গুহার বাসিন্দারা
গুহা, যাকে আদি মানব তাঁর ঠিকানা বানিয়েছিল। তাই গুহার সাথে জড়িয়ে আছে মানব সংস্কৃতি ও সভ্যতা বিকাশের বই এর আদি পাতাগুলো। বিকশিত মানব গুহা ছেড়ে এখন খোলা প্রান্তরে। আর গুহার দখল নিয়েছে বাদুড়, সাপ, গিরগিটি, বিছাপোকা ছাড়াও আরও অনেক প্রজাতির পোকামাকড় । মাটির ওপরের প্রাণীদের মতো এরা চোখনির্ভর নয়। এদের গন্ধ, স্পর্শ ও শ্রবণের অনুভূতি খুব প্রখর। এরা এসব অনুভূতি দিয়েই গুহায় জীবনধারণ করে। গুহাতে এমন কিছু প্রাণী বাস করে যেসব প্রাণী গুহার অন্ধকার ছাড়া অন্য কোথাও বাস করে না। বা বলা উচিত বাস করতে পারে না। ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১১ এর বিকাল ৩টা ১৬ মিনিট হতে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত, অন্ধকারের প্রতিশব্দ আলীর গুহাতে- ‘যুব’, ‘লিটন’, ‘অঞ্জন’, ‘প্রতীম’ আর ‘আমি’ এ পাঁচজন স্পিলাংকার্স ঠিকানা করেছিলাম। চিরচেনা ক্ষেত্র থেকে এক ভিন্ন ক্ষেত্রে।
পরিকল্পনা শুরুর কথাগুলি
রাঙামাটির ফারুয়া না বরিশাল যাব এ নিয়ে দ্বিধা ছিল। এক দুই হবার যোগাড়। শেষমেষ দুইকে এক করার জন্য দু’টোই বাদ দিয়ে বান্দরবানের আলীকদমের এ আলীর গুহাকেই গন্তব্য ঠিক করলাম। ৭টার যাত্রা ৯টায় শুরু, লোকাল বাসের ছ্যাচড়ামির কারণে চকোরিয়ায় যেখানে সাড়ে ১১টার পৌঁছার কথা সেখানে পৌঁছলাম দুপুর ১টায়। চকোরিয়ায় পৌঁছে বাস বদল করে আলীকদমের বাসে ওঠলাম। আলীকদমকে যখন ছুঁয়েছি তখন ২টা ৩৫ মিনিট। পাহড়ি কাঁচা মরিচের ঝালে লাঞ্চ সারতে সারতে ঘড়ির কাঁটা তখন ৩টা কে ছুঁয়ে ফেলেছে। এরপর আলীকদম থেকে টমটম এ করে ছুটা, আলীর গুহাকে লক্ষ্য করে। টমটমকে আলবিদা জানাতে হল ‘আবুল’ রাস্তার কারণে। এরপর হাঁটা পথ।
লক্ষ্য পূরণ
গুহায় প্রবেশের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা ও পূর্ব প্রস্তুতির প্রয়োজন। মোমের আলো ছাড়া তেমন কিছু সংগ্রহ করতে পরিনি। ছোট গোল একটি বৃত্তের মতো গুহা মুখটা। ভেতরে অন্ধকার হা করে আছে। নিকষ কালো গাঢ় অন্ধকার। গা শিউরে ওঠে। ভেতরে যদি প্রতিকূল কিছু থাকে। ভয়ের দেয়াল এর চাদর সরিয়ে ঢুকে পড়েছি। একে একে সবাই। ক্রলিং করে এগোতে থাকলাম। ক্রলিং করে বেশিদূর করতে হলো না। পেট বিশাল। উচ্চতা ২৭ ফিট ও প্রস্থে ১৫ ফিট এর কাছাকাছি। লম্বায় বেশি নয়। ৪০ ফিট এর মতো। সঙ্কীর্ণ গুহার মুখ দেখে বুঝার উপায় ছিল