somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমি যখন পণ্ডিতমশাই...(১)

১৪ ই অক্টোবর, ২০১১ দুপুর ২:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি যখন পণ্ডিতমশাই...(১)

নিজের ছাত্রজীবন এখনো শেষ না হলেও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আমাকেও দ্বৈতভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠার আগে বাড়ি থেকেই টাকা নিতাম। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ওঠার পরপরই নিজেকে বড় বড় মনে হতে লাগলো। ফলে বাবার কাছে চাইতে গিয়ে মনের বাধাটা এলো দু’ভাবে। একদিকে স্বাবলম্বী হওয়ার তথা নিজের পায়ে(কেউ কি অন্যের পায়ে হাঁটে নাকি!) দাঁড়ানোর উত্তুঙ্গ বাসনা আর অন্যদিকে মধ্যবিত্ত বাবার কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করার তাড়না। এই দু’য়ের চাপে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইডিটাকে মূলধন করে আরো অনেক ভার্সিটিপড়ুয়া পুলাপাইনের মতো আমিও আমার কর্মজীবন শুরু করলাম একজন গৃহশিক্ষক হিসেবে।

একসময় অনেক টাকা-পয়সা থাকা সত্ত্বেও অনেক অভিভাবককেই সন্তানের শিক্ষার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী হতেন না। বলতেন, “আরে এতো পড়াশুনা করে কি হবে? আমার এতো জায়গা-জমি, সহায়-সম্পত্তি কে খাইবো?” মায়ের মুখে শুনেছিলাম তাঁর ঠাকুর্দার অনেক সহায়-সম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও তিনি (আমার)দাদুকে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দিতে রাজি হননি। শেষে দাদু বাড়ি থেকে পালিয়ে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেছিলেন। আর সেই পরীক্ষার ফি যোগাড় করতে তাঁকে নিজেদের বাগানের নারিকেল-সুপারিই চুরি করতে হয়েছিলো। তবে আমার ভাগ্য ভালো যে, অমন একটা শিক্ষানুরাগী দাদু পেয়েছি, সেইসাথে বাপকা-বেটি হিসেবে আমার মা ও শিক্ষানুরাগী ছিলেন। আর বাবার অবস্থাও অত ভালো না হওয়ায় সহায়-সম্পত্তির দোহাই শুনতে হয়নি।

যাই হোক, বর্তমান যুগের অভিভাবকেরা কিন্তু খুবই শিক্ষা সচেতন! তাঁরা সম্ভব হলে সন্তান পৃথিবীর মাটিতে পদার্পণ করার আগে থেকেই তার শিক্ষা যাবতীয় বন্দোবস্ত করে রাখতে খুবই সচেতন। তাদের সেই একাগ্রতায় দেশ আজ এগিয়ে যাচ্ছে বিদ্যুতে বেগে! আর অত্যন্ত আনন্দের বিষয় এই যে তাদের সেই একাগ্রতা আমাদের(মানে পার্টটাইম পণ্ডিতমশাই সম্প্রদায়ের) জন্য খুবই লাভজনকও!

আমার মনে আছে, আমি আমার জীবনে প্রথম প্রাইভেট টিউটরের শরণাপন্ন হয়েছিলাম ক্লাস নাইনের শেষদিকে এসে। তাও আবার নিতান্ত বাধ্য হয়ে। বেয়াড়া ম্যাথটাকে যে কিছুতেই বাগে আনতে পারছিলাম না। তারপর ক্লাসটেনে উঠেও কিছুদিন পড়েছিলাম। সেই শেষ। এরপর নটরডেম কলেজে এসে এমন কিছু শিক্ষক পেয়েছি যে আমাকে প্রাইভেট পড়ার কথা আর ভাবতে হয়নি(ট্রুলি স্পীকিং)।

কিছুদিন আগে বাসে করে ফার্মগেট যাচ্ছিলাম ঐ টিউশনির উদ্দেশ্যেই। তো, বাসে আমার পাশেই কয়েকটা এস,এস,সি ক্যান্ডিডেট ছেলে বসেছিলো। পথে একটা স্টপেজ থেকে ওদেরই একটা ক্লাসমেট উঠলো।

১মবন্ধুঃ আরে দোস্ত, এইহানে? কি মনে কইরা?
২য়বন্ধুঃ আর কইস না, দোস্ত। মোস্তফা স্যারের কাছে আইছিলাম মডেল টেস্ট দিতে।
১মবন্ধুঃ ধর্মের মডেল টেস্ট!(মোস্তফা স্যার মনে হয় ধর্মশিক্ষক)
২য়বন্ধুঃ হ দোস্ত। আম্মায় পাঠায় দিলো।

