোজা উত্তর দেন এমন কোনো রিপোর্ট তিনি পাননি। দুপুরের মিটিং-এ সরাসরি অস্বীকার করে বললেন, এমন একটা রিপোর্ট আছে তা তাকে বলাও হয়নি। এ কথা শুনে চিফ রিপোর্টার আকাশ থেকে পড়লেন। বললেন, ‘দাদা সম্ভবত আপনি ভুলে গেছেন’ আপনাকে বলা হয়েছে। এবং রিপোর্টটা সময়মতোও দেয়া হয়েছে। একথা বলতেই রেগে আগুন। বললেন, ‘চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি এরকম কোনো রিপোর্ট কাল আমি পাইনি।’ কি আর করা। শেষ পর্যন্ত চিফ রিপোর্টার এন্ট্রি স্লিপ ও ডেস্কের এন্টির সময় এনে দেখালেন। এ সময় মিটিং-এ উপস্থিত রহিম ভাই বললেন, দাদা রিপোর্টটা আপনি আমাকে দেখার জন্য দিয়েছিলেন। আমি দেখেও দিয়েছিলাম। এবার উল্টো কথা। আমি মেকআপ নিয়ে ব্যাস্ত। আমাকে তো বলতে হবে। আপনারা যাচ্ছে তাই করবেন আর সব দায়-দায়িত্ব আমাকে নিতে হবে। এই হলো বিশ্বনাথ প্রামাণিক।
তিনি যে কতভাবে কতরকম অভিযোগ করতে পারেন তা তার সঙ্গে যারা কাজ করছে তারা ছাড়া অন্যরা কল্পনাও করতে পারবে না। এ অভিযোগের ধরণ অনেকটা অতীত দিনে গ্রাম-বাংলায় স্বামীর কাছে সদ্য বিবাহিত ছোট বউয়ের হাজারো অভিযোগের মতো। আমাদের দেশের গ্রাম-বাংলায় এক সময় পুরুষরা একাধিক বিয়ে করতো। এবং একাধিক বিয়ের পর আগের বউরা স্বামীর কাছে সব সময় অবহেলিত উপেক্ষিত হতো। আর এ কাজটা সম্পন্ন করতে সর্বশেষ স্ত্রী অর্থাৎ ছোট বউ যা যা করার তাই তাই করতো। এটা করতে গিয়ে স্বামীর নাওয়া খাওয়া ঘুম হারাম করে দিতো। দেখা গেছে স্বামী সারাদিন পরিশ্রম করে ঘরে ফিরেছে। একটু বিশ্রাম নেবে। কিন্তু তার কোন উপায় নেই। তার আগেই ছোট বউ শুরু করে নাকি কান্না। আর কাঁদতে কাঁদতে নানান অভিযোগ। তার বড় সতিন, মেজ সতিন মিলে তাকে কি বলেছে, কি কি করেছে। মেরেছে এই সব। ঘরের দাওয়ায় উঠতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে হাঁটুতে চোট পেয়েছে এ জন্য দায়ী সতিনরা। কারণ তারাই নাকি বুদ্ধি করে ফেলে দিয়েছে। তা না হলে ওরা হাসবে কেন? দাওয়ায় কাঠের টুকরোই বা আসবে কি করে? এই কাঠের টুকরোর বিষয়টা হচ্ছে অতিরঞ্জিত। একটু বেশি টাইট দেয়া জন্যে অথবা অভিযোটা পোক্ত করতে কাঠের টুকরোর গল্প বানানো হতো।
বিশ্বনাথ প্রামাণিক এক্ষেত্রে গ্রাম-বাংলার ওই ছোট বউদেরও বিট করেছে। ওরাও মাঝে মধ্যে অভিযোগ করা থেকে বিরতি দিত। যেদিন মনটা ভালো থাকতো বা কিছু একটা বিশেষ আদায়ের মতলব থাকতো অথবা অন্য মতলব করতো সেদিন অভিযোগ করা থেকে বিরত থাকতো। কিন্তু বিশ্বনাথের এক্ষেত্রে কোনো বিরতি নেই। অবশ্য সেই যুগে মোবাইল ফোন ছিল না। থাকলে কি হতো বলা