গত ১২ সেপ্টম্বর, ২০০৮ তারিখের দৈনিক প্রথম আলোর খোলা কলম পাতায় "বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা" শিরোনামে একটি প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে। বাংলাদেশ সহ দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি বর্তমানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে সম্প্রতি দুনিয়াজুড়ে খাদ্য সংকট তৈরী হওয়া এবং চাল ও গমের মজুদ কম ও আন্তর্জাতিক বাজারে তার উচ্চমূল্য তথা দূর্মূল্য হওয়ার ঘটনায় এই খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি সহজেই সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করে। ফলে, প্রথম আলোর সেই দীর্ঘ প্রবন্ধটিও পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে, প্রবন্ধটি আমার চোখে আসার সময়ে শিরোনাম বা প্রবন্ধের বিষয়ের চেয়েও যেটি আমাকে উৎসুক করেছে তা হচ্ছে এর রচয়িতা। প্রবন্ধটি লিখেছেন একজন জেনারেল, জেনারেল মঈন উ আহমেদ, এনডিসি, পিএসসি, বর্তমান সেনাবাহিনী প্রধান। আমার কাছে সেনাপ্রধানের কৃষি বিষয়ে জাতীয় দৈনিকে প্রবন্ধ লেখার ঘটনাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ! কেন তাৎপর্যপূর্ণ সে সম্পর্কে আগে দুচারটি কথা বলেই প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রবন্ধের দিকে যেতে চাই....
পট পরিবর্তনঃ
১/১১ এ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকেই আমাদের দেশে যে মানুষটি হঠাৎ করেই সকলের দৃষ্টির গোচরে অনেক বেশী করে আসতে থাকেন, তিনি সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন উ আহমেদ। এসময়কালে স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা প্রধান উপদেষ্টা, অন্যান্য উপদেষ্টামণ্ডলী মিডিয়ায় এসেছেন; কিন্তু একইভাবে আমাদের সেনাপ্রধানও সমস্ত মিডিয়ায় সমান গুরুত্ব পেয়েছেন এবং অন্য যেকোন সময়ের তুলনায় (সামরিক আমল ব্যতীত) একজন সেনাপ্রধানের এমন বাইরে আসাটা মোটামুটি বিরল ঘটনাই বলা যেতে পারে। দেশে জরুরী অবস্থা বিরাজ করছে সেই পট পরিবর্তনের পর থেকে, পুরো সেনাবাহিনীকেই এসময়ে খুব তৎপর থাকতে দেখা যাচ্ছে, জরুরী অবস্থার দোহাই দিয়ে অন্যান্য বাহিনীও তৎপর তবে সেনাবাহিনীর তৎপরতা চোখে পরার মত। তারচেয়ে বেশী চোখে পড়ে সেনাপ্রধানের তৎপরতা। আর, একসময় জনগণের সন্দেহ ঘুচানোর নিমিত্তে তাইতো সেনাপ্রধান বলেই বসেন তাঁর ক্ষমতা দখলের কোন আগ্রহ নেই, বাংলাদেশে সেনা শাসনের কোন সম্ভাবনা নেই। "রান্না ঘরে কে রে? আমি কলা খাই না" এরকমভাবে সরাসরি কেউ না বললেও, সেনাপ্রধানের আগ বাড়িয়ে সেই কথাগুলো আশঙ্কা-সন্দেহকে বাড়িয়েই তুলে বৈকি!
সেনা সমর্থন? নাকি নিয়ন্ত্রণ?
তবে এটা ঠিক যে, এই তত্তাবধায়ক সরকারকে সামরিক সরকার বা সেনা সরকার বলা যাবে না। আজকাল মিডিয়াগুলোতে অনেকে এই সরকারকে বলছে "সেনা সমর্থিত সরকার", তবে এর চেয়ে অধিকতর সঠিক হয় যদি একে "সেনা পরিচালিত/নিয়ন্ত্রিত সরকার' বা "মিলিটারি ব্যাকড গভরমেন্ট" বলা হয়।
তবে যেটাই বলা হোক না কেন, জনগণের কাছে এটা অন্তত পরিষ্কার যে, এই সরকার ও সেনাবাহিনীর মধ্যে বিশেষ একটা সম্পর্ক বিদ্যমান।
নতুন মডেল?
