somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভ্রমণ: ‘আলীর গুহায় কিছুক্ষণ’

১০ ই নভেম্বর, ২০১১ সন্ধ্যা ৬:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দিনের পরে রাত । সে চিরাচরিত নিয়ম । তাই আাবহমান থেকে পৃথিবীর বিশাল অংশ পালা করে দিনে রোদ পোহায় ও রাতে অন্ধকার এর চাদর মুড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ে ৷ আলীকদমের ‘আলীর গুহা’ কিন্তু ব্যতিক্রম৷ এখানে দিন নেই৷ চির অন্ধকার এখানে৷ প্রকৃতির হিসাব সব জায়গায় অতো সোজা সাপটা নয়৷ সে বুঝে নিয়ম৷ নিয়মের পাল্লায় পড়ে গড়ে ওঠে গিরি গুহা ইত্যাদি। পাহাড়ের স্থানে স্থানে অধঃক্ষেপণ, তাপ, চাপ ও রাসায়নিক ক্রিয়ার ফলে, এর স্থানে স্থানে খনিজ উপাদান ও বুনট পরিবর্তিত হয়ে পলির রূপ ধারণ করে, হাজার হাজার বছরের পথ পরিক্রমায় ধীরে ধীরে, ধীরে ধীরে পলি পানির সাথে স্থানচ্যুত হয় এবং ওই স্থান ফাঁকা হয়ে তা গুহায় রূপ নেয়।



গুহার বাসিন্দারা

গুহা, যাকে আদি মানব তাঁর ঠিকানা বানিয়েছিল। তাই গুহার সাথে জড়িয়ে আছে মানব সংস্কৃতি ও সভ্যতা বিকাশের বই এর আদি পাতাগুলো। বিকশিত মানব গুহা ছেড়ে এখন খোলা প্রান্তরে। আর গুহার দখল নিয়েছে বাদুড়, সাপ, গিরগিটি, বিছাপোকা ছাড়াও আরও অনেক প্রজাতির পোকামাকড় । মাটির ওপরের প্রাণীদের মতো এরা চোখনির্ভর নয়। এদের গন্ধ, স্পর্শ ও শ্রবণের অনুভূতি খুব প্রখর। এরা এসব অনুভূতি দিয়েই গুহায় জীবনধারণ করে। গুহাতে এমন কিছু প্রাণী বাস করে যেসব প্রাণী গুহার অন্ধকার ছাড়া অন্য কোথাও বাস করে না। বা বলা উচিত বাস করতে পারে না। ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১১ এর বিকাল ৩টা ১৬ মিনিট হতে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত, অন্ধকারের প্রতিশব্দ আলীর গুহাতে- ‘যুব’, ‘লিটন’, ‘অঞ্জন’, ‘প্রতীম’ আর ‘আমি’ এ পাঁচজন স্পিলাংকার্স ঠিকানা করেছিলাম। চিরচেনা ক্ষেত্র থেকে এক ভিন্ন ক্ষেত্রে।



পরিকল্পনা শুরুর কথাগুলি

রাঙামাটির ফারুয়া না বরিশাল যাব এ নিয়ে দ্বিধা ছিল। এক দুই হবার যোগাড়। শেষমেষ দুইকে এক করার জন্য দু’টোই বাদ দিয়ে বান্দরবানের আলীকদমের এ আলীর গুহাকেই গন্তব্য ঠিক করলাম। ৭টার যাত্রা ৯টায় শুরু, লোকাল বাসের ছ্যাচড়ামির কারণে চকোরিয়ায় যেখানে সাড়ে ১১টার পৌঁছার কথা সেখানে পৌঁছলাম দুপুর ১টায়। চকোরিয়ায় পৌঁছে বাস বদল করে আলীকদমের বাসে ওঠলাম। আলীকদমকে যখন ছুঁয়েছি তখন ২টা ৩৫ মিনিট। পাহড়ি কাঁচা মরিচের ঝালে লাঞ্চ সারতে সারতে ঘড়ির কাঁটা তখন ৩টা কে ছুঁয়ে ফেলেছে। এরপর আলীকদম থেকে টমটম এ করে ছুটা, আলীর গুহাকে লক্ষ্য করে। টমটমকে আলবিদা জানাতে হল ‘আবুল’ রাস্তার কারণে। এরপর হাঁটা পথ।