মুশকিল। কিন্তু বিশ্বনাথ প্রামাণিকের যুগে মোবাইল ফোন আছে। আছে ল্যান্ডফোনও। আবার এজন্য কোনো খরচও নেই। কারণ অফিস বিল দেয়। তাই অভিযোগের জন্য মোবাইলের সর্বোচ্চ ব্যবহারের জলজ্যান্ত প্রমাণ বিশ্বনাথ। তিনি নিজেও জানেন কাজটা ভালো না। তারপরও করেন। কারণ এটা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এ অভ্যাস ত্যাগ করা সম্ভব নয়। এবিষয়ে বিশ্বনাথের এক সাবেক কলিগের মন্তব্য, ‘বিশ্বনাথ এমন একটা মানুষ যে চক্রান্ত ষড়যন্ত্র ছাড়া থাকতে পারে না। আর তাতেই ভদ্রলোকের আনন্দ। বেচারাকেই বা কি দোষ দেব। অনেক দেখেশুনে অনেক টাকা খরচ করে একটা বিয়ে করলো কিন্তু বউটা ছ’মাসও থাকলো না। উপরোন্তু ঘরে সোনা দানা যা কিছু ছিলো সবই নিয়ে গেল। ভাই বোনরাও দেশ ছেড়ে চলে গেল। মা আছে, তিনিও থাকেন ইন্ডিয়ায় মেয়ের কাছে। এই অবস্থায় পারিবারিক আবহাওয়া বঞ্চিত একটা মানুষ একটু অস্বাভাবিক তো হবেই।’
‘সত্যি বলতে কি দাদার বউটা অপূর্ব সুন্দরী ছিলো। যাকে বলে একেবারে ডানা কাটা পরী। আর তা নাহলে কি আমানউল্লাহ ভায়ের মতো লোকের চোখ পড়ে। আমানউল্লাহ ভাইয়ের থার্ড ওয়াইফটাই দাদার বউ ছিলো।’
‘আমার ধারণা তার পর থেকেই বিশ্বনাথ অন্য রকম হয়ে গিয়েছে। কাউকে বিশ্বাস করে না, সবাইকে সন্দেহ করে, অবিশ্বাস করে। এ ছাড়া একটা ইমফিউরিটি কমপ্লেক্সও আছে। তাই যখন যেখানে কাজ করেন সেখানে ২৪ ঘণ্টা পড়ে থাকেন। মালিক-কর্তৃপক্ষের চোখে চোখে থাকেন। তেল ঘি যখন যা প্রয়োজন দেন। আর সব সময় অন্যদের বিরূদ্ধে অভিযোগ করেন কেউ কাজ জানে না, কেউ কাজ করে না। কাজ করতে চায় না। কাজ না করলে, অফিসে না আসলে অফিসটা চলবে কি করে।’
অফিসের নিয়মকানুনের ব্যাপারে অত্যন্ত কড়া বিশ্বনাথ প্রামাণিক। নিজে অফিসে আসেন দুপুর বারোটা-সাড়ে বারোটায়। তারপর টানা রাত দেড়টা দুইটা। এ সময়ে এক মিনিটের জন্যও অফিস থেকে বের হন না রাতে হাঁটার সময়টুকু বাদে । এমন কি দুপুরে খাওয়ার জন্যও নয়। তার সাফ কথা ‘বাইরে গেলে তো ঘণ্টা খানেক সময় নষ্ট হবে। কি দরকার অফিসে থাকাই ভালো।’
এমনিতেই তিনি স্বল্পাহারী মানুষ, তারপর সকালে গরম ভাত খেয়ে বের হন তাই দুপুরে চা-বিস্কুট খেয়ে কাটিয়ে দেন। বিকেলে টিফিন করেন কলা রুটি। তারপর রাতে বড়ি ফিরে দুইটা রুটি আর সবজি। নিজে কম খান বলে অন্যদের বেশি খাওয়া পছন্দ করেন না। তাই যারা সিগারেট, চা-নাস্তার জন্য ক্যান্টিনে বা অফিসের আশ-পাশের কোন দোকানে যায় তাদের তিনি দু’চোখে দেখতে পারেন না।
তিনি বলেন : চা-সিগারেটের নাম করে তোমরা যে নিচে যাও তাতে অফিসের কত ক্ষতি হয় জানো?