আজকাল বুর্জোয়াদের মধ্যে এই মডেলটি ক্রমশই জনপ্রিয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। মডেলটি হলো এমন- একটি সিভিল সরকার, যে শুধু নামেই সিভিল- দৃশ্যপটে থাকবে, আসলে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে সেনা ছাউনি থেকে। এর প্রধান কারণ সেনাশাসন সম্পর্কে দুনিয়াজুড়ে যে নেতিবাচক ধারণা বিরাজ করে- তা জনগণের মধ্যে গ্রহণযোগ্য করে তোলা কঠিন এবং দ্বিতীয়ত বুর্জোয়ারা (দেশী বা আন্তর্জাতিক) সেনা শাসনের ফলস্রুতিতে একনায়ক-স্বেচ্ছাচারী স্বৈরশাসকের আবির্ভাব ঘটার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিতে পারে না। তবে কারণ হিসাবে প্রথমটিই প্রধান কেননা, বুর্জোয়ারা সেনা শাসকের মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থরক্ষার নিশ্চয়তা পেলে দ্বিতীয়টিতে আপত্তি যে করেনা তার নজিরও আছে।
বাংলাদেশেও এই মডেলটির কথা ভাবা হচ্ছিল অনেক আগে থেকেই। বিশেষ করে প্রধান দুই বুর্জোয়া দলের সীমাহীন দুর্নীতি এবং সংঘাতময় রাজনীতি, মানুষের মধ্যে দুই দলের প্রতি বিরূপতা বৃদ্ধি এসমস্তকে কেন্দ্র করে, একদল সুশীল সমাজের প্রতিনিধি রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন, দুর্নীতি, স্বজনপ্রিয়তা, পরিবার প্রথা প্রভৃতির বিরুদ্ধে জোরে শোরে আওয়াজ তুলতে থাকেন। সাথে সাথে তারা হরতাল, অবরোধ, ধর্মঘট প্রভৃতি গণতান্ত্রিক অধিকার রদের কথা বলতে থাকেন, ছাত্র রাজনীতি তুলে দেয়ার কথা বলতে থাকেন, রাস্তা বন্ধ করে মিছিল সমাবেশ করার বিরুদ্ধে কথা বলতে থাকেন। এসমস্তই তারা বলতে থাকেন প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক সমস্যা সংকটের সাথে একত্র করেই। ফলে, জনগণের বিশেষ করে মধ্যবিত্তের টাটকা স্মৃতিতে প্রধান দুই দলের বিরুদ্ধ মনোভাবের কারণে এই সুশীল সমাজের অনেক প্রচারণাই সমাজে একটি জায়গা পায়। মধ্যবিত্ত ভাষা পায়। কিন্তু এতদসত্তেও কোন সাংগাঠনিক ভিত্তি না থাকার দরুন, আওয়ামী লীগ-বিএনপির প্রতি ত্যাক্ত-বিরক্ত জনগণ বিকল্প হিসাবে তাদের গ্রহণ করতে পারে না।
যাহোক যেটা বলছিলাম, এই সুশীলদের কর্মকাণ্ড টকশো- সভাসমিতি- সেমিনার - কলাম লেখা এসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে দেখা যায়। তেমনি এক টক শো- বিবিসি সংলাপে প্রথম আলোর সম্পাদক, মতিউর রহমান এই মডেলটির কথা, তার যৌক্তিক ভিত্তি, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই মডেলের উপযোগীতা এসব সম্পর্কে তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। সেই মডেলটি হলো পেছনে অর্থাৎ অন্তরালে সেনা শাসন- এবং সামনে সুশীল সমাজ এই সমন্বয়ে গঠিত সরকার।(১)
এরপরে ১/১১ এর পট পরিবর্তনের পরেই শুরু হয় এ সংক্রান্ত প্রকৃত উদ্যোগ। চলে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। একদিকে রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে ক্রমান্বয়ে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা, মামলায় জামিন না দিয়ে কারাগারে প্রেরণ, শীর্ষ দুই নেত্রীকে দেশ থেকে নির্বাসনের প্রচেস্টা, তাতে ব্যর্থ হয়ে দুই নেত্রীকে জেলে প্রেরণ- এ সমস্তকে কেন্দ্র করে রাজনীতির বিরুদ্ধেই এক ধরণের প্রচারণা, জরুরী অবস্থা জারি করে সমস্ত গণতান্ত্রিক-রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করে রাখা; আর অন্যদিকে সুশীলদের একটি প্লাটফর্ম গড়ে তোলা- সুশীলদের নেতা বানানো, সুশীলদের লাইমলাইটে নিয়ে আসা- এই দ্বিবিধ কাজই সরকার করতে থাকে। কামাল হোসেন- বদরুদ্দোজা এক্সপেরিমেন্ট শেষে আসে নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ইউনুস এবং তারপরে কোরেশী। যদিও সরকারের সর্বোচ্চ সহযোগীতা সত্তেও কোন এক্সপেরিমেন্টই সফল হয় না।
