মৃত্যু জীবনের বিরামচিহ্ন। এর সাথে জড়িয়ে আছে ভয়, কান্না, আর দুঃখ। কারণ একটি জীব যখন মারা যায় তার দেহ আর কাজ করে না। রহস্যে ভরা মৃত্যু। মৃত্যু কি ? জীব কেন মৃত্যুবরণ করে ? দেহের মৃত্যু হলে কি আত্মারও মৃত্যু হয় ? পুরানো অনেক বিশ্বাস প্রচলিত মৃত্যকে নিয়ে। কেউ কেউ বিশ্বাস করে আত্মার মৃত্যু হয় না। আত্মা দেহ ছেড়ে চলে যায়। ভালো আত্মা স্বর্গে খারাপ আত্মা নরকে। আসলে কি তাই ?
মানুষসহ অন্যান্য প্রাণির মৃত্যুর একটি সাধারণ প্রাকৃতিক কারণ দেহের ধীর বার্ধক্য। বার্ধক্য ছাড়াও অপুষ্টি, রোগ, শিকার এসব প্রাকৃতিক কারণেও মৃত্যু হতে পারে। যুদ্ধের কারণেও মৃত্যু হতে পারে।
জীব মাত্রেই মরণশীল। আসলে এ পুরোপুরি ঠিক নয়। সব জীবের মৃত্যু হয় না । যেমন অণুজীবদের মৃত্যু নেই। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, প্রোটোজোয়ান - এদের কি কখনো স্বাভাবিক মৃত্যু হয় ? হয় না। এরা অমর। পরিনত বয়সে এদের মাতৃদেহ বিভাজিত হয়ে যায়। প্রতিটি বিভাজিত খণ্ড হতে এক একটি নতুন প্রাণী তৈরি হয়। মৃত্যু হয় অধিকাংশ বহুকোষী প্রাণিদের।
একটি প্রাণির মৃত্যু কেন হয় এটা জানতে হলে জানতে হবে বার্ধক্য ও প্রাণির জন্ম ও বৃদ্ধির প্রক্রিয়া সম্পর্কে। এটা জানা, জীব মাত্রেই কোষের সমষ্টি। কাজের প্রকৃতি অনুসারে এক এক কোষের এক এক নাম। জীবের জন্মের সাথে জড়িত কোষটির নাম জনন কোষ। এ জনন কোষের মধ্যে নারীরটির নাম ডিম্বানু আর পুরুষেরটির নাম শুক্রাণু। এ দু' টো কোষের মিলন জীবের জন্মের পূর্বশর্ত। এ পূর্বশর্ত পালন হলে আমরা নতুন একটি কোষ পাব, যাকে সবাই বলে জাইগোট। জাইগোটের পর শুধু বিভাজন আর বিভাজন। অর্থাৎ কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি। এক হতে দু’টি, দু’টি হতে চারটি, চারটি হতে আটটি। এভাবে চলতে থাকে জ্যামিতিক হারে। পরিনতিতে জীবও হতে থাকে বড় হতে বড়। ভ্রণ হতে শিশু, শিশু হতে কিশোর, কিশোর হতে..।
বৃদ্ধি তো আর এমনি এমনি হয়না, এ জন্য প্রয়োজন পুষ্টি। পুষ্টি মানে কার্বোহাইড্রেট, প্রেটিন, চর্বি, খনিজ লবণ, ভিটামিন আর পানি। যা আমরা খাদ্য আকারে গ্রহণ করি। কিন্তু কোষের এ বৃদ্ধি অনন্ত কাল চলে না । বিভিন্ন বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ ফ্যাক্টর যেমন ক্রোমোজম, বিকিরণ, তাপমাত্রা, পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি ইত্যাদির প্রভাবে কোষগুলো ধীরে ধীরে বিভাজন ক্ষমতা হারাতে থাকে। এক সময় তা বন্ধই হয়ে পড়ে। এ জন্যই একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর দেহের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়। কোষের বিভাজন ক্ষমতা হারানোর পরিণতিতে আসে বার্ধক্য। আর বার্ধক্যের পরিণতি মৃত্যু।
একজন মানুষ হাত, পা, চোখ, কান, দাঁত ইত্যাদি ছাড়া দিব্যি বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু কিছু অত্যাবশ্যকীয় অঙ্গ যেগুলো না হলে চলে না। যেমন মস্তিষ্ক, হৃৎপিন্ড, ফুসফুস। এদের যেকোন একটির বা সবগুলোর কার্যকারিতা নষ্ট হলে মৃত্যু হতে পারে। শারীরবৃত্তীয় কাজগুলোর সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রন করে মস্তিষ্কের স্নায়ু কোষগুলো। এই সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রন ক্ষমতা নষ্ট হলে শরীরের অন্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোও কাজ করে না। জীবিতদেহ তখন জড় পদার্থের মত আচরণ করে। মস্তিষ্কের মৃত্যু হলে মনেরও মৃত্যু হয় কারণ মন মস্তিষ্কের কার্যকারিতার ফল।