বিশ্বনাথ প্রামাণিক নিউজএডিটর হিসাবে যোগদানের পর অফিসের অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে। এখন আর কেউ হাসে না, জোরে কথা বলে না। কারণ হাসা জোরে কথা বলা আড্ডা দেয়া নিষেধ। তার এক কথা : ‘আড্ডা দেবে দাও, অফিসের বাইরে গিয়ে দাও, অফিসের ভিতর কিসের আড্ডা।’ এমন কি কোনো নিউজ নিয়ে কলিগদের সঙ্গে আলোচনাও নিষেধ। একদিন এক সাব-এডিটর তার পাশের টেবিলের সহকর্মীকে জিজ্ঞেস করেনÑ‘ভাই বিহার তো ভাগ হয়েছে, নালন্দা এখন কোন রাজ্যে পড়েছে?’ এটা জিজ্ঞেস করতেই নিউজএডিটরের কড়া ধমক, ‘আড্ডা বাদ দিয়ে কাজ করো।’
বেচারি কাচুমাচু হয়ে বলে- ‘দাদা একটা নিউজ নিয়ে কথা বলছি। নিউজে নালন্দা বিহারে বলা হচ্ছে। কিন্তু বিহার ভাগ হয়েছে এটা তো ঝাড়খণ্ডেও পড়তে পারে।’
এটা বলেও রক্ষা পায়নি সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক। তার বলা শেষ না হতেই আর এক ধমক ‘তুমি যা বোঝ লেখ। ওকে জিজ্ঞেস করার কি আছে। ওকি পণ্ডিত। অফিসে ননসেন্স একদম পছন্দ করি না।’
বদলে গেছে কর্মপদ্ধতিও। আগে অন লাইন এডিট হতো। বিশ্বনাথ এসে প্রথম দিনেই অন লাইন এডিট বাতিল করে দেন। তার কথা : ‘অন লাইন আবার কি? সব কপির প্রিন্ট নিয়ে আমাকে দিতে হবে। আমি দেখে তারপর ডিস্টিবিউট করবো।’
শুধু নিউজ নয়, সব ছবির কম্পিউটার প্রিন্ট দিতে হবে। কম্পিউটার প্রিন্ট নিয়ে আশি দশকের মতো ছবির উপর স্কেল ফেলে মাপ জোপ করে ছবির সাইজ ঠিক করেন।
নিউজ ডিস্ট্রিবিউট করার ক্ষেত্রেও বিশ্বনাথের পদ্ধতি একেবারে তার নিজস্ব ঢ্যং-এর। অন্য নিউজএডিটররা নিউজ ডিস্ট্রিবিউট করেন কার হাতে কি কাজ আছে তা দেখে। কিন্তু বিশ্বনাথের পদ্ধতি ভিন্ন। তিনি একজনের কাছে অনেক কপি দেন। আর অনেককে বসিয়ে রাখেন। এ বিতরণ পদ্ধতিতে বেশ কৌশলগত। যাদের তিনি নিউজ দেন না তারা বসে বসে ক্লান্ত হয়ে কম্পিউটারে গেম খেলো অথবা ব্রউজিং করে। দু’দিন পরে এই সুযোগটা নিয়ে প্রামানিক তাদের বলেন, ‘তুমি তো কিছুই করো না। তোমাকে কাজ দিয়ে কি হবে। যাও বসে থাক। বসে বসে গেম খেলো, ব্রাউজিং করো। কাজ করা লাগবে না।’
অন্যদিকে যাকে বেশি বেশি কপি দেন তার দিকে লক্ষ্য রাখেন কখন সে ভুল করে। একের পর এক নিউজ দিলে ভুলভ্রান্তি হবার সম্ভাবনা থাকে। সেই সুযোগটার জন্যই তিনি অপেক্ষা করতে থাকেন। আর এসবই তিনি প্রতিদিন প্রতি ঘণ্টায় তার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ফোনে জানান। বলেন ‘এরা কোনো কাজই করতে চায় না। কাজ করলেও নিউজ ছাড়া যায় না। দেখে ছাড়তে হয়। সব ভুলে ভরা’ ইত্যাদি।
কখনো অভিযোগ করেন ‘সব বেয়াদব।’ আবার কখনো অভিযোগ করেন ‘কেউ কিছু জানে না’ ইত্যাদি।
শুধু তাই নয়, বস হিসাবে। অধীনস্থদের ধমক-ধামক দেয়ার ক্ষেত্রেও তার জুড়ি নেই। আর এ ধমকের বেশির ভাগটাই জুড়ে থাকে অশ্লীল নোংড়া সব শব্দ প্রয়োগ । এটা অনেকের জন্য বিব্রতকর হয়। কিন্তু কী করা, বস বলে কথা। শুনেছি সারদায় পুলিশ ট্রেনিং-এর সময় গালি শিখানো হয়। কিন্তু বিশ্বনাথ কখনোই পুলিশে ছিলেন না। পুলিশের এসআই হবার জন্য যে শিক্ষাগত যোগ্যতা দরকার তাও তার নেই। তারপরও গালি গালাজে এমন পাকা কী করে হলেন তা অজ্ঞত। তবে এ নিয়ে তার বেশ খ্যাতি আছে। তাহলো বিশ্বনাথের পাস করা (অশ্লীল) মুখ।
এ নিয়ে হাজারো অভিযোগ, তারপরও তার কিছু আসে যায় না। এমনকি লিখিত অভিযোগকেও গুরুত্ব দিতে নারাজ। আইটির কবির জিএম-এর কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। এ নিয়ে আপসেট হওয়া দূরে থাক আরো ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন। সোজা নির্বাহী সম্পাদকের কাছে গেলেন। বললেন, ‘সব বেয়াদব। এই অবস্থা হলে কাজ করবো কি করে?’
