মিনার রশীদ
(আগের অংশের পর ...)
এক থেকে যেমন তিন হতে পারে না তেমনি এক জাতিতত্ত্ব থেকে লাফ দিয়ে বাংলাদেশের জন্য অতি প্রয়োজনীয় ত্রি-জাতিতত্ত্বের উদ্ভব হতে পারতো না। ইতিহাসের এই বাস্তবতা থেকে আমরা চোখ ফিরিয়ে রাখতে পারবো না। একে স্বীকার করা মানে আগের ত্রুটিপূর্ণ তত্ত্বকে সমর্থন করা নয়। বাঙালি জাতিসত্তা থেকে পৃথক বাংলাদেশি জাতিসত্তার সৃষ্টি এর হাত ধরেই হয়েছে। এটাই এদেশের মূলধারা। এদেশের গণমানুষের বোধ-বিশ্বাস-স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের পক্ষের ধারা। বাকি সব ধারা রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক গোলামি বা দালালির মনোবৃত্তি থেকে উৎসারিত - তা যতোই শৈল্পিক বা সাংস্কৃতিক সুষমায় আচ্ছাদিত করে পরিবেশন করা হোক না কেন। অথচ সঠিক এই ধারণা বা ভাবনাকে ঘিরে সুকৌশলে হীনমন্যতা ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। বুক ফোলানোর মতো দর্শন নিয়ে মাথা নুইয়ে থাকতে হয়েছে। সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে প্রবাহিত এক ধরনের আধিপত্য বা আজব ধরনের সন্ত্রাস এই অবস্থার সৃষ্টি করে রেখেছিল। অবস্থা অনেক দিন পর্যন্ত এমন ছিল যে, এক জাতিতত্ত্বের সমালোচনা করার আরেক নাম দ্বি-জাতিতত্ত্বকে সর্বান্তকরণে সমর্থন করা। বুশ যেমন বলতে চান তার বিরোধিতা মানেই লাদেনকে সমর্থন করা। তৃতীয় কোনো রাস্তা নেই। এসব আজব সন্ত্রাসীর ভাবখানাও ছিল অনুরূপ। এক পর্যায়ে এই চিন্তাধারাকে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে এমন করে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে এবং সার্বিক পরিবেশ এমন করে রাখা হয়েছে যে, তাদের এই মতের বিরোধিতা করা মানেই দেশের স্বাধীনতার বিরোধী হয়ে যাওয়া। নিজের দেশ-বোধ-বিশ্বাসের ওপর আবেগ প্রকাশ করলে কিংবা এদের কোনো অবিচারের বিরুদ্ধে মুখ খুললে পেচিয়ে এটাকে তারা পাকিস্তানপ্রীতি বানিয়ে ফেলতো। শিল্প, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বলয়ে উপরোক্ত মহলটি এমন আধিপত্য বিস্তার করে ফেলে যে, এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা রীতিমতো বিপজ্জনক হয়ে দাড়ায়। কারো দেশপ্রেম মাপা ও দেশপ্রেমের সার্টিফিকেট বিতরণের একচ্ছত্র মালিক বনে যায় তারা। এই ধারণার বাইরে যেসব বুদ্ধিজীবী অবস্থান নিতেন তাদের বুদ্ধি ও দেশপ্রেম আদৌ আছে কি না তাই নিয়ে সংশয় দেখা দিতো। দু-এক জন গো ধরে বসলে বুদ্ধিজীবীদের খাতা থেকেই তাদের নাম কেটে দেয়া হতো। সাধারণ শিক্ষিত মহলে এর একটা সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে। এই লাইন বরাবর চিন্তা তখন এক ধরনের ফ্যাশন হয়ে দাড়ায়।
সবার মনে গুঞ্জরিত এ সঠিক কথাটি তাই অনেকদিন পর্যন্ত বুক ফুলিয়ে বলতে পারা যেতো না। কথাটি প্রথম বলার সাহস যুগিয়ে গেছেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। ইতিহাসের বাকগুলোতে যেখানেই আমরা দ্বিধান্বিত ছিলাম, সেখানেই তার দৃঢ়কণ্ঠ বেজে উঠেছে। যখন মনে হয়েছে এখানে এখন একজন মানুষের দাড়িয়ে পড়া দরকার, তখনই তাকে সেখানে দেখা গিয়েছে। তার সফলতা যাদের ব্যর্থতা তুলে ধরেছে তারা সঙ্গত কারণেই তার এই 'অপরাধ' ক্ষমা করতে পারেনি। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর যে জিয়াউর রহমানের বীরত্বপূর্ণ দেশপ্রেমিক ভূমিকা এই দেশটিকে এক জাতিতত্ত্বের ভাবাবেগে করদরাজ্য হওয়া থেকে রক্ষা করেছে, যার ভূমিকায় আজও কেউ কেউ মুখ্যমন্ত্রী বা রাজ্যপাল হওয়ার পরিবর্তে স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট হয়ে ঘুরে বেড়ান তারাও এই দিনে তার কবর জিয়ারতে ভয় পান। অথচ অমন ভয়, হীনমন্যতাকেই জিয়াউর রহমান ভেঙে গুড়িয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন।
এই ভয় পাওয়ার অপরাধে একজনকে শাস্তি বা গালি দিয়ে লাভ হবে না বা বলির পাঠা বানিয়ে লাভ হবে না। আরো গভীরে এর সমাধান খুজতে হবে।
.....................................................
১১ নভেম্বর, ২০০৬
যায়যায়দিনের সৌজন্যে

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