লক্ষ্য পূরণ

গুহায় প্রবেশের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা ও পূর্ব প্রস্তুতির প্রয়োজন। মোমের আলো ছাড়া তেমন কিছু সংগ্রহ করতে পরিনি। ছোট গোল একটি বৃত্তের মতো গুহা মুখটা। ভেতরে অন্ধকার হা করে আছে। নিকষ কালো গাঢ় অন্ধকার। গা শিউরে ওঠে। ভেতরে যদি প্রতিকূল কিছু থাকে। ভয়ের দেয়াল এর চাদর সরিয়ে ঢুকে পড়েছি। একে একে সবাই। ক্রলিং করে এগোতে থাকলাম। ক্রলিং করে বেশিদূর করতে হলো না। পেট বিশাল। উচ্চতা ২৭ ফিট ও প্রস্থে ১৫ ফিট এর কাছাকাছি। লম্বায় বেশি নয়। ৪০ ফিট এর মতো। সঙ্কীর্ণ গুহার মুখ দেখে বুঝার উপায় ছিল না ভেতরের বিস্তৃতি। অনন্য। অসাধারণ। হাজার হাজার বছরের অন্ধকার স্তরে স্তরে, স্তরে স্তরে জমা হয়ে আছে। মোমবাতির কৃত্রিম আলো সামান্যই দাগ কাটতে পারছে অন্ধকারের গায়ে। চির অন্ধকারের প্রাণীগুলো ক্ষণিক এর আলোর স্রোতে পড়ে দিশা খুঁজে পাচ্ছিল না। পাঁচ লক্ষ বছর আগে, যে সময় গুহাকে মানুষ বাসস্থান হিসেবে ব্যবহার শুরু করে, সে সময়ে ফেরার অনুভূতি। আমাদের কথাবার্তার শব্দগুলো পর্যন্ত পাহাড়ের দেয়ালগুলো চুষে নিচ্ছে। কোন প্রতিশব্দ নেই। ক্রোম্যাগননরা নাকি খ্রিস্টপূর্ব ৪০ হাজার বছর থেকে গুহাচিত্র আঁকা শুরু করে। গুহার দেয়ালের অন্ধকার চিরে অতীতকে কাছ থেকে বুঝার চেষ্টা করলাম। পাহাড়ের গা চুঁইয়ে চুঁইয়ে আসা জলের ফোঁটায় তলদেশ কর্দমাক্ত। পিচ্ছিল তাই মুভমেন্ট এ সাবধান সবাই। অন্ধকার আর কাহাতক সয়।
প্রধান গুহাটির পাশের পাহাড়ে আরো একটি গুহা আছে। যা খুবই বিপদসঙ্কুল। একে সঙ্কীর্ণতা দ্বিতীয়ত গুহাবাসী প্রাণীর প্রচুরতা এর জন্য। ‘লিটন’, ‘প্রতীম’ আর ‘অঞ্জন’কে সে গুহামুখে রিজার্ভ রেখে, ঝুকি থাকা স্বত্ত্বেও, আমি অদম্য ‘যুব’ কে নিয়ে সাথে নিয়ে অন্ধকারকে আলো দেখাতে দেখাতে এগোলাম। এটির চরিত্রে প্রথমটি থেকে ভিন্নতর। অন্ধকার এর পুরুত্ব আরো বেশি। দেখে মনে হয়, সত্যি নাও হতে পারে, গুহার দেয়ালগুলো যেকোন সময় যে কাউকে চাপা দেয়ার জন্য প্রস্তুত। আলো দেখে অন্ধকারের পাহাড়াদার বাদুড়রা ‘দক্ষযজ্ঞ’ শুরু করে দিল। সব কিছুকে নিমিষে দেখে নিলাম। কিছু সময়কে ক্লিকে বন্দী করলাম। তারপর গুহামুখের দিকে উল্টোযাত্রা।



পৃথিবী আহ্নিক গতির কোন প্রভাব চির অন্ধকার এ গুহা দু’টোতে নেই। কিন্তু বাইরেতো আছে। তাই গিরি গুহা ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে হলো। ঘড়ির কাঁটা তখন ৬টার দিকে দৌড়াঁচ্ছে। টিম এর নিউক্লিয়াস ‘অঞ্জন’ এর নেতৃত্বে আমরা বাসের দিকে দৌড়।



ঘটন অঘটন স্বস্তি অস্বস্তি শুরু থেকে শেষ অবধি ছিল। তার মধ্যে কিছু ব্যক্ত কিছু অব্যক্ত। পথ পথ চলতে চলতে বলা করা শোনা বহু ছোট ছোট মুহূর্ত রঞ্জিত আছে মনে। তা কখনও মুখে দিয়েছে দম ফাটানো হাসি, কখনওবা কারও মুখ করে দিয়েছে মলিন। সব কিছুকে গুছিয়ে লিখতে পারিনি। অদূর ভবিষ্যতে হয়ত ভালো লিখতে পারব। এজন্য চেষ্টা করছি। ‘লিটন’ এর প্রেরণায় এ লেখা। তাকে ধন্যবাদ।




১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×