নির্বাহী সম্পাদক সব জানেন। বোঝেন। তারপর তারও প্রতি অন্ধ। তাই যা হওয়ার তাই হলো। অভিযোগকারীকে ডেকে উল্টো ঝাড়ি দিলেন। বললেন, ‘তোমরা ভুল-ভ্রান্তি করলে তোমাদের বকাঝকা করা যাবে না? এ কেমন কথা। যাও কাজ কর। কিছু হলে আমাকে বলবে। লিখিত দিলে আমাকে দেবে। জিএমকে কেন?’
অফিসের চাকরি, বড় কর্তাকে কে ঘাটাতে চায়। তারপর এই দূরমূল্যের বাজারে। বিশেষ করে ওয়ান ইলেভেনের পর মিডিয়া একেবারে ম্যাসাকার হয়ে গেছে। অসংখ্য সাংবাদিক- সংবাদ কর্মি চাকরি হারিয়ে বেকার হয়েছে। আবার অনেকের চাকরি আছে কিন্তু মাসের পর মাস বেতন নেই । ফলে বাধ্য হয়ে সুবোধ বালকের মতো চলে যায় কবির ।
এসবই বিশ্বনাথের নিত্যদিনের ঘটনা। দেখেশুনে মনে হয় বিশ্বনাথ বেপরোয়া সাহসী গোঁয়ার গোবিন্দ। না, তাও নয়। গোঁয়ার গোবিন্দরা কি বসের চাটুকারিতা করে? বসকে তেল মালিশ করে? না, কখোনই না। গোঁয়াররা ঁেগায়ারই হয় সর্বক্ষেত্রে। কি অফিস কি বাড়ি। তাই বিশ্বনাথকে গোঁয়ার বলা যাবে না। বললে বলতে হয় চাটুকার। এটাই এক স্বভাব। তার সম্পর্কে তার আগের অফিসের কলিগদের বক্তব্য : ‘বিশ্বনাথ ষড়যন্ত্র চক্রান্ত ছাড়া থাকতে পারে না।’ এমনকি তার নিজের লোকদের বিরুদ্ধেও চক্রান্ত ষড়যন্ত্র করে। সুযোগ পেলে বসের বিরুদ্ধেও।সিড়ি বাওয়ার তার পুরোনো অভ্যাস। কিন্তু সবকিছু এমনভাবে করে যে কেউ কিছু বুঝেই পারে না। এই বিশ্বনাথ আবার প্রয়োজনে বসের বাড়ির বাজার করে দিতেও প্রস্তুত। প্রস্তুত বসের জুতার ফিতে বেঁধে দিতেও।
একদিন রাতে নির্বাহী সম্পাদক রুম থেকে বের হবেন, বাড়ি যাবেন। কিন্তু তার ব্যাগে রয়েছে অনেকগুলো কাঁচা আম। আমের ব্যাগটা তিনতলা থেকে তার গাড়িতে পৌঁছে দেয়ার জন্য পিয়নের আসার অপেক্ষা করছেন। কিন্তু কোনো পিয়ন নেই। এ অবস্থায় বিশ্বনাথ এগিয়ে গেলেন। বললেন, ‘দ্যান তো আমার হাতে।’ বলে আমের ব্যাগ নিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। বেচারা নির্বাহী সম্পাদক বিব্রতকর অবস্থায় পড়লেন। বাধ্য হয়ে নিজে নিতে চাইলেন। বললেন, ‘দাদা আপনি একি করছেন?’ তাই তার বলার কথা, নির্বাহী সম্পাদক এমনিতেই বয়সে বিশ্বনাথের ছোট। তারপর আবার একজন নিউজএডিটর তার আমের ব্যাগ বইবে এ ক্যামন করে হয়? এটা হলে কি তার নিজের মান সম্মান থাকে? না তারপরও নিউজএডিটর নাছোড়বান্দা আমের ব্যাগ তিনতলা থেকে গাড়িতে পৌঁছে দিলেন। বললেন ‘এ এমন কি ভারি। আমি তো মাঝেমধ্যে বাজার করি। বাজারের ব্যাগ-এর চাইতেও ভারি হয়।’
এ যে বাজার করার কথা বললেন, এটাও সঠিক নয়। কারণ তিনি থাকেন মিরপুরে এক আত্মীয়র বাড়িতে পেইং গেস্ট হিসাবে। তাই বাজার হাটের কোনো বালাই নেই। আর সময়ই বা কোথায়? রাত তিনটায় ঘরে ফিরে সকাল দশটা সাড়ে দশটার মধ্যে রেডি হতে হয় অফিসের জন্য। সাপ্তাহিক ছুটিও নেন না যে ছুটির দিনে বাজার হাট করবেন। এক অদ্ভুত স্বভাব। সপ্তাহিক ডে অফের কথা বললে বলেন, ‘ডে অফ নিলে পত্রিকা বের করবে কে?’ শুধু ডে অফ নয়, কেউ ছুটি নিলেও মাথা খারাপ হয়ে যায়। এমনকি স্ত্রীর অপারেশনের জন্য ছুটি নিলেও আপত্তিকর কথা বলেন। নিজে ডে অফ নেন না অন্যদেরও ডে অফ নিতে দেন না। অন্যদের বলতে তার সাথে সরাসরি কাজ করে এমন সিনিয়রদের। এই ডে অফ নিয়ে নির্বাহী সম্পাদকের সঙ্গে চিফ রিপোর্টারের অনেক কথা হয়েছে। নির্বাহী সম্পাদকের এ নিয়ে আপত্তি নেই। কিন্তু তার এক কথা ‘দাদাকে একটু রাজি করান।’ আসলে নির্বাহী সম্পাদক দাদা বলতে অজ্ঞান। তার বিবেচনায় ‘দাদা দেশের সেরা নিউজএডিটর।’ ‘মুখটা একটু খারাপ এই যা।’
