আজকাল আর ঠিক মত ঘুমাতে পারি না। ঘুমালেই মনে হয় এমন কিছু স্বপ্ন দেখব যা আমি দেখতে চাই না। স্বপ্নগুলো যে কেন দেখি আমি নিজেও জানি না। আমার কি কোন অদৃশ্য ক্ষমতা আছে? আরে না আসলে তা নেই। কিন্তু মাঝে মাঝে যা স্বপ্নে দেখি তা সত্যি হয়ে যায়। কেন সত্যি হয় তা জানি না। স্বপ্ন দেখলে তা সত্যি হয়ে যাবে এই ভয়ে ঘুমাতে ইচ্ছে করে না। কলেজে যাই চোখ লাল, দেখে মনে হয় নেশা করে এমন কেউ! কিন্তু বিশ্বাস করেন নেশা করি না আমি।
একদিন রাতে স্বপ্নে দেখলাম দাদী আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, আমি স্বপ্নের মাঝেই ভাবছি দাদী তো গ্রামের বাড়িতে তাহলে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে কে? দাদীর স্পর্শে ভাল লাগছিল, যদিও জানতাম স্বপ্ন তবুও চাইছিলাম অনেকক্ষণ ধরে চলুক এই স্বপ্ন। একটু পরেই ঘুম ভেঙ্গে গেল। দেখি বাসায় হট্টগোল, বাড়ি থেকে ফোন এসেছে, দাদী নাকি আর নেই! ঘুম থেকে উঠে কিছুক্ষণ বুঝতে পারছিলাম না আসলেই কি আমি জেগে আছি নাকি ঘুমের মাঝেই আছি এখনো? যাইহোক সকালেই বাড়ি গিয়ে দাদীকে শেষ বারের মত দেখলাম, কবর দিয়ে আসলাম। পড়ালেখায় বরাবর ভাল ছিলাম। বেশি পড়ালেখা করি বলে আঁতেল গালি শুনতে হয়েছে অনেকবার। এস এস সি পরীক্ষা দিলাম, অনেকটা শিওর যে গোল্ডেন পাব। রেজাল্ট দেয়ার কয়েকদিন আগে স্বপ্নে দেখলাম সামাজিক বিজ্ঞান পরীক্ষায় ৭৬ পেয়েছি, আমার হাতে আমার খাতা, কিছুতেই আমি ৪ নাম্বার বাড়াতে পারছি না। খাতা অনেকবার উলটে পালটে দেখলাম কিন্তু বাড়াতে পারলাম না। ঘুম ভেঙ্গে গেল। পানি খেলাম আর মনে মনে ভাবলাম সমাজে আমি ৫০ টা অব্জেক্টিভ কারেক্ট করেছি, এত চিন্তা করে লাভ নেই। সব স্বপ্ন তো আর সত্যি হয় না। রেজাল্ট দেয়ার পরে যেন আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। এত কষ্ট করেও গোল্ডেন পেলাম না। তখন খুব খারাপ লেগেছিল কিন্তু খারাপ লাগার থেকে যে অনুভূতিটা আমার বেশি হয়েছিল সেটা হচ্ছে ভয়! আবারও আমার একটা স্বপ্ন সত্যি হয়ে গেল! কয়েকদিন খুব টেনশনে কাটল। এরপরে আবার সব ঠিক হয়ে গেল। কয়েকটা উলটা পালটা স্বপ্ন দেখতাম মাঝে মাঝে যেগুলো সত্যি হয় নি। ভাবলাম আমি এই চক্র থেকে মুক্তি পেয়েছি।
জেসমিন নামের মেয়েটাকে খুব ভাল লাগে। একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম তাকে নিয়ে। সে আমাদের মাইক্রো বায়োলজি ডিপারটমেন্টের ল্যাবের ফ্যানের সাথে ঝুলে আছে। ঘুম ভেঙ্গে গেল। প্রচণ্ড ভয় পেলাম। মেয়েটার যদি কিছু হয়। সাথে সাথে ফোন করলাম তাকে, তখন রাত ৩ টা বাজে। যদিও আমি তার নাম্বার জানি, কিন্তু মেয়েটা আমার নাম্বার জানে না। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে দুইবার হ্যালো হ্যালো শুনে রেখে দিলাম। পরেরদিন তাকে কলেজে দেখে শান্তি পেলাম। নাহ মেয়েটা ভালই আছে, আমি শুধু শুধু টেনশন করছিলাম। পরেরদিন আবার একই দুঃস্বপ্ন দেখলাম। তারপরের দিন আবার! দুই দিনই আমি ফোন করেছিলাম কিন্তু কথা বলিনি। জেসি ঠিক আছে, যাক আমার চিন্তার অবসান এই ভেবে রেখে দিয়েছি। পরেরদিন থেকে যাতে এই দুঃস্বপ্ন দেখতে না হয় তাই ঘুমানো ছেড়ে দিয়েছি। চোখ লাল করে আবার কলেজে যাওয়া শুরু আমার। আজকে জেসি আমাকে দেখেই কাছে এসে বলল, “মুকিত তুমি কি আমাকে প্রতিদিন ফোন কর?” আমি কাচু মাচু হয়ে গেলাম তার সামনে। সে দেখে বলল, “লজ্জা পেতে হবে না, তুমি আমাকে ফোন করতেই পার কিন্তু রাত তিনটের সময় ফোন করে কথা বল না, এই ব্যাপারটা একটু ওড। বুঝেছ? আর এমন করবে না”। পরের দিন রাত জেগে আর থাকতে পারলাম না, কেন যেন খুব আরামের ঘুম হল। সকালে কলেজে এসে জেসিকে না দেখে বুকটা ধক করে উঠল। সাথে সাথে কল দিলাম। জেসি কল ধরেছে! শান্তি! ফোন আবার কেটে দিলাম। ৭ দিনের দিন আমার স্বপ্ন সত্যি হল। ঘুম ভাঙল এক ফ্রেন্ডের কল পেয়ে, জেসি নাকি হাতের রগ কেটে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। ঈদের কিছুদিন আগে তো তাই বেশি লোক ছিল না হলে, কেউ খেয়াল করেনি। এখন নাকি অনেক দেরি হয়ে গেছে, বাচানো যাবে না। জেসি আমি হসপিটাল আসার অপেক্ষা করেনি। আগেই চলে গেছে আমাকে ছেড়ে। কিন্তু কেন এমন হল? আমি পরের কিছু রাত জোর করে স্বপ্ন দেখতে চাইলাম জেসি কেন এমন করল, কিন্তু আমার আসলেই কোন ক্ষমতা নেই।
ব্যাগ থেকে সব্জি কাটার ছুরিটা বের করলাম। সেটা হাতে নিয়ে লেডিস হোস্টেল থেকে কলেজে যাওয়ার সেই চিপায় অপেক্ষা করছি। এতদিন আমি চাইতাম আমার স্বপ্ন সত্যি না হোক, কিন্তু আজ আমি নিজেই আমার স্বপ্ন সত্যি করার জন্য অপেক্ষা করছি। গতরাতে স্বপ্ন দেখেছি মাইক্রো ডিপার্টমেন্টের জলিল মামার গলার আরটারি কেটে দিচ্ছি, তাকে নির্মমভাবে হত্যা করছি, আর জেসি দূর থেকে তাকিয়ে দেখছে। জলিল মামা জেসির মৃত্যুর সাথে কিভাবে জড়িত তা জানি না, জানার দরকার নেই। জীবনে প্রথম বারের মত নিজের একটা দুঃস্বপ্নকে সত্যি করতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