এসব এক্সপেরিমেন্ট সফল না হলেও, মডেল থেকে সরে যাওয়ার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, বা সরে যাওয়ার কথাও নয়। কেননা বুর্জোয়া (দেশীয় ও আন্তর্জাতিক)দের জন্য এটাই দুর্দান্ত একটা সুযোগ। এখনও চলছে এক্সপেরিমেন্ট, নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ীই সমস্ত কিছু এগুচ্ছে বলেই প্রতিভাত হয় এবং এসব এক্সপেরিমেন্ট তথা পরিকল্পনায় সেই মডেলকে বাদ দেয়ার কোন সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। ফলে, ধরে নেয়াই যায় যে এখনকার মত আগামী আরো বেশ কিছু সময় সেনাপ্রধান মঈন উ আহমদ এখানে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকছেন।
সেনাপ্রধানঃ সুশীল ভাবমূর্তি
পট পরিবর্তনের পর থেকে আমাদের সেনাপ্রধানের হঠাৎ করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার বিষয়টি নিয়ে এর মধ্যেই বলেছি। সেনাপ্রধানের নানাভাবে লাইম লাইটে আসার ঘটনাগুলো যদি আমরা দেখি- তবে কিছু বিষয়ও আমাদের চোখে আসার কথা। এবারের সেনাপ্রধানের অবস্থান সেনাশাসন চলাকালীন সময়কার অবস্থানের চেয়ে কিছুটা আলাদা। আলাদা এভাবে এবং একারণে যে, এসময়কালে জেনারেল মঈন উ আহমদ তাঁর তথা সেনাবাহিনীর একটি উজ্জল ভাবমূর্তি গড়ে তোলার ব্যাপারে দারুন যত্নশীল (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা, ছাত্র আন্দোলন সেই ভাবমূর্তিটিকে যথেস্ট প্রশ্নবিদ্ধ করেছে!)। বিশেষ করে, সেনাপ্রধান তার বক্তৃতায়, বিবৃতিতে সবসময়ই সেরকম একটি ভাবমূর্তি ধরে রাখার ব্যাপারে সচেস্ট ছিলেন বা এখনও আছেন। ফলে, মাঝে মধ্যেই তাকে জনদরদী হতে দেখা যায়, জন গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সমস্যায় মতামত দেয়া থেকে শুরু করে, জাতির সামনে করণীয়, এগিয়ে যাওয়ার বিভিন্ন পথ বাতলে দিতেও তাকে দেখা যায় । এমনকি সরকারের বিভিন্ন নীতি-নির্ধারণী বিষয়েও তাকে কথা বলতে দেখা যায়, তত্তাবধায়ক সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড যৌক্তিক ও সহনশীল করে উপস্থাপন করাটাও দৃশ্যমান হয়- কখনো সরকারের আগেই তাকে কোন কোন বিষয়ে কথা বলতে দেখা গেছে যেটিতে পরবর্তীতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। সমস্ত কিছুই দুটো বিষয়ের ব্যাপারে নিশ্চিৎ সাক্ষ্য দেয়ঃ
১। তত্তাবধায়ক সরকার এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে অন্তত একটি আন্ত সংযোগ বিরাজমান, যেখানে কখনো কখনো সরকার সেনাবাহিনীর আজ্ঞাবহ।
২। সেনাবাহিনীকে জনগণের মধ্যে সহনীয় করে তোলার ব্যাপারে দুপক্ষই বিশেষ উদ্যোগী ও যত্নশীল, ক্ষেত্রবিশেষে জনগণের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয়তা যে আবশ্যক এমন একটি ভাবমানস গড়ে তোলার চেস্টাও দৃশ্যমান।
সুতরাং, এ কথা খুব সহজেই পরিষ্কার যে, সেনাপ্রধানের বক্তব্য- প্রথম আলোর নিবন্ধ নিছক মতামত, বিশ্লেষণ কিংবা ব্যক্তিবিশেষের চিন্তার প্রকাশ নয়; বরং এর চেয়েও আরো কিছু তাৎপর্য অবশ্যই সেটি দাবী করে। আমার মতে, বিভিন্ন লক্ষণ পর্যালোচনা করে আমার মনে হয়েছে, সেনাপ্রধানের বক্তব্যকে বর্তমান শাসক গোষ্ঠীর বক্তব্য হিসাবেই দেখতে হবে, এবং এসবের মধ্যে যেসব কিছু করণীয় বা উপদেশ হিসাবে জাতির সামনে উপস্থাপিত হচ্ছে, সেগুলোকে শাসক গোষ্ঠীর আশু কর্মসূচী হিসাবেও ধরা যেতে পারে। সে অর্থে বলা যেতে পারে, তার বক্তব্য শাসক গোষ্ঠীর নীতি নির্ধারণী বক্তব্যেরই অংশ বিশেষ, যা জনগণের মাঝে শাসক গোষ্ঠীর সেই বক্তব্যকে গ্রহণযোগ্য করে উপস্থাপনের এক প্রয়াস মাত্র। মূলত এ কাজটি শাসক গোষ্ঠীর অনুগত বুদ্ধিজীবি শ্রেণীর কাজ হলেও, সেনাপ্রধানের এ ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার পেছেনে জনগণের সামনে একটি সিভিল রূপ নিয়ে হাজির হওয়ার পরিকল্পনা থাকতে পারে বলেই মনে হয়।
এ বিষয়টি মাথায় রেখেই প্রথম আলোর নিবন্ধের দিকে সকলের দৃষ্টি দেয়ার আহবান জানাই।
………………….
(চলবে )

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