নির্বাহী সম্পাদকের এ আশ্রয় প্রশ্রয়ে প্রমাণিকের অত্যাচার নির্যাতন ধমক-ধামাক দিন দিন বেড়েই চলে। এমনকি ধর্মপরায়ণ ব্যক্তিদের অফিসে নামাজ আদায় পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। শিফট ইনচার্জসহ এক-আধজন সাব-এডিটর ও দু’তিন জন কম্পিউটার অপারেটর ও রিডার অফিসে মাগরিব ও এশার নামাজ পড়তেন। এ নিয়ে প্রামাণিক অভিযোগ করেন নির্বাহী সম্পাদকের কাছে। অভিযোগ করে বলেন ‘অফিস সময়ে সবাই যদি নামাজ পড়ে সময় পার করে তাহলে তো পত্রিকার ডেট লাইন ধরা সম্ভব নয়।’
প্রিয়ভাজন প্রামাণিকের অভিযোগ। আর যাই কোথায়? সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ডেকে নির্বাহী সম্পাদক বলে দিলেন কাজের সময় কোনো নামাজ-টামাজ চলবে না। নামাজ পড়ার ইচ্ছা হলে কাজ শেষ করে পড়বেন। এক সাথে সব নামাজ পড়া যায় বলে ফতোয়াও দিলেন। কী আর করা! চাকরি বলে কথা। তাও আবার এই দুর মূল্যেরে বাজারে। একে একে সবাই কথা দিলেন ‘আপনি যা বলছেন তাই হবে।’
এমনি করে গ্রীষ্ম-বর্ষা পেরিয়ে শীতও যায় যায়। মাঘের শীত বাঘের গায়ে, এখন আর সেদিন নাই। বৈশ্বিক উষ্ণতা আর জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে আর অগের মতো শীত পড়ে না। তারপরও প্রতি বছরই দু’তিনটা শৈত্যপ্রবাহ হয়। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী এবারের শীতের সর্বশেষ শৈত্যপ্রবাহ শেষে নগরী গা-ঝাড়া দিয়ে উঠেছে। এমনি এক রোদ্র উজ্জ্বল দিনে আর দশটা দিনের মতোই প্রামাণিক বাড়ি থেকে বেরিয়ে লোকাল বাসে মিরপুর থেকে ফার্মগেট এসে রিকসা নিলেন অফিস পর্যন্ত। রিকসা নিয়ে সিটে আরাম করে বসে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলেন না, আজ তেমন জ্যাম নেই। রেলগেটটা উঠলেই দ্রুত অফিসে পৌঁছে যাবেন। হাতের ঘড়িটা দেখলেন। মনে মনে ভাবলেন ভালোই হলো- আজ একটু আগেই পৌঁছে যাব। নির্বাহী সম্পাদকের আসতে আরো এক দেড় ঘণ্টা লাগবে। এ সময়ে একবার ডিজিএম-এর রুমে ঢু মারবো। ডিজিএমকে বলা দরকার কম্পিউটার সেকশনে বিশৃঙ্খলা চলছে। রাতে লেট নাইটে কেউ কাজ করতে চায় না। ওভারটাইম দাবি করে ইত্যাদি। সেই সঙ্গে মনে মনে প্লান করেন মূলত কাকে দায়ী করবেন এজন্য। এসব ভাবতে ভাবতেই অফিসে পৌঁছে গেলেন। তারপর সিঁড়ি দিয়ে সোজা তিনতলায় উঠে তার রুমের সামনে এসে নিজেই চাবি দিয়ে দরজা খুলে আরাম করে চেয়ারে বসলেন। চেয়ারে বসে প্রতিদিনের অভ্যাস মতো টিভির রিমোর্টটা হাতে নিয়ে ইটিভি বাংলা ধররেন। ইটিভিতে এখন একটা সিরিয়াল চলছে। এ সিরিয়াল দেখতে দেখতে ডিজিএমকে কী বললেন তা আর একবার মনে মনে ঝালিয়ে নিলেন। ঠিক এ সময় পিয়ন এসে বললো, ‘স্যার ডিজিএম স্যার আপনাকে সালাম দিয়েছেন।’ শুনে একটু বিরক্ত হলেন। সকাল সকাল ডিজিএম আবার কী চায়। আবার মনে মনে খুশিও হলেন কারণ তিনি তো যাচ্ছিলেনই। নির্বাহী সম্পাদক জিজ্ঞেস করলে বলা যাবে তিনি নিজের থেকে যাননি। ডিজিএম তাকে ডেকেছিলেন তাই তিনি গিয়েছিলেন । যাহোক একটা মুড নিয়ে ডিজিএমের রুমে গেলেন। রুমে ঢুকতেই ডিজিএম সাহেব বললেন, ‘বসেন প্রামাণিক সাহেব।’ বলে একটু দম নিয়ে প্রামাণিক সাহেবের ওপর গভীর দৃষ্টি নিবন্ধ করে এদিক-ওদিক তাকিয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে আলোচনা শুরু করলেন। প্রথমেই বললেন, ‘একটা অপ্রিয় বিষয় নিয়ে আজ আপনার সঙ্গে আলোচনা করতে হচ্ছে। কিন্তু কোনো উপায় নেই, আদিষ্ট হয়েছি।’