না ভেতরের বিস্তৃতি। অনন্য। অসাধারণ। হাজার হাজার বছরের অন্ধকার স্তরে স্তরে, স্তরে স্তরে জমা হয়ে আছে। মোমবাতির কৃত্রিম আলো সামান্যই দাগ কাটতে পারছে অন্ধকারের গায়ে। চির অন্ধকারের প্রাণীগুলো ক্ষণিক এর আলোর স্রোতে পড়ে দিশা খুঁজে পাচ্ছিল না। পাঁচ লক্ষ বছর আগে, যে সময় গুহাকে মানুষ বাসস্থান হিসেবে ব্যবহার শুরু করে, সে সময়ে ফেরার অনুভূতি। আমাদের কথাবার্তার শব্দগুলো পর্যন্ত পাহাড়ের দেয়ালগুলো চুষে নিচ্ছে। কোন প্রতিশব্দ নেই। ক্রোম্যাগননরা নাকি খ্রিস্টপূর্ব ৪০ হাজার বছর থেকে গুহাচিত্র আঁকা শুরু করে। গুহার দেয়ালের অন্ধকার চিরে অতীতকে কাছ থেকে বুঝার চেষ্টা করলাম। পাহাড়ের গা চুঁইয়ে চুঁইয়ে আসা জলের ফোঁটায় তলদেশ কর্দমাক্ত। পিচ্ছিল তাই মুভমেন্ট এ সাবধান সবাই। অন্ধকার আর কাহাতক সয়।
প্রধান গুহাটির পাশের পাহাড়ে আরো একটি গুহা আছে। যা খুবই বিপদসঙ্কুল। একে সঙ্কীর্ণতা দ্বিতীয়ত গুহাবাসী প্রাণীর প্রচুরতা এর জন্য। ‘লিটন’, ‘প্রতীম’ আর ‘অঞ্জন’কে সে গুহামুখে রিজার্ভ রেখে, ঝুকি থাকা স্বত্ত্বেও, আমি অদম্য ‘যুব’ কে নিয়ে সাথে নিয়ে অন্ধকারকে আলো দেখাতে দেখাতে এগোলাম। এটির চরিত্রে প্রথমটি থেকে ভিন্নতর। অন্ধকার এর পুরুত্ব আরো বেশি। দেখে মনে হয়, সত্যি নাও হতে পারে, গুহার দেয়ালগুলো যেকোন সময় যে কাউকে চাপা দেয়ার জন্য প্রস্তুত। আলো দেখে অন্ধকারের পাহাড়াদার বাদুড়রা ‘দক্ষযজ্ঞ’ শুরু করে দিল। সব কিছুকে নিমিষে দেখে নিলাম। কিছু সময়কে ক্লিকে বন্দী করলাম। তারপর গুহামুখের দিকে উল্টোযাত্রা।
পৃথিবী আহ্নিক গতির কোন প্রভাব চির অন্ধকার এ গুহা দু’টোতে নেই। কিন্তু বাইরেতো আছে। তাই গিরি গুহা ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে হলো। ঘড়ির কাঁটা তখন ৬টার দিকে দৌড়াঁচ্ছে। টিম এর নিউক্লিয়াস ‘অঞ্জন’ এর নেতৃত্বে আমরা বাসের দিকে দৌড়।
ঘটন অঘটন স্বস্তি অস্বস্তি শুরু থেকে শেষ অবধি ছিল। তার মধ্যে কিছু ব্যক্ত কিছু অব্যক্ত। পথ পথ চলতে চলতে বলা করা শোনা বহু ছোট ছোট মুহূর্ত রঞ্জিত আছে মনে। তা কখনও মুখে দিয়েছে দম ফাটানো হাসি, কখনওবা কারও মুখ করে দিয়েছে মলিন। সব কিছুকে গুছিয়ে লিখতে পারিনি। অদূর ভবিষ্যতে হয়ত ভালো লিখতে পারব। এজন্য চেষ্টা করছি। ‘লিটন’ এর প্রেরণায় এ লেখা। তাকে ধন্যবাদ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