শুধু ধর্ম না, বর্তমানে কোন সাবজেক্ট বাকি আছে যা প্রাইভেট পড়া কিংবা পড়ানো হয় না? আমাদের এই প্রাইভেটমুখী শিক্ষার শুরুটা অবশ্য গোড়া থেকেই। ভর্তিযুদ্ধে নামার জন্য সেই বাল্যকাল থেকে শুরু হয়ে চলে শিক্ষাজীবনের শেষ অব্দি। (হ্যাঁ, সত্যিই তাই! আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ছাত্র-ছাত্রীদেরও ব্যাচে ব্যাচে প্রাইভেটমুখী হতে দেখেছি। দেশসেরা প্রতিষ্ঠান বুয়েটের ছাত্রছাত্রীরা পর্যন্ত দল বেঁধে C++, মেকানিক্স, সার্কিট ইত্যাদি সাবজেক্ট প্রাইভেট পড়ে। আর অন্যদের কথা কি বলবো।) পাড়া-মহল্লার মোড়ে মোড়ে এখন দেখা যায় “ভি,এন,সি, আইডিয়াল, সেন্ট যোসেফে ভর্তির একশতভাগ নিশ্চয়তা”, “অত্যন্ত যত্নসহকারে ১০০ভাগ সাফল্যের নিশ্চয়তায় পড়ানো হয়” টাইপ বিজ্ঞাপন। আর সেই চটকদার বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে আমাদের শিক্ষাসচেতন(!) মা-বাবারাও তাদের সন্তানদের ঠেলে দেন মহাযুদ্ধের ময়দানে। এরা কীভাবে বড় হয়ে বলবে, “যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই।”??

আমি আমার শিক্ষাজীবন শুরু করেছিলাম ছয়বছর বয়সে। মাথার উপর দিয়ে হাত নিয়ে কান ছুঁতে বলা হত। প্রথমবছর এই কান ছোঁয়ার পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ায় ‘ছোটো ওয়ান’ এ ভর্তি করা হয়েছিলো। পরের বছর সুযোগ ঘটেছিলো বড় ওয়ান তথা ক্লাস ওয়ানে ওঠার। এখনকার শিশুদেরকে নাকি ক্লাস ওয়ানে উঠার আগেই আরো অনেক গুলো ক্লাস(টডলার, প্লে, নার্সারি, কেজি) পেরিয়ে আসতে হয়। তারপর ভালো স্কুলে ভর্তির জন্য একাধিকবার একই ক্লাসে পড়ে থাকার ব্যাপার তো আছেই। এজন্যই মনে হয়, আমার পাঁচ ব্যাচ জুনিয়র স্টুডেন্টটাকেও এতো বড় বড় লাগে।

এমনি আরো অনেক কথাই বলার ছিলো। হয়তো বলবোও। তবে অন্য কোনোদিন। আজ এখানেই থামছি। তবে শেষ করার আগে আমার পণ্ডিতি জীবনের দুটি মজার ঘটনা পাঠকদের সাথে শেয়ার করার লোভ সামলাতে পারছি না।

শিমুল এবং রাতুল দু’জনেই আমার কাছে সেই ইন্টারমিডিয়েটের শুরু থেকে পড়ে। দু’জনেই ছাত্র হিসেবে যথেষ্ট ভালো। সামনে এইচ,এস,সি পরীক্ষা দিবে। আমি ওদেরকে মূলতঃ পদার্থ, রসায়ন আর গণিত- এই তিনটা সাবজেক্টই পড়াই। তো, একদিন ওদের গার্জিয়ানরা অনুরোধ করলো আমি যাতে টেস্টের আগে ছয় সাবজেক্টের জন্যই অন্ততঃ একটা করে মডেল টেস্ট নেই। তো, আমি ওদের মডেল টেস্টের রুটিন এমনভাবে করলাম যে একজনের ১মপত্র পরীক্ষার সময় আরেকজন ২য়পত্র পরীক্ষা দিবে। প্রথমদিন শিমুল বাংলা-১মপত্র আর রাতুল বাংলা-২য়পত্র পরীক্ষা দিলো। পরদিন শিমুল বাংলা-২য়পত্র পরীক্ষা আর রাতুল বাংলা-১মপত্র পরীক্ষা দিচ্ছে। ওরা পরীক্ষা দিচ্ছে আর আমি একটু বেলকনিতে এসে দাঁড়ালাম। এমন সময় হটাৎ কানে এলো শিমুল রাতুলকে জিজ্ঞাসা করছে, “আচ্ছা রাতুল, বলতো সন্ত্রাসীরা মানুষ মারে কি দিয়ে?” রাতুলের জবাব, “লাঙ্গল দিয়ে।” পরদিন শিমুলের খাতা দেখতে গিয়ে আমি তো হতবাক। প্রশ্নে বলা হয়েছিলো, “তোমার এলাকার আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতির কথা জানিয়ে সংবাদপত্রে প্রকাশের জন্য একটি প্রতিবেদন লিখ।” সেখানে একজায়গায় শিমুল যা লিখেছে তা হলো এরকম, “………সন্ত্রাসীরা লাঙ্গল দিয়ে হাজার হাজার মানুষকে মেরে ফেলছে। তাঁদের লাঙ্গলের কাছে এলাকাবাসীরা আজ জিম্মি………”
৫টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×