ডিজিএমের এ ভূমিকায় প্রামাণিক কিছুটা হতচকিত হলেন। কিন্তু ভয়ভীতি বা বিস্ময়ের কোন ছাপ নেই তার চেহারায়। তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে চেয়ারে বসে ডিজিএমের রুমের চারিদিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে ডিজিমএ কি বলেন তার অপেক্ষায় রইলেন।
ডিজিএম নিরবতা ভেঙে বললেন, প্রামাণিক সাহেব আপনাকে আগেও বলেছি আপনার বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ এসেছে। অবশ্য কোনো অভিযোগকেই কর্তৃপক্ষ গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু তারপরও আপনাকে অবহিত করেছি। অবশ্য একটি অভিযোগের জন্য শোকজ করতে হয়েছে। আপনি উত্তরও দিয়েছেন। যাহোক অতিত নিয়ে আর কোনো কথা বলতে চাই না। কিন্তু এখন যে অভিযোগগুলো পেয়েছি, এগুলো খুবই গুরুতর। কর্তৃপক্ষ রীতিমত বিস্মিত। আপনার মতো একজন সিনিয়র জার্নালিস্টের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ আমরা চিন্তাই করতে পারি না।
কিন্তু অভিযোগ কি তাতো বললেন না?
বলছি, বলছি। বলার জন্যই ডেকেছি। তার আগে একটু চা খাওয়া যাক। কি বলেন? বলে ডিজিএম সাহেব পিয়নকে দু’কাপ চা দিতে বললেন।
এদিকে প্রামাণিক কড়া এসির মধ্যেও ঘামাতে শুরু করেছেন। কারণ আগে কখনোই ডিজিএমতারসঙ্গে কথা বলতে এরকম ভূমিকা করেন নি। তাই প্রামাণিকের কপালে ভাঁজ পড়তে শুরু করেছে। অজানা আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
ইতিমধ্যে চা এসে গেছে। চা’য়ে একটা চুমুক দিয়েই ডিজিএম বললেন, আপনার বিরুদ্ধে কারেন্ট অভিযোগগুলোর সবগুলোই হচ্ছে- অহেতুক গালাগালি, দুর্ব্যবহার এবং অত্যন্ত অশ্লীল নোংরা ভাষায় বকাবাজির। এ নিয়ে কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত বিব্রত। আপনি জানেন আমরা এখানে একটা কর্পোরেট কালচার চালু করতে চাচ্ছি। এভাবে গালিগালাজ, বকাবাজি, হৈচৈ করে তো কর্পোরেট কালচার চালু করা যাবে না। কোনো সাংবাদিক, রিডার বা কম্পিউটার অপারেটর কথা না শুনলে, ঠিকমত কাজ না করলে আপনি নোট দেন। আপনাকে বার বার বলা হয়েছে নোট দিতে। কিন্তু আপনি নোট না দিয়ে ইচ্ছা মতো বকাবাজি, গালিগালাজ করছেন। একজনের বিরুদ্ধে আর একজনকে উষ্কে দিচ্ছেন। মিথ্যাচার করে যাচ্ছেন। এতে পুরো অফিসের ডিসিপ্লিন ভেঙে পড়েছে। নির্বাহী সম্পাদক ফাহিম সাহেব আপনাকে অত্যন্ত বিশ্বাস করেন। আর বিশ্বাস করেন বলেই তিনি আপনাকে কিছু বলেন না। এমনকি এত অভিযোগের পরও তিনি চুপচাপ আছেন। কিন্তু নিউজ নিয়ে আপনি যেভাবে টাকা পয়সার লেনদেন শুরু করেছেন, যেভাবে পুরো অফিস থেকে সুবিধা নিতে শুরু করেছেন এটা তো ঠিক না।
