মার্কিন ঔপন্যাসিক ও সমালোচক হেনরি জেমস লিখেছেন যে, একজন কবি বা সৃজনশীল সাহিত্যিক যা কিছু লেখেন, তার প্রতিটি পঙতিতে নিজের কথাই লেখা থাকে। তাঁহার জীবনচরিতে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন এর ঠিক উলটাঃ 'কবিরে পাবে না তাঁহার জীবনচরিতে'; অবশ্য এ কথা লিখলেও তিনি তার কবিতা,গানে, উপন্যাসে তার নিজের কথা বারবার বলেছেন।তিনি যে পরিমান লিখেছেন তাতে তাকে কোন বিশেষ ধরনের কবি বা সাহিত্যিক বলা সম্ভব নয়। তাকে শুধু আধ্যাত্মিক বা প্রকৃতির কবি বলা যাবে না।তাহলে তাকে প্রেমের কবি বলা যায়। কারণ তার প্রেম শুধু শত শত প্রেমের গানে প্রকাশ পায় নি, তার প্রকৃতি ও পূজাও প্রেমের সাথে একাকার হয়ে গেছে।
যেমনঃ ভগ্নহৃদয় কাব্য তিনি উৎসর্গ করেছেন বউদি কাদম্বরী দেবীকে - একটি কবিতার মাধ্যমে -'তোমারেই করেছি জীবনের ধ্রুবতারা'।তার প্রেম দৈহিক ছিল না। তাঁর প্রেম ছিলঃ কামগন্ধ নাহি পায়। কিন্তু তিনি নারীদেহের সৌন্দর্য সম্পর্কে সচেতন ছিলেন না বা তা দিয়ে আকৃষ্ট হন নি তা বলেন নি। একবারে প্রথম দিকের কবিতায় 'শেষ চুম্বন' বা 'স্তন' এর মত শব্দ ব্যবহার করেছেন।
কবির জীবনের প্রেমসম্পর্কিত বিষয়গুলো ঐতিহাসিকরা আলোচনা করেন না। কবির জীবনে প্রথম কার প্রেমে পরেছিলেন! তাঁর সেই প্রেমের চরিত্র কেমন ছিল। সেই সম্পর্কে অনেক গুজব আছে। আজ সেই বিষয়ে সামান্য আলোচনা করব। যে বালিকার প্রেমে পরেন তিনি প্রথম , তিনি কাদম্বরী দেবী,জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্ত্রী।কাদম্বরী দেবী তাঁর প্রথম খেলার সাথি,সাহিত্যের পথপ্রদরসক,প্রথম পাঠিকা ও সমালোচক, তাঁর পথের দিশারী।কাদম্বরী বাবা ছিলেন কম বেতনের বাজার-সরকার।নিজের গায়ের রং ছিল শ্যামলা ,শিক্ষাদীক্ষার অভাব ছিল।তাই তাঁর স্থান হয়েছিল ঠাকুরবাড়ির নিচতলার কাজের লোকদের সাথে। রবীন্দ্রনাথ তাকে আগে দেখেছিলেন কিনা তা জানা যায় না। তখন কবির বয়স সাত, আর কাদম্বরির নয়। অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও সংবেদনশীল বালক রবীন্দ্রনাথ বাবা মার স্নেহ বেশি পান নি। তিনি পেয়েছিলেন সমান দুখী এক বউদিকে। কাদম্বরীই কবিকে সাহিত্যের রস আস্বাদন করতে শিখিয়েছিলেন। এভাবেই বঙ্কিম,শেকসপিয়র পরে ফেললেন।কাদম্বরী চেয়েছিলেন কবি তাঁর লেখা পরিপক্ক হবার পর ছাপান। কিন্তু কবি চেয়েছিলেন প্রকাশ হতে।এতে তাদের দূরত্ব তৈরি হয়। এরপর কবি বিলেত গেলেন।বিলেত যাবার আগে তিনি বোম্বাইতে এক পরিবারে ছিলেন সাত-আট সপ্তাহ ইংরেজি শিখতে। সেই পরিবারের ছোটো মেয়ে আনা তরখড়ের উপরে কবির শিক্ষার ভার পড়লো। কিন্তু এমন সুদর্শন কবি আর গায়ক দেখে আনার প্রেমে পরতে দেরি হল না। কবিও কবিতা ,গান লিখে তাকে 'নলিনী'নাম দিয়ে মুগ্ধ করলেন।এই বিষয়ে কবি লিখেছেন:
