somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নরওয়ে কর্তৃপক্ষ বাঙালি প্রগতিশীলদের হতাশ করে জানালেন, এ কর্ম মুসলমানদের নয়, তাদের নিজেদের মানুষের।

০২ রা আগস্ট, ২০১১ দুপুর ২:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আওরঙ্গজেব বা আলিবর্দীর যুগ এখনকার মতো ছিল না, তা সত্ত্বেও তাঁরা ইউরোপীয় উপনিবেশবাদীদের ধাক্কা খেয়েছেন। আলিবর্দীর নাতির কাছ থেকে ইংরেজরা দেশটাকেই ছিনতাই করে নেয় মীরজাফর-জগ ৎ শেঠদের সহযোগিতায়। দেশ তো গেলই, এ দেশের মানুষের ধর্মটাও চলে যেত যদি ১৮৫৭-তে মহাবিদ্রোহ না হতো। ১৮৪০ থেকে ১৮৫৬ পর্যন্ত সময়ে কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, কৃষ্ণনগর এবং খাস কলকাতা মহানগরে যে হারে সব শ্রেণীর হিন্দু ও গরিব মুসলমানকে খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়, তাতে ১৯০১ নাগাদ গোটা ভারতবর্ষ খ্রিষ্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে পরিণত হতো, ঠিক যেমনটি হয়েছে ফিলিপিন, আজ ৮৫ শতাংশের বেশি খ্রিষ্টান। সিপাহি বিদ্রোহের ধাক্কায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সরকার এবং ক্যাথলিক মিশনারিরা তাঁদের রোডম্যাপ বা পরিকল্পনা পরিবর্তন করেন। শুধু শাসন ও শোষণ করব—অন্য কিছু নয়।


স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই ভালো। নরওয়ে ছোট শান্ত দেশ। গত ২২ জুলাই নরওয়ের রাজধানী অসলোয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কাছে শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণে ও গোলাগুলিতে ৭ জন নিহত ও ১৫ জন আহত হয় এবং একটি দ্বীপে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির এক যুব-সম্মেলনে বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত হয় ৭৮ জন। নরওয়ের সরকার কিছু না বললেও, বিদেশে নরওয়ের বন্ধুরা মুহূর্তের মধ্যে ধরে নেন, এ কাজ নন্দ ঘোষের।

অসলোর পুলিশ ও গোয়েন্দারা কোনো তথ্য জানার আগেই ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের পোর্টিকোর নিচে এক বঙ্গসন্তান দৈবক্রমে অবগত হয়ে আমাকে বললেন, এ কাজ মুসলমান জঙ্গিদের।

নরওয়ে কর্তৃপক্ষ বাঙালি প্রগতিশীলদের হতাশ করে জানালেন, এ কর্ম মুসলমানদের নয়, তাদের নিজেদের মানুষের। সাবলীলভাবে এই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেন অ্যান্ডার্স বেহরিং ব্রেইভিক নামক ৩২ বছর বয়স্ক এক অজ্ঞাত ব্যক্তি। তিনি পালাননি বা আত্মহত্যা করেননি, ধরা পড়েছেন। সুতরাং ওই হত্যাকাণ্ডের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তাঁর কাছ থেকেই জানা গেল। ব্রেইভিক বলেছেন, ‘ঘটনাটি নির্মম, তবে এর প্রয়োজন ছিল।’ যেখানে প্রয়োজনটাই প্রধান, নির্মমতা সেখানে গৌণ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উত্তপ্ত মস্তিষ্কের বন্দুকধারীদের গুলিতে প্রায়ই বহু মানুষ হতাহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গুলিতে অসংখ্য ছাত্রছাত্রী প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু নরওয়ের ঘটনাটি সে রকম কিছু নয়। কোনো হতাশাগ্রস্ত মানুষের পাগলামো নয়। এই ঘটনার যিনি নায়ক, তাঁর রয়েছে একটি সুদূর রাজনৈতিক পরিকল্পনা, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও কঠিন সংকল্প।

তিনি একাও নন, তাঁর পেছনে রয়েছে তাঁর মতাদর্শী সংখ্যাহীন। শুধু তাঁর দেশে নয়—অন্য দেশেও। তাঁর রাজনীতি যদি তাঁর নিজের দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত, তাহলে আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ ছিল না। তাঁর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ওই নিরপরাধ তরুণ-তরুণীরা নয়, তারা তাঁর লক্ষ্য অর্জনের উপায় মাত্র। তাঁর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু পৃথিবীর একটি বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়। ঘটনাক্রমে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সেই ধর্মাবলম্বী। ওই ধর্মের অনুসারী ৩০ কোটি মানুষের বসবাস ভারত ও পাকিস্তানে। ওই ধর্মের কয়েক কোটি মানুষ বাস করে আমেরিকা, কানাডা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। গোটা মধ্যপ্রাচ্যের কথা বলা নিষ্প্রয়োজন।
গণহত্যা ঘটানোর আগে ইন্টারনেটে ঘাতক এক হাজার ৫১৮ পৃষ্ঠার একটি ইশতেহার প্রকাশ করেন। তার শিরোনাম: ‘2080: A Eu ৎopean Decla ৎation of Independence’। তাতে তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তিনি বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পতনকামী আন্দোলনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের প্রশংসা করেছেন। ইশতেহারে বলা হয়, তাঁর সংগঠন জাস্টিসিয়ার নাইটস সাধারণভাবে ভারতীয় হিন্দুদের সনাতন ধর্ম আন্দোলন ও হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের সমর্থন করে। তিনি বলেন, ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা ভারতীয় সাংস্কৃতিক ‘মার্ক্সিস্টদের’ হাতে ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদীদের মতো একই যন্ত্রণা ভোগ করছেন।