মস্তিষ্কের মৃত্যু হলেও শ্বাসযন্ত্র বা রেসপিরেটরের মাধ্যমে কৃত্রিম উপায়ে ফুসফুস ও হৃৎপিণ্ড সচল রেখে আয়ু বড়ানো যায়। অর্থাৎ কৃত্রিম উপায়ে দেহের কোষসমূহকে বাচিঁয়ে রাখা যায়।
অন্যভাবেও দেহের মৃত্যু ঘটতে পারে। শ্বসনের কথায় আসি এবার। কোষস্থ খাদ্যবস্তু অক্সিজেন সহযোগে জারিত করে প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপাদনই শ্বসন। শ্বসন কাজের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সংগ্রহ করে ফুসফুস আর তা কোষে কোষে পৌঁছে দেয় হৃৎপিণ্ড। সুতরাং বুঝতেই পারছি, ফুসফুস ও হৃৎপিণ্ডের কার্যকারিতা নষ্ট হলে কোষের শক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। আর কোষের শক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার মানে একটাই তা হল কোষের মৃত্যু। কোষের মৃত্যু দেহের মৃত্যু বয়ে আনে।
এ প্রসঙ্গে লংকান ক্রিকেটার রমন লাম্বার মৃত্যুর ঘটনাই শুনুন। ১৯৯৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বর্তমান বঙ্গবন্ধু স্টোডিয়ামে লীগের ক্রিকেট খেলা চলাকালীন একটি বল ফিল্ডিংরত লাম্বার মাথায় সজোরে আঘাত করে। প্রথমে মনে হয়েছিল কিছুই হয়নি। নিজেই হেঁটে প্যাভিলিয়নে ফিরলেন। কিন্তু অল্প কিছুক্ষণ পরে জ্ঞান হারালেন তিনি। দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হল। ২২শে ফেব্রুয়ারি চিকিৎসকরা জানালেন যে, মস্তিষ্ক তার কার্যকারিতা হারিয়েছে। অর্থাৎ ? মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলি পরিবেশ হতে উদ্দীপনা গ্রহণ ও শারীরবৃত্তীয় কাজগুলোর সমন্বয় করার ক্ষমতা হারিয়েছে। হার্ট-লাং মেশিনের সাহায্যে কৃত্রিমভাবে লাম্বার হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসের কাজ চলছিল। ২৩ শে ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে তিনটায় তার স্ত্রীর উপস্থিতিতে হার্ট-লাং মেশিন বন্ধ করে দিলেন চিকিৎসকরা। থেমে গেল রমন লাম্বার হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুস। আর হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুস থেমে যাওয়ার মানে কোষে কোষে অক্সিজেন ও পুষ্টি উপাদানের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া। শক্তি ও তাপ উৎপাদন না হওয়া। এ না হলে যা হয় তা মৃত্যু। যার মানে দেহের হৃৎস্পন্দন, শ্বসন, নড়ন-চলন, ব্রেন অ্যক্টিভিটি, রিফ্লেক্স অ্যাকশন বন্ধ হয়ে যাওয়া। এ এমন এক পরিসমাপ্তি যা হতে পূর্বের অবস্থায় আর ফিরে আসা যায় না।
একজনের অঙ্গ অন্যের দেহে প্রতিস্থাপনের মাধ্যমেও মৃত্যুকে আপাতত এড়ানো যায়। এছাড়া আছে কৃত্রিম অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ব্যাপার স্যাপার।
একটা সময়ে মানুষ অত কিছু জানত না। এটা ও জানত না যে মন বা আত্মা মস্তিষ্কের কার্যকারিতার ফল এবং দেহের মৃত্যুর সাথে সাথে মনেরও মৃত্যু ঘটে। সুতরাং বলা যায়, মানুষের স্বাভাবিক বার্ধক্যের জন্য দায়ী সময়ের সাথে সাথে কোষের আভ্যন্তরীণ পরিবেশ পরিবর্তন হয়ে যাওয়া। এ পরিবর্তনের জন্য দায়ী বিভিন্ন ভৌত ও রাসায়নিক ফ্যাক্টর যেমন ক্রোমোজম,তাপমাত্রা, বিকিরণ ইত্যাদি। এ পরিবর্তনের পথ ধরেই আসে বার্ধক্য ও মৃত্যু।
বিষয়টা সম্পূর্ণ লৌকিক। বিন্দুমাত্র অলৌকিকতা এখানে নেই। নেই রূপকথার যম বা আজরাইলের উপস্থিতি। বিজ্ঞানের আলোয় মানবহের অজানা রহস্য আজ জানা গেছে। প্রাচীন বিশ্বাস দূরে সরে গেছে। মুছে গেছে পরকালের ধারণা। বিজ্ঞানের এ আলো ছড়িয়ে পড়ুক সবার মনে।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০১০ রাত ১২:৪০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