" আমার সঙ্গে সে প্রায়ই যেচে মিশতে আসত। কত ছুতো করেই না ঘুরত আমার আনাচে কানাচে। আমাকে বিমর্ষ দেখলে দিত সান্ত্বনা, প্রফুল্ল দেখলে দিত সান্ত্বনা, প্রফুল্ল দেখলে পিছন থেকে ধরত চোখ টিপে। এ কথা আমি মানব যে আমি তের পেতাম ঘটবার মতন একটা কিছু ঘতেছে,কিন্তু হায় রে, সে হওয়াটাকে উস্কে দেওয়ার দিকে আমার না ছিল কোনো রকম তৎপরতা, না কোনো প্রতুৎপন্নমতিত্ব।..... একদিন সন্ধাবেলা, সে আচমকা এসে হাজির আমার ঘরে।চাঁদনি রাত। চারদিকে সে যে কই অপরূপ আলো হাওয়া! কিন্তু আমি কেবলই ভাবছি বাড়ির কথা। ভাল লাগছে না কিছুই। সে বলে বসল আহা কী ভাবো আকাশপাতাল। তাঁর ধরনধারণ জানা সত্ত্বেও আমার একটু কেমন কেমন লাগল। কারণ যে প্রশ্ন না করতে একেবারে আমার নেয়া খাটের উপরেই বসল। আচ্ছা আমার হাত ধরে টানো টাগ- অব ওয়ারে দেখি যে জেতে। শেষে একদিন বলল তেমনি আচমকাঃ জানো কোনো মেয়ে ঘুমিয়ে পড়লে যদি তাঁর দস্তানা কেউ চুরি করতে পারে তবে তাঁর অধিকার জন্মায় মেয়েটিকে চুমো খাওয়ার? বলে খানিক বাদে আমার আরাম কেদারায় নেতিয়ে পড়ল নিদ্রাবেশে। ঘুম ভাঙতেই সে চাইল তাঁর দস্তানার দিকে। একটিও কেউ চুরি করেনি।(প্রশান্ত পালের রবিজীবনী ,দ্বিতীয় খণ্ড থেকে লেখা)
এ থেকেই বোঝা যায়, ভালোবাসাকে দৈহিক করে তোলার মত স্থূল রুচি তাঁর গড়ে উঠেনি। তিনি তাঁর বউদিকেও তেমনি করে ভালোবাসতেন। আনার সাথে তাঁর ভালোবাসা অঙ্কুরিত হয়েছিল। পল্লবিত হয়নি। কিন্তু কবি ও আনা কেউই নলিনী নাম ভুলেননি। নলিনী নামে গান লিখেছেন, নাটক লিখেছেন। বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত মনে রেখেছেন। এ তো প্রেমেই। আনাও তাকে ভালোবাসতেন। পরিবারের কাছে বিয়ের কথাও হয়েছিল ।আত্মারাম তাঁর মেয়ে আনাকে নিয়ে কলকাতা এসেছিলেন রবির সাথে আনার বিয়ের ব্যপারে দেবেন্দ্রনাথের সাথে আলাপ করতে।দেবেন্দ্রনাথ ছিলেন চরম রক্ষণশীল ,অসবর্ণে ছিল তাঁর ঘোর আপত্তি। কথাবার্তা হয়েছিল কিনা তা জানা যায় নি। আনা রবীন্দ্রনাথের মনে স্থায়ী দাগ কেতেছিলেন,কিন্তু তাদের প্রণয়ে কোনো অগ্রগতি হয় নি।
কবি তাঁর জীবনে অনেক মেয়ের সান্নিধে এসেছিলেন। তবে যতটুকু জানা যায় কাদম্বরী দেবীকে কবি ভালোবাসতেন। রবীন্দ্রনাথের রবীন্দ্রনাথ হওয়ার পিছনে কাদম্বরীর দেবী অবদান কোন অংশে কম না। সামনে কবির জীবনের আসা অন্য মেয়েদের সম্পর্কে বলব।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

