somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমি যদি দলের (জামায়াতের) আমির হতাম

১৭ ই ডিসেম্বর, ২০০৭ ভোর ৫:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের প্রায় ৯৫ ভাগ সদস্য বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বা বিপক্ষে কোনও ভূমিকা রাখারই সুযোগ পায়নি কেবল বয়সের কারণে। এই দলের ৯৫ ভাগ সদস্যের সর্বোচ্চ বয়স ৪৫ বছরের বেশি নয়। সেই হিসাবে তারা ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সময় ৯/১০ বছর বয়সী ছিল। অর্থাৎ তারা ছিল শিশু, সকল অপরাধ আর অভিযোগের ঊর্ধ্বে।

এর বাইরে ৫ ভাগের মধ্যে নেতৃস্থানীয়দের মধ্যে বেশ কয়েকজন আছেন যাদের ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিল প্রতিপক্ষের। আবার এ কথাও সত্য, বেশ কিছু সদস্য আছেন যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধা।

কেন্দ্রীয় ও জেলাপর্যায় মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী নেতৃস্থানীয় সদস্য জামায়াতে ইসলামীতে আছেন সর্বোচ্চ ৫০ জন বলে মনে করা হয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে স্বাধীনতাবিরোধী অংশটি সংখ্যালঘু। আর নেতৃস্থানীয় পর্যায়ের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অথবা যুদ্ধাপরাধীর সংখ্যা ৫০ জনও হবে কিনা সন্দেহ।

জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমির হিসেবে আমি বিবেচনা করতাম, অতি সংখ্যালঘু বা বলা চলে মুষ্টিমেয় কয়েকজনের জন্যে দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক ঝুঁকি ক্রমাগত বাড়ানোর পরিবর্তে মুষ্টিমেয়ের ব্যাপারে কৌশলগত ব্যবস্থা নেয়াই যুক্তিসঙ্গত ও ইতিবাচক পদক্ষেপ। যেমন জামায়েতে ইসলামীর প্রাক্তন আমির অধ্যাপক গোলাম আযমকে দলের দালিলিক ও দৃশ্যমান নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দিয়ে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ও গোলাম আযম দুজনেই উপকার পেয়েছেন। অথচ অধ্যাপক গোলাম আযমের কার্যকর ও আদর্শিক নেতৃত্ব দেয়া থেকে কেউই বাধা সৃষ্টি করতে পারছে না।

একইভাবে অন্যান্য সর্বদা আলোচিত ও বিতর্কিত ১০/১৫ জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে দলের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখলে তারা আড়াল থেকে এখনও আদর্শিক, উপকারী এবং নেতৃস্থানীয় ভূমিকা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হতেন।

এছাড়া জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ যেহেতু স্বাধীনতা-পূর্ব সংগঠনের ঐতিহ্য ধারণ করে তাই দল হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের সময় সক্রিয় প্রতিপক্ষের ভূমিকার কথা রাজনৈতিকভাবে অস্বীকার করতে পারে না। এটা অনেকটা পিতার সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার নেয়ার পাশাপাশি সেই সম্পত্তির কিছু দায়-দেনার দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করার মতো সুবিধাবাদী ও অগ্রহণযোগ্য ভূমিকা।

আমি যদি জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমির হতাম, এ ক্ষেত্রেও আমার একটা পরিকল্পনা থাকত। আমি সর্বাত্মক গুরুত্বের সঙ্গে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এর প্রতিপক্ষ হিসেবে কাজ করার জন্য আন্তরিক ও সর্বাত্মকভাবে ক্ষমা প্রার্থনার উদ্যোগ নিতাম যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।

দলের সকল ফোরামে বিস্তারিত আলাপ-আলোচনার করে এই ক্ষমা প্রার্থনা শুরু হত সংগঠনের সর্বনিম্ন পর্যায় থেকে। ইউনিয়ন পর্যায়ে জামায়াতে ইসলামীর সংগঠন থাকলে মাদ্রাসা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় ছাত্র সংগঠনের মাধ্যমেও বড় অনুষ্ঠান করে এলাকার বা প্রতিষ্ঠানের মুক্তিযোদ্ধাদের দাওয়াত করে এনে তাদের সামনে আল্লাহর কাছে দু-হাত তুলে দলের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ভূমিকা এবং যুদ্ধাপরাধীদের জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা করতাম। সর্বসাধারণের কাছেও মাফ চাইতাম। তারপর একইভাবে জেলা, বিভাগ হয়ে জাতীয় পর্যায়েও ব্যাপক উদ্যোগ আয়োজনের মাধ্যমে আন্তরিকভাবে দলের মুক্তিযুদ্ধকালীন সকল অপরাধের দায় নিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করতাম। ক্ষমা প্রার্থনার চেয়ে বড়, জনসংযোগ এর চেয়ে মহৎ ‘উৎসব’ আর কী হতে পারত?