মুসলমানদের ওপর হামলাকারী হিন্দু সংগঠনগুলোর প্রশংসাও করেছেন ব্রেইভিক। সংগঠনের ব্যাজও ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ থেকে তৈরি করিয়েছিলেন ব্রেইভিক।

খ্রিষ্টধর্মকে মুসলমানেরা খুবই শ্রদ্ধার চোখে দেখেন। যিশুখ্রিষ্টকে মুসলমানেরা হজরত ঈশা আলাইহিস সালাম বলে সম্বোধন করেন। যার অর্থ হলো—যিশুখ্রিষ্টের ওপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। আমাদের দেশে সাধারণত মিলাদ মাহফিলেও আমি বহু আলেমকে মোনাজাতের সময় হজরত ঈশার আত্মার শান্তির জন্য দোয়া করতে দেখেছি। বাঙালি মুসলমানেরা এ কাজ করেন, অন্য দেশের মুসলমানদের কথা জানি না।
আজ ইউরোপের দেশে দেশে ইতালি থেকে স্পেন পর্যন্ত ইসলাম ও মুসলিম অভিবাসীবিরোধী এক চরম ফ্যাসিবাদী শক্তির উত্থান ঘটেছে। তাদের বক্তব্য: ইসলাম কোনো ধর্মই নয় এবং মুসলমানেরা গত ৫০ বছরে আমাদের অনেক খেয়েছে, এখন তাদের কাছ থেকে সেসব আদায় করে তাদের তাড়িয়ে দিতে হবে। প্যারিসের আমেরিকান ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক বলেছেন, ‘এই ঘটনা ইউরোপে ক্রমবর্ধমান ইসলামবিদ্বেষী আবহের অংশ। এটি এমন এক দর্শনজগতের অংশ, যা থেকে ব্রেইভিকের মতো মানুষ প্রেরণা পাচ্ছে।’

পশ্চিমের খ্রিষ্টান মৌলবাদীদের মূলনীতি হলো: hate is good—ঘৃণা ভালো। এবং সে ঘৃণাটা আর কাউকে নয়, ইসলাম ও মুসলমানকে। মুসলমানদের প্রতি যারা বন্ধুভাবাপন্ন, তাদেরকেও ঘৃণা করতে হবে। তাদেরকে ভীতসন্ত্রস্ত করতে হবে। সে জন্যই উটোয়া দ্বীপে উদারপন্থী লেবার পার্টির যারা নিহত হয়েছে, তারা সবাই খ্রিষ্টান বা ইহুদি।

ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে যাঁরা কাজ করবেন, পশ্চিমে তাঁরা পাবেন রাজা বা সম্রাজ্ঞীর সম্মান। এশিয়া আফ্রিকার জননেতা ও রাষ্ট্রনায়কেরা রাষ্ট্রীয় সফরে গেলেও কাগজে কভার পান না। প্রচার পান তসলিমা নাসরিন। তাঁকে দেওয়া হয় শেক্সপিয়ার ও গ্যেটের চেয়ে বেশি প্রচার। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক হিসেবে তাঁকে পশ্চিমারা যে সম্মান দিয়েছেন, তার চল্লিশ ভাগের এক ভাগ রবীন্দ্রনাথ পেলে বর্তে যেতেন। মানবজাতির ইতিহাসে এত সাহিত্য ও শান্তি পুরস্কার আর কোনো মানুষ বা মানুষী পাননি। নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্কে তিনি পেয়েছেন নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদা। ফরাসি দেশ আর এক কাঠি বেশি। সেখানে পেয়েছেন ‘রাষ্ট্রপতির মর্যাদা’র সিকিউরিটি। মুহাম্মদ (সা.) ও ইসলামকে গালাগালের পুরস্কার।

(নিবন্ধ টি আজকে প্রথম আলোতে প্রকাশিত কলামিষ্ট সৈয়দ আবুল মকসুদের সহজিয়া কড়চা ‘ঘৃণা ভালো’ নয়—ভালোবাসা ভালো লেখার কিছু অংশ। পুরোটা পড়ার জন্য ক্লিক করুন Click This Link)
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা আগস্ট, ২০১১ দুপুর ২:২৯
৬টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×