রফিক ভাই(ডিজিএম), ঠিক বুঝতে পারছি না টাকা পয়সার কথা আসছে কেন। আর পুরো অফিসের কথা বললেন না। অফিসে যাদের বসাইয়ে রাখছেন সবাই এক একটা মাল। অপদার্থ। এরা তো অভিযোগ করবেই। দু’লাইন লিখতে পারে না। যত্তসব হাজিহাবি লেখে । সকাল দশটার নিউজ রাত দশটায় দেয় ওদের অভিযোগের দু’পয়সা দাম আছে। এ সব আজেবাজে অভিযোগ যদি হিসেবে নেন তাহলে তো কাজ করা যাবে না। ফাহিম ভাইকে (নির্বাহী সম্পাদক) আজই বলবো আমার পক্ষে এইভাবে কাজ করা সম্ভব নয়।
ডিজিএম : হ্যাঁ তা ঠিক, অহেতুক আজেবাজে অভিযোগ হলে তো কাজ করা কঠিন। তাই আপনার সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে বলেছে কর্তৃপক্ষ। এই দেখেন এক গাদা অভিযোগ, বলে ড্রয়ার থেকে বিভিন্ন সাইজের অনেকগুলো কাগজ টেবিলের ওপর রাখলেন। টেবিলে রেখে প্রামাণিকের ওপর অনেকটা সহানুভূতির দৃষ্টি নিবন্ধ করে একটা কাগজ তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, এতে আপনার বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে নিউজ ছাপার অভিযোগ। সঙ্গে একাধিক প্রমাণপত্র। এছাড়া আপনাকে রিপোর্টাররা নিউজ দেয়ার পরও আপনি নিউজ ছাপেন নি। নিউজ বেচা-কেনা করেছেন বলে অভিযোগ করেছে একজন রিপোর্টার । অভিযোগ করেছে রিপোর্ট দেয়ার পর আপনি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করে অর্থ নিয়েছেন। এরও প্রমাণসহ হাজির করেছে রিপোর্টার। এবং পুরো টাকাই আপনার ব্যাংক একাউন্টে জমা হয়েছে তারও প্রমাণ আছে। সর্বশেষ হচ্ছে আমাদের এক ডাইরেক্টর অভিযোগ করেছেন আপনি তার এক আত্মীয়ের কাছে টাকা চেয়েছেন। নইলে তার বাড়ি নিয়ে যে সমস্যা আছে তার রিপোর্ট করবেন বলে হুমিক দিয়েছেন। এবার আপনিই বলেন এ অভিযোগ কতটা সত্যি আর কতটা মিথ্যা। আপনার বক্তব্য আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর্পোরেট কালচারে কোনো অভিযোগ আসলে আমরা তদন্ত করি। তদন্তের পরই অভিযোগকে অভিযোগ হিসাবে গুরুত্ব দেই। আপনার বিরুদ্ধে সর্বশেষ অভিযোগ কর্তৃপক্ষ আমলে নিয়েছে। এখন তদন্তের পালা। তার আগে কর্তৃপক্ষ আপনার বক্তব্য জানতে চায়। আপনাকে আর এক কাপ চা দিতে বলবো?
না, চায়ের দরকার নেই। অভিযোগ নিয়েও আমার কোনো বক্তব্যও নেই। কারণ সবটাই চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র। চক্রান্ত ষড়যন্ত্রের কি জবাব দেবো। আর বকাবাজি গালিগালাজ কে না করে? এটা করেছি কাজের জন্য, কাজের জন্য কর্তৃপক্ষের জন্য বকাবাজি যদি দোষের হয় তাহলে দোষ করেছি। এই বলে চেয়ার থেকে উঠে অসহায়ভাবে ডিজিএমের দিকে তাকালেন।
ডিজিএম : স্যরি আমি আপনাকে বিব্রত করলাম।
ডিজিএমের রুম থেকে বেরিয়ে, সোজা নিজের রুমে গিয়ে নির্বাহী সম্পাদককে ফোন করলেন। প্রতিদিন ফোন করে যেভাবে অভিযোগ করেন আজ তার ধারে কাছে নেই। অত্যন্ত অসহায়ভাবে বললেন, ফাইম ভাই আমার বিরুদ্ধে গভীর চক্রান্ত শুরু হয়েছে। আমাকে সরানোর চক্রান্ত। আমাকে সরাতে না পারলে ওরা আপনাকে সরাতে পারছে না। তাই আমার বিরুদ্ধে কী সব মিথ্যা আজেবাজে জঘন্য অভিযোগ দাঁড় করেছে। আমি কোথায় কি কার কাছে টাকা নিয়েছি। কার রিপোর্ট আটকে দিয়েছি, কিল করেছি এটা কোনো অভিযোগ হতে পারে? আপনি তো জানেন আমি সব রিপোর্ট ছাপার চেষ্টা করি। কিন্তু যেগুলো রিপোর্টই হয়নি। কোনো লেখাই হয় নি সেগুলো ছাপাবো কি করে। আমি তো আপনাকে বলেছিও। অনেকগুলো আপনাকে দেখিয়েছিও। আপনাকে বলেই রিপোর্ট কিল করেছি....
ফাহিম : দেখি দাদা কী করা যায়। আমি পথে আছি। দশ মিনিটের মধ্যে চলে আসছি।
অফিসে এসে ফাহিম সাহেব সোজা ডিজিএমর রুমে ঢুকলেন। ডিজিএমের সঙ্গে দীর্ঘ এক ঘণ্টার বৈঠক করলেন। বৈঠক থেকে বেরিয়ে নিজের রুমে গিয়ে চেয়ারে বসে গা এলিয়ে দিলেন। ভেঙে পড়েছেন তিনি। দাদাকে রাখার কোনো পথ দেখছেন না। তারপরও একটা উপায় বের করার জন্য চোখ বুঁজে চিন্তা করতে লাগলেন। এ সময় ইন্টারকমে দাদার ফোন।
দাদাকে বললেন আমি চিন্তা করছি দেখি কী করা যায়।
ইতিমধ্যে অফিসের অনেকেই দাদার কেলেঙ্কারী জেনে গেছে। এ এক অদ্ভুত অফিস, কোনো কিছুই গোপন থাকে না।
অনেকে উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখছে দাদা রুমে কী করছে। অনেকে আবার আঙুল দিয়েও দেখাচ্ছে ঐ যে বসে আছে। এবার বুঝবে কত ধানে কত চাল। কেউ কেউ মন্তব্য করছে চোরের দশ দিন সাধুর একদিন। অনেকে আবার বলছে চোরের মা’র বড় গলা। অফিসের ফ্লোরে এসব ফিসফাস আলোচনা এক কান দু’কান করে বিকেলের মধ্যে সারা অফিস রাস্ট্র হয়ে গেছে। রাস্ট্র হয়ে গেছে নিচতলার বিজ্ঞাপন সার্কুলেশনেও।
এদিকে দুপুরের মিটিং-এর সময় যায় যায়। কিন্তু মিটিং-এর কোনো উদ্যোগ আয়োজন নেই। চিফ রিপোর্টার এ বিষয়ে নির্বাহী সম্পাদকের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি জানান আজ মিটিং হবে না। এভাবে এক গুমোট অবস্থায় দুপুর পেরিয়ে রাতের আঁধার নেমে এলো। এদিকে প্রামাণিক শরীরটা ভালো না বলে রুমেই বসে আছেন। চোখের চশমাটা কয়েকবার টিস্যু পেপার দিয়ে মুঝে পরিষ্কার করে ডিজিএমের রুমে ঢুকলেন।
শিফট ইনচার্জকে বলেছেন যা নিউজ আছে এডিশনাল নিউজএডিটরকে দেখিয়ে ছেড়ে দেন। ড্যামি করার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে কাউকে না কাউকে তো ড্যামি করতে হবে। এ বিষয়ে নির্দেশের জন্য নিউজ রুমের সিনিয়ররা অপেক্ষা করছে ঠিক এ সময় নির্বাহী সম্পাদক নিউজ রুমে এসে এডিশনাল নিউজএডিটরকে বললেন, ‘আজকের দিনটা চালিয়ে নেন।’ দাদাকে আজ বিরক্ত করা ঠিক হবে না। এটা বলে তিনি সোজা চলে গেলেন নিউজএডিটরের রুমে। নিউজএডিটর যেন হালে পানি পেলেন। কিন্তু না নির্বাহী সম্পাদক একথা সেকথার পর সোজা সাপটা জানিয়ে দিলেন, ‘দাদা, স্যরি। আমার কিছু করার নেই।’ শুনেই দাদা ভেঙে পড়লেন। একেবারে কাঁদো কাঁদো ভাব। এ সময় টেলিফোন বেজে উঠলো। হেড অফিসের ফোন। প্রামাণিক ও ফাহিম সাহেবকে অফিসে থাকতে বলেছেন। হেড অফিস থেকে বড় কর্তারা আসছেন।
বড় কর্তাদের সঙ্গে ডিজিএমও এলেন। এসে প্রথমে নির্বাহী সম্পাদক তলব করলেন। নির্বাহী সম্পাদকের বুকটা কেঁপে উঠলো। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কী হতে পারে ত

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