মহান ভাষা আন্দোলন ও রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, এই দেশে যতদিন একুশে ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ ভাষা সংস্কৃতির মাস, ২৫ মার্চ অর্থাৎ স্বাধীনতার মাস, ১৬ ডিসেম্বর অর্থাৎ পুরো ডিসেম্বর অর্থাৎ বিজয়ের মাস যতদিন থাকবে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ অথবা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের জন্যে অত্যন্ত বিপজ্জনক ও বিব্রতকর একটি সময় থাকবে অনাদিকাল। এ সময়ে স্বাধীনতা বিরোধীদের কিছুতেই মুক্তি নেই। যত শক্তিমান শাসকই হোন, স্বাধীনতা বিরোধীদের কোনও সুবিধা দিয়েই সুবিধা করতে পারবেন না। সুতরাং সারা বছর জুড়ে অন্যান্য মাসে কোনও কারণে কম হলেও উল্লিখিত মাসগুলো জামায়াতে ইসলামীর জন্য হবে কোণঠাসা থাকার সময়, বিব্রত ও চাপে থাকার মাস। তা ছাড়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি ক্রমাগত শক্তিশালী হতেই থাকবে। গতকাল ১৬ ডিসেম্বর অনেকগুলো রাজনৈতিক দল বঙ্গভবনের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান বর্জন করে উচ্চস্বরে সেই সত্যই আবার জানান দিয়ে গেল। উল্লেখ্য, সেখানে উল্লেখযোগ্য সাংবাদিক ও সম্পাদকও চোখে পড়েনি। নিজেকেই দলছুট, একা একা লাগছিল। চারদিকে তাকিয়ে মনে হয়েছে, অনেকেই এসেছেন আবার অনেকেই আসেননি।

জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের এই দুর্বলতা তার জন্মসূত্রে পাওয়া সমস্যা যা ডাক্তারি ভাষায় congenital problem । এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছে অন্যান্য রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি সকলেই, যার যখন প্রয়োজন বা সুযোগ হয়েছে। অথচ once for all মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকার জন্য প্রকাশ্যে ও আন্তরিকভাবে ক্ষমা চেয়ে ফেললে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো জামায়াতে ইসলামীকে অত সহজে ব্যবহার করতে পারত না। আবার চাইলেও ছুড়ে ফেলতে পারত না।

ক্ষমা প্রার্থনার এই অনুষ্ঠান আমি এমনভাবে করতাম, তাতে গ্লানির চেয়ে স্বস্তি আসত বেশি। বিশেষ করে যেহেতু গ্লানি থাকা উচিত অপরাধ সংগঠনে ভুল করার জন্যে, ক্ষমা প্রার্থনা তো গ্লানি মুক্তির। তবে এ স্বস্তি পাওয়ার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনায় এত অনীহার যুক্তিসঙ্গত কারণ কী আমি বুঝি না। আমি আরও বুঝি না, কেন ক্ষমা প্রার্থনা করে দলকে দায়মুক্ত করে শক্তিশালী করা হবে না। কেন এটা তাদের রাজনীতির আদর্শ ও উদ্দেশ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সহায়ক হবে না, আমার বোধগম্য হয় না।

পাদটিকা: যুদ্ধাপরাধ, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বা জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের অন্যান্য প্রসঙ্গ এখানে আমার আলোচ্য নয়। এখানে শুধু স্বাধীনতা-বিরোধী রাজনৈতিক ভূমিকার কথা বিবেচনা করেছি।

নাঈমুল ইসলাম খান
সম্পাদক
দৈনিক আমাদের সময়
[মূল লেখার লিংক]
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই ডিসেম্বর, ২০০৭ ভোর ৫:৪৭
৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×