আগের পর্ব
Click This Link
কিষাণীর স্মৃতি থেকে-৬
আগে ভেবেছিলাম যাক বাবা এ যাত্রা বাঁচলাম। কি যে বাঁচলাম তা দু'দিনেই বুঝলাম। ও আমাকে এড়িয়ে চলতে চায়। আগের চাইতে স্বাভাবিক আচরন করে, আরো বেশী হৈচৈ করে। আর আমি কষ্টে মরে যাই। আমার মনের মধ্যে নতুন আঙ্গিকে প্রতিনিয়ত ঝড় বইছে। মাঝে মাঝে রাগ হয় কেন সে এত সহজে আমাকে মন থেকে মুছে ফেলবে, এই হল বেয়াড়া মন! তাহলে আমি কি করবো এবার তাকে বলবো যে আমিও তাকে ভালবাসি নাকি তার মত ভাল থাকার অভিনয় করবো। নিজের সাথে যুদ্ধ করে ক্লান্ত হয়ে পড়ছি। মনে হচ্ছিল ব্যাপারটা কারো সাথে শেয়ার করি। কেন যেন সমবয়সী বান্ধবীদের প্রতি আস্থা রাখতে পাছিলাম না। আমি ঢাকায় আমার কলেজের এক স্যারের শরণাপন্ন হলাম। উনি আমাদের পরিবারের সবাইকে চেনেন। উনি সব শুনে বললেন তোমার মধ্যে দোটানা হচ্ছে কারন তুমি ছেলেটাকে ভালবেসে ফেলেছো, এখন তো কিছু করার নেই। আমি মনে মনে বলি আমি তো জানি ভালবেসেছি। স্যার যে বকা দিলেন না তাতে মনে একটু সাহস পেলাম। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
ক্যাম্পাসে ফিরে এলাম। এ ভদ্রলোকতো তো দেখি রীতিমত মহাভদ্রলোকে পরিণত হয়েছেন। সদা সর্বদা ১০০ হাত দুরে থাকেন, এমন অবস্থা। আমি তা হতে দেব কেন! আমি জেনে গেছি আমাদের কি হবে। এখন সে আমাকে এড়িয়ে চলে আর আমি তার পিছু পিছু। আমার আচরনে অবাক হয়ে মাঝে মাঝে আমাকে খোঁচা দেয়, তাকে ফিরিয়ে দিয়েছি একথা নানা রসিকতা করে বলে। মাঝে মাঝে আমি কষ্ট পাই, কখনো বা হেসে উড়িয়ে দেই। আমি তার হাস্যরসের গভীরে তার মনের কথা পড়বার চেষ্টা করি।
আমি তার প্রতিটি এক্সপ্রেশন বুঝি, বুঝি উপরে উপরে ভাব দেখানো হচ্ছে। যে অনুভুতি আমার হচ্ছে তা তার না হবার কোন কারণ নেই। অথচ আমি তাকে কিছু বলবার কোন সুযোগ ও পাচ্ছিনা। তাই এক সন্ধ্যায় যখন ফেরার পথে টি এস সির বারান্দা থেকে নামবার সময় বলল হাত ধরবা কিনা ধর, সেদিন তো মন দিলাম নিলা না। কথাটায় কোন আবেগ ছিল না। তারপরও শুনে আমার বুক কেঁপে উঠল, আমি তার চোখের দিকে তাকালাম। কিছু না বলে হাত ধরে নামলাম। যখন হাতটা আর ছাড়ছি না তখন তার টনক নড়লো। ও নীচু স্বরে বলল, তুমি আমার হাত ধরলা? আমি বললাম, ধরলাম আর ছাড়বো না। সে তো বেশ কনফিউজড, আরো নিশ্চিত হওয়ার জন্য বলল, আবার ধর। আমি খুব স্বভাবিক ভাবে হাত ধরে হাঁটছি। আমার খুব ভাল লাগছে, মনটা হাল্কা লাগছে। সে বলছে তাহলে ব্যপারটা কি দাঁড়াইল? আমি বলি কি দাড়াইল, কিছুই দাড়ইল না। কিছুক্ষন টি এস সির সামনের রাস্তায় পায়চারী। ধীরে ধীরে হলে ফিরে এলাম। আমাকে পৌঁছে দিয়ে হলে চলে গেল।
এতদিন যা ছিল মনে মনে এখন তা দুজনের জানা হয়ে গেল। কেমন যেন একটা হতবিহ্বল অবস্থা। প্রবল ঝড়ের পর যেমন সব শান্ত নিশ্চুপ হয়ে যায় তেমনি।
ধীরে ধীরে বিহ্বলতা কাটলো। আবার সেই পুরোনো জীবন যাপন মাঝে শুধু ভাললাগা গুলোর মাত্রার পরিবর্তন। কাজের গতি, পড়াশোনায় মনযোগ বাড়লো। সুযোগ পেলে একটু রিকশায় ঘোরা, কাছাকাছি থাকার জন্য। সন্ধ্যার পর এলোমেলো হাঁটা। সারাদিন ক্লাশ লাইব্রেরী ঘোরাঘুরির পর সন্ধ্যায় হলের ডাইনিংএ খেয়ে আমি দিতাম ঘুম। সাধারনত বান্ধবীরা তখন আড্ডা মারতে আসতো। এই আড্ডা এড়াতেই ঘুম থেরাপী, আমি ঘুমিয়ে আছি তাই আমার ডাক পড়তো না। ঘুম থেকে রাত এগারোটার দিকে উঠে পড়াগুলো শেষ করতাম। কারন আমাকে রেজাল্ট ভাল করতে হবে। বাবা মাকে শান্ত করার এটাই একমাত্র পথ।
আমাদের বন্ধুমহলে এখনো আমাদের মধ্যে ঘটে যাওয়া পরিবর্তিত পরিস্থিতি সম্পর্কে আপডেট করা হয়নি। তবু সেটা কারো অগোচরে থাকলো না। ফ্যাকাল্টির পিকনিকে আমাদের কমন বান্ধবী ঘোষনা দিল "এই যে এরা আমাদের ক্লাশের নতুন জুটি"। আমরা দুজন মিটিমিটি হাসি।
আর সব জুটিদের মত আমরাও স্বপ্ন দেখি, প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন, ঘর বাঁধার স্বপ্ন। প্রতিকূলতার মুখোমুখি হবার জন্য একে অপরকে সাহস দেই। আশায় বুক বাঁধি।
চলবে......